রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩

নথি লুটেরও অভিযোগ

দুধ দিয়ে গোসল করে আ.লীগ ছাড়ার ঘোষণা দেওয়া চেয়ারম্যানকে ঘিরে তাণ্ডব, ইউপি সচিবকে পিটিয়ে আহত; ৩৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা

এবিএম আতিকুর রহমান বাশার, বিশেষ প্রতিবেদক : প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬, ৯:৪৮ পিএম
দেবীদ্বারের ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যানের পুনর্বহালকে কেন্দ্র করে হামলা-ভাঙচুরের পর ইউপি কার্যালয়ের চিত্র এবং দুধ দিয়ে গোসল করে আওয়ামী লীগ ছাড়ার ঘোষণা দেওয়া চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান মাসুদের সংগৃহীত ছবি।

দেবীদ্বারের ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যানের পুনর্বহালকে কেন্দ্র করে হামলা-ভাঙচুরের পর ইউপি কার্যালয়ের চিত্র এবং দুধ দিয়ে গোসল করে আওয়ামী লীগ ছাড়ার ঘোষণা দেওয়া চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান মাসুদের সংগৃহীত ছবি। আজকের কথা

সংবাদের মূল সারসংক্ষেপ

  • দুধ দিয়ে গোসল করা কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান মাসুদের পুনর্বহালকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হামলা, ভাঙচুর, ইউপি সচিবকে মারধর এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিপত্র নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে ৩৮ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
  • তবে ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এ মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
  • সোমবার (২০ জুলাই) সকাল ১০টার দিকে উপজেলার ৬ নম্বর ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে।

দুধ দিয়ে গোসল করা কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান মাসুদের পুনর্বহালকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হামলা, ভাঙচুর, ইউপি সচিবকে মারধর এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিপত্র নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে ৩৮ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও এ মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

সোমবার (২০ জুলাই) সকাল ১০টার দিকে উপজেলার ৬ নম্বর ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। ওই রাতেই ইউনিয়ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা (ইউপি সচিব) আবু হানিফ রানা বাদী হয়ে দেবীদ্বার থানায় ৮ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ২৫ থেকে ৩০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা দায়ের করেন।

কামরুজ্জামান মাসুদ ফতেহাবাদ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ কার্যক্রম) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি দুধ দিয়ে গোসল করে আওয়ামী লীগ ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় আসেন। পরে জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে রুবেল হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলার আসামি হন এবং দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন।

পুলিশ, লিখিত অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিভাগীয় কমিশনারের নির্দেশে সোমবার কামরুজ্জামান মাসুদের চেয়ারম্যান হিসেবে পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণের কথা ছিল। বিষয়টি জানাজানি হলে ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের সামনে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন। একপর্যায়ে উত্তেজনার মধ্যে একদল ব্যক্তি ইউপি সচিব আবু হানিফ রানার কক্ষে ঢুকে তাকে মারধর করে। হামলাকারীরা চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাঙচুর করে বলে অভিযোগ রয়েছে।

খবর পেয়ে দেবীদ্বার থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে আহত ইউপি সচিবকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর একাধিক মামলার আসামি হয়ে কামরুজ্জামান মাসুদ দীর্ঘদিন অনুপস্থিত ছিলেন। এ সময় তিনি অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তিন মাসের ছুটিতে যান এবং ইউপি সদস্য মো. সালাউদ্দিন রুহুলকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেন।

পরবর্তীতে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে নিম্ন আদালতে হাজির হলে আদালত তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। প্রায় এক মাস আগে তিনি আবারও উচ্চ আদালত থেকে জামিন লাভ করেন। পরে বিভাগীয় কমিশনারের কাছে আবেদন করলে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব ফিরে পান এবং সোমবার দায়িত্ব গ্রহণের কথা ছিল।

ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. সালাউদ্দিন রুহুল বলেন, প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় ইউপি কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও গণঅধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থকেরা ইউপি সচিবের কক্ষে ঢুকে তাকে মারধর করেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে কামরুজ্জামান মাসুদের চেয়ারম্যান পদে পুনর্বহাল হওয়া কঠিন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এ বিষয়ে কামরুজ্জামান মাসুদ বলেন, “বিভাগীয় কমিশনারের নির্দেশেই আমি আমার পদে যোগদান করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মব সন্ত্রাসের আশঙ্কায় যেতে পারিনি। এখন প্রশাসন কী ব্যবস্থা নেয়, সেটাই দেখার বিষয়।”

মামলার বাদী ও হামলার শিকার ইউপি সচিব আবু হানিফ রানা বলেন, তিনি নিয়মিত দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের জন্য কার্যালয়ে গেলে জাকির হোসেন ও মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে কয়েকজন ব্যক্তি তার কক্ষে ঢুকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। পরে তারা কিল-ঘুষি, লাথি ও লাঠি দিয়ে মারধর করেন এবং একপর্যায়ে চেয়ার দিয়ে মাথায় আঘাত করেন। হামলাকারীরা তাকে মেঝেতে ফেলে মারধরের পাশাপাশি অফিসের চেয়ার-টেবিলসহ আসবাবপত্র ভাঙচুর, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিঁড়ে ফেলা এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথিপত্র নিয়ে যায় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে থানায় মামলা দায়ের করেন।

দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “মামলা দায়েরের পর থেকে অভিযুক্তরা পলাতক রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।”

সর্বশেষ সংবাদের জন্য যুক্ত থাকুন:
সম্পাদকীয় নোট

প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী

সম্পাদক- দৈনিক আজকের কথা
0 0 votes
রেটিং দিন।
Subscribe
Notify of
guest
0 মন্তব্যসমূহ
Oldest
Newest Most Voted
এলাকার খবর

রহস্য ঘনীভূত

জামায়াত এমপির সঙ্গে হোটেলকাণ্ডে আলোচিত মরিয়ম, এবার লাশ পাওয়া গেল ন্যাম ভবনে

খাদিজা বেগম, বিশেষ প্রতিবেদক : প্রকাশিত: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:০২ পিএম
জামায়াত এমপির সঙ্গে হোটেলকাণ্ডে আলোচিত মরিয়ম, এবার লাশ পাওয়া গেল ন্যাম ভবনে

ন্যাম ভবনে এমপি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ

রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানাধীন ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য জিএম নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়ম খাতুনের (১৯) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাত ৭টার দিকে খবর পেয়ে ন্যাম ভবনে যায় শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ। পরে ভবনের একটি কক্ষে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় মরিয়মের মরদেহ দেখতে পায় পুলিশ।

মরিয়ম খাতুনকে এর আগে একটি হোটেলকেন্দ্রিক ভিডিওকাণ্ড ঘিরে আলোচনায় আসা সংসদ সদস্য জিএম নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। তবে তার মৃত্যুর কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

দৈনিক আজকের কথা
খবর পেয়ে আমিসহ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এসেছি। ভবনের একটি রুমের জানালা দিয়ে মরদেহ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা গেছে। পিবিআই ও সিআইডির ফরেনসিক দলকে ডাকা হয়েছে। এরপর থানা পুলিশ রুমে প্রবেশ করবে। তবে কখন তিনি আত্মহত্যা করেছেন, এ বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
— ইবনে মিজান
উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি), তেজগাঁও বিভাগ, ডিএমপি

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, খবর পেয়ে তিনি ও থানা পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গেছেন। ভবনের একটি কক্ষের জানালা দিয়ে মরদেহটি ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা যায়।

তিনি জানান, ঘটনাস্থলে পিবিআই ও সিআইডির ফরেনসিক দলকে ডাকা হয়েছে। তাদের উপস্থিতিতে পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

মরিয়ম খাতুন কখন মারা গেছেন এবং মৃত্যুর পেছনে কী কারণ রয়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তা।

পুলিশের তদন্ত ও ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যেতে পারে।

দেবীদ্বারে হত্যা-নাশকতা মামলায় ছাত্রলীগের দুই নেতা গ্রেপ্তার

এবিএম আতিকুর রহমান বাশার, বিশেষ প্রতিবেদক : প্রকাশিত: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৩৫ পিএম
দেবীদ্বারে হত্যা-নাশকতা মামলায় ছাত্রলীগের দুই নেতা গ্রেপ্তার

কুমিল্লার দেবীদ্বারে হত্যা ও সন্ত্রাসবিরোধী নাশকতা মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের দুই নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে দেবীদ্বার থানা পুলিশ। গ্রেপ্তার দুজনের মধ্যে একজন সাব্বির হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি এবং অপরজন সন্ত্রাসবিরোধী নাশকতা মামলার আসামি।

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে গ্রেপ্তার দুজনকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এর আগে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে পৃথক স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—দেবীদ্বার উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ও এলাহাবাদ গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে মো. আল-আমিন অভি (২৯) এবং দেবীদ্বার বরকামতা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ও একই ইউনিয়নের বাগুর গ্রামের বাবুল সরকারের ছেলে মো. আশরাফুল সরকার রাতুল (২০)।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আমিনুল ইসলাম সাব্বিরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে পিটিয়ে আহত করা হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একই বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান। এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার আল-আমিন অভি এজাহারভুক্ত ৪৪ নম্বর আসামি।

দৈনিক আজকের কথা
সাব্বির হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছাত্রলীগ নেতা আল-আমিন অভি এবং নাশকতা মামলার আসামি আশরাফুল সরকার রাতুলকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
— মো. মনিরুজ্জামান
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), দেবীদ্বার থানা।

মামলা দায়েরের পর থেকেই অভি পলাতক ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। এছাড়া সম্প্রতি ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যুবলীগের ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় মুরাদনগর থানায় দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী মামলায়ও তিনি এজাহারনামীয় ১৯ নম্বর আসামি। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অন্যদিকে, দেবীদ্বার থানাধীন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের খাদঘর এলাকায় ছাত্রলীগের প্ল্যাকার্ড হাতে সরকারবিরোধী মিছিল এবং নাশকতার প্রস্তুতির ঘটনায় তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আশরাফুল সরকার রাতুলকে সন্ত্রাসবিরোধী নাশকতা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

তুহিনের বাড়িতে মিলল আইফোন

খুন করে শোকের ভান, অপ্রতিমের মাকেও সান্ত্বনা দেয় খুনিরা: পুলিশ

খাদিজা বেগম, বিশেষ প্রতিবেদক : প্রকাশিত: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:২৪ পিএম
খুন করে শোকের ভান, অপ্রতিমের মাকেও সান্ত্বনা দেয় খুনিরা: পুলিশ

আইফোন ছিনিয়ে নিতে পাহাড়ি জঙ্গলে নিয়ে হত্যা, প্রধান পরিকল্পনাকারীসহ চারজন গ্রেপ্তার

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। আরও হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, হত্যাকাণ্ডের পরদিন অপ্রতিমের বাড়িতে গিয়ে তার শোকাহত মাকে সান্ত্বনাও দিয়েছিল হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা।

রোববার দুপুরে কুমিল্লায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান এসব তথ্য জানান। এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের প্রধান পরিকল্পনাকারী সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনটিও উদ্ধার করা হয়েছে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন কুমিল্লা নগরীর সানন্দা এলাকার সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫), কোতোয়ালি থানার হাতিগাড়া এলাকার মো. কামরুল হাসান এবং আফজাল খান ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. সিয়াম (১৯)।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, গত ১৮ সেপ্টেম্বর জুমার নামাজের পর কুমিল্লা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতিমকে দেখা যায়। পরে মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করে তাকে এক ঘণ্টার জন্য বাইরে যাওয়ার কথা বলে ডেকে নেয় তুহিন।

সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটের দিকে তুহিন অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের পাশ দিয়ে সানন্দা এলাকার দিকে যায়। পরে ফাহাদ ও কামরুলও ওই এলাকার একটি নির্জন জঙ্গলের দিকে যায়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে পাহাড়ঘেরা নির্জন এলাকায় অপ্রতিমের কাছে থাকা আইফোনটি নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে অপ্রতিম বাধা দিলে তুহিনের সঙ্গে তার ধস্তাধস্তি শুরু হয়। পরে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে। একপর্যায়ে অপ্রতিমের মৃত্যু হলে তার আইফোন নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায় তারা।

দৈনিক আজকের কথা
প্রাথমিক তদন্তে আমরা জানতে পেরেছি, অপ্রতিমকে তার ব্যবহৃত আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আইফোন নেওয়ার চেষ্টা করলে অপ্রতিম বাধা দেয়। একপর্যায়ে তাকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। হত্যার পরদিনও আসামিরা অপ্রতিমের বাড়িতে গিয়ে তার শোকাহত মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভান করেছে। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য ও জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে আমরা ঘটনাটির রহস্য উদঘাটন করেছি। তদন্ত শেষে দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিলের প্রস্তুতি চলছে।
— আনিসুজ্জামান
পুলিশ সুপার, কুমিল্লা।

কিন্তু হত্যার পরও থামেনি নির্মমতার এই অধ্যায়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, পরদিন শনিবার সকালে তুহিনসহ কয়েকজন অপ্রতিমের বাড়িতে গিয়ে তার শোকাহত মাকে সান্ত্বনা দেয়। তখনও পরিবার জানত না, যাদের একজন তাদের পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছে, তার বিরুদ্ধেই উঠছে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ।

অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেন। সন্ধান না পেয়ে রাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়।

পরদিন শনিবার দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণে সালমানপুর এলাকার পাহাড়ঘেরা জঙ্গলে স্থানীয় লোকজন ও শিক্ষার্থীরা অপ্রতিমের মরদেহ দেখতে পান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিমের মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল।

পরে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলের নেতারা তুহিনকে শনাক্ত করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাকে আটক করার পর পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্যদেরও গ্রেপ্তার করা হয়। তুহিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তার বাসা থেকে অপ্রতিমের আইফোন উদ্ধার করা হয়েছে।

নিহত অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। সে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে অপ্রতিমের বাবা-মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। স্বজন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া।

রোববার সকালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকায় নিজ বাড়ির পাশের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও তার স্মরণে বিশ্ববিদ্যালয়ে শোক কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। এ কারণে স্থগিত রাখা হয়েছে ক্লাস ও পরীক্ষা। নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান আরো জানান, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটন করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়াই হত্যার উদ্দেশ্য ছিল বলে জানা গেছে। মামলার তদন্ত শেষ করে দ্রুত আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের প্রস্তুতি চলছে।

অপ্রতিমের মরদেহ এখন মাটির নিচে। কিন্তু তার হত্যাকাণ্ড ঘিরে কুমিল্লাজুড়ে যে প্রশ্ন ও শোক তৈরি হয়েছে, তা আরও গভীর হয়েছে একটি কারণে—একটি শিশুকে হত্যার পর তারই শোকাহত মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো নির্মম পরিহাসও ঘটেছে এই ঘটনায়।

×
ENG