‘সবাইকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে হবে’—কায়েস মীর

‘সবাইকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে হবে’—কায়েস মীর। ছবি : দৈনিক আজকের কথা
মুরাদনগরে পুটিয়াজুরী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন (কায়কোবাদ) নূরানী ও হাফিজিয়া মাদ্রাসার উদ্বোধন
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ১৯ নম্বর দারোরা ইউনিয়নের কাজিয়াতল এলাকায় ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রসারে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘পুটিয়াজুরী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন (কায়কোবাদ) নূরানী ও হাফিজিয়া মাদ্রাসা’র শুভ উদ্বোধন করা হয়েছে। শনিবার (২২ আগস্ট) বিকেল ৩টায় পুটিয়াজুরী এলাকার মাদ্রাসা হলরুমে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে এ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সদস্য, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। নতুন এই মাদ্রাসাকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে উৎসাহ ও আগ্রহ দেখা যায়। বিশেষ করে এলাকার শিশু-কিশোরদের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন সংশ্লিষ্টরা।

সবাইকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে হবে এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় সৎ সাহস রাখতে হবে।
তিনি বলেন, একটি আদর্শ সমাজ গঠনে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মানবিকতা, সততা ও মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার মানসিকতা তৈরি করতে পারলে ভবিষ্যতে তারা সমাজ ও দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
কায়েস মীর আরও বলেন, নতুন প্রজন্মকে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার দায়িত্ব পরিবার, শিক্ষক ও সমাজের সবার। অন্যায় দেখেও নীরব থাকা উচিত নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো সাহস এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার মতো মানসিকতা প্রত্যেকের মধ্যে তৈরি করতে হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও ১৭ নম্বর জাহাঙ্গীরপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আলহাজ্ব সৈয়দ তৌফিক আহমেদ মীর-এর। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখার কথা ছিল মুরাদনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আনোয়ার হোসেন চৌধুরী-এর।
অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য উপস্থাপন করেন সোনাকান্দা কামিল মাদ্রাসার আরবি প্রভাষক হযরত মাওলানা মো. সাইদুল ইসলাম আলামিন মাহমুদী। তিনি ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব, কোরআন-সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনা এবং শিশু-কিশোরদের নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার ওপর আলোচনা করেন।
তিনি বলেন, একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের শুরুতেই তার মধ্যে সঠিক মূল্যবোধ তৈরি করা জরুরি। কোরআন শিক্ষা শুধু ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের বিষয় নয়; এর মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী সত্যবাদিতা, শৃঙ্খলা, মানবিকতা, পরোপকার ও ন্যায়বোধের শিক্ষা লাভ করতে পারে। তাই আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার সমন্বয় প্রয়োজন।
আয়োজকরা জানান, এলাকার শিশু-কিশোরদের প্রাথমিক কোরআন শিক্ষা, নূরানী শিক্ষা ও হিফজুল কোরআনের সুযোগ তৈরি করার লক্ষ্যেই মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয়ভাবে ধর্মীয় শিক্ষার একটি উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের চরিত্রবান ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যাশা রয়েছে তাদের।
অনুষ্ঠানের শেষপর্বে গোপালনগর মাদ্রাসা জামে মসজিদের খতিব আলহাজ্ব হযরত মাওলানা জয়নাল আবেদীন-এর পরিচালনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। মোনাজাতে মাদ্রাসার উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কল্যাণ এবং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার সফলতা কামনা করা হয়।
এ সময় মাদ্রাসার ছাত্রদের কোরআন শিক্ষার সবক প্রদান করা হয়। নতুন শিক্ষার্থীদের কোরআন শিক্ষার আনুষ্ঠানিক যাত্রাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠানে এক আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মো. আনোয়ার হোসেন মাস্টার বলেন, এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার সুযোগ তৈরির উদ্দেশ্যেই এ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে মাদ্রাসাটিকে আরও উন্নত ও আধুনিক শিক্ষার পরিবেশে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের শুধু কোরআন পড়তে শেখানো নয়, কোরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার জন্যও প্রস্তুত করাই আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। আমরা চাই, এখান থেকে এমন শিক্ষার্থী বের হয়ে আসুক, যারা পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য কল্যাণকর মানুষ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।”
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সদস্যবৃন্দ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, স্থানীয় আলেম-ওলামা, অভিভাবক এবং এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয়রা জানান, এলাকায় একটি নূরানী ও হাফিজিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার ফলে শিশু-কিশোরদের কোরআন ও ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ আরও সহজ হবে। পাশাপাশি অভিভাবকরাও নিজেদের সন্তানদের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করার ক্ষেত্রে নতুন একটি সুযোগ পাবেন।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, ‘পুটিয়াজুরী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন (কায়কোবাদ) নূরানী ও হাফিজিয়া মাদ্রাসা’ ভবিষ্যতে শুধু একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং নৈতিকতা, মানবিকতা ও মূল্যবোধসম্পন্ন প্রজন্ম গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মাদ্রাসাটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যেও সৃষ্টি হয়েছে নতুন আশাবাদ। তাদের প্রত্যাশা, নিয়মিত পাঠদান ও দক্ষ শিক্ষকমণ্ডলীর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি অল্প সময়ের মধ্যেই এলাকার শিক্ষা ও ধর্মীয় চর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।
সব ধর্মের মানুষের অধিকার নিশ্চিতের অঙ্গীকার
জন্মাষ্টমীর আয়োজনে কায়কোবাদ, ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তায় ঐক্যের ডাক

রাজধানীতে শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ। ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সব সম্প্রদায়ের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের বার্তা নিয়ে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার।” তিনি দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার এবং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সবার সমঅধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা তুলে ধরেন।

ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ও অধিকার রয়েছে। রাষ্ট্র সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করবে।
ধর্মমন্ত্রী কায়কোবাদ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার পরিবেশ বজায় রাখার গুরুত্বকে সামনে আনেন। তাঁর উপস্থিতিতে জন্মাষ্টমীর এ আয়োজন বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বার্তাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। ধর্মীয় উৎসবগুলো যেন নির্বিঘ্নে ও উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দুই স্বাস্থ্যকর্মীর হাতে সাড়ে ১০ হাজারের বেশি স্বাভাবিক প্রসব

নিরাপদ মাতৃত্বে আস্থার প্রতীক নাজমা-শিরিনা
কখনো গভীর রাতে, কখনো ভোরের আগে—প্রসববেদনায় কাতর মায়ের পাশে ছুটে যেতে হয়েছে তাঁদের। দীর্ঘদিনের দক্ষতা, আন্তরিকতা ও সেবার মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দুটি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে স্বাভাবিক প্রসবের ক্ষেত্রে তাঁরা হয়ে উঠেছেন আস্থা ও ভরসার নাম। তাঁদের তত্ত্বাবধানে পৃথিবীর আলো দেখেছে সাড়ে ১০ হাজারের বেশি শিশু।
এই দুই স্বাস্থ্যকর্মী হলেন বাঞ্ছারামপুর উপজেলার দরিয়াদৌলত ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা নাজমা আক্তার এবং বিজয়নগর উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা শিরিনা চৌধুরী।
পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নাজমা আক্তার গত ১২ বছরে প্রায় ৩ হাজার এবং শিরিনা চৌধুরী ৩৪ বছরে ৭ হাজার ৫৭৩টি স্বাভাবিক প্রসব করিয়েছেন।
নাজমার সুনাম ছড়িয়েছে আশপাশেও
নাজমা আক্তার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার ছয়ফুল্লাহকান্দি ইউনিয়নের ফতেহপুর গ্রামের বাসিন্দা। ২০১৪ সালের ১০ ডিসেম্বর চাকরিতে যোগ দেন তিনি। ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় মাসের মিডওয়াইফারি প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তাঁর দক্ষতা ও সুনাম আরও বাড়ে।
বর্তমানে বাঞ্ছারামপুর ছাড়াও পাশের নবীনগর, নরসিংদী এবং কুমিল্লার হোমনা থেকেও প্রসূতিরা তাঁর কাছে আসেন।

স্বাস্থ্যকর্মী শিরিনা চৌধুরী ও নাজমা আক্তার স্বাভাবিক প্রসবে জেলায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁরা অসাধারণ কাজ করে যাচ্ছেন।
বাঞ্ছারামপুর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় ও দরিয়াদৌলত স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত নাজমার তত্ত্বাবধানে ২ হাজার ৪৪১টি স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই তিনি ২৮০টি প্রসবে সহায়তা করেছেন।
২০২২ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত উপজেলা পর্যায়ে টানা শ্রেষ্ঠ পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা হয়েছেন নাজমা। ২০২৪, ২০২৫ ও চলতি বছরেও তিনি জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ হয়েছেন।
গত ১৬ জুন দরিয়াদৌলত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, নাজমার কক্ষে রোগীর ভিড়। প্রসববেদনা নিয়ে পাশের কক্ষে অপেক্ষা করছিলেন এক প্রসূতি। আগের দিন বিকেল থেকে পরবর্তী ১৭ ঘণ্টায় পাঁচটি স্বাভাবিক প্রসবে সহায়তা করেন তিনি। এক দিনে সর্বোচ্চ ছয়টি প্রসব করানোর অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। তাঁর তত্ত্বাবধানে এ পর্যন্ত ১৫ জোড়া যমজ শিশুর জন্ম হয়েছে।
নাজমা আক্তার বলেন, দীর্ঘ সময় কাজ করে ক্লান্ত হয়ে পড়লেও সুস্থ নবজাতকের জন্মের পর সেই ক্লান্তি থাকে না। বর্তমানে তিনি প্রতি মাসে গড়ে ৪০ থেকে ৪৫টি স্বাভাবিক প্রসবে সহায়তা করেন। ২০১৯ সালের মিডওয়াইফারি প্রশিক্ষণের পর তাঁর দক্ষতা বাড়ার পাশাপাশি মানুষের আস্থাও বেড়েছে।
দরিয়াদৌলত গ্রামের আনসার আলী জানান, তাঁর এক নাতির জন্মও এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হয়েছে। নাজমার সুনাম এখন শুধু ইউনিয়ন নয়, পুরো উপজেলা ও আশপাশের এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে।
৩৪ বছরে শিরিনার ৭ হাজার ৫৭৩ প্রসব
বিজয়নগরের পাহাড়পুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে শিরিনা চৌধুরী ১৯৯২ সালের জুনে পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা হিসেবে যোগ দেন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯২ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত মাসে গড়ে ৮ থেকে ৯টি এবং ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ২৫ থেকে ৩০টি স্বাভাবিক প্রসব করিয়েছেন তিনি।
হিসাব অনুযায়ী, ৩৪ বছরে তাঁর তত্ত্বাবধানে ৭ হাজার ৫৭৩টি স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এক মাসেই ৪৭টি প্রসব করিয়ে রেকর্ড গড়েন তিনি।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর ২০১৯ সাল থেকে অনলাইনে প্রসবের তথ্য সংরক্ষণ করছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত বিজয়নগরের ১০টি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে মোট ৫ হাজার ৫৫২টি স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে। এর মধ্যে শিরিনা একাই করিয়েছেন ২ হাজার ৪৩৯টি।
বর্তমানে উপজেলার চারটি কেন্দ্রে স্বাভাবিক প্রসব কার্যক্রম চালু রয়েছে। বাকি ছয়টি কেন্দ্রে প্রসব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
শিরিনা চৌধুরী বলেন, চাকরির শুরুর দিকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রসব করাতে হতো। পরে মানুষকে সচেতন করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রমুখী করা হয়। সেবার সাফল্যের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রসূতিদের আস্থাও বেড়েছে। দূরদূরান্ত থেকেও এখন অনেকে এখানে আসেন। অসংখ্য নির্ঘুম রাত পার হলেও সুস্থ নবজাতকের জন্মের মুহূর্তে সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।
স্বাস্থ্যসেবায় অবদানের জন্য শিরিনা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে একাধিকবার পুরস্কৃত হয়েছেন। ২০১০ সাল থেকে তিনি উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা এবং পাহাড়পুর স্বাস্থ্যকেন্দ্রও শ্রেষ্ঠ হয়ে আসছে। ২০১৫ সালে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা এবং ২০১৮ সালে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতা পুরস্কার পান তিনি।
দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন দুই স্বাস্থ্যকর্মী
জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী বলেন, স্বাস্থ্যকর্মী শিরিনা চৌধুরী ও নাজমা আক্তার স্বাভাবিক প্রসবে জেলায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁরা অসাধারণ কাজ করে যাচ্ছেন।
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের সংগঠন অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সাবেক সভাপতি রওশন আরা বেগম তাঁদের প্রশংসা করে বলেন, এই দুই স্বাস্থ্যকর্মীকে সাধুবাদ ও স্যালুট জানানো উচিত। সারা দেশে স্বাভাবিক প্রসবের যে ধারা রয়েছে, তা অব্যাহত রাখার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
নাজমা আক্তার ও শিরিনা চৌধুরী জানান, কোনো প্রসূতির শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন মনে হলে তাঁরা দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত স্থানান্তরের সুবিধার্থে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখার পরামর্শও দেন তাঁরা।
দাউদকান্দির ইউএনওকে বদলি, এআই কণ্ঠে ‘নিউজ সরানোর’ দাবি—অখ্যাত পেজে অডিও, গভীর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

বদলির পর ছড়ানো অডিও ঘিরে নতুন বিতর্ক
কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাছরীন আক্তারকে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে এ বদলি করা হলেও আদেশ জারির এক সপ্তাহ পরও তিনি দাউদকান্দি থেকে বিদায় নেননি।
গত ২৩ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসন শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মো. বর্মন হোসেন স্বাক্ষরিত আদেশে নাছরীন আক্তারকে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ন্যস্ত করা হয়। আদেশে তাঁকে নিজ অধিক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ১৪৪ ধারার অধীনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। জনস্বার্থে জারিকৃত আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হওয়ার কথা বলা হয়।
তবে আদেশ জারির প্রায় এক সপ্তাহ পরও নাছরীন আক্তার দাউদকান্দিতে অবস্থান করছিলেন বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে তাঁর সরকারি মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে বদলি ও এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন আলোচনার বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (সাধারণ) সাইফুল ইসলাম বদলির বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ডিসি স্যার তাঁকে এ আদেশের বিষয়ে জানিয়েছেন। সরকারি চাকরিতে বদলি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া; মন্ত্রণালয় চাইলে যেকোনো কর্মকর্তাকে বদলি করতে পারে।
এদিকে ইউএনও নাছরীন আক্তারকে ঘিরে নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকটি অখ্যাত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ফেসবুক পেজে তাঁর কণ্ঠসদৃশ একটি অডিও ছড়িয়ে দিয়ে বিভিন্ন নিউজ সরিয়ে নেওয়ার দাবি করা হচ্ছে। তবে অডিওটি সত্যিই নাছরীন আক্তারের কণ্ঠ কি না, কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে কণ্ঠটি তৈরি বা পরিবর্তন করা হয়েছে কি না—তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সরকারি চাকরিতে বদলি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। মন্ত্রণালয় চাইলে যে কাউকেই বদলি করতে পারে।
অডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের কেউ কেউ এটিকে ইউএনও নাছরীন আক্তারের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ও গভীর ষড়যন্ত্র বলেও মন্তব্য করেছেন। বিশেষ করে বদলির খবর প্রকাশের পর এ ধরনের অডিও ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এর আগে গত ২৩ জুলাই দাউদকান্দি উপজেলা চেয়ারম্যানের বাসভবন ভেঙে মালামাল নিলামে না দিয়ে বিক্রি করার অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল। তবে ওই অভিযোগের সঙ্গে নাছরীন আক্তারের বর্তমান বদলির সরাসরি কোনো সম্পর্ক রয়েছে—এমন তথ্য সরকারি আদেশে উল্লেখ নেই।
সরকারি কর্মকর্তার কণ্ঠসদৃশ কোনো অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সেটির সত্যতা যাচাই না করে প্রচার করা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। ফলে অডিওটির উৎস, সত্যতা এবং এটি এআই-নির্মিত কি না—তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

































