রবিবার, ৯ আগস্ট ২০২৬, ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

নিখোঁজ মাথা-পা

দেবীদ্বারে গৃহবধূকে অর্ধশত টুকরো করে হত্যার অভিযোগ, ভাড়াটিয়া আটক

এবিএম আতিকুর রহমান বাশার, বিশেষ প্রতিবেদক : প্রকাশিত: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ১১:১০ পিএম
দেবীদ্বারে গৃহবধূকে অর্ধশত টুকরো করে হত্যার অভিযোগ, ভাড়াটিয়া আটক

দেবীদ্বারে গৃহবধূকে অর্ধশত টুকরো করে হত্যার অভিযোগ, ভাড়াটিয়া আটক। ছবি : আজকের কথা

সংবাদের মূল সারসংক্ষেপ

  • ৯ প্যাকেটে খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার, মাথা-পা এখনো নিখোঁজ কুমিল্লার দেবীদ্বারে ফরিদা বেগম (৫৫) নামে এক গৃহবধূকে নৃশংসভাবে হত্যার পর তাঁর মরদেহ অর্ধশতাধিক টুকরো করে বস্তা ও পলিথিনে প্যাকেট করে বাড়ির পেছনে ফেলে রাখার অভিযোগ উঠেছে।
  • এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে লাইলী বেগম (৩৫) নামে এক ভাড়াটিয়াকে আটক করেছে পুলিশ।
  • জিজ্ঞাসাবাদে লাইলী হত্যার কথা স্বীকার করেছেন এবং তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন জড়িত থাকার কথা জানিয়েছেন বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

৯ প্যাকেটে খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার, মাথা-পা এখনো নিখোঁজ

কুমিল্লার দেবীদ্বারে ফরিদা বেগম (৫৫) নামে এক গৃহবধূকে নৃশংসভাবে হত্যার পর তাঁর মরদেহ অর্ধশতাধিক টুকরো করে বস্তা ও পলিথিনে প্যাকেট করে বাড়ির পেছনে ফেলে রাখার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে লাইলী বেগম (৩৫) নামে এক ভাড়াটিয়াকে আটক করেছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে লাইলী হত্যার কথা স্বীকার করেছেন এবং তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন জড়িত থাকার কথা জানিয়েছেন বলে পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

নিহত ফরিদা বেগম কুমিল্লার দেবীদ্বার পৌর এলাকার ছোটআলমপুর মোহনা আবাসিক এলাকার মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়ার স্ত্রী। শনিবার (৮ আগস্ট) বিকেলে দেবীদ্বার দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়ার মালিকানাধীন বাসায় এ ঘটনা ঘটে।

ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বাড়ির পেছন থেকে পলিথিনে মোড়ানো একাধিক প্যাকেটে খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

সকাল থেকে নিখোঁজ ছিলেন ফরিদা

স্বজনদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, শনিবার সকাল থেকেই ফরিদা বেগমের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তাঁকে না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরে তাঁর সন্ধানে এলাকায় মাইকিং করা হয়।

স্বজনদের দাবি, ফরিদা বেগমকে খুঁজে না পেয়ে তাঁরা দেবীদ্বার থানায় নিখোঁজ সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে পুলিশ জিডি নেয়নি। তবে এ বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

এদিকে বিকেলের দিকে ফরিদা বেগমের বোনের ছেলে মামুন বাড়ির পেছনে গিয়ে সন্দেহজনক অবস্থায় কয়েকটি বস্তা ও প্যাকেট দেখতে পান। কাছে গিয়ে তিনি খণ্ডিত মরদেহ দেখতে পেয়ে বিষয়টি পুলিশকে জানান।

খবর পেয়ে দেবীদ্বার থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পলিথিন ও বস্তায় মোড়ানো মরদেহের খণ্ডিত অংশ উদ্ধার করে। একই সঙ্গে ওই বাড়ির ভাড়াটিয়া লাইলী বেগমকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।

৯ প্যাকেটে খণ্ডিত মরদেহ

দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান জানান, পলিথিনে মোড়ানো ফরিদা বেগমের খণ্ডিত মরদেহের ৯টি প্যাকেট উদ্ধার করা হয়েছে। তবে মরদেহের মাথা ও পা এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

ওসি বলেন, আটক লাইলী বেগমকে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আরও চারজনের নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁদের পরিচয় ও সম্পৃক্ততা যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁদের গ্রেপ্তারে পুলিশ চেষ্টা চালাচ্ছে।

তবে নিহত ফরিদা বেগমকে ঠিক কীভাবে হত্যা করা হয়েছে, কী কারণে হত্যা করা হয়েছে এবং মরদেহ কীভাবে এতগুলো অংশে বিভক্ত করা হয়েছে—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

মাত্র আট দিন আগে বাসাটি ভাড়া নেন লাইলী

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, লাইলী বেগমের স্বামী আবুল কালাম চট্টগ্রামে জাহাজে চাকরি করেন। ফরিদা বেগমের দুই মেয়ে রাবেয়া বসরী ও মরিয়ম আক্তারের বিয়ে হয়ে গেছে। তাঁরা বর্তমানে নিজ নিজ সংসারে থাকেন। তাঁদের এক ছেলে কয়েক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।

এদিকে লাইলী বেগম প্রায় আট দিন আগে দেবীদ্বার পৌর এলাকার চাপানগর গ্রাম থেকে এসে ফরিদা বেগমদের মালিকানাধীন ওই বাসায় একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন বলে জানা গেছে।

এত অল্প সময়ের মধ্যে একই বাড়ির বাসিন্দা ফরিদা বেগমের সঙ্গে তাঁর কী ধরনের সম্পর্ক বা বিরোধ তৈরি হয়েছিল, কিংবা হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না—তা নিয়েও এলাকায় নানা আলোচনা চলছে।

পুলিশ বলছে, ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে লাইলী বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাঁর দেওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা আলামতও তদন্তের আওতায় নেওয়া হচ্ছে।

জিজ্ঞাসাবাদে সহযোগীদের নাম

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের সময় লাইলী বেগম ফরিদা বেগমকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। পাশাপাশি তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন সহযোগী ছিলেন বলেও জানিয়েছেন।

ওসি মো. মনিরুজ্জামানের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক লাইলী আরও চারজনের নাম উল্লেখ করেছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে তাঁদের পরিচয় বা ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

পুলিশ জানিয়েছে, লাইলীর দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যাঁদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাঁদের আইনের আওতায় আনা হবে।

লাইলীর বিরুদ্ধে পুরোনো হত্যা মামলার তথ্য

এদিকে স্থানীয় সূত্রে লাইলী বেগমকে ঘিরে একটি পুরোনো হত্যা মামলার তথ্যও সামনে এসেছে।

সূত্রের দাবি, ২০২১ সালের ৭ নভেম্বর দেবীদ্বার এলাকায় একটি শিশু হত্যার ঘটনায় লাইলী বেগমসহ পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছিল। ওই ঘটনার সঙ্গে লাইলীর ভাসুর আমির হোসেনের নামও জড়িত ছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

ঘটনার বর্ণনা অনুযায়ী, আমির হোসেনের সাত বছর বয়সী মেয়ে ফাহিমা তাঁর বাবাকে লাইলী বেগমের সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে ওই শিশুকে হত্যা করা হয় বলে মামলার অভিযোগে উঠে আসে। এরপর শিশুটির মরদেহ বস্তাবন্দি করে কাচিসাইর পুলের নিচে ফেলে রাখা হয়েছিল বলে জানা যায়।

পরে একই বছরের ১৪ নভেম্বর বস্তাবন্দি অবস্থায় শিশুটির গলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ওই ঘটনায় লাইলী বেগমসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ সময় পর তাঁরা জামিনে মুক্তি পান। এরপর লাইলীর স্বামী আবুল কালাম আবার বিয়ে করেন বলেও স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।

তবে ওই পুরোনো মামলার সঙ্গে শনিবারের ফরিদা বেগম হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ বিষয়ে পুলিশও কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি পরিষ্কার হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্য ও উদ্বেগ

শনিবার বিকেলে ফরিদা বেগমের খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে ছোটআলমপুর ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ঘটনাস্থলে উৎসুক মানুষ ভিড় করেন। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে মরদেহের অংশগুলো উদ্ধার করে।

স্থানীয়রা বলছেন, একজন গৃহবধূকে এভাবে হত্যার পর মরদেহ খণ্ডিত করে বাড়ির পেছনে ফেলে রাখার ঘটনা অত্যন্ত ভয়াবহ। তাঁরা হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।

বিশেষ করে মরদেহের মাথা ও পা এখনো উদ্ধার না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এসব অংশ কোথায় রাখা হয়েছে এবং হত্যাকাণ্ডের পর কীভাবে মরদেহ সরানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, তা তদন্ত করে বের করার দাবি উঠেছে।

তদন্তে পুলিশের একাধিক দিক

পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ, ভুক্তভোগীর সঙ্গে অভিযুক্তদের সম্পর্ক, পূর্ববিরোধ, আর্থিক বা ব্যক্তিগত কোনো দ্বন্দ্ব এবং অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না—সবকিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

একই সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা পলিথিন, বস্তা ও অন্যান্য আলামত পরীক্ষা করা হবে। মরদেহের উদ্ধার হওয়া অংশগুলোর ময়নাতদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং হত্যার ধরন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

তদন্তকারীরা লাইলী বেগমের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে ঘটনাস্থলের আলামত ও অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে দেখছেন। তাঁর উল্লেখ করা চার ব্যক্তির ভূমিকা কী ছিল, তাঁরা ঘটনার সময় কোথায় ছিলেন এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও যাচাই করা হচ্ছে।

পুলিশের বক্তব্য

পলিথিনে মোড়ানো ফরিদা ইয়াসমিনের টুকরো করা লাশের ৯টি প্যাকেট উদ্ধার করা হয়েছে। তবে পা ও মাথা এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আটককৃত লাইলীকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আরও চারজনের নাম উল্লেখ করেছেন। যাচাই-বাছাই করে বাকি আসামিদের আটকের চেষ্টা চলছে।
মো. মনিরুজ্জামান
অফিসার ইনচার্জ (ওসি), দেবীদ্বার থানা, কুমিল্লা

পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তদন্তের স্বার্থে এখনই সব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার জন্য কাজ চলছে।

এদিকে ফরিদা বেগমের পরিবার ও স্বজনেরা এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, মরদেহের বাকি অংশ উদ্ধার এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

সর্বশেষ সংবাদের জন্য যুক্ত থাকুন:
সম্পাদকীয় নোট

প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী

সম্পাদক- দৈনিক আজকের কথা
0 0 votes
রেটিং দিন।
Subscribe
Notify of
guest
0 মন্তব্যসমূহ
Oldest
Newest Most Voted
এলাকার খবর

কঠোর হুঁশিয়ারি

সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়নে সরকারকে ৩ মাসের আল্টিমেটাম

ফাহিমা বেগম প্রিয়া, বিশেষ প্রতিবেদক : প্রকাশিত: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ৮:১৩ পিএম
সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়নে সরকারকে ৩ মাসের আল্টিমেটাম

নভেম্বরের মধ্যে আইন না হলে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

সাংবাদিক সুরক্ষায় আইন প্রণয়নের জন্য সরকারকে তিন মাসের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সভাপতি ও বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান আহমেদ আবু জাফর। আগামী নভেম্বরের মধ্যে সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা না হলে আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে আইন প্রণয়নে বাধ্য করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

শনিবার (৮ আগস্ট ২০২৬) কুমিল্লায় সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির নবগঠিত কুমিল্লা জেলা কমিটির পরিচিতি ও আলোচনা সভায় প্রধান বক্তার বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

আহমেদ আবু জাফর বলেন,

“সাংবাদিকদের কাছে ভালো সংবাদ চাইবেন, অথচ তাঁদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দেবেন না—এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সাংবাদিকদের জন্য কোনো সরকারই কার্যকরভাবে কিছু করেনি। জাতির বিবেক হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকদের গত ৫৫ বছর ধরে নানা আশ্বাস দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে।”

তিনি বলেন, সাংবাদিক সুরক্ষা আইন, সাংবাদিক নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন এবং সাংবাদিকদের তালিকা তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে। সাংবাদিকতা পেশার অস্তিত্ব ও মর্যাদা রক্ষায় দ্রুত গণমাধ্যম কমিশন গঠন করে গণমাধ্যম অঙ্গনকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

আহমেদ আবু জাফর আরও বলেন, দেশে সাংবাদিক নির্যাতনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। সাংবাদিক হত্যার মতো স্পর্শকাতর মামলাগুলোরও যথাযথ বিচার হচ্ছে না। অনেক আসামি জামিনে বের হয়ে যাচ্ছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এখন পর্যন্ত ৫৩ জন সাংবাদিক হত্যার শিকার হলেও অধিকাংশ হত্যা মামলার বিচার শেষ হয়নি। সাংবাদিকদের সঙ্গে এ ধরনের বিমাতাসুলভ আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

সাংবাদিকদের কাছে ভালো সংবাদ চাইবেন, অথচ তাঁদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দেবেন না—এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আগামী নভেম্বরের মধ্যে সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন না হলে আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে আইন প্রণয়নে বাধ্য করা হবে।
— আহমেদ আবু জাফর
সভাপতি, সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম ট্রাস্টি বোর্ড

সাংবাদিকদের পাশে থাকার আশ্বাস

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, সাংবাদিকরা পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যাতে কোনো ধরনের হেনস্তা বা হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে তিনি খেয়াল রাখবেন।

তিনি বলেন,

“আমি সাংবাদিকদের পাশে আছি, ইনশাআল্লাহ থাকব।”

সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি কুমিল্লা জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিএম মহিউদ্দিন মন্টির সঞ্চালনায় এবং জেলা কমিটির সভাপতি ওমর ফারুকী তাপসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ওমর ফারুক মিয়াজী, কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আবুল হাসনাত বাবুল, নবনির্বাচিত সভাপতি এনামুল হক ফারুক, সিনিয়র সাংবাদিক সহিদুল্লাহ, প্রেসক্লাবের সাবেক আহ্বায়ক নীতিশ সাহা, দৈনিক ইনকিলাবের স্টাফ রিপোর্টার সাদিক মামুন, কুমিল্লার জমিন পত্রিকার সম্পাদক শাহজাদা এমরান এবং দৈনিক সমাজ কণ্ঠের সম্পাদক জসিম উদ্দিন চাষী।

এ ছাড়া বক্তব্য দেন সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক জি কে রাসেল, কেন্দ্রীয় নেতা কাজী সালাহ উদ্দিন নোমান, সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের নেতা সিকান্দার আলী কাবুল এবং কেন্দ্রীয় নেতা ফাতেমা আক্তার।

১১১ সদস্যের কমিটির পরিচিতি

অনুষ্ঠানে নবগঠিত কুমিল্লা জেলা সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির ১১১ সদস্যের কার্যকরী পর্ষদ ও সদস্যদের পরিচিতি পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতির বক্তব্যের পর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক সংগঠনের সাংগঠনিক রূপরেখা তুলে ধরেন।

এ সময় মাঠপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে হামলা, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হওয়া ১০ জন সাংবাদিককে সম্মাননা স্মারক দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়।

ডোবায় ভাসল যুবদল নেতার লাশ

কবিরহাটে যুবদল নেতা আজাদকে হত্যা, লাশ গুমের চেষ্টা

আজকের কথা ডেস্ক প্রকাশিত: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৫৫ পিএম
কবিরহাটে যুবদল নেতা আজাদকে হত্যা, লাশ গুমের চেষ্টা

ডোবায় ভাসল মরদেহ, গলায় দড়ি-চোখে আঘাতের চিহ্ন

নোয়াখালীর কবিরহাটে যুবদল নেতা আজাদ হোসেন (৩৪)কে গভীর রাতে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে হত্যার পর মরদেহ গুমের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় নিহতের বোন লাভলী বেগম বাদী হয়ে কবিরহাট থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

শনিবার (৮ আগস্ট) দায়ের করা মামলাটির নম্বর-৪। এতে দণ্ডবিধির ৩০২ (হত্যা), ২০১ (আলামত বিনষ্ট ও লাশ গুমের চেষ্টা) এবং ৩৪ (পরস্পর যোগসাজশ) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলায় দুজনকে এজাহারভুক্ত এবং আরও ৩ থেকে ৪ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।

শুক্রবার বিকেলে কবিরহাট পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ ঘোষবাগ গ্রামের নিজ বাড়ির পাশের একটি ডোবা থেকে আজাদের ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহের গলায় দড়ি প্যাঁচানো এবং চোখের ওপর গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এসব আলামত থেকে প্রাথমিকভাবে তাঁকে শ্বাসরোধ ও নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।

নিহত আজাদ হোসেন দক্ষিণ ঘোষবাগ গ্রামের মৃত ফজল হকের ছেলে। তিনি কবিরহাট পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের প্রচার সম্পাদক ছিলেন। পাশাপাশি স্থানীয় ক্লাবঘর এলাকায় ব্যবসা করতেন।

রাতে ডেকে নেওয়ার পর নিখোঁজ

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ১টার দিকে একদল লোক আজাদকে তাঁর বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। সারারাত ও পরদিন সকাল পর্যন্ত পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও তাঁর সন্ধান পাননি।

পরে শুক্রবার বিকেল ৫টার দিকে বাড়ির পাশের ডোবায় আজাদের মরদেহ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে।

নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, আজাদের চাচাতো ভাই ফারুক (৪০) ও নিজাম (৩৬) তাঁকে রাতে ডেকে নিয়ে যান। পূর্বশত্রুতা কিংবা স্থানীয় কোনো বিরোধের জেরে তাঁরা আজাদকে হত্যা করে মরদেহ গুমের উদ্দেশ্যে ডোবায় ফেলে রেখে পালিয়ে যান বলে অভিযোগ স্বজনদের।

ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত দুই ভাই এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের বা তাঁদের পরিবারের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মাদকবিরোধিতা নাকি রাজনৈতিক বিরোধ?

তদন্তসংশ্লিষ্টরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন, মাদক সেবনে বাধা দেওয়া কিংবা স্থানীয় কোনো আড্ডাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরেও হত্যাকাণ্ডটি ঘটে থাকতে পারে। তবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিষয়টিও উড়িয়ে দিচ্ছেন না স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য গোলাম মোমিত ফয়সাল বলেন,

“আজাদ শুধু একজন ব্যবসায়ী ছিলেন না, তিনি যুবদলের একজন সক্রিয় ও ত্যাগী নেতা ছিলেন। রাজনৈতিক কারণে অতীতেও একাধিকবার তাঁর ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়েছিল। আমরা এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পেছনে জড়িত মূল পরিকল্পনাকারী ও ঘাতকদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।”

পুলিশের অভিযান

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও কবিরহাট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। মরদেহের গলায় দড়ি প্যাঁচানো এবং চোখে আঘাতের আলামত পাওয়া গেছে। নিহতের বোনের দায়ের করা হত্যা মামলায় আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম অভিযান শুরু করেছে। দ্রুতই আসামিদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বর্ষীয়ান মুক্তিযোদ্ধার প্রয়াণে শোক

কোটালীপাড়ায় বীর মুক্তিযোদ্ধা হাজী লুৎফর রহমানের মৃত্যু

কামরুল হাসান, কোটালীপাড়া প্রতিনিধি : প্রকাশিত: শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৩১ পিএম
কোটালীপাড়ায় বীর মুক্তিযোদ্ধা হাজী লুৎফর রহমানের মৃত্যু

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক সফল কমান্ডার এবং কোটালীপাড়া পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা হাজী লুৎফর রহমান শেখ আর নেই।

শুক্রবার দিবাগত রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে (২টা ৩০ মিনিট) কোটালীপাড়া পৌরসভায় অবস্থিত নিজ বাসভবনে বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর।

তিনি স্ত্রী, চার ছেলে, চার মেয়ে, আত্মীয়স্বজনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে হাজী লুৎফর রহমান শেখ সাহসিকতার সঙ্গে সম্মুখসমরে অংশ নেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং স্থানীয় মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।

দীর্ঘদিন তিনি কোটালীপাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি কোটালীপাড়া পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। সাংগঠনিক দক্ষতা, নেতৃত্বগুণ ও মানুষের পাশে থাকার কারণে স্থানীয়ভাবে তিনি ছিলেন সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তি।

বীর মুক্তিযোদ্ধা হাজী লুৎফর রহমান শেখের মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। মহান মুক্তিযুদ্ধ ও সমাজের জন্য তাঁর অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই।
— ফাহিমা বেগম প্রিয়া
সহ-সাধারণ সম্পাদক, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কেন্দ্রীয় কমিটি

তাঁর মৃত্যুতে কোটালীপাড়াজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা, উপজেলা আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী, স্থানীয় শিক্ষক সমাজ, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

শোকবার্তায় স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে হাজী লুৎফর রহমান শেখের অবদান এবং স্বাধীনতার পর সমাজ গঠনে তাঁর ভূমিকা কোটালীপাড়ার মানুষ দীর্ঘদিন স্মরণ করবে। তাঁর মতো একজন বর্ষীয়ান মুক্তিযোদ্ধা ও সমাজহিতৈষী ব্যক্তির শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তির পক্ষ থেকে মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে।

×
CLOSE X
ENG