রবিবার, ৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩

‘বাংলাদেশের মানুষই আমার শক্তি, আমি অবশ্যই ফিরব’—শেখ হাসিনার লাইভ বক্তব্যের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী : প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৩৭ এএম
শেখ হাসিনা

শেখ হাসিনা। ছবি : আজকের কথা

সংবাদের মূল সারসংক্ষেপ

  • শেখ হাসিনার দেওয়া লাইভ বক্তব্যের ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ।
  • Fcc South কে ধন্যবাদ জানিয়ে আপা বক্তব্য শুরু করে।
  • বাংলাদেশকে নিয়ে যারা নিষ্ঠা ও সাহসের সঙ্গে সংবাদ পরিবেশন করে চলেছেন, সেই সাংবাদিকদের প্রতিও উনার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।

শেখ হাসিনার দেওয়া লাইভ বক্তব্যের ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ।
Fcc South কে ধন্যবাদ জানিয়ে আপা বক্তব্য শুরু করে।
বাংলাদেশকে নিয়ে যারা নিষ্ঠা ও সাহসের সঙ্গে সংবাদ পরিবেশন করে চলেছেন, সেই সাংবাদিকদের প্রতিও উনার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।

সাংবাদিকতার দায়িত্ব সত্যকে তুলে ধরা। বিশেষ করে যখন ক্ষমতাসীনরা সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করে। ইতিহাসের কঠিন সময়ে সেই দায়িত্ব আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

আজ আমি শুধু বাংলাদেশের পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবেও আপনাদের সামনে কথা বলছি। আমি এমন একজন মানুষ, যিনি সারা জীবন বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে থেকেছেন। আমাকে আমার দেশ থেকে দূরে থাকতে বাধ্য করা হয়েছে, কিন্তু আমাকে কখনোই আমার জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায়নি।

বর্তমান সংকট নিয়ে কথা বলার আগে আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, জাতীয় চার নেতাকে এবং আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদকে।

একই সঙ্গে গভীর বেদনার সঙ্গে স্মরণ করছি আমার পরিবারের সেই সদস্যদের, যাদের আমি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হারিয়েছিলাম।

আজ আমার প্রিয় ভাই শেখ কামালের জন্মদিনও। তিনি আমার চেয়ে দুই বছরের ছোট ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, যুবনেতা, ক্রীড়া সংগঠক এবং সাংস্কৃতিক কর্মী। তাঁর জীবন বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের সাহস, সৃজনশীলতা ও দেশপ্রেমের প্রতীক ছিল। আজ আমি তাঁকে গভীর ভালোবাসা, বেদনা ও গর্বের সঙ্গে স্মরণ করছি।

গত ২ বছর ধরে আমি আমার প্রিয় বাংলাদেশকে কষ্ট পেতে দেখেছি। মানুষের ঘরে, কর্মক্ষেত্রে এবং শিক্ষাঙ্গনে ভয় ঢুকে পড়েছে। এটি সেই বাংলাদেশ নয়, যা আমরা গড়ে তুলেছিলাম। এটি সেই বাংলাদেশ নয়, যার জন্য ১৯৭১ সালে ৩০ লাখ মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

আমি ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট সম্পর্কে সত্য দিয়ে শুরু করতে চাই।

এটি কোনো শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন ছিল না। শুরু থেকেই আমার সরকার সংলাপ, আইনি প্রক্রিয়া এবং ধৈর্যের মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করতে চেয়েছিল। কিন্তু সংস্কারের দাবির আড়ালে সংগঠিত কিছু গোষ্ঠী ছাত্রদের দাবিকে সহিংস রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করার চেষ্টা করছিল।

২০১৮ সালে ছাত্রদের দাবির প্রেক্ষিতে আমরা কোটা ব্যবস্থা বাতিল করেছিলাম। ২০২৪ সালে যখন হাইকোর্ট সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে, তখন সরকার আপিল করেছিল, কারণ আমরা কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখতে চেয়েছিলাম।

আমি ব্যক্তিগতভাবে ছাত্রদের সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নিয়েছিলাম এবং তাদের গণভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। তিনজন মন্ত্রীও তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন।

কিন্তু কোটা সংস্কার আন্দোলনকে শেষ পর্যন্ত আমার পদত্যাগের একদফা দাবিতে রূপ দেওয়া হয়। পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা প্রচারণা চালানো হয়। প্রকৃত ছাত্রদের আবেগকে ব্যবহার করা হয়, আর সংগঠিত গোষ্ঠীগুলো তাদের আন্দোলনকে সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে।

মাহমুদুর রহমান নিজেও বলেছিলেন, এটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত একটি আন্দোলন, যার পেছনে একজন মূল পরিকল্পনাকারী (মাস্টারমাইন্ড) ছিলেন। তাঁর নিজের বক্তব্যই সত্যকে প্রকাশ করে। এটি স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন ছিল না।

এখানে কোনো দৃশ্যমান বা দায়িত্বশীল নেতৃত্ব ছিল না। নির্দেশনা আসছিল অদৃশ্যভাবে। পুরো বিষয়টি সংগঠিত ও পরিচালিত ছিল এবং এর উদ্দেশ্য ছিল ব্যালটের বাইরে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ তৈরি করা।

১৫ জুলাই থেকে আন্দোলনের চরিত্র বদলে যায়। শুরু হয় হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ, হামলা ও লুটপাট। ব্যাপক সম্পদ ধ্বংস করা হয়।

বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনে হামলা চালিয়ে আগুন দেওয়া হয়। শেখ রাসেল ভবন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ইপিআই টিকাদান কর্মসূচির ভবন, ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশন, ফ্লাইওভার, মিরপুর এক্সপ্রেসওয়ে, বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যালয়, জাতীয় ডেটাবেস সেন্টার, কোভিড-১৯ বিশেষায়িত হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসিক হোটেল, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, নরসিংদীসহ বিভিন্ন জেলার কারাগারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

কারাগার থেকে সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের মুক্ত করে দেওয়া হয়।

সারা দেশে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। দলের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা হয় এবং অনেককে হত্যা করা হয়। আমার সরকারের মন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের বাড়িঘর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়।

গণমাধ্যমও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। প্রায় ৫০টি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলা বা অগ্নিসংযোগ করা হয়। সাংবাদিকরাও নিহত হন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরও সংগঠিত হামলা চালানো হয়। পুলিশ সদস্য ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয় এবং তাদের মরদেহ ফ্লাইওভারে ঝুলিয়ে রাখা হয়।

প্রায় ৪৬০টি থানায় বা পুলিশ ফাঁড়িতে আগুন দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও সদস্যরা ভবনের ভেতরে আটকা পড়ে জীবন্ত দগ্ধ হন। অস্ত্র লুট করা হয়, কর্মকর্তাদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

নির্যাতিত পুলিশ সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৩,০০০ সদস্য নিহত, হামলার শিকার, নির্যাতিত বা গুরুতর সহিংসতার শিকার হন।

তাই আমি আপনাদের একটি সহজ প্রশ্ন করতে চাই।

এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব কী? যখন থানায় আগুন দেওয়া হয়, সরকারি ভবনে হামলা হয়, রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়, কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয় এবং অস্ত্র লুট করা হয়, তখন রাষ্ট্রের কি জীবন ও সম্পদ রক্ষার কোনো দায়িত্ব নেই?

পৃথিবীর প্রতিটি দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব হলো নাগরিকদের, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর এবং নিজেদের জীবন রক্ষা করা। এটি কোনো অপরাধ নয়, আইন তাদের ওপর এই দায়িত্বই অর্পণ করেছে।

একই সঙ্গে আমি চেয়েছিলাম সত্য উদঘাটিত হোক। সে কারণেই ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই আমি একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করি। এর উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট , প্রতিটি মৃত্যুর তদন্ত করা, প্রতিটি সহিংস ঘটনার সত্য উদঘাটন করা এবং প্রতিটি পরিবারকে সত্য জানার সুযোগ করে দেওয়া।

আমি নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছি, আহতদের দেখতে গিয়েছি এবং তাদের সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনা খরচে নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছি।

সাংবিধানিক শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে এটি ছিল একটি সমন্বিত আক্রমণ, পরিকল্পিত নির্দেশনা, সংগঠিত সহিংসতা এবং প্রচারণার মাধ্যমে পরিচালিত। এই ষড়যন্ত্র ৫ আগস্টে শেষ হয়নি। ৫ আগস্টের পর সহিংসতা রূপ নেয় রাজনৈতিক নিপীড়নের ধারাবাহিক অভিযানে।

১৬ জুলাই ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ কর্মী সবুজ আলীর হত্যার মাধ্যমে যে হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়েছিল, তা আজও থামেনি। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে, গুম করা হচ্ছে, গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, ঘরছাড়া করা হচ্ছে এবং মিথ্যা মামলার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

দাবি করা হচ্ছে, অন্তত ১০ হাজার মানুষ নিহত বা গুম হয়েছেন। গত দুই বছরে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং প্রায় ৩,৫০০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার নেতা-কর্মী ও সমর্থককে আসামি করা হয়েছে। আরও ১০ লাখের বেশি মানুষকে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আমার বিরুদ্ধেই ৬০০টিরও বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের নারী কর্মীরা নির্যাতন, অপমান, হেফাজতে নির্যাতন ও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বহু নেতা-কর্মী কারাগারেও প্রাণ হারিয়েছেন। নির্যাতন, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা, খাদ্য না দেওয়া, অবহেলা এবং মৌলিক অধিকার অস্বীকারের বহু অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে।

এই নিপীড়ন শুধু আওয়ামী লীগের সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য, বিচারক, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, পেশাজীবী, শ্রমিক, এমনকি রিকশাচালক, কৃষক ও সাধারণ নাগরিকরাও হামলা, গ্রেপ্তার কিংবা হত্যা মামলার আসামি হওয়ার শিকার হয়েছেন। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেন, তাদের কেউই নিরাপদ নন।

মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ও প্রতীক ধ্বংস করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হয়েছে। ধানমন্ডি ৩২-এ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাসভবন ও বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ধাপে ধাপে আক্রমণ ও ধ্বংস করা হয়েছে।

এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো সহিংসতা নয়। এগুলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে ফেলার একটি প্রচেষ্টা। প্রধানমন্ত্রী নিজেই দেশের পূর্ববর্তী ইতিহাস মুছে ফেলতে “রিসেট বাটন” চাপার কথা বলেছেন। তারা মুক্তিযুদ্ধকে মুছে ফেলতে চায়। তারা বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলতে চায়। তারা বাংলাদেশের জন্মের ভিত্তিকে বদলে দিয়ে নতুন করে ইতিহাস লিখতে চায়।

দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। জঙ্গি ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদেরও মুক্তি দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পর বিএনপি ক্ষমতায় এলেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। বাংলাদেশ এখনও ভয়, সন্ত্রাস, দমন-পীড়ন, অর্থনৈতিক দুর্দশা এবং গভীর অনিরাপত্তার মধ্যে রয়েছে।

এখন দেশের অবস্থা দেখুন। আমরা যে অগ্রগতি গড়ে তুলেছিলাম, তা ধ্বংস হয়ে গেছে। আর এর মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

দাবি করা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৮০ শতাংশ, সেখানে তা নেমে এসেছে ২.২ শতাংশে। শিল্প উৎপাদন তীব্রভাবে কমে গেছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৭ শতাংশে পৌঁছেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। দারিদ্র্যের হার ১৮.৬০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৬.৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিনিয়োগ কমে গেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রায় ভেঙে পড়েছে। নতুন করে ২ কোটির বেশি মানুষ বেকার হয়েছেন। ৫০০-র বেশি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অর্ধেকেরও বেশি শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী হয় কারাগারে, নয়তো আত্মগোপনে রয়েছেন।

সরকার প্রতিদিন ব্যাংক থেকে ৭০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে চলছে। বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় ৫০ শতাংশ থেকে ২৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সময়ে জঙ্গিবাদ বাড়ছে। নারী ও শিশুরা নির্যাতন, ধর্ষণ ও অপমানের শিকার হচ্ছেন। সাধারণ মানুষ নিজেদের জীবন নিয়েও নিরাপদ বোধ করছেন না। চাঁদাবাজি, হত্যা ও অপহরণ নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

এগুলো শুধু সংখ্যা নয়, বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একজন শ্রমিক, একজন কৃষক, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, এমন এক মা যিনি সন্তানের জন্য খাবার কিনতে পারেন না, এবং এমন এক তরুণ, যে আর ভবিষ্যতের কোনো আশা দেখতে পায় না।

কিন্তু বাংলাদেশ কী অর্জন করেছিল, সেটিও মনে রাখা প্রয়োজন। মানুষের কল্যাণই সবসময় আমার রাজনীতির উদ্দেশ্য ছিল। আমার পিতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, এই আদর্শের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। আমিও সেই আদর্শকে পূর্ণ অঙ্গীকারের সঙ্গে ধারণ করেছি।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার পাঁচ মেয়াদে আমরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সুশৃঙ্খল আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি নির্মাণ করেছি। ২০০৮ সালের পর টানা ১৬ বছরে আমরা পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী টানেল এবং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি।

আমরা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ থেকে ৭.৫ শতাংশের মধ্যে ধরে রেখেছিলাম। আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বিলাসিতা ছিল না; এগুলো ছিল জাতীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার অংশ। আমাদের সামাজিক কর্মসূচিগুলো দান ছিল না, এগুলো ছিল মানুষের মর্যাদায় বিনিয়োগ। আমরা বাংলাদেশকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখিয়েছিলাম। আমরা বাংলাদেশকে এশিয়ার উদীয়মান বাঘ হিসেবে পরিচিত করেছিলাম।

বাংলাদেশের সংকট শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়। এটি আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, উন্নয়ন এবং মানবিক মর্যাদার সঙ্গেও জড়িত। তাই আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বাংলাদেশের সকল বন্ধুদের প্রতি আহ্বান জানাই বাংলাদেশের জনগণের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও শান্তির সংগ্রামে তাদের পাশে দাঁড়ান।

একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল, উন্নয়ন সহযোগী এবং গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারে বিশ্বাসী সব দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দশক পুনরুদ্ধার ও নবযাত্রার দশক হতে পারে, যদি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং জনগণকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করার সুযোগ দেওয়া হয়।

তাই আমি স্পষ্টভাবে কয়েকটি দাবি জানাচ্ছি। আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জনগণের জন্য কাজ করবে, ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য নয়।

এগুলো কোনো একটি দলের দাবি নয়, বাংলাদেশকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।

আমার ভাগ্যে যাই থাকুক, আমি আমার মানুষের কাছে ফিরে আসব। আমার প্রিয় দেশবাসী যখন কষ্টে আছে, তখন আমি দূরে থাকতে পারি না। আমি জানি, আমাকে আটক করা হতে পারে, কারাগারে পাঠানো হতে পারে। সাজানো মামলার রায় কার্যকর করারও চেষ্টা হতে পারে। কিন্তু ভয় কখনোই জনগণের প্রতি আমার দায়িত্ব নির্ধারণ করতে পারে না।

অনেক আগেই আমার জীবন ব্যক্তিগত নিরাপত্তার হিসাবের ঊর্ধ্বে চলে গেছে!

আমার বিরুদ্ধে যত বাধাই আসুক না কেন!
২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাও আমাকে থামাতে পারেনি।

তাই আমি আমার নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন নই। আমি উদ্বিগ্ন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

আমি দেশে ফিরতে চাই, কারণ বাংলাদেশের মানুষ নিরাপত্তা, উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও শান্তি পাওয়ার অধিকার রাখে। তারা এমন একটি রাষ্ট্রের যোগ্য, যা তাদের সুরক্ষা দেবে, এমন একটি অর্থনীতির যোগ্য, যা তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করবে, এবং এমন একটি গণতন্ত্রের যোগ্য, যা তাদের অধিকার নিশ্চিত করবে।

আমার ফিরে আসা এবং আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসা ক্ষমতার প্রশ্ন নয়। এটি বাংলাদেশকে আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার প্রশ্ন।

এটি দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি, ধর্মনিরপেক্ষতা ও স্থিতিশীলতার ধারাকে পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়।

আমি একটিমাত্র উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশে ফিরতে চাই মানুষের পাশে দাঁড়াতে এবং তাদের জীবন আরও উন্নত করতে।

জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। আমি তাদের ওপর বিশ্বাস করি, তাদের আস্থা রাখি, তাদের ভালোবাসি, এবং আমি তাদের কাছেই ফিরে আসব।

জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।

আমাকে ধৈর্য সহকারে শোনার জন্য এবং এতটা সময় দেওয়ার জন্য আপনাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ। ধন্যবাদ।

সর্বশেষ সংবাদের জন্য যুক্ত থাকুন:
সম্পাদকীয় নোট

প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী

সম্পাদক- দৈনিক আজকের কথা
0 0 votes
রেটিং দিন।
Subscribe
Notify of
guest
0 মন্তব্যসমূহ
Oldest
Newest Most Voted
এলাকার খবর

‘আমার নিরাপত্তা কোথায়?’ ফেসবুকে খন্দকার মোশাররফের পুত্রবধূর আকুতি, হুমকি ও হয়রানির অভিযোগ

আজকের কথা ডেস্ক : প্রকাশিত: শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬, ৯:৩২ পিএম
‘আমার নিরাপত্তা কোথায়?’ ফেসবুকে খন্দকার মোশাররফের পুত্রবধূর আকুতি, হুমকি ও হয়রানির অভিযোগ

প্রাণনাশের আশঙ্কা জানিয়ে প্রশাসনের সহযোগিতা চাইলেন নাইমা খন্দকার; ২০ দিন ধরে থানায় জানিয়েও প্রতিকার না পাওয়ার দাবি, লিখিত অভিযোগ চেয়েছে পুলিশ

নিজের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও কুমিল্লা-১ আসনের সংসদ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের পুত্রবধূ সমাজকর্মী নাইমা খন্দকার। শুক্রবার রাতে দেওয়া ওই পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, একটি প্রভাবশালী মহলের ইন্ধনে কয়েকটি ফেসবুক আইডি থেকে তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি, মানহানিকর অপপ্রচার ও নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।

পোস্টে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘আমার নিরাপত্তা কোথায়? একজন নারী হিসেবে আজ আমি কার কাছে বিচার চাইব?’

নাইমা খন্দকার জে. হুদা ওয়েলফেয়ার সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক ও সচিব। পাশাপাশি তিনি জাতীয় মহিলা ক্রীড়া সংস্থা, কুমিল্লা জেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ফেসবুক পোস্টে নাইমা লেখেন, দাউদকান্দির সর্বস্তরের মানুষ, দেশের সচেতন নাগরিক, সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই তিনি বিষয়টি প্রকাশ্যে এনেছেন। যেকোনো সময় তাঁর প্রাণনাশসহ বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

নাইমার দাবি, তাঁর শ্বশুর ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের চিকিৎসার জন্য স্বামী খন্দকার মাহবুব হোসেন তুষার তাঁকে নিয়ে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। এই সুযোগে তিনি নিজ বাসায় একা থাকায় বিভিন্ন ফেসবুক আইডি থেকে তাঁকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানহানিকর অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।

পোস্টে তিনি আরও দাবি করেন, এসব বিষয়ে গত ২০ দিন ধরে দাউদকান্দি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ জানালেও কার্যকর কোনো প্রতিকার পাননি।

নাইমা লেখেন, চলমান মানসিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেই তাঁকে আইনের পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে। চরম মানসিক ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে পরীক্ষার হলে তাঁর প্রায় জ্ঞান হারানোর উপক্রম হয়েছিল।

শনিবার সন্ধ্যায় নাইমা খন্দকার বলেন, ‘আমি একটি রাজনৈতিক পরিবারের পুত্রবধূ হয়েও যদি নিজের এলাকায় এমন হেনস্তা ও অপপ্রচারের শিকার হই, তবে সাধারণ পরিবারের মেয়েদের নিরাপত্তা কোথায়? আমার শ্বশুর ড. খন্দকার মোশাররফ এবং স্বামী মাহবুব হোসেন তুষার বলে আমি কোনো বাড়তি সুবিধা চাই না। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে শুধু সম্মান, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার চাই। কার ইন্ধনে ফেসবুক আইডি থেকে এমন অপপ্রচার ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে, তা পুলিশকে খুঁজে বের করার অনুরোধ জানিয়েছি।’

এদিকে দাউদকান্দি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাজেদুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নাইমা খন্দকার মৌখিকভাবে ফেসবুকে তাঁকে নিয়ে লেখালেখির অভিযোগ জানিয়েছেন। তাঁকে লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ফেসবুক অ্যাকাউন্টগুলো শনাক্ত করতে সাইবার ক্রাইম ইউনিটে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

কুমিল্লায় মববাজদের দৌরাত্ম্য! শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সাইনবোর্ড ভাঙল এনসিপি নেতারা

আজকের কথা ডেস্ক : প্রকাশিত: শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬, ৩:৪৭ পিএম
কুমিল্লায় মববাজদের দৌরাত্ম্য! শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সাইনবোর্ড ভাঙল এনসিপি নেতারা

ঐতিহ্য সংরক্ষণের নামে ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ, বৈধ ওয়ারিশ আরমা দত্তের সাইনবোর্ড গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ-নিন্দা

কুমিল্লায় এবার ভাষাসৈনিক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পৈতৃক বাড়ির সাইনবোর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মহানগর শাখার নেতাদের বিরুদ্ধে। ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ ও স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবির আড়ালে শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাতে নগরীর ধর্মসাগরের পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত বাড়িটিতে এ ঘটনা ঘটে। বাড়িটির বৈধ ওয়ারিশ আরমা দত্তের মালিকানা-সংক্রান্ত সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলার ঘটনায় ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

শনিবার সাইনবোর্ড ভাঙচুরের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি ও সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আরমা দত্ত।

স্থানীয় সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে বাড়িটি সংস্কার, সংরক্ষণ এবং সেখানে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি উঠলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এর মধ্যে আরমা দত্ত উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তির মালিকানা উল্লেখ করে বাড়িতে একটি সাইনবোর্ড স্থাপন করেন। তিনি শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের একমাত্র ছেলে সঞ্জিব দত্তের মেয়ে।

সাইনবোর্ডে লেখা ছিল, ‘এই জমির প্রকৃত মালিক ওয়ারিশ সূত্রে আরমা দত্ত। পিতা মৃত সঞ্জিব দত্ত। দাগ নং ১৮০০, মৌজা ছোটরা, কুমিল্লা।’

ঐতিহ্য রক্ষার নামে সাইনবোর্ড ভাঙচুর

এনসিপির কুমিল্লা মহানগর শাখার নেতাদের দাবি, বাড়িটি ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঐতিহ্য। তাদের অভিযোগ, বাড়িটি বিক্রির প্রচেষ্টা হিসেবে সেখানে সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে এবং পুরোনো স্থাপনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাড়ি বিক্রি ঠেকাতেই সাইনবোর্ডটি ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে তারা জানান।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার সন্ধ্যার পর এনসিপির নেতারা বাড়িটিতে গিয়ে প্রথমে স্থাপনাটি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বক্তব্য দেন। পরে তাঁরা সাইনবোর্ডটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কুমিল্লা মহানগর শাখার সদস্যসচিব মাসুমুল বারী কাওসারের স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি কোনো সাধারণ স্থাপনা নয়। এটি ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঐতিহ্য। তাই বাড়িটি ব্যক্তিগত কেনাবেচার বিষয় না করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সংরক্ষণ করতে হবে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন জানাবেন তাঁরা।

শনিবার মাসুমুল বারী কাওসার বলেন, ‘একটি ঐতিহাসিক বাড়ি রক্ষা করতে আমরা সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলেছি। এখানে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। এ কাজে আশা করি সরকার ও ওয়ারিশ হিসেবে আরমা দত্তকে পাশে পাব। এ জায়গা বিক্রি কিংবা বহুতল ভবন করতে চাইলে জনগণ নিয়ে প্রতিহত করা হবে।’

‘আমার সম্পত্তি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমার’

এদিকে আরমা দত্ত বলেন, ‘এটি আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি। আমি এর বৈধ ওয়ারিশ। এটা কুমিল্লাবাসীও জানেন। তাই এ বাড়ির জায়গা আমি কী করব, রাখব নাকি বিক্রি করব—সেটি একান্তই আমার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু রাতে এভাবে একটি বাড়ির বৈধ সাইনবোর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। আমি এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করব।’

ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের দাবি থাকলেও ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তিতে এভাবে হস্তক্ষেপের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, কোনো সম্পত্তি ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করলেই কি তার মালিক বা বৈধ ওয়ারিশের অধিকার উপেক্ষা করে কেউ নিজ উদ্যোগে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারেন? সংরক্ষণের দাবি থাকলে তা বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণের কথা বলছেন তাঁরা।

কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলার বিষয়ে তাঁরা কোনো অভিযোগ পাননি। অভিযোগ পেলে এ বিষয়ে তদন্ত করা হবে।

ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত

উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।

১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে কুমিল্লার নিজ বাসভবন থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁকে ও তাঁর ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাঁদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ সালে তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। দিলীপ কুমার দত্তের মেয়ে আরমা দত্ত একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন।

খাল পরিষ্কারে নেমে কাদায় আটকে গেলেন ইউএনও, তবু থামেননি কাজ

আজকের কথা ডেস্ক : প্রকাশিত: শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬, ৩:১০ পিএম
খাল পরিষ্কারে নেমে কাদায় আটকে গেলেন ইউএনও, তবু থামেননি কাজ

সরকারি বরাদ্দের অপেক্ষা না করে স্বেচ্ছাশ্রমে দুই কিলোমিটার খাল পরিষ্কারের উদ্যোগ, ইউএনওর সঙ্গে শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী

বরিশালের উজিরপুরে দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে থাকা একটি খাল পরিষ্কারের অভিযানে নিজেই নেমে পড়েন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা। পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে গিয়ে একপর্যায়ে কাদায় আটকে যান তিনি। পরে স্বেচ্ছাসেবীরা তাঁকে টেনে উদ্ধার করেন। তবে এতে দমে না গিয়ে আবারও খাল পরিষ্কারের কাজে যোগ দেন তিনি।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) উজিরপুর উপজেলা পরিষদসংলগ্ন প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ খালে এ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হয়। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিডি ক্লিন বরিশালের সহযোগিতায় আয়োজিত কর্মসূচিতে ইউএনওর পাশাপাশি শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী, স্থানীয় তরুণ-তরুণী ও যুবসমাজের সদস্যরা অংশ নেন।

সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত টানা পাঁচ ঘণ্টা চলে পরিচ্ছন্নতা অভিযান। এ সময় খাল থেকে কচুরিপানা, প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিনসহ দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য অপসারণ করা হয়। এতে খালের পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একসময় খালটি ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছিল। কচুরিপানা ও প্লাস্টিক বর্জ্যে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আশপাশের এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে খালটির এমন দুরবস্থা চলছিল।

অভিযানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ইউএনও মো. আলী সুজার সরাসরি অংশগ্রহণ। বিডি ক্লিনের টি-শার্ট পরে স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে তিনিও খালের ময়লা পরিষ্কারে নেমে পড়েন। একপর্যায়ে কাদায় আটকে গেলে স্বেচ্ছাসেবীরা তাঁকে টেনে তুলে সহযোগিতা করেন। এরপর আবারও কাজে যোগ দেন তিনি।

ইউএনওর খাল পরিষ্কারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে একজন সরকারি কর্মকর্তার সরাসরি অংশগ্রহণকে দায়িত্ববোধ, জনসম্পৃক্ততা ও নেতৃত্বের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন অনেকে।

বিডি ক্লিনের বিভাগীয় সমন্বয়ক জাহেদ ইরফান বলেন, উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজার আহ্বানে দীর্ঘদিনের অপরিচ্ছন্ন খালটি পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় স্থানীয় তরুণ-তরুণীসহ শতাধিক স্বেচ্ছাসেবীর অংশগ্রহণে কর্মসূচিটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। ইউএনও নিজে স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করায় সবাই আরও উৎসাহিত হয়েছেন।

ইউএনও মো. আলী সুজা বলেন, খালের পাশের বাসিন্দাদের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিনসহ বিভিন্ন বর্জ্যে পানিপ্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সরকারি বরাদ্দের অপেক্ষায় না থেকে সম্মিলিত স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে উদ্যোগী হলে সমাজের অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। এই পরিচ্ছন্নতা অভিযান তারই একটি উদাহরণ।

তিনি আরও বলেন, তরুণ-তরুণী ও যুবসমাজকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রাখা অত্যন্ত জরুরি। অবসর সময়ের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে অনেকেই নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে। পরিচ্ছন্নতা অভিযানসহ সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রমে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এতে তারা মাদকাসক্তি ও মোবাইল ফোনের অপব্যবহারসহ বিভিন্ন নেতিবাচক প্রবণতা থেকে দূরে থেকে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারবে।

×
ENG