‘বাংলাদেশের মানুষই আমার শক্তি, আমি অবশ্যই ফিরব’—শেখ হাসিনার লাইভ বক্তব্যের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ

শেখ হাসিনা। ছবি : আজকের কথা
শেখ হাসিনার দেওয়া লাইভ বক্তব্যের ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ।
Fcc South কে ধন্যবাদ জানিয়ে আপা বক্তব্য শুরু করে।
বাংলাদেশকে নিয়ে যারা নিষ্ঠা ও সাহসের সঙ্গে সংবাদ পরিবেশন করে চলেছেন, সেই সাংবাদিকদের প্রতিও উনার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
সাংবাদিকতার দায়িত্ব সত্যকে তুলে ধরা। বিশেষ করে যখন ক্ষমতাসীনরা সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করে। ইতিহাসের কঠিন সময়ে সেই দায়িত্ব আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আজ আমি শুধু বাংলাদেশের পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হিসেবেও আপনাদের সামনে কথা বলছি। আমি এমন একজন মানুষ, যিনি সারা জীবন বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে থেকেছেন। আমাকে আমার দেশ থেকে দূরে থাকতে বাধ্য করা হয়েছে, কিন্তু আমাকে কখনোই আমার জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায়নি।
বর্তমান সংকট নিয়ে কথা বলার আগে আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, জাতীয় চার নেতাকে এবং আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদকে।
একই সঙ্গে গভীর বেদনার সঙ্গে স্মরণ করছি আমার পরিবারের সেই সদস্যদের, যাদের আমি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হারিয়েছিলাম।
আজ আমার প্রিয় ভাই শেখ কামালের জন্মদিনও। তিনি আমার চেয়ে দুই বছরের ছোট ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, যুবনেতা, ক্রীড়া সংগঠক এবং সাংস্কৃতিক কর্মী। তাঁর জীবন বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের সাহস, সৃজনশীলতা ও দেশপ্রেমের প্রতীক ছিল। আজ আমি তাঁকে গভীর ভালোবাসা, বেদনা ও গর্বের সঙ্গে স্মরণ করছি।
গত ২ বছর ধরে আমি আমার প্রিয় বাংলাদেশকে কষ্ট পেতে দেখেছি। মানুষের ঘরে, কর্মক্ষেত্রে এবং শিক্ষাঙ্গনে ভয় ঢুকে পড়েছে। এটি সেই বাংলাদেশ নয়, যা আমরা গড়ে তুলেছিলাম। এটি সেই বাংলাদেশ নয়, যার জন্য ১৯৭১ সালে ৩০ লাখ মানুষ জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
আমি ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট সম্পর্কে সত্য দিয়ে শুরু করতে চাই।
এটি কোনো শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন ছিল না। শুরু থেকেই আমার সরকার সংলাপ, আইনি প্রক্রিয়া এবং ধৈর্যের মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করতে চেয়েছিল। কিন্তু সংস্কারের দাবির আড়ালে সংগঠিত কিছু গোষ্ঠী ছাত্রদের দাবিকে সহিংস রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত করার চেষ্টা করছিল।
২০১৮ সালে ছাত্রদের দাবির প্রেক্ষিতে আমরা কোটা ব্যবস্থা বাতিল করেছিলাম। ২০২৪ সালে যখন হাইকোর্ট সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে, তখন সরকার আপিল করেছিল, কারণ আমরা কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখতে চেয়েছিলাম।
আমি ব্যক্তিগতভাবে ছাত্রদের সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নিয়েছিলাম এবং তাদের গণভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। তিনজন মন্ত্রীও তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন।
কিন্তু কোটা সংস্কার আন্দোলনকে শেষ পর্যন্ত আমার পদত্যাগের একদফা দাবিতে রূপ দেওয়া হয়। পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা প্রচারণা চালানো হয়। প্রকৃত ছাত্রদের আবেগকে ব্যবহার করা হয়, আর সংগঠিত গোষ্ঠীগুলো তাদের আন্দোলনকে সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে।
মাহমুদুর রহমান নিজেও বলেছিলেন, এটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত একটি আন্দোলন, যার পেছনে একজন মূল পরিকল্পনাকারী (মাস্টারমাইন্ড) ছিলেন। তাঁর নিজের বক্তব্যই সত্যকে প্রকাশ করে। এটি স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন ছিল না।
এখানে কোনো দৃশ্যমান বা দায়িত্বশীল নেতৃত্ব ছিল না। নির্দেশনা আসছিল অদৃশ্যভাবে। পুরো বিষয়টি সংগঠিত ও পরিচালিত ছিল এবং এর উদ্দেশ্য ছিল ব্যালটের বাইরে ক্ষমতায় যাওয়ার পথ তৈরি করা।
১৫ জুলাই থেকে আন্দোলনের চরিত্র বদলে যায়। শুরু হয় হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ, হামলা ও লুটপাট। ব্যাপক সম্পদ ধ্বংস করা হয়।
বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনে হামলা চালিয়ে আগুন দেওয়া হয়। শেখ রাসেল ভবন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ইপিআই টিকাদান কর্মসূচির ভবন, ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশন, ফ্লাইওভার, মিরপুর এক্সপ্রেসওয়ে, বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যালয়, জাতীয় ডেটাবেস সেন্টার, কোভিড-১৯ বিশেষায়িত হাসপাতাল, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসিক হোটেল, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, নরসিংদীসহ বিভিন্ন জেলার কারাগারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
কারাগার থেকে সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের মুক্ত করে দেওয়া হয়।
সারা দেশে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। দলের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা হয় এবং অনেককে হত্যা করা হয়। আমার সরকারের মন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের বাড়িঘর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়।
গণমাধ্যমও হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। প্রায় ৫০টি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলা বা অগ্নিসংযোগ করা হয়। সাংবাদিকরাও নিহত হন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরও সংগঠিত হামলা চালানো হয়। পুলিশ সদস্য ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয় এবং তাদের মরদেহ ফ্লাইওভারে ঝুলিয়ে রাখা হয়।
প্রায় ৪৬০টি থানায় বা পুলিশ ফাঁড়িতে আগুন দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও সদস্যরা ভবনের ভেতরে আটকা পড়ে জীবন্ত দগ্ধ হন। অস্ত্র লুট করা হয়, কর্মকর্তাদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
নির্যাতিত পুলিশ সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৩,০০০ সদস্য নিহত, হামলার শিকার, নির্যাতিত বা গুরুতর সহিংসতার শিকার হন।
তাই আমি আপনাদের একটি সহজ প্রশ্ন করতে চাই।
এমন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব কী? যখন থানায় আগুন দেওয়া হয়, সরকারি ভবনে হামলা হয়, রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়, কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয় এবং অস্ত্র লুট করা হয়, তখন রাষ্ট্রের কি জীবন ও সম্পদ রক্ষার কোনো দায়িত্ব নেই?
পৃথিবীর প্রতিটি দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব হলো নাগরিকদের, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর এবং নিজেদের জীবন রক্ষা করা। এটি কোনো অপরাধ নয়, আইন তাদের ওপর এই দায়িত্বই অর্পণ করেছে।
একই সঙ্গে আমি চেয়েছিলাম সত্য উদঘাটিত হোক। সে কারণেই ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই আমি একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করি। এর উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট , প্রতিটি মৃত্যুর তদন্ত করা, প্রতিটি সহিংস ঘটনার সত্য উদঘাটন করা এবং প্রতিটি পরিবারকে সত্য জানার সুযোগ করে দেওয়া।
আমি নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছি, আহতদের দেখতে গিয়েছি এবং তাদের সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসা সম্পূর্ণ বিনা খরচে নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছি।
সাংবিধানিক শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে এটি ছিল একটি সমন্বিত আক্রমণ, পরিকল্পিত নির্দেশনা, সংগঠিত সহিংসতা এবং প্রচারণার মাধ্যমে পরিচালিত। এই ষড়যন্ত্র ৫ আগস্টে শেষ হয়নি। ৫ আগস্টের পর সহিংসতা রূপ নেয় রাজনৈতিক নিপীড়নের ধারাবাহিক অভিযানে।
১৬ জুলাই ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগ কর্মী সবুজ আলীর হত্যার মাধ্যমে যে হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়েছিল, তা আজও থামেনি। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে, গুম করা হচ্ছে, গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, ঘরছাড়া করা হচ্ছে এবং মিথ্যা মামলার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
দাবি করা হচ্ছে, অন্তত ১০ হাজার মানুষ নিহত বা গুম হয়েছেন। গত দুই বছরে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং প্রায় ৩,৫০০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার নেতা-কর্মী ও সমর্থককে আসামি করা হয়েছে। আরও ১০ লাখের বেশি মানুষকে অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আমার বিরুদ্ধেই ৬০০টিরও বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের নারী কর্মীরা নির্যাতন, অপমান, হেফাজতে নির্যাতন ও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বহু নেতা-কর্মী কারাগারেও প্রাণ হারিয়েছেন। নির্যাতন, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা, খাদ্য না দেওয়া, অবহেলা এবং মৌলিক অধিকার অস্বীকারের বহু অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে।
এই নিপীড়ন শুধু আওয়ামী লীগের সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য, বিচারক, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক, পেশাজীবী, শ্রমিক, এমনকি রিকশাচালক, কৃষক ও সাধারণ নাগরিকরাও হামলা, গ্রেপ্তার কিংবা হত্যা মামলার আসামি হওয়ার শিকার হয়েছেন। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেন, তাদের কেউই নিরাপদ নন।
মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ও প্রতীক ধ্বংস করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হয়েছে। ধানমন্ডি ৩২-এ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক বাসভবন ও বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ধাপে ধাপে আক্রমণ ও ধ্বংস করা হয়েছে।
এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো সহিংসতা নয়। এগুলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে ফেলার একটি প্রচেষ্টা। প্রধানমন্ত্রী নিজেই দেশের পূর্ববর্তী ইতিহাস মুছে ফেলতে “রিসেট বাটন” চাপার কথা বলেছেন। তারা মুক্তিযুদ্ধকে মুছে ফেলতে চায়। তারা বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলতে চায়। তারা বাংলাদেশের জন্মের ভিত্তিকে বদলে দিয়ে নতুন করে ইতিহাস লিখতে চায়।
দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে। জঙ্গি ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদেরও মুক্তি দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পর বিএনপি ক্ষমতায় এলেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি। বাংলাদেশ এখনও ভয়, সন্ত্রাস, দমন-পীড়ন, অর্থনৈতিক দুর্দশা এবং গভীর অনিরাপত্তার মধ্যে রয়েছে।
এখন দেশের অবস্থা দেখুন। আমরা যে অগ্রগতি গড়ে তুলেছিলাম, তা ধ্বংস হয়ে গেছে। আর এর মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
দাবি করা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৮০ শতাংশ, সেখানে তা নেমে এসেছে ২.২ শতাংশে। শিল্প উৎপাদন তীব্রভাবে কমে গেছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিল্প খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৭ শতাংশে পৌঁছেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। দারিদ্র্যের হার ১৮.৬০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৬.৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিনিয়োগ কমে গেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রায় ভেঙে পড়েছে। নতুন করে ২ কোটির বেশি মানুষ বেকার হয়েছেন। ৫০০-র বেশি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অর্ধেকেরও বেশি শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী হয় কারাগারে, নয়তো আত্মগোপনে রয়েছেন।
সরকার প্রতিদিন ব্যাংক থেকে ৭০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে চলছে। বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় ৫০ শতাংশ থেকে ২৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সময়ে জঙ্গিবাদ বাড়ছে। নারী ও শিশুরা নির্যাতন, ধর্ষণ ও অপমানের শিকার হচ্ছেন। সাধারণ মানুষ নিজেদের জীবন নিয়েও নিরাপদ বোধ করছেন না। চাঁদাবাজি, হত্যা ও অপহরণ নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
এগুলো শুধু সংখ্যা নয়, বিচ্ছিন্ন ঘটনাও নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একজন শ্রমিক, একজন কৃষক, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, এমন এক মা যিনি সন্তানের জন্য খাবার কিনতে পারেন না, এবং এমন এক তরুণ, যে আর ভবিষ্যতের কোনো আশা দেখতে পায় না।
কিন্তু বাংলাদেশ কী অর্জন করেছিল, সেটিও মনে রাখা প্রয়োজন। মানুষের কল্যাণই সবসময় আমার রাজনীতির উদ্দেশ্য ছিল। আমার পিতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, এই আদর্শের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। আমিও সেই আদর্শকে পূর্ণ অঙ্গীকারের সঙ্গে ধারণ করেছি।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার পাঁচ মেয়াদে আমরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সুশৃঙ্খল আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য একটি শক্ত ভিত্তি নির্মাণ করেছি। ২০০৮ সালের পর টানা ১৬ বছরে আমরা পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী টানেল এবং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মতো বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি।
আমরা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ থেকে ৭.৫ শতাংশের মধ্যে ধরে রেখেছিলাম। আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বিলাসিতা ছিল না; এগুলো ছিল জাতীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার অংশ। আমাদের সামাজিক কর্মসূচিগুলো দান ছিল না, এগুলো ছিল মানুষের মর্যাদায় বিনিয়োগ। আমরা বাংলাদেশকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখিয়েছিলাম। আমরা বাংলাদেশকে এশিয়ার উদীয়মান বাঘ হিসেবে পরিচিত করেছিলাম।
বাংলাদেশের সংকট শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়। এটি আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, উন্নয়ন এবং মানবিক মর্যাদার সঙ্গেও জড়িত। তাই আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বাংলাদেশের সকল বন্ধুদের প্রতি আহ্বান জানাই বাংলাদেশের জনগণের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও শান্তির সংগ্রামে তাদের পাশে দাঁড়ান।
একটি স্থিতিশীল বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল, উন্নয়ন সহযোগী এবং গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারে বিশ্বাসী সব দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দশক পুনরুদ্ধার ও নবযাত্রার দশক হতে পারে, যদি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং জনগণকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করার সুযোগ দেওয়া হয়।
তাই আমি স্পষ্টভাবে কয়েকটি দাবি জানাচ্ছি। আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জনগণের জন্য কাজ করবে, ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য নয়।
এগুলো কোনো একটি দলের দাবি নয়, বাংলাদেশকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
আমার ভাগ্যে যাই থাকুক, আমি আমার মানুষের কাছে ফিরে আসব। আমার প্রিয় দেশবাসী যখন কষ্টে আছে, তখন আমি দূরে থাকতে পারি না। আমি জানি, আমাকে আটক করা হতে পারে, কারাগারে পাঠানো হতে পারে। সাজানো মামলার রায় কার্যকর করারও চেষ্টা হতে পারে। কিন্তু ভয় কখনোই জনগণের প্রতি আমার দায়িত্ব নির্ধারণ করতে পারে না।
অনেক আগেই আমার জীবন ব্যক্তিগত নিরাপত্তার হিসাবের ঊর্ধ্বে চলে গেছে!
আমার বিরুদ্ধে যত বাধাই আসুক না কেন!
২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাও আমাকে থামাতে পারেনি।
তাই আমি আমার নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন নই। আমি উদ্বিগ্ন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
আমি দেশে ফিরতে চাই, কারণ বাংলাদেশের মানুষ নিরাপত্তা, উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও শান্তি পাওয়ার অধিকার রাখে। তারা এমন একটি রাষ্ট্রের যোগ্য, যা তাদের সুরক্ষা দেবে, এমন একটি অর্থনীতির যোগ্য, যা তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করবে, এবং এমন একটি গণতন্ত্রের যোগ্য, যা তাদের অধিকার নিশ্চিত করবে।
আমার ফিরে আসা এবং আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসা ক্ষমতার প্রশ্ন নয়। এটি বাংলাদেশকে আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার প্রশ্ন।
এটি দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি, ধর্মনিরপেক্ষতা ও স্থিতিশীলতার ধারাকে পুনরুজ্জীবিত করার বিষয়।
আমি একটিমাত্র উদ্দেশ্য নিয়ে বাংলাদেশে ফিরতে চাই মানুষের পাশে দাঁড়াতে এবং তাদের জীবন আরও উন্নত করতে।
জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। আমি তাদের ওপর বিশ্বাস করি, তাদের আস্থা রাখি, তাদের ভালোবাসি, এবং আমি তাদের কাছেই ফিরে আসব।
জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।
আমাকে ধৈর্য সহকারে শোনার জন্য এবং এতটা সময় দেওয়ার জন্য আপনাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ। ধন্যবাদ।
প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।
দেবীদ্বারে মা-ভাতিজি হত্যার দায় স্বীকার, ইমনের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি

‘আমি সর্বনাশ করেছি, তখন আমার মাথা ঠিক ছিল না’
কুমিল্লার দেবীদ্বারে মা ও ভাতিজিকে হত্যার ঘটনায় আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন ইমন মিয়া (২৯)। জবানবন্দিতে তিনি হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়ে ইমন বলেন, ‘আমি সর্বনাশ করেছি, তখন আমার মাথা ঠিক ছিল না।’
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে দেবীদ্বার থানা পুলিশ ইমন মিয়াকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের জন্য সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত-৪-এর বিচারক সায়মা শরীফ নিশাতের আদালতে হাজির করে। পরে আদালতে তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, জবানবন্দিতে ইমন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী রাতেই পুলিশি নিরাপত্তায় তাঁকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।
পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য, পায়ের অসহ্য ব্যথার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে ইমন আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। এ সময় তাঁর মা পিয়ারা বেগম বাধা দিলে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি দা দিয়ে মাকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করেন। পরে তাঁর বড় ভাইয়ের ৮ মাস বয়সী মেয়ে ইসরাত জাহানকেও আছড়ে হত্যা করার অভিযোগ ওঠে।

আদালতে ইমন হত্যার দায় স্বীকার করেছে। নিহত দুজনের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
নিহত পিয়ারা বেগম (৬৫) ইমনের মা ও মৃত ফরিদ মিয়ার স্ত্রী। অপর নিহত ৮ মাস বয়সী ইসরাত জাহান ইমনের বড় ভাই সুজন মিয়ার মেয়ে।
ঘটনার সময় ইমনের বড় ভাই সুজন মিয়ার স্ত্রী রাবেয়া বেগম তাঁর মেয়েকে কোলে নিয়ে ছুটে এলে ইমন তাঁকেও কাঠের লাঠি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেন বলে স্থানীয়রা জানান। এ সময় শিশুটির মাথায়ও আঘাত লাগে এবং সে মায়ের কোল থেকে ছিটকে পড়ে। পরে শিশুটিকে তুলে এনে ইমন আছড়ে হত্যা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ৪-৫ বছর আগে ফুটবল খেলতে গিয়ে ইমনের পায়ে আঘাত লাগে। ২-৩ বছর আগে তাঁর প্রথমবার অস্ত্রোপচার করা হলেও ব্যথা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। গত এক সপ্তাহে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় প্রায় ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ে তাঁর পায়ে আরেকটি অস্ত্রোপচার করা হয়। রোববার বিকেলে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে তিনি বাড়িতে ফেরেন। তবে পায়ের ব্যথা তখনো ছিল বলে স্বজন ও স্থানীয়রা জানান।
সোমবার সকালে পায়ের ব্যথার কারণে ইমন আত্মহত্যার চেষ্টা করলে তাঁর মা বাধা দেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। একপর্যায়ে ইমন মায়ের হাতে দা দিয়ে তাঁকে হত্যা করতে বলেন। পিয়ারা বেগম ছেলেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘বাবা, তুই সুস্থ হয়ে যাবি।’ এরপর ইমন তাঁর মায়ের হাত থেকে দা ছিনিয়ে নিয়ে তাঁকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করেন বলে অভিযোগ।
ঘটনাটি ঘটে সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার ১ নম্বর বড়শালঘর ইউনিয়নের বড়শালঘর গ্রামের দক্ষিণপাড়া এলাকার মোস্তফা মাস্টারের বাড়িতে।
ইমন মিয়া ওই গ্রামের মৃত ফরিদ মিয়ার ছেলে।
ঘটনার খবর পেয়ে স্থানীয়রা আহত রাবেয়া বেগমকে উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। এ সময় ইমনকে ঘরে আটকে রাখেন স্থানীয়রা।
খবর পেয়ে দেবীদ্বার সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সিনিয়র এএসপি) মো. শাহীন এবং দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান একদল পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে ইমনকে উদ্ধার করে হেফাজতে নেন।
এ ঘটনায় ইমনের বড় ভাই সুজন মিয়া বাদী হয়ে ইমন মিয়াকে একমাত্র আসামি করে দেবীদ্বার থানায় হত্যা মামলা করেছেন।
দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান জানান, আদালতে ইমন হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। নিহত দুজনের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
মুরাদনগরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ইউপি সদস্যসহ গ্রেপ্তার ২

মুরাদনগরে আগে আটক, পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা
স্বজনদের দাবি, মামলার খবরই জানতেন না তারা
কুমিল্লার মুরাদনগরে ইউপি সদস্য মো. ইদ্রিস ও মো. দেলোয়ার হোসেনকে নিজ নিজ বাড়ি থেকে আটকের পর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। তবে স্বজনদের অভিযোগ, তাদের আটক করার আগে বা পরে মামলা সম্পর্কে তারা কিছুই জানতেন না।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ভোর রাতে মুরাদনগর উপজেলা সদর ইউনিয়নের দিলালপুর ও নাগেরকান্দি এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের নিজ নিজ বাড়ি থেকে আটক করা হয়।
গ্রেপ্তার ইদ্রিস মেম্বার (৪৫) মুরাদনগর সদর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য এবং দিলালপুর গ্রামের শামসুল হকের ছেলে। অন্যদিকে দেলোয়ার হোসেন (৪৫) নাগেরকান্দি গ্রামের বেদন মিয়ার ছেলে।
পুলিশ জানায়, ভোররাতে পৃথক অভিযান চালিয়ে তাদের নিজ নিজ বাড়ি থেকে আটক করা হয়। পরে তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয় এবং ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

গ্রেপ্তার দুজনকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তবে গ্রেপ্তার দুজনের স্বজনদের অভিযোগ, ভোররাতে পুলিশ বাড়িতে এসে তাদের ধরে নিয়ে যায়। তখন কোনো মামলার কথা জানানো হয়নি। পরে তারা জানতে পারেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। মামলাটি সম্পর্কে আটকের আগে তারা কিছুই জানতেন না বলেও দাবি করেন স্বজনরা।
মুরাদনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন চৌধুরী জানান, গ্রেপ্তার দুজনকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তবে মামলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, ধারাসহ বিস্তারিত তথ্য পুলিশ জানায়নি।
অপ্রতিম হত্যার পর মায়ের ফেসবুকে ধারাবাহিক পোস্ট, আইডি চালাচ্ছেন কে?

অপ্রতিম হত্যার পর মায়ের ফেসবুক পোস্ট ঘিরে নতুন প্রশ্ন, সামনে এলো ৫ হাজার টাকা ও আইফোনের তথ্য
ছেলের শোকে কাতর মা, তবু ফেসবুকে একের পর এক পোস্ট; হত্যার নেপথ্য নিয়ে নিজেই দিলেন নতুন তথ্য
কুমিল্লায় আলোচিত কিশোর ইশরাত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর তার মা ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমকে নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকাহত এই মায়ের ব্যক্তিগত ফেসবুক কার্যক্রমও এখন আলোচনায় এসেছে।
‘নাদিদা নাহিদ’ নামের ফেসবুক আইডি থেকে নিয়মিত পোস্ট ও অপ্রতিমকে ঘিরে বিভিন্ন তথ্য শেয়ার করা হচ্ছে। সর্বশেষ, এই প্রতিবেদনের প্রস্তুতির সময়ের প্রায় দুই ঘণ্টা আগেও ওই আইডি থেকে অপ্রতিমের হত্যা নিয়ে একটি দীর্ঘ পোস্ট দেওয়া হয়। পোস্টের সঙ্গে অপ্রতিম ও আইফোনসহ চারটি ছবি শেয়ার করা হয়েছে।
ফেসবুক পোস্টে অপ্রতিমের মা দাবি করেছেন, শুধু আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাই নয়, অপ্রতিমের কাছ থেকে ধার নেওয়া ৫ হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়টিও হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ভূমিকা রাখতে পারে।
পোস্টে তিনি লেখেন, অপ্রতিম মায়ের আইফোন নিয়ে টিকটক ভিডিও বানাতে বের হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অন্যরা আগে থেকেই ফোনটি নেওয়ার জন্য তাকে চাপ দিচ্ছিল এবং তাদের পরিকল্পনা ছিল ফোনটি ছিনিয়ে নেওয়া। এ পরিকল্পনার সঙ্গে ‘তুহিন’ নামের একজন জড়িত ছিলেন বলেও পোস্টে দাবি করা হয়।
পোস্টের বর্ণনা অনুযায়ী, তুহিন অপ্রতিমকে নিয়ে পাহাড়ের প্রায় দেড় কিলোমিটার ভেতরে চলে যায়। পরে আরও দুজন সেখানে যোগ দেয়। তিনজন মিলে অপ্রতিমের কাছ থেকে মোবাইল ফোন নেওয়ার চেষ্টা করে এবং তার মাথায় আঘাত করে। সেখানেই অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত হয় বলে দাবি করেছেন তার মা।
তবে পোস্টে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে—অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা এক কিশোরকে অপ্রতিম ৫ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল। সম্প্রতি অপ্রতিম সেই টাকা ফেরত চাইছিল। এতে ওই কিশোর বিরক্ত হয়ে পড়েছিল এবং টাকা ফেরত না দেওয়ার উদ্দেশ্যে অপ্রতিমকে সরিয়ে দেওয়ার চিন্তা করতে পারে বলে পোস্টে দাবি করা হয়েছে।
পোস্টে আরও বলা হয়, তুহিনকে আটক করার পরও সে অন্যদের বিষয়ে তথ্য দেয়নি। ওই সময় তুহিনের মোবাইলে বারবার ফোন আসছিল। পোস্টদাতার দাবি, ফোনগুলো করছিল সেই কিশোর—যে অপ্রতিমের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা ধার নিয়েছিল।
অপ্রতিমের মা আরও দাবি করেন, ওই কিশোর পাহাড়ে যাওয়ার সময় নিজের মোবাইল সঙ্গে নেয়নি, যাতে তার অবস্থান শনাক্ত করা না যায়। পোস্টে তার বয়স ১৫ বছর বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে অপ্রতিমের মায়ের দাবি, অপ্রতিমের বন্ধুদের অধিকাংশই তার চেয়ে বয়সে বড় ছিল। একই সঙ্গে অপ্রতিম নিজে কোথা থেকে ৫ হাজার টাকা পেয়েছিল এবং কেন অন্য একজনকে সেই টাকা ধার দিয়েছিল—সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
এর আগে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদকে নিয়ে নতুন তথ্য সামনে আসে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির মানববন্ধনে অপ্রতিমের মায়ের পক্ষে তার সহকর্মী সহযোগী অধ্যাপক ড. কামরুন নাহার জানান, ফাহাদ ঘটনার প্রায় ১০ দিন আগে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে বিনা বেতনে কাজ শুরু করেছিলেন।
এ ছাড়া ড. নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর থাকাকালে মাদকবিরোধী অভিযানে স্থানীয় কয়েকজন কিশোর গ্যাং সদস্যকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিলেন বলেও মানববন্ধনে জানানো হয়। ওই কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্বে মামলার আরেক আসামি সাইফুল ইসলাম তুহিন ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
অপ্রতিমের মা মনে করেন, অতীতে ওই কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের সঙ্গে তার ছেলেকে হত্যার কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে যাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে দেখানো হয়েছে, তাদের প্রকৃত বয়স নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তার মা। তিনি ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের বয়স-সংক্রান্ত বিষয় নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। প্রয়োজনে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে আইন সংশোধনের দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
এর আগে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের একটি ফেসবুক পোস্টও অপ্রতিমের মৃত্যুর পর নতুন করে আলোচনায় আসে। কুমিল্লার কোটবাড়ি বিশ্বরোড এলাকায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের সময় ঘটনাস্থলে গিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে ওই পোস্ট করেছিলেন ড. নাহিদা বেগম। সেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি আহত শিক্ষার্থীদের সহযোগিতার চেষ্টা করার কথা জানিয়েছিলেন।
অন্যদিকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর তার মা জানিয়েছিলেন, “ওই ছিল আমাদের সব। ওকে ঘিরেই আমাদের কত স্বপ্ন ছিল, কত পরিকল্পনা ছিল। ওর হাসি, ওর কথা, ওর ছোট ছোট আবদারেই আমাদের ঘরটা ভরে থাকত। আজ সেই ঘরেই ও নেই, ওর বই-খাতা আছে, বিছানায় ওর জিনিসপত্র আছে, কিন্তু ও নেই।”
অপ্রতিমের বাবা কেএম ফিরোজ শাহরিয়ারও ছেলের হত্যার উপযুক্ত বিচার দাবি করেছেন।
অপ্রতিম ছিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও ব্যবসায়ী কেএম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। সে কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ি গন্ধমতি এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হওয়ার পর অপ্রতিম নিখোঁজ হয়। প্রায় ২১ ঘণ্টা পর শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ঘেঁষা সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিমের মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, কারা কীভাবে জড়িত এবং ফেসবুক পোস্টে উঠে আসা নতুন তথ্যগুলোর সঙ্গে ঘটনার কোনো যোগসূত্র আছে কি না—তা তদন্তের বিষয়।

অপ্রতিমের মায়ের সঙ্গে দেখা করেছি। তার অবস্থা খুবই খারাপ। তারপরও তিনি আমাকে কয়েকটি দাবি জানাতে বলেছেন। তার পক্ষ হয়ে আমি এসব দাবি জানিয়েছি।






























