

ঈদের আনন্দ শেষে ঘরে ফেরার পথে একটি পরিবারের হাসি মুহূর্তেই পরিণত হলো হৃদয়বিদারক শোকে। কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায় ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের চারজনসহ মোট পাঁচজন নিহত হয়েছেন। আর অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া ১২ বছরের শিশু আবরার এখন নিথর—কথা হারিয়ে ফেলেছে নিজের চোখের সামনে ভেঙে পড়া পৃথিবীর শোকে।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সন্ধ্যা ৬টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কালাকচুয়া এলাকায় ঘটে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। একটি প্রাইভেটকার বাসের ধাক্কায় দুমড়ে-মুচড়ে যায়, আর তাতেই শেষ হয়ে যায় একটি সুখী পরিবারের চারটি প্রাণ।
দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন—আবরারের বাবা মুফতি আব্দুল মোমিন (৫২), মা দিল আফরোজ আক্তার (৪৫), বোন লাবিবা (২১) এবং ছোট ভাই আরশাদ (৬)। তাদের সঙ্গে থাকা প্রাইভেটকারের চালক জামাল হোসেন (৫০) ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।
অবিশ্বাস্যভাবে প্রাণে বেঁচে যায় আবরার। কিন্তু শুরুতে সে জানতো না, তার পৃথিবী ইতোমধ্যেই ধ্বংস হয়ে গেছে। হাসপাতালে আহত অবস্থায় তাকে জানানো হয়েছিল, তার পরিবারের সবাই চিকিৎসাধীন। কিন্তু রাত গভীর হলে, স্বজনরা যখন ময়নামতি হাইওয়ে থানা থেকে একে একে মরদেহ নিয়ে যায়—তখনই সত্যটা সামনে আসে। সেই মুহূর্ত থেকে আবরার আর কোনো কথা বলেনি। যেন তার কণ্ঠও হারিয়ে গেছে প্রিয়জনদের সঙ্গে।
নিহতদের স্বজনরা জানান, লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে নানা বাড়িতে ঈদের ছুটি কাটিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন তারা। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে তাদের বাসায় ফেরার পথেই এই নির্মম দুর্ঘটনার শিকার হন সবাই।
পরিবারের আরেক সদস্য হুজাইফা (২৫) নানা বাড়িতে থেকে যাওয়ায় প্রাণে বেঁচে গেছেন। কিন্তু বেঁচে থাকলেও তিনি হারিয়েছেন তার পুরো পরিবার।
জানা গেছে, নিহতদের বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার ছাতারপাইয়া গ্রামে। আবরারের বাবা রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি মাদ্রাসায় মুফতি হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
হাইওয়ে পুলিশ জানায়, কালাকচুয়ার একটি হোটেলে যাত্রাবিরতির পর প্রাইভেটকারটি পুনরায় ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়। ঠিক তখনই সড়কে ওঠার সময় চট্টগ্রামমুখী একটি দ্রুতগতির বাস সজোরে ধাক্কা দেয়। মুহূর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় গাড়িটি।
আবরারের মামা মাওলানা ফয়সাল আহমেদ অভিযোগ করেন, বেপরোয়া বাস চালনার কারণেই এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে। তিনি দ্রুত চালক ও সহকারীর গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
ময়নামতি হাইওয়ে থানার ওসি আবদুল মমিন বলেন, দুর্ঘটনার ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল কেউই বেঁচে নেই। কিন্তু আবরারের বেঁচে যাওয়া সত্যিই অলৌকিক। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঘাতক বাসটি জব্দ করা হলেও চালক ও সহকারী পালিয়ে গেছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
এই দুর্ঘটনা শুধু পাঁচটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি—একটি শিশুর শৈশব, একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং অসংখ্য স্বপ্নও মুহূর্তেই ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে।