জেনারেল ওয়াকার-ইউনূস বোঝাপড়ায় গভীর হচ্ছে রাজনৈতিক সংকট

জেনারেল ওয়াকার ও ইউনুসের বোঝাপড়ায় দীর্ঘায়িত বাংলাদেশ রাজনৈতিক সংকট: ক্ষমতা কাঠামোর নেপথ্যে কারা চালকের আসনে?
জেনারেল ওয়াকার এবং মুহাম্মদ ইউনূসের মধ্যকার পর্দার আড়ালের বোঝাপড়া আজকের বাংলাদেশ রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর ও জটিল করে তুলেছে। একজন সেনাপ্রধান হয়েও ওয়াকার যেভাবে ইউনূস সরকারের টিকে থাকার প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছেন, তা শুধু আশ্চর্যের নয়—গণতন্ত্র ও নিরাপত্তার ভবিষ্যতের জন্য তা ভয়ানক বিপদের পূর্বাভাসও বটে।

একদিকে সেনাপ্রধান ওয়াকার নিজেকে নিরপেক্ষ বললেও বাস্তবতায় তিনি বারবার এমন ভূমিকা রেখেছেন যা ‘অরাজনৈতিক পেশাদারিত্ব’কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার সময় সেনাবাহিনীকে ছাত্রদের উপর গুলি না চালানোর সিদ্ধান্ত, পরে ভারতীয় সেনাপ্রধান ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার ফোনে শেখ হাসিনাকে ভারতে পাঠানোর আয়োজন, জামাতকে সবার আগে বৈঠকে ডাকা, এবং ইউনূসকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অভ্যর্থনা—সবই প্রমাণ করে তিনি শুধু একজন সেনাপ্রধান নন, বরং রাজনৈতিক সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।
অন্যদিকে মুহাম্মদ ইউনূস মূলত পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষত ডিপ স্টেটের প্রিয়পাত্র। তাঁকে সামনে রেখে নতুন এক ধরনের ‘ডিপ পার্লামেন্টারি স্ট্রাকচার’ কায়েম করা হচ্ছে, যেখানে জনগণের ভোট বা গণতন্ত্র কেবল মুখরোচক বুলি মাত্র। ওয়াকার এখানে দায়িত্ব নিয়েছেন ভারসাম্য রক্ষার—ভারত, চীন, রাশিয়া ও পাকিস্তানকে সামলে দেশের ভিতরে ইউনূসের সরকারকে দীর্ঘায়িত করতে।
সেনাসদরে দরবার ডেকে ওয়াকার যখন সরকারের কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে ১০ দফা তুলে ধরলেন, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন—তিনি বুঝি ‘ঘুম ভেঙে’ উঠেছেন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই ইউনূস নাটকীয়ভাবে পদত্যাগ নাটক করে আবারও নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নিলেন। বিএনপি ও অন্যান্য দলও ওয়াকারের পাশে না দাঁড়িয়ে নির্বাচন দাবি করেই থেমে গেল।
জামাত এর মধ্যেই দেশের প্রশাসন, শিক্ষা, বিচারব্যবস্থা—সব জায়গায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। আজহার মুক্তি, মূর্তি ও ম্যুরাল ধ্বংস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী হামলা সবই চলছে সেনাবাহিনীর চোখের সামনে, কখনো কখনো তাদের অংশগ্রহণে। অথচ ওয়াকার বরাবর ‘নির্বিকার’। ফলে এই অবস্থা প্রমাণ করে জামাত-ইসলামিস্টদের ‘নতুন বন্দোবস্ত’কেই সমর্থন দিচ্ছেন তিনি।
এদিকে সেনাবাহিনীর ভেতর থেকেও ইউনূস সরকার ওয়াকারের বিরুদ্ধে ক্যু চেষ্টা চালায়। সেনাপ্রধান তখন ক্ষমতা আরও সংহত করলেও সরকার বদলের পথে অগ্রসর হননি। বরং তিনি রাশিয়া সফর শেষে ফিরে এসে আবারো সেনা দরবার ডেকে সরকারকে ‘নরম বার্তা’ দিলেন।
সাম্প্রতিক মব ভায়োলেন্স, মুক্তিযুদ্ধের ম্যুরাল ভাঙা, কে এম নূরুল হুদার গলায় জুতার মালা পরানো, এবং সরকারের মদতে চলা বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধেও জেনারেল ওয়াকার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেননি—বা নেননি।
❝ তাহলে কি তিনি শেষ বিচারে ইউনূসের লোক? ❞
পর্যবেক্ষণ বলছে, জেনারেল ওয়াকার ও মুহাম্মদ ইউনূস উভয়ই ক্ষমতা কাঠামোর দুই মেরু হলেও একে অপরের পরিপূরক। ওয়াকার সামলাচ্ছেন সামরিক-অভ্যন্তরীণ-আঞ্চলিক ভারসাম্য, আর ইউনূস সামলাচ্ছেন পশ্চিমা অনুমোদন। ফলে দুইজন মুখোমুখি দেখালেও মূলত একই ছাতার নিচে অবস্থান করছেন।
তাই যেসব আওয়ামীপন্থী বা বিএনপি ঘরানার মানুষ ভেবে বসে আছেন, ওয়াকার একদিন শেখ হাসিনাকে বা বিএনপিকে ফিরিয়ে আনবেন, তারা ভয়ানক ভুল করছেন। তার অবস্থান ও অভিলাষ ‘অরাজনৈতিক’ বলে যতই প্রচার হোক, বাংলাদেশ রাজনৈতিক সংকটের সমাধান তাঁর ‘নিরপেক্ষতা’ নয়, বরং তার অবস্থান পরিবর্তনের ওপরই নির্ভর করছে।
জেনারেল ওয়াকার যদি সত্যিই মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেন, তাহলে আজকের বাংলাদেশ রাজনৈতিক সংকট এতটা গভীর হত না। বরং দেখা যাচ্ছে, দৃশ্যমান বিরোধিতার আড়ালে দুইজনই একই ক্ষমতা কাঠামোর নিরাপদ খেলোয়াড়—যারা জনগণের শ্বাসরুদ্ধ গণতন্ত্রের ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের শর্তে রাষ্ট্র চালিয়ে যাচ্ছেন।
🔑 সারসংক্ষেপ (চুম্বক পয়েন্ট):
- জেনারেল ওয়াকার দৃশ্যত নিরপেক্ষ হলেও কার্যত ইউনূস সরকারের চালিকাশক্তি
- জামাত-ইসলামিস্টদের প্রশাসনে প্রভাব বেড়েছে, মব ভায়োলেন্সে সেনা নীরব
- ওয়াকারের ভারত-রাশিয়া সংযোগ বনাম ইউনূসের পশ্চিমা মদত
- সেনাবাহিনীর ‘আনুষ্ঠানিক বিরোধিতা’ও কার্যত দৃশ্যভ্রম মাত্র
- নির্বাচন পিছোলে সবচেয়ে লাভবান জামাত, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বিএনপি
প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।
দেবীদ্বারে মা-ভাতিজি হত্যার দায় স্বীকার, ইমনের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি

‘আমি সর্বনাশ করেছি, তখন আমার মাথা ঠিক ছিল না’
কুমিল্লার দেবীদ্বারে মা ও ভাতিজিকে হত্যার ঘটনায় আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন ইমন মিয়া (২৯)। জবানবন্দিতে তিনি হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়ে ইমন বলেন, ‘আমি সর্বনাশ করেছি, তখন আমার মাথা ঠিক ছিল না।’
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে দেবীদ্বার থানা পুলিশ ইমন মিয়াকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের জন্য সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত-৪-এর বিচারক সায়মা শরীফ নিশাতের আদালতে হাজির করে। পরে আদালতে তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, জবানবন্দিতে ইমন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন। জবানবন্দি রেকর্ড শেষে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী রাতেই পুলিশি নিরাপত্তায় তাঁকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।
পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য, পায়ের অসহ্য ব্যথার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে ইমন আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। এ সময় তাঁর মা পিয়ারা বেগম বাধা দিলে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি দা দিয়ে মাকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করেন। পরে তাঁর বড় ভাইয়ের ৮ মাস বয়সী মেয়ে ইসরাত জাহানকেও আছড়ে হত্যা করার অভিযোগ ওঠে।

আদালতে ইমন হত্যার দায় স্বীকার করেছে। নিহত দুজনের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
নিহত পিয়ারা বেগম (৬৫) ইমনের মা ও মৃত ফরিদ মিয়ার স্ত্রী। অপর নিহত ৮ মাস বয়সী ইসরাত জাহান ইমনের বড় ভাই সুজন মিয়ার মেয়ে।
ঘটনার সময় ইমনের বড় ভাই সুজন মিয়ার স্ত্রী রাবেয়া বেগম তাঁর মেয়েকে কোলে নিয়ে ছুটে এলে ইমন তাঁকেও কাঠের লাঠি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেন বলে স্থানীয়রা জানান। এ সময় শিশুটির মাথায়ও আঘাত লাগে এবং সে মায়ের কোল থেকে ছিটকে পড়ে। পরে শিশুটিকে তুলে এনে ইমন আছড়ে হত্যা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ৪-৫ বছর আগে ফুটবল খেলতে গিয়ে ইমনের পায়ে আঘাত লাগে। ২-৩ বছর আগে তাঁর প্রথমবার অস্ত্রোপচার করা হলেও ব্যথা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। গত এক সপ্তাহে এলাকাবাসীর সহযোগিতায় প্রায় ৭০ হাজার টাকা ব্যয়ে তাঁর পায়ে আরেকটি অস্ত্রোপচার করা হয়। রোববার বিকেলে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে তিনি বাড়িতে ফেরেন। তবে পায়ের ব্যথা তখনো ছিল বলে স্বজন ও স্থানীয়রা জানান।
সোমবার সকালে পায়ের ব্যথার কারণে ইমন আত্মহত্যার চেষ্টা করলে তাঁর মা বাধা দেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। একপর্যায়ে ইমন মায়ের হাতে দা দিয়ে তাঁকে হত্যা করতে বলেন। পিয়ারা বেগম ছেলেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘বাবা, তুই সুস্থ হয়ে যাবি।’ এরপর ইমন তাঁর মায়ের হাত থেকে দা ছিনিয়ে নিয়ে তাঁকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করেন বলে অভিযোগ।
ঘটনাটি ঘটে সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার ১ নম্বর বড়শালঘর ইউনিয়নের বড়শালঘর গ্রামের দক্ষিণপাড়া এলাকার মোস্তফা মাস্টারের বাড়িতে।
ইমন মিয়া ওই গ্রামের মৃত ফরিদ মিয়ার ছেলে।
ঘটনার খবর পেয়ে স্থানীয়রা আহত রাবেয়া বেগমকে উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। এ সময় ইমনকে ঘরে আটকে রাখেন স্থানীয়রা।
খবর পেয়ে দেবীদ্বার সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সিনিয়র এএসপি) মো. শাহীন এবং দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান একদল পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে ইমনকে উদ্ধার করে হেফাজতে নেন।
এ ঘটনায় ইমনের বড় ভাই সুজন মিয়া বাদী হয়ে ইমন মিয়াকে একমাত্র আসামি করে দেবীদ্বার থানায় হত্যা মামলা করেছেন।
দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান জানান, আদালতে ইমন হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। নিহত দুজনের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
মুরাদনগরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ইউপি সদস্যসহ গ্রেপ্তার ২

মুরাদনগরে আগে আটক, পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা
স্বজনদের দাবি, মামলার খবরই জানতেন না তারা
কুমিল্লার মুরাদনগরে ইউপি সদস্য মো. ইদ্রিস ও মো. দেলোয়ার হোসেনকে নিজ নিজ বাড়ি থেকে আটকের পর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। তবে স্বজনদের অভিযোগ, তাদের আটক করার আগে বা পরে মামলা সম্পর্কে তারা কিছুই জানতেন না।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ভোর রাতে মুরাদনগর উপজেলা সদর ইউনিয়নের দিলালপুর ও নাগেরকান্দি এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের নিজ নিজ বাড়ি থেকে আটক করা হয়।
গ্রেপ্তার ইদ্রিস মেম্বার (৪৫) মুরাদনগর সদর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য এবং দিলালপুর গ্রামের শামসুল হকের ছেলে। অন্যদিকে দেলোয়ার হোসেন (৪৫) নাগেরকান্দি গ্রামের বেদন মিয়ার ছেলে।
পুলিশ জানায়, ভোররাতে পৃথক অভিযান চালিয়ে তাদের নিজ নিজ বাড়ি থেকে আটক করা হয়। পরে তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয় এবং ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

গ্রেপ্তার দুজনকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তবে গ্রেপ্তার দুজনের স্বজনদের অভিযোগ, ভোররাতে পুলিশ বাড়িতে এসে তাদের ধরে নিয়ে যায়। তখন কোনো মামলার কথা জানানো হয়নি। পরে তারা জানতে পারেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। মামলাটি সম্পর্কে আটকের আগে তারা কিছুই জানতেন না বলেও দাবি করেন স্বজনরা।
মুরাদনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন চৌধুরী জানান, গ্রেপ্তার দুজনকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তবে মামলার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, ধারাসহ বিস্তারিত তথ্য পুলিশ জানায়নি।
অপ্রতিম হত্যার পর মায়ের ফেসবুকে ধারাবাহিক পোস্ট, আইডি চালাচ্ছেন কে?

অপ্রতিম হত্যার পর মায়ের ফেসবুক পোস্ট ঘিরে নতুন প্রশ্ন, সামনে এলো ৫ হাজার টাকা ও আইফোনের তথ্য
ছেলের শোকে কাতর মা, তবু ফেসবুকে একের পর এক পোস্ট; হত্যার নেপথ্য নিয়ে নিজেই দিলেন নতুন তথ্য
কুমিল্লায় আলোচিত কিশোর ইশরাত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর তার মা ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমকে নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকাহত এই মায়ের ব্যক্তিগত ফেসবুক কার্যক্রমও এখন আলোচনায় এসেছে।
‘নাদিদা নাহিদ’ নামের ফেসবুক আইডি থেকে নিয়মিত পোস্ট ও অপ্রতিমকে ঘিরে বিভিন্ন তথ্য শেয়ার করা হচ্ছে। সর্বশেষ, এই প্রতিবেদনের প্রস্তুতির সময়ের প্রায় দুই ঘণ্টা আগেও ওই আইডি থেকে অপ্রতিমের হত্যা নিয়ে একটি দীর্ঘ পোস্ট দেওয়া হয়। পোস্টের সঙ্গে অপ্রতিম ও আইফোনসহ চারটি ছবি শেয়ার করা হয়েছে।
ফেসবুক পোস্টে অপ্রতিমের মা দাবি করেছেন, শুধু আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাই নয়, অপ্রতিমের কাছ থেকে ধার নেওয়া ৫ হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়টিও হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ভূমিকা রাখতে পারে।
পোস্টে তিনি লেখেন, অপ্রতিম মায়ের আইফোন নিয়ে টিকটক ভিডিও বানাতে বের হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অন্যরা আগে থেকেই ফোনটি নেওয়ার জন্য তাকে চাপ দিচ্ছিল এবং তাদের পরিকল্পনা ছিল ফোনটি ছিনিয়ে নেওয়া। এ পরিকল্পনার সঙ্গে ‘তুহিন’ নামের একজন জড়িত ছিলেন বলেও পোস্টে দাবি করা হয়।
পোস্টের বর্ণনা অনুযায়ী, তুহিন অপ্রতিমকে নিয়ে পাহাড়ের প্রায় দেড় কিলোমিটার ভেতরে চলে যায়। পরে আরও দুজন সেখানে যোগ দেয়। তিনজন মিলে অপ্রতিমের কাছ থেকে মোবাইল ফোন নেওয়ার চেষ্টা করে এবং তার মাথায় আঘাত করে। সেখানেই অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত হয় বলে দাবি করেছেন তার মা।
তবে পোস্টে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে—অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা এক কিশোরকে অপ্রতিম ৫ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল। সম্প্রতি অপ্রতিম সেই টাকা ফেরত চাইছিল। এতে ওই কিশোর বিরক্ত হয়ে পড়েছিল এবং টাকা ফেরত না দেওয়ার উদ্দেশ্যে অপ্রতিমকে সরিয়ে দেওয়ার চিন্তা করতে পারে বলে পোস্টে দাবি করা হয়েছে।
পোস্টে আরও বলা হয়, তুহিনকে আটক করার পরও সে অন্যদের বিষয়ে তথ্য দেয়নি। ওই সময় তুহিনের মোবাইলে বারবার ফোন আসছিল। পোস্টদাতার দাবি, ফোনগুলো করছিল সেই কিশোর—যে অপ্রতিমের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা ধার নিয়েছিল।
অপ্রতিমের মা আরও দাবি করেন, ওই কিশোর পাহাড়ে যাওয়ার সময় নিজের মোবাইল সঙ্গে নেয়নি, যাতে তার অবস্থান শনাক্ত করা না যায়। পোস্টে তার বয়স ১৫ বছর বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে অপ্রতিমের মায়ের দাবি, অপ্রতিমের বন্ধুদের অধিকাংশই তার চেয়ে বয়সে বড় ছিল। একই সঙ্গে অপ্রতিম নিজে কোথা থেকে ৫ হাজার টাকা পেয়েছিল এবং কেন অন্য একজনকে সেই টাকা ধার দিয়েছিল—সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
এর আগে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদকে নিয়ে নতুন তথ্য সামনে আসে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির মানববন্ধনে অপ্রতিমের মায়ের পক্ষে তার সহকর্মী সহযোগী অধ্যাপক ড. কামরুন নাহার জানান, ফাহাদ ঘটনার প্রায় ১০ দিন আগে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে বিনা বেতনে কাজ শুরু করেছিলেন।
এ ছাড়া ড. নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর থাকাকালে মাদকবিরোধী অভিযানে স্থানীয় কয়েকজন কিশোর গ্যাং সদস্যকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিলেন বলেও মানববন্ধনে জানানো হয়। ওই কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্বে মামলার আরেক আসামি সাইফুল ইসলাম তুহিন ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে।
অপ্রতিমের মা মনে করেন, অতীতে ওই কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের সঙ্গে তার ছেলেকে হত্যার কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে যাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে দেখানো হয়েছে, তাদের প্রকৃত বয়স নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তার মা। তিনি ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের বয়স-সংক্রান্ত বিষয় নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। প্রয়োজনে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে আইন সংশোধনের দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
এর আগে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের একটি ফেসবুক পোস্টও অপ্রতিমের মৃত্যুর পর নতুন করে আলোচনায় আসে। কুমিল্লার কোটবাড়ি বিশ্বরোড এলাকায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের সময় ঘটনাস্থলে গিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে ওই পোস্ট করেছিলেন ড. নাহিদা বেগম। সেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি আহত শিক্ষার্থীদের সহযোগিতার চেষ্টা করার কথা জানিয়েছিলেন।
অন্যদিকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর তার মা জানিয়েছিলেন, “ওই ছিল আমাদের সব। ওকে ঘিরেই আমাদের কত স্বপ্ন ছিল, কত পরিকল্পনা ছিল। ওর হাসি, ওর কথা, ওর ছোট ছোট আবদারেই আমাদের ঘরটা ভরে থাকত। আজ সেই ঘরেই ও নেই, ওর বই-খাতা আছে, বিছানায় ওর জিনিসপত্র আছে, কিন্তু ও নেই।”
অপ্রতিমের বাবা কেএম ফিরোজ শাহরিয়ারও ছেলের হত্যার উপযুক্ত বিচার দাবি করেছেন।
অপ্রতিম ছিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও ব্যবসায়ী কেএম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। সে কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ি গন্ধমতি এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হওয়ার পর অপ্রতিম নিখোঁজ হয়। প্রায় ২১ ঘণ্টা পর শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ঘেঁষা সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিমের মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, কারা কীভাবে জড়িত এবং ফেসবুক পোস্টে উঠে আসা নতুন তথ্যগুলোর সঙ্গে ঘটনার কোনো যোগসূত্র আছে কি না—তা তদন্তের বিষয়।

অপ্রতিমের মায়ের সঙ্গে দেখা করেছি। তার অবস্থা খুবই খারাপ। তারপরও তিনি আমাকে কয়েকটি দাবি জানাতে বলেছেন। তার পক্ষ হয়ে আমি এসব দাবি জানিয়েছি।






















