

বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের কার্যক্রমে গণমাধ্যমের ওপর যে দমন-পীড়ন চলেছে, তা বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থা সিপিজে (কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস) চলতি মাসের শুরুতে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, “বাংলাদেশের নেতারা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, অথচ বহু সাংবাদিক আজ জেলে।” একইসঙ্গে ইউনেসকো ঢাকায় আয়োজিত বিশ্ব প্রেস স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে উদ্বেগ জানিয়ে বলেছে, ক্রমবর্ধমান সেন্সরশিপ, আর্থিক চাপ, আইনি হুমকি, লিঙ্গ বৈষম্য ও অপরাধীদের দায়মুক্তি পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করছে।

বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা
নোয়াখালির সাইফুল্লা কামরুল ও বরিশালের আখতার ফারুক শাহীন সরাসরি অনুষ্ঠানে তাদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। ইউনেসকোর বাংলাদেশ প্রধান ড. সুসান ভিজ বলেন, “সাংবাদিকদের নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করার এখনই সময়।”
একই দিনে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদন অনুসারে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম আট মাসে ৬৪০ জন সাংবাদিককে টার্গেট করা হয়েছে। ১৮২ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, ২০৬ জন শারীরিক হামলার শিকার হয়েছেন এবং ৮৫ জনের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়েছে।
⚖️ উচ্চপর্যায়ের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা
সিপিজের প্রতিবেদনটি শুরু হয়েছে একাত্তর টিভির সাবেক সাংবাদিক ফারজানা রূপা-এর দুরবস্থার বর্ণনা দিয়ে। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা, আইনজীবী না পাওয়া এবং জামিন না হওয়া- সবই আন্তর্জাতিক মহলে শঙ্কা তৈরি করেছে। তার স্বামী, একই চ্যানেলের সাবেক হেড অব নিউজ শাকিল আহমেদও কারাগারে।
শ্যামল দত্ত ও মোজাম্মেল হক বাবু-সহ আরও দুই প্রখ্যাত সাংবাদিক কারাগারে রয়েছেন। সিপিজে মনে করে, তাদের আগের রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে এই মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
সিপিজের এশীয় পরিচালক বেহ লিইহ ওয়াইয়ি বলেন, “কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই চারজন নামী সাংবাদিককে কারাগারে আটক রাখা সরকারের সংস্কার প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।” তিনি মনে করিয়ে দেন, প্রকৃত সংস্কার মানে অতীতের ভুল থেকে সরে আসা, তার পুনরাবৃত্তি নয়।
🌐 আশাভঙ্গের বাস্তবতা
লন্ডনভিত্তিক বিশ্লেষক প্রিয়জিৎ দেব সরকার বলেন, ড. ইউনূসের সরকার দ্বিতীয় স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে গণমাধ্যমের শৃঙ্খল আরও দৃঢ় হয়েছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন বহাল রয়েছে, বরং নতুন বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
২০২৫ সালের মার্চে বরিশালে দিনের আলোয় সাংবাদিকদের মারধর, ঢাকায় রিপোর্টার্স ইউনিটির সামনেও হামলার ঘটনা, নারী সাংবাদিকের গণধর্ষণ, রাফিয়া তামান্না ও সাজেদুল ইসলাম সেলিমের ওপর হামলা—এসব ঘটনাই প্রমাণ করে, পরিস্থিতি ভয়াবহ।
দৈনিক প্রথম আলোর রাজশাহী অফিসে হামলা, সাংবাদিক কামরুজ্জামানকে মোবাইল কোর্টে ১০ দিনের সাজা, রুবেল হোসেইনের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানকালে খুনের মামলা, দীপ্ত টিভির সম্প্রচার বন্ধ, এটিএন বাংলার সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করা—সবই গণমাধ্যম দমনের ধারাবাহিকতা।
বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এখন এক সংকটময় মুহূর্তে। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং মর্যাদা রক্ষা করা এখন শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, জাতীয় অস্তিত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার প্রশ্ন।