সরকার ও জুলাই যোদ্ধাদের পক্ষ নিয়েও গ্রেফতার সাংবাদিক শাহজাদা এমরান

“আঙ্কেল গেইটটা খোলেন না” বইয়ে সরকারের পক্ষের অবস্থানকে সমর্থন, উপদেষ্টার অভিনন্দনও পেয়েছিলেন—তবুও রাষ্ট্রবিরোধী তকমা দিয়ে আটক
সরকারের পক্ষের লেখক গ্রেফতার—এমন ঘটনা বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের ইতিহাসে এক ভয়ঙ্কর বাঁক। ২০২৪ সালের “গণঅভ্যুত্থান” নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে প্রকাশ্যে লিখে প্রশংসিত হওয়া সাংবাদিক ও লেখক শাহজাদা এমরান এখন নিজেই রাষ্ট্রীয় দমননীতির শিকার। সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালানোর সময় তাকে আটক করেছে বিজিবি। বর্তমানে তিনি একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার হেফাজতে আছেন এবং রাষ্ট্রবিরোধী সন্দেহে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
এই গ্রেফতার এমন এক সময়ে ঘটল, যখন শাহজাদা এমরান তার আলোচিত বই “আঙ্কেল গেইটটা খোলেন না—গণঅভ্যুত্থান, কুমিল্লা ২০২৪” প্রকাশ করে সরাসরি অন্তর্বর্তী সরকার ও তথাকথিত জুলাই বিপ্লবীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এই গ্রন্থে তিনি কুমিল্লা কেন্দ্রিক ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে রাষ্ট্র পরিবর্তনের বৈধ চেষ্টার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তার লেখায় বর্তমান সরকারের উত্থানকে ‘ঐতিহাসিক প্রয়োজনে সৃষ্ট রাজনৈতিক সমাধান’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। শুধু তাই নয়, বইটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ সরকারের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধি। এমনকি বইটি গ্রহণ করে লেখককে সরাসরি অভিনন্দন জানান অন্তর্বর্তী সরকারের খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার। সেই বই আজ সরকারি গ্রন্থাগারেও ঠাঁই পেয়েছে।

কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, এমন একজন সরকারঘেঁষা লেখককেই এখন রাষ্ট্র ‘রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতার’ অভিযোগে আটকে রেখেছে। সূত্রমতে, বিজিবির নিজস্ব গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নীলফামারী সীমান্তে শাহজাদা এমরান ও তার সঙ্গী তরিকুল ইসলাম করুন (ছদ্মনাম)—যিনি কুমিল্লার সিডি প্যাড হাসপাতালে চাকরি করেন ও কথিত সাংবাদিক—তাদের আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হয় প্রায় ২০ লক্ষ টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। এরপর তাদের যৌথ বাহিনীর মাধ্যমে একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, তাদের লক্ষ্য ছিল ভারতে গমন করে বর্তমান সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব নাইমুল ইসলাম খানের সঙ্গে গোপন সাক্ষাৎ। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সন্দেহ করছে, এদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বা নথিপত্র থাকতে পারে, কিংবা তারা কোনো আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে কাজ করছিলেন।
অন্যদিকে দুই দিন ধরে নিখোঁজ থাকার পর শাহজাদা এমরানের পরিবার ও বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ) সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যপক লেখালেখি শুরু করে। তাদের চাপের মুখেই আজ শনিবার দুপুরে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, “রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিবেচনায় শাহজাদা এমরান ও তার সহযোগীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।”
এ ঘটনার প্রেক্ষিতে সাংবাদিক মহলে নিন্দার ঝড় বইছে। বিএমএসএফ’র উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম আতিকুর রহমান বাশার বলেন—
“যিনি সরকারপন্থী বই লিখে মঞ্চে অভিনন্দন পান, তাকেও যদি সরকার গ্রেফতার করে, তাহলে বাকস্বাধীনতা বলে আর কিছু থাকে না। এটি ভয় দেখানোর কৌশল, যেখানে সরকারের জন্য কলম ধরা বুদ্ধিজীবীরাও নিরাপদ নন।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাষ্ট্র এখন এমন এক আতঙ্ক ও অনাস্থার জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে নিজের তৈরি করা বুদ্ধিজীবী বা প্রচারকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। এমন বাস্তবতায় কেউই নিরাপদ নয়—না বিরোধী, না সমর্থক। শাসনব্যবস্থা আজ এতটাই দুর্বল ও দুর্ভাবনায় নিমজ্জিত যে, বন্ধুকেও শত্রু মনে করছে। রাষ্ট্র এখন আর পার্থক্য করছে না—কে সমালোচক, আর কে প্রশংসাকারী।
বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে এই ধরনের ‘সফট টার্গেট’ তৈরি করে রাষ্ট্র মূলত সাংবাদিক সমাজে ভয় ও নীরবতা চাপিয়ে দিতে চায় বলে মনে করছে নাগরিক সমাজ। শাহজাদা এমরানের গ্রেফতার সেই ভয়ের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।
সরকারের পক্ষের লেখক গ্রেফতার—এই বার্তাটি এখন শুধু একজন সাংবাদিককে আটক করার ঘটনা নয়, এটি হলো রাষ্ট্রের আত্মঘাতী দ্বন্দ্বের দলিল। যে রাষ্ট্র নিজের মুখপাত্রদের বিশ্বাস করে না, সেই রাষ্ট্র নিজের জনগণকে কীভাবে বিশ্বাস করবে?
প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।
রহস্য ঘনীভূত
জামায়াত এমপির সঙ্গে হোটেলকাণ্ডে আলোচিত মরিয়ম, এবার লাশ পাওয়া গেল ন্যাম ভবনে

ন্যাম ভবনে এমপি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ
রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানাধীন ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য জিএম নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়ম খাতুনের (১৯) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাত ৭টার দিকে খবর পেয়ে ন্যাম ভবনে যায় শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ। পরে ভবনের একটি কক্ষে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় মরিয়মের মরদেহ দেখতে পায় পুলিশ।
মরিয়ম খাতুনকে এর আগে একটি হোটেলকেন্দ্রিক ভিডিওকাণ্ড ঘিরে আলোচনায় আসা সংসদ সদস্য জিএম নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। তবে তার মৃত্যুর কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

খবর পেয়ে আমিসহ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এসেছি। ভবনের একটি রুমের জানালা দিয়ে মরদেহ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা গেছে। পিবিআই ও সিআইডির ফরেনসিক দলকে ডাকা হয়েছে। এরপর থানা পুলিশ রুমে প্রবেশ করবে। তবে কখন তিনি আত্মহত্যা করেছেন, এ বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, খবর পেয়ে তিনি ও থানা পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গেছেন। ভবনের একটি কক্ষের জানালা দিয়ে মরদেহটি ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা যায়।
তিনি জানান, ঘটনাস্থলে পিবিআই ও সিআইডির ফরেনসিক দলকে ডাকা হয়েছে। তাদের উপস্থিতিতে পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
মরিয়ম খাতুন কখন মারা গেছেন এবং মৃত্যুর পেছনে কী কারণ রয়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তা।
পুলিশের তদন্ত ও ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যেতে পারে।
দেবীদ্বারে হত্যা-নাশকতা মামলায় ছাত্রলীগের দুই নেতা গ্রেপ্তার

কুমিল্লার দেবীদ্বারে হত্যা ও সন্ত্রাসবিরোধী নাশকতা মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের দুই নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে দেবীদ্বার থানা পুলিশ। গ্রেপ্তার দুজনের মধ্যে একজন সাব্বির হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি এবং অপরজন সন্ত্রাসবিরোধী নাশকতা মামলার আসামি।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে গ্রেপ্তার দুজনকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এর আগে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে পৃথক স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—দেবীদ্বার উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ও এলাহাবাদ গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে মো. আল-আমিন অভি (২৯) এবং দেবীদ্বার বরকামতা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ও একই ইউনিয়নের বাগুর গ্রামের বাবুল সরকারের ছেলে মো. আশরাফুল সরকার রাতুল (২০)।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আমিনুল ইসলাম সাব্বিরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে পিটিয়ে আহত করা হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একই বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান। এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার আল-আমিন অভি এজাহারভুক্ত ৪৪ নম্বর আসামি।

সাব্বির হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছাত্রলীগ নেতা আল-আমিন অভি এবং নাশকতা মামলার আসামি আশরাফুল সরকার রাতুলকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
মামলা দায়েরের পর থেকেই অভি পলাতক ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। এছাড়া সম্প্রতি ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যুবলীগের ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় মুরাদনগর থানায় দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী মামলায়ও তিনি এজাহারনামীয় ১৯ নম্বর আসামি। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অন্যদিকে, দেবীদ্বার থানাধীন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের খাদঘর এলাকায় ছাত্রলীগের প্ল্যাকার্ড হাতে সরকারবিরোধী মিছিল এবং নাশকতার প্রস্তুতির ঘটনায় তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আশরাফুল সরকার রাতুলকে সন্ত্রাসবিরোধী নাশকতা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তুহিনের বাড়িতে মিলল আইফোন
খুন করে শোকের ভান, অপ্রতিমের মাকেও সান্ত্বনা দেয় খুনিরা: পুলিশ

আইফোন ছিনিয়ে নিতে পাহাড়ি জঙ্গলে নিয়ে হত্যা, প্রধান পরিকল্পনাকারীসহ চারজন গ্রেপ্তার
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। আরও হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, হত্যাকাণ্ডের পরদিন অপ্রতিমের বাড়িতে গিয়ে তার শোকাহত মাকে সান্ত্বনাও দিয়েছিল হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা।
রোববার দুপুরে কুমিল্লায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান এসব তথ্য জানান। এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের প্রধান পরিকল্পনাকারী সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনটিও উদ্ধার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন কুমিল্লা নগরীর সানন্দা এলাকার সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫), কোতোয়ালি থানার হাতিগাড়া এলাকার মো. কামরুল হাসান এবং আফজাল খান ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. সিয়াম (১৯)।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, গত ১৮ সেপ্টেম্বর জুমার নামাজের পর কুমিল্লা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতিমকে দেখা যায়। পরে মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করে তাকে এক ঘণ্টার জন্য বাইরে যাওয়ার কথা বলে ডেকে নেয় তুহিন।
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটের দিকে তুহিন অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের পাশ দিয়ে সানন্দা এলাকার দিকে যায়। পরে ফাহাদ ও কামরুলও ওই এলাকার একটি নির্জন জঙ্গলের দিকে যায়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে পাহাড়ঘেরা নির্জন এলাকায় অপ্রতিমের কাছে থাকা আইফোনটি নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে অপ্রতিম বাধা দিলে তুহিনের সঙ্গে তার ধস্তাধস্তি শুরু হয়। পরে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে। একপর্যায়ে অপ্রতিমের মৃত্যু হলে তার আইফোন নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায় তারা।

প্রাথমিক তদন্তে আমরা জানতে পেরেছি, অপ্রতিমকে তার ব্যবহৃত আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আইফোন নেওয়ার চেষ্টা করলে অপ্রতিম বাধা দেয়। একপর্যায়ে তাকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। হত্যার পরদিনও আসামিরা অপ্রতিমের বাড়িতে গিয়ে তার শোকাহত মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভান করেছে। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য ও জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে আমরা ঘটনাটির রহস্য উদঘাটন করেছি। তদন্ত শেষে দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিলের প্রস্তুতি চলছে।
কিন্তু হত্যার পরও থামেনি নির্মমতার এই অধ্যায়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, পরদিন শনিবার সকালে তুহিনসহ কয়েকজন অপ্রতিমের বাড়িতে গিয়ে তার শোকাহত মাকে সান্ত্বনা দেয়। তখনও পরিবার জানত না, যাদের একজন তাদের পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছে, তার বিরুদ্ধেই উঠছে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ।
অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেন। সন্ধান না পেয়ে রাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়।
পরদিন শনিবার দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণে সালমানপুর এলাকার পাহাড়ঘেরা জঙ্গলে স্থানীয় লোকজন ও শিক্ষার্থীরা অপ্রতিমের মরদেহ দেখতে পান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিমের মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল।
পরে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলের নেতারা তুহিনকে শনাক্ত করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাকে আটক করার পর পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্যদেরও গ্রেপ্তার করা হয়। তুহিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তার বাসা থেকে অপ্রতিমের আইফোন উদ্ধার করা হয়েছে।
নিহত অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। সে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে অপ্রতিমের বাবা-মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। স্বজন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া।
রোববার সকালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকায় নিজ বাড়ির পাশের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও তার স্মরণে বিশ্ববিদ্যালয়ে শোক কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। এ কারণে স্থগিত রাখা হয়েছে ক্লাস ও পরীক্ষা। নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান আরো জানান, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়াই হত্যার উদ্দেশ্য ছিল বলে জানা গেছে। মামলার তদন্ত শেষ করে দ্রুত আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের প্রস্তুতি চলছে।
অপ্রতিমের মরদেহ এখন মাটির নিচে। কিন্তু তার হত্যাকাণ্ড ঘিরে কুমিল্লাজুড়ে যে প্রশ্ন ও শোক তৈরি হয়েছে, তা আরও গভীর হয়েছে একটি কারণে—একটি শিশুকে হত্যার পর তারই শোকাহত মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো নির্মম পরিহাসও ঘটেছে এই ঘটনায়।

























