মরা খালের আর্তনাদ: কুমিল্লার মুরাদনগরে হারিয়ে যাচ্ছে কাজিয়াতলের মাছ শিকারের শতবর্ষের ঐতিহ্য

কুমিল্লার কাজিয়াতল গ্রামে মরা খালে বৈঠা হাতে নৌকায় বসে আছেন দুইজন ব্যক্তি। পাশে কলাগাছ ও ঝোপঝাড় দেখা যাচ্ছে। ছবি : আজকের কথা
খালের বুকে আর নামে না জাল, শোনা যায় না মাছ ধরার উল্লাস—হারিয়ে যাচ্ছে কাজিয়াতলের শতবর্ষের ঐতিহ্য
একসময় যেই খালের ঢেউয়ের শব্দে মুখরিত থাকত পুরো গ্রাম। এখন সেই খালেরই কান্নার আর্তনাদ চোখে পড়ার মতো। বর্ষা এলেই শত শত মানুষ খড়া জাল, বেড় জাল, খাঁটি আর পলো হাতে নেমে পড়তেন মাছ ধরার উৎসবে। শিশুদের হাসি, জেলেদের ব্যস্ততা আর গ্রামবাসীর মিলনমেলায় প্রাণ ফিরে পেত কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ১৯ নম্বর দারোরা ইউনিয়নের কাজিয়াতল গ্রাম। অথচ আজ সেই খাল নীরব। পানির জায়গা দখল করেছে ঘাস-ঝোপ, আর মাছের রাজত্ব পরিণত হয়েছে শুকনো স্মৃতিতে।
গ্রামের পূর্ব পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া এই ঐতিহ্যবাহী খালটি একসময় ছিল এলাকার প্রাণ। বছরের প্রায় সব সময়ই এতে থাকত পর্যাপ্ত পানি। বর্ষাকালে খালটি ধারণ করত ভয়াল অথচ মনোমুগ্ধকর রূপ। স্রোতের বেগে পানির গর্জন শোনা যেত দূর থেকে। শুধু মাছের আধারই নয়, এই খাল ছিল স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি, বিনোদন ও সামাজিক সম্প্রীতির অন্যতম কেন্দ্র।
প্রবীণদের ভাষ্যমতে, মাছ ধরা ছিল শুধু একটি কাজ নয়—এটি ছিল গ্রামীণ উৎসব। খালের দুই পাড়ে জড়ো হতো শত শত মানুষ। কেউ জাল ফেলতেন, কেউ পলো চালাতেন, কেউ আবার ধরা মাছ ভাগাভাগি করে বাড়ি ফিরতেন। শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাস, নারীদের আনন্দ আর প্রবীণদের গল্পে মুখর থাকত পুরো এলাকা। সেই দৃশ্য আজ আর কোথাও দেখা যায় না।
সময়ের পরিবর্তন, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব, অপরিকল্পিত ভরাট, দখল এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় খালটি আজ মৃতপ্রায়। আগের মতো পানি জমে না, নেই মাছের প্রাকৃতিক আবাস। ফলে বিলুপ্তির পথে শুধু জলজ সম্পদ নয়, হারিয়ে যাচ্ছে একটি জনপদের শতবর্ষের লোকজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিও।
গ্রামের প্রবীণ জেলে শ্রী শম্ভু নাথ চন্দ্র দাস চোখে-মুখে আক্ষেপের ছাপ নিয়ে বলেন, “একসময় এই খালে এত মাছ ছিল যে জাল ফেললেই উঠে আসত। এখন খালেই পানি থাকে না, মাছও নেই। আগের মতো গ্রামের মানুষ একসঙ্গে মাছ ধরার আনন্দও আর উপভোগ করতে পারে না। সবকিছুই যেন স্মৃতি হয়ে গেছে।”
খালের পাড়ের বাসিন্দা হোসনেয়ারা বেগম, জাহানারা বেগম ও মনোয়ারা বেগম বলেন, “এই খালের সঙ্গে আমাদের শৈশব জড়িয়ে আছে। ছোটবেলায় সবাই মিলে মাছ ধরতাম, কত আনন্দ করেছি! এখন সেই খালে আর পানি নেই। সেখানে ঘাস জন্মেছে। সেই ঘাস গরু-ছাগলের জন্য কেটে নিয়ে যাই। খালের পাড় থেকে বিভিন্ন দেশীয় শাক-লতাপাতাও সংগ্রহ করি। কিন্তু খালের সেই প্রাণ আর নেই।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, খালটি রক্ষায় দীর্ঘদিন ধরেই কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নিয়মিত খনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে খালটি আবারও প্রাণ ফিরে পেতে পারে বলে মনে করছেন তারা। একই সঙ্গে তারা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং পানি উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
পরিবেশবিদদের মতে, একটি খাল শুকিয়ে যাওয়া মানে শুধু একটি জলাধার হারিয়ে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে বিলীন হয় জীববৈচিত্র্য, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, স্থানীয় অর্থনীতি এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। তাই এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে কাজিয়াতলের এই ঐতিহ্যবাহী খাল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কেবল ইতিহাসের পাতায় কিংবা প্রবীণদের স্মৃতিচারণেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
মরা খালটি আজ যেন নীরবে প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে—উন্নয়নের নামে আমরা কি আমাদের শেকড়, প্রকৃতি ও ঐতিহ্যকে ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি?
প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।
দেবীদ্বারে হত্যা-নাশকতা মামলায় ছাত্রলীগের দুই নেতা গ্রেপ্তার

কুমিল্লার দেবীদ্বারে হত্যা ও সন্ত্রাসবিরোধী নাশকতা মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের দুই নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে দেবীদ্বার থানা পুলিশ। গ্রেপ্তার দুজনের মধ্যে একজন সাব্বির হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি এবং অপরজন সন্ত্রাসবিরোধী নাশকতা মামলার আসামি।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে গ্রেপ্তার দুজনকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এর আগে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে পৃথক স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—দেবীদ্বার উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ও এলাহাবাদ গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে মো. আল-আমিন অভি (২৯) এবং দেবীদ্বার বরকামতা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ও একই ইউনিয়নের বাগুর গ্রামের বাবুল সরকারের ছেলে মো. আশরাফুল সরকার রাতুল (২০)।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আমিনুল ইসলাম সাব্বিরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে পিটিয়ে আহত করা হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একই বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান। এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার আল-আমিন অভি এজাহারভুক্ত ৪৪ নম্বর আসামি।

সাব্বির হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছাত্রলীগ নেতা আল-আমিন অভি এবং নাশকতা মামলার আসামি আশরাফুল সরকার রাতুলকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
মামলা দায়েরের পর থেকেই অভি পলাতক ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। এছাড়া সম্প্রতি ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যুবলীগের ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় মুরাদনগর থানায় দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী মামলায়ও তিনি এজাহারনামীয় ১৯ নম্বর আসামি। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
অন্যদিকে, দেবীদ্বার থানাধীন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের খাদঘর এলাকায় ছাত্রলীগের প্ল্যাকার্ড হাতে সরকারবিরোধী মিছিল এবং নাশকতার প্রস্তুতির ঘটনায় তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আশরাফুল সরকার রাতুলকে সন্ত্রাসবিরোধী নাশকতা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তুহিনের বাড়িতে মিলল আইফোন
খুন করে শোকের ভান, অপ্রতিমের মাকেও সান্ত্বনা দেয় খুনিরা: পুলিশ

আইফোন ছিনিয়ে নিতে পাহাড়ি জঙ্গলে নিয়ে হত্যা, প্রধান পরিকল্পনাকারীসহ চারজন গ্রেপ্তার
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। আরও হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, হত্যাকাণ্ডের পরদিন অপ্রতিমের বাড়িতে গিয়ে তার শোকাহত মাকে সান্ত্বনাও দিয়েছিল হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা।
রোববার দুপুরে কুমিল্লায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান এসব তথ্য জানান। এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের প্রধান পরিকল্পনাকারী সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনটিও উদ্ধার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন কুমিল্লা নগরীর সানন্দা এলাকার সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫), কোতোয়ালি থানার হাতিগাড়া এলাকার মো. কামরুল হাসান এবং আফজাল খান ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. সিয়াম (১৯)।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, গত ১৮ সেপ্টেম্বর জুমার নামাজের পর কুমিল্লা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতিমকে দেখা যায়। পরে মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করে তাকে এক ঘণ্টার জন্য বাইরে যাওয়ার কথা বলে ডেকে নেয় তুহিন।
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটের দিকে তুহিন অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের পাশ দিয়ে সানন্দা এলাকার দিকে যায়। পরে ফাহাদ ও কামরুলও ওই এলাকার একটি নির্জন জঙ্গলের দিকে যায়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে পাহাড়ঘেরা নির্জন এলাকায় অপ্রতিমের কাছে থাকা আইফোনটি নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে অপ্রতিম বাধা দিলে তুহিনের সঙ্গে তার ধস্তাধস্তি শুরু হয়। পরে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে। একপর্যায়ে অপ্রতিমের মৃত্যু হলে তার আইফোন নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায় তারা।

প্রাথমিক তদন্তে আমরা জানতে পেরেছি, অপ্রতিমকে তার ব্যবহৃত আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আইফোন নেওয়ার চেষ্টা করলে অপ্রতিম বাধা দেয়। একপর্যায়ে তাকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। হত্যার পরদিনও আসামিরা অপ্রতিমের বাড়িতে গিয়ে তার শোকাহত মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভান করেছে। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য ও জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে আমরা ঘটনাটির রহস্য উদঘাটন করেছি। তদন্ত শেষে দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিলের প্রস্তুতি চলছে।
কিন্তু হত্যার পরও থামেনি নির্মমতার এই অধ্যায়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, পরদিন শনিবার সকালে তুহিনসহ কয়েকজন অপ্রতিমের বাড়িতে গিয়ে তার শোকাহত মাকে সান্ত্বনা দেয়। তখনও পরিবার জানত না, যাদের একজন তাদের পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছে, তার বিরুদ্ধেই উঠছে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ।
অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেন। সন্ধান না পেয়ে রাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়।
পরদিন শনিবার দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণে সালমানপুর এলাকার পাহাড়ঘেরা জঙ্গলে স্থানীয় লোকজন ও শিক্ষার্থীরা অপ্রতিমের মরদেহ দেখতে পান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিমের মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল।
পরে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলের নেতারা তুহিনকে শনাক্ত করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাকে আটক করার পর পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্যদেরও গ্রেপ্তার করা হয়। তুহিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তার বাসা থেকে অপ্রতিমের আইফোন উদ্ধার করা হয়েছে।
নিহত অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। সে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে অপ্রতিমের বাবা-মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। স্বজন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া।
রোববার সকালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকায় নিজ বাড়ির পাশের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও তার স্মরণে বিশ্ববিদ্যালয়ে শোক কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। এ কারণে স্থগিত রাখা হয়েছে ক্লাস ও পরীক্ষা। নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।
পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান আরো জানান, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়াই হত্যার উদ্দেশ্য ছিল বলে জানা গেছে। মামলার তদন্ত শেষ করে দ্রুত আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের প্রস্তুতি চলছে।
অপ্রতিমের মরদেহ এখন মাটির নিচে। কিন্তু তার হত্যাকাণ্ড ঘিরে কুমিল্লাজুড়ে যে প্রশ্ন ও শোক তৈরি হয়েছে, তা আরও গভীর হয়েছে একটি কারণে—একটি শিশুকে হত্যার পর তারই শোকাহত মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো নির্মম পরিহাসও ঘটেছে এই ঘটনায়।
কুমিল্লায় ৯ মাসে ১০৪ হত্যা, শিশু অপ্রতিমের মৃত্যুতে লালমাই পাহাড় ঘিরে তীব্র আলোচনা

কুমিল্লায় গত নয় মাসে ১০৪ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের নৃশংস মৃত্যু কুমিল্লাজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অপ্রতিমের মৃত্যু ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে চলছে আলোচনা। একই সঙ্গে লালমাই পাহাড় ও আশপাশের নির্জন এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।
রোববার সকালে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। সকাল ১০টা ১০ মিনিটে অনুষ্ঠিত জানাজায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, স্বজন, পরিচিতজনসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। জানাজা শেষে কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতিতে ঈদগাহ কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
অপ্রতিম বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। শুক্রবার বিকেলে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় সে। এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়।
শনিবার দুপুরে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার দক্ষিণ মোড়ের দক্ষিণ পাশে সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক।
অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন অপ্রতিমের পরিবার, স্বজন ও স্থানীয়রা।
অপ্রতিমের মৃত্যুর পর আলোচনায় এসেছে লালমাই পাহাড়ের নিরাপত্তা। কুমিল্লা শহর, কোটবাড়ি ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন হওয়ায় লালমাই পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে মানুষের চলাচল থাকলেও পাহাড়ের অনেক স্থান এখনো নির্জন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব নির্জন এলাকা অপরাধীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করছে।
লালমাই পাহাড়ে অপরাধের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০১০ সালে পাহাড়ের হাতিমারা এলাকা থেকে মেহেদি হাসান নামে এক কিশোর অটোরিকশাচালকের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। এর আগে ২০০৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি লালমাই পাহাড়ের মোড় থেকে রিফাত হোসেন নামে আরেক শিশুর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ছাড়া গত ২৯ আগস্ট কুমিল্লার কোটবাড়ির শান্তির মোড় এলাকায় দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে পাহাড়ের নির্জন স্থানে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা বিভিন্ন বসতিতেও ডাকাতি, ছিনতাই এবং মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পাহাড় ও আশপাশের এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। এসব অপরাধের সঙ্গে মাদকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, বিচ্ছিন্নভাবে অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি পাহাড়কেন্দ্রিক অপরাধচক্রের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, গত নয় মাসে জেলায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ১০৪ জন। জেলার সামগ্রিক হত্যাকাণ্ডের এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে লালমাই পাহাড় ও আশপাশের এলাকায় একের পর এক গুরুতর অপরাধের অভিযোগ স্থানীয়দের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয়দের প্রশ্ন, জনবসতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছাকাছি থাকা লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থা কতটা কার্যকর। পাহাড়ের বিভিন্ন প্রবেশপথে নজরদারি, নিয়মিত পুলিশ টহল এবং প্রয়োজনীয় স্থানে সিসিটিভি স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে মাঠে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। হত্যাকাণ্ডের ক্লু শনাক্ত করে প্রকৃত হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
একটি শিশুর আকস্মিক ও করুণ মৃত্যু এখন শুধু তার পরিবারকেই শোকাহত করেনি, লালমাই পাহাড়ের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে কুমিল্লাবাসীকে। অপ্রতিমের জানাজায় অংশ নেওয়া মানুষের চোখে ছিল শোক, ক্ষোভ ও দ্রুত বিচারের প্রত্যাশা।
স্থানীয়দের দাবি, অপ্রতিম হত্যার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে লালমাই পাহাড় ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা প্রতিরোধ করতে হবে।
অপ্রতিম আর ফিরবে না। কিন্তু তার মৃত্যু যেন কুমিল্লার পাহাড়ি এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্নগুলোর স্থায়ী সমাধানের কারণ হয়—এটাই এখন স্বজন, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা।



























