তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন
‘টোকাই’ থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে, আসিফের বিরুদ্ধে এবার হাজার কোটি টাকার অভিযোগের তদন্ত করবে দুদক

টোকাইখ্যাত আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। ছবি : দৈনিক আজকের কথা
আসিফ আমলের নিয়োগ-পদোন্নতির নথি দুদকে, উঠছে হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ
সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া দায়িত্ব পালনকালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে হওয়া নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়েছে। এসব নথি যাচাই-বাছাই করে অনিয়ম বা আইন-বিধির ব্যত্যয় ঘটেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে দুদক।
দুদকের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ের কাছে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র চাওয়া হয়। পরে মন্ত্রণালয় থেকে অধিকাংশ নথি দুদকে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
দুদকের ওই কর্মকর্তা জানান, অনুসন্ধানের স্বার্থেই যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নথিপত্র তলব করা হয়েছিল। প্রাপ্ত নথিগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে। আইন ও বিধি লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যাংক হিসাব ও আর্থিক লেনদেনও খতিয়ে দেখা হতে পারে।
চার ধরনের নথি তলব
গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি, কেনাকাটাসহ বিভিন্ন কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক।
অনুসন্ধানের জন্য দুদকের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়। পরদিনই যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কাছে বিভিন্ন নথিপত্র চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়।
এর মধ্যে আসিফ মাহমুদ দায়িত্ব পালনকালে মন্ত্রণালয়ে সম্পন্ন হওয়া সব নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি সংক্রান্ত নথি এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট স্মারকের ভিত্তিতে সম্পন্ন বদলির নথিও রয়েছে।
নতুন অভিযোগেও অনুসন্ধান
এরই মধ্যে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘুষ, নিয়োগ-পদায়ন বাণিজ্য, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও অর্থ পাচারের অভিযোগে আরও অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক।
দুদকের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ জানিয়েছেন, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। নতুন অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই শেষে আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে সংযুক্ত করে তদন্ত করা হবে।
নতুন অভিযোগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ, বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়ন, ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন টেন্ডার এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন গ্রহণের অভিযোগ আনা হয়েছে।
১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ
দুদকের কাছে করা অভিযোগে বিশ্বের পাঁচ দেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, এর মধ্যে দুবাইয়ে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে দেড় হাজার কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। পর্তুগালে জমি কেনারও অভিযোগ রয়েছে।

আসিফ একজন টোকাই। যার কাছে এখনো মানুষ রুটি-কলার পয়সা পায়। সেই টোকাই আজ ১৩ হাজার কোটি টাকা সুইস ব্যাংকে পাচার করেছে—এটা কীভাবে সম্ভব? বিষয়টি জনগণের সামনে পরিষ্কার হওয়া দরকার।
তবে এসব অর্থ পাচারের অভিযোগ এখনো অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে। দুদকের অনুসন্ধান ও যাচাই-বাছাইয়ের পর অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং ৩৬ জন জেলা প্রশাসক পদায়নে ২ থেকে ১০ কোটি টাকা করে লেনদেন হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণসহ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
প্রকল্প নিয়েও গুরুতর অভিযোগ
অভিযোগে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ, ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেন, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ, এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগ এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।
মুরাদনগরের প্রকল্প নিয়েও অভিযোগ
অভিযোগে আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা মুরাদনগরের জন্য গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং সেই বরাদ্দ ও অর্থ গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
অভিযোগে তার বাবা বিল্লাল হোসেন, এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেন ও পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার, ঘুষ লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে দুদকের অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ অস্বীকার আসিফের
তবে দুদকের অনুসন্ধানে ওঠা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগে কখনো ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, কখনো ১১ হাজার কোটি টাকা আবার কখনো ২ কোটি ৭৬ লাখ টাকার কথা বলা হচ্ছে। অভিযোগের অঙ্কের এমন পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সরকারকে আগে নিজেদের মধ্যে বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে।

১১ হাজার কোটি টাকার এই সংখ্যাটি আগে ঠিকমতো নিজেদের মধ্যে বসে সিদ্ধান্ত নিলে ভালো হয়। একবার শুনি ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, এরপর ১১ হাজার কোটি টাকা, আবার কয়েকদিন আগে শুনলাম ২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। ২ কোটি ৭৬ লাখ থেকে ১১ হাজার কোটিতে উঠে যায়—তাহলে বিষয়টি নিয়ে সরকারের নিজেদের মধ্যে আগে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। সরকার যদি সিদ্ধান্ত নেয় কাউকে পাকড়াও করবে, তাহলে এর অনেক পদ্ধতি রয়েছে। আমরা দেখছি আগে দুদক কী কী করছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, অতীতে যেভাবে দুদককে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, ভবিষ্যতেও একইভাবে ব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলের দুর্নীতি নিয়েও দুদকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
একাধিক কর্মকর্তার নাম
দুদকের অনুসন্ধানে আসিফ মাহমুদ ছাড়াও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্ম সচিব ড. শেখ মোহাম্মদ জুবায়েদ হোসেন, উপসচিব মো. মাসুম আহমেদসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তার নাম এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর অনুসন্ধানের তথ্য প্রকাশের পর দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তার বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছিলেন আসিফ মাহমুদ। তিনি ওই বক্তব্যে নিজের মানহানি হয়েছে বলেও দাবি করেন। পরে ১০ সেপ্টেম্বর দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক আখতারুল ইসলামের দেওয়া বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিতে আইনি নোটিশ পাঠানোর কথাও জানান তিনি।
তবে ৯ সেপ্টেম্বর দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান জানিয়েছিলেন, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী অনুসন্ধান চলছে।
দুদকের অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। অনুসন্ধানে নথিপত্র, আর্থিক লেনদেন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাইয়ের পরই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন
সমালোচকদের কেউ কেউ আরও বলছেন, আসিফ মাহমুদ ও সরকারের পক্ষ থেকে পরস্পরের সঙ্গে নিগোসিয়েশন বা সমঝোতার মাধ্যমে একের পর এক অভিযোগ ও তদন্তের নাটক সাজানো হচ্ছে—যার শেষ পর্যন্ত বাস্তব কোনো ফল হবে না। তাদের ভাষায়, আসিফের অনিয়ম দূর্নীতি দিনের আলোর মতো সত্য হলেও, অভিযোগের অঙ্ক কখনো হাজার কোটি, কখনো অন্য কোনো পরিমাণ; কিন্তু দৃশ্যমানভাবে দায় নির্ধারণ বা অর্থ উদ্ধারের কার্যকর উদ্যোগ কতটা হচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
তাদের দাবি, জনগণকে একদিকে ব্যস্ত ও বিভ্রান্ত রাখতে এবং অন্যদিকে মূল বিষয়গুলো থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দিতে সময়-সময় নতুন অভিযোগ সামনে আনা হচ্ছে। ফলে তদন্তের নামে যদি শেষ পর্যন্ত কাউকে দায়ী করা না হয়, অর্থ উদ্ধার না হয় কিংবা কোনো মামলার কার্যকর পরিণতি না আসে, তাহলে পুরো প্রক্রিয়াটিই লোক দেখানো ও জনগণের সঙ্গে তামাশা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে আসিফ মাহমুদ ও সরকারের মধ্যে এমন কোনো সমঝোতা হয়েছে—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া না গেলেও সচেতন মহল এটা প্রকাশ্যেই বলে বেড়াচ্ছেন। অভিযোগগুলোর সত্যতা এবং তদন্তের প্রকৃত উদ্দেশ্য নির্ধারণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধান ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।
প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।
দুর্নীতিতে ‘নো কম্প্রোমাইজ’, কঠোরতায় প্রশংসায় ভাসছেন মুরাদনগরের প্রকৌশলী ফয়সল বারী

নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দেখলেই কাজ বন্ধের নির্দেশ, ঠিকাদারদের কড়া হুঁশিয়ারি; বাড়ির সামনের রাস্তার কাজে শতভাগ সন্তুষ্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা
সরকারি উন্নয়নকাজে অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রীর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে প্রশংসায় ভাসছেন কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফয়সল বারী পূর্ণ। ঠিকাদারদের উদ্দেশে তাঁর দেওয়া কড়া হুঁশিয়ারি এবং নিম্নমানের নির্মাণকাজের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে তাঁর এমন আপসহীন অবস্থানকে স্বাগত জানাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, নির্মাণকাজ অনুমোদিত নকশা ও প্রাক্কলন অনুযায়ী হচ্ছে কি না এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত মান বজায় রাখছে কি না, এসব বিষয় নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, কাজের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন এবং অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে মুরাদনগরে দায়িত্ব পালনকালে এসব বিষয়ে কঠোর নজরদারির বার্তা দিচ্ছেন উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফয়সল বারী পূর্ণ।
সম্প্রতি উপজেলার দরিকান্দি-ভাগলপুর সড়কসহ কয়েকটি চলমান উন্নয়ন প্রকল্প সরেজমিনে পরিদর্শনে যান তিনি। এ সময় নির্মাণকাজে ত্রুটিপূর্ণ ইট ও নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের বিষয়টি তাঁর নজরে আসে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। পরে তিনি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন এবং নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী সরিয়ে নির্ধারিত মানের উপকরণ ব্যবহারের নির্দেশনা দেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তাঁকে ঠিকাদারদের উদ্দেশে দৃঢ় কণ্ঠে বলতে শোনা যায়, তাঁর দায়িত্বে থাকাকালে মুরাদনগরে নিম্নমানের কাজ, অনিয়ম কিংবা দুর্নীতির সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। জনগণের টাকায় নির্মিত অবকাঠামোর গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। অনুমোদিত নকশা ও প্রকৌশলগত মানদণ্ড অনুসরণ করেই প্রতিটি প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করতে হবে।
এর আগেও উপজেলার একটি বড় উন্নয়ন প্রকল্পে নির্ধারিত শিডিউল অনুসরণ না করা এবং নকশাগত ত্রুটির অভিযোগ সামনে এলে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন এই প্রকৌশলী। সংশ্লিষ্ট নির্মাণকাজে ত্রুটি চিহ্নিত হওয়ার পর নিম্নমানের অংশ ভেঙে ফেলে নির্ধারিত মান অনুযায়ী পুনরায় কাজ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তাঁর এ ধরনের পদক্ষেপ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শুধু নির্মাণকাজের মান নয়, রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের চাপের মুখেও পেশাদারিত্ব বজায় রাখার বিষয়টি নিয়েও আলোচনায় রয়েছেন কাজী ফয়সল বারী পূর্ণ। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে তাঁর কার্যালয়ে এক রাজনৈতিক নেতার অনাকাঙ্ক্ষিত ও উগ্র আচরণের মুখোমুখি হয়েও তিনি ধৈর্য ও সংযমের পরিচয় দিয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতেও দায়িত্বশীল আচরণ করায় সে সময় সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে তাঁর ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছিল বলে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।
উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফয়সল বারী পূর্ণ বলেন, সরকারি উন্নয়নকাজের গুণগত মান বজায় রাখা আমার দায়িত্ব। জনগণের অর্থের অপচয় কিংবা নিম্নমানের কাজের সঙ্গে কোনো আপস করা হবে না। প্রতিটি প্রকল্প অনুমোদিত নকশা ও প্রাক্কলন অনুযায়ী বাস্তবায়নে নিয়মিত তদারকি অব্যাহত থাকবে।
এদিকে স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আবদুল মতিন চৌধুরী উপজেলা প্রকৌশলীর কাজের প্রশংসা করে বলেন, আমার বাড়ির সামনের রাস্তাটির নির্মাণকাজ আমি নিজে দেখেছি। কাজের মান ও গুণগত দিক বিবেচনায় আমি শতভাগ সন্তুষ্ট। একজন প্রকৌশলী আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করলে যে ভালো উন্নয়ন সম্ভব, এই রাস্তাটি তার উদাহরণ। তাঁর মতো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা মুরাদনগরে থাকলে এলাকার উন্নয়নকাজ আরও টেকসই ও জনবান্ধব হবে।
এলজিইডির আওতায় গ্রামীণ সড়ক, সেতু, কালভার্ট ও বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে উপজেলা প্রকৌশলীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্মাণকাজে ব্যবহৃত ইট, বালু, খোয়া, সিমেন্টসহ অন্যান্য উপকরণের মান, কাজের পরিমাণ, নির্ধারিত সময়সীমা এবং অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, এসব বিষয় নিয়মিত তদারকির দায়িত্ব প্রকৌশল বিভাগের। কোনো প্রকল্পে অনিয়ম বা ত্রুটি দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয় এবং একই অবকাঠামো সংস্কারে আবারও সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ সড়ক কিংবা কালভার্ট নির্মাণে ত্রুটি ও জনভোগান্তির অভিযোগ উঠলে কাজী ফয়সল বারী পূর্ণ সরেজমিনে গিয়ে পরিস্থিতি দেখার চেষ্টা করেন। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি নির্মাণকাজের মান বজায় রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দেন তিনি। ফলে তাঁর সাম্প্রতিক ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন ব্যবহারকারীর মধ্যেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
মুরাদনগর উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, কাজী ফয়সল বারী পূর্ণ ২০২৫ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মুরাদনগর উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন। এর আগে তিনি সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলায় উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর প্রশংসা করে অনেকেই বলছেন, সরকারি উন্নয়নকাজে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করতে হলে শুধু বক্তব্য নয়, মাঠপর্যায়ে এমন কঠোর তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ঠিকাদারদের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাব বিবেচনা না করে কাজের মান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া গেলে সরকারি অর্থের অপচয় অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
মুরাদনগরের সচেতন মহলের প্রত্যাশা, উপজেলা প্রকৌশলীর এই কঠোর অবস্থান যেন ধারাবাহিকভাবে বজায় থাকে এবং সব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একই নিয়মের আওতায় আনা হয়। কারণ, সরকারি অর্থ কোনো ব্যক্তি বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিগত সম্পদ নয়; এটি জনগণের কর ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ। সেই অর্থে নির্মিত একটি সড়ক, সেতু কিংবা কালভার্ট নিম্নমানের হলে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। তাই উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানই পারে জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার এবং টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ নিশ্চিত করতে।
কুমিল্লায় মাদক, কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইবিরোধী অভিযানে আটক ২৯৯

এক রাতেই ১৫৯ জনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা, অভিভাবকের জিম্মায় মুক্তি ১৪০ জনের
কুমিল্লায় মাদক কারবারি, কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশের বিশেষ অভিযানে এক রাতেই ২৯৯ জনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৫৯ জনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বাকি ১৪০ জনকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ।
বুধবার (৪ নভেম্বর) সন্ধ্যার পর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কুমিল্লা জেলার ১৮টি থানায় একযোগে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মো. লুৎফর রহমান অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামানের নির্দেশনায় জেলা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ও গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) যৌথভাবে এ অভিযান পরিচালনা করে। নগরীসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, মাদক কারবার ও ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে বিশেষ নজরদারি চালানো হয়। অভিযানে জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সরাসরি অংশ নেন।
জেলা পুলিশ আরও জানায়, গত ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া বিশেষ অভিযানে ৪ নভেম্বর পর্যন্ত মোট ৬ হাজার ৮৫৭ জনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৩ হাজার ৯৬৪ জনকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ২ হাজার ৮৯৩ জনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান বলেন, উঠতি বয়সী কিশোরেরা যাতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে না পড়ে, সে লক্ষ্যেই নিয়মিত এ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও পুলিশ সতর্ক রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধপ্রবণতা রোধে জেলা পুলিশ বদ্ধপরিকর। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
এবার জুলাই অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ইকবাল সোবহান চৌধুরী

ডিবিসি নিউজ কার্যালয় থেকে আটক সাবেক প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টাকে যাত্রাবাড়ীর হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে
জুলাই অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে দায়ের করা হত্যা মামলায় সাংবাদিক নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রাতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট যাত্রাবাড়ী থানায় দায়ের করা একটি হত্যা মামলায় ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। মামলাটি জুলাই অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট।
এদিকে একই ঘটনায় ডিবির হেফাজতে নেওয়া ডিবিসি নিউজের বিশেষ প্রতিবেদক রাজীব ঘোষকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিবিপ্রধান।
এর আগে বুধবার বিকেলে রাজধানীর মহাখালীতে ডিবিসি নিউজের কার্যালয় থেকে ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও রাজীব ঘোষকে নিয়ে যায় গোয়েন্দা পুলিশ। তাঁদের সহকর্মী ও ডিবি কর্মকর্তারা এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
তখন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার মো. আখতার হোসেন সাংবাদিকদের জানান, একটি প্রতিবেদন প্রকাশকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতির পর তাঁদের দুজনকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। সেখানে তাঁদের সঙ্গে কথা বলছিলেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
অন্যদিকে ডিবিসি নিউজের অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর মুকতাদির আনিক জানিয়েছিলেন, ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হয়েছে বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন।
ইকবাল সোবহান চৌধুরী বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সাবেক সভাপতি, দৈনিক অবজারভারের সম্পাদক এবং বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসির সাবেক চেয়ারম্যান। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।



























