ভোগান্তি ছাড়াই ঘরে ফিরছেন দক্ষিণের মানুষ, ধন্যবাদ শেখ হাসিনা

স্বপ্নের সেতুতে স্বস্তির যাত্রা, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের মুখে একটাই কথা—ভোগান্তি ছাড়াই ঘরে ফিরছেন, ধন্যবাদ শেখ হাসিনা
🔹 ভোগান্তি ছাড়াই ঘরে ফিরছেন দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ, পদ্মা সেতু ও এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহারে যাত্রা নির্বিঘ্ন।
🔹 খুলনাগামী যাত্রী সালমা খাতুন বললেন, “৮ ঘণ্টার পথ এবার পেরিয়েছি ৩ ঘণ্টায়—ধন্যবাদ শেখ হাসিনা।”
🔹 পদ্মা সেতুতে সকাল পর্যন্ত ৮ ঘণ্টায় পার হয়েছে প্রায় ১১,৫০০ যান, আদায় হয়েছে কোটি টাকার বেশি টোল।
🔹 বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও যানজট ছাড়াই ঈদের আগে মাওয়া প্রান্তে যান চলাচল ছিল স্বাভাবিক।
🔹 প্রশাসনের প্রস্তুতি, উন্নত অবকাঠামো ও প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সম্ভব হয়েছে স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা।
ঈদের সময় ঢাকা ছাড়ার চেনা দৃশ্য হলো যানজট আর ভোগান্তি। কিন্তু এবার দৃশ্যপট ভিন্ন। ভোগান্তি ছাড়াই ঘরে ফিরছেন দক্ষিণের মানুষ, আর একবাক্যে তারা বলছেন—“ধন্যবাদ শেখ হাসিনা”। পদ্মা সেতু ও ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহারে তাদের ঈদযাত্রা হয়েছে নির্বিঘ্ন, আরামদায়ক ও ঝামেলাহীন।
ALSO READ
দক্ষিণের মানুষ বলছেন—ধন্যবাদ শেখ হাসিনা
✅ নিয়ন্ত্রিত যান চলাচল, বাড়তি চাপের পরও নেই যানজট
শুক্রবার (৬ জুন) সকালে মাওয়া প্রান্তে কিছুটা চাপ থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। পদ্মা সেতু দিয়ে যাত্রী ও পণ্যবাহী গাড়ি নির্বিঘ্নে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় পৌঁছে যায়। ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতেও তেমন যানজট দেখা যায়নি, যা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়েছেন যাত্রীরা।
পদ্মা সেতুর অতিরিক্ত পরিচালক শেখ ইশতিয়াক আহমেদ জানান—
“শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ৮ ঘণ্টায় সেতু পার হয়েছে প্রায় ১১,৫০০ যানবাহন। টোল আদায় হয়েছে কোটি টাকার বেশি। যান চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে আমরা সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছি।”
✅ প্রশাসনের প্রস্তুতি ও সহযোগিতা প্রশংসনীয়
মুন্সিগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন—
“চলতি ঈদে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে কোনো বড় দুর্ঘটনার খবর নেই। আমরা আগাম প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, ফলে যানজট বা বিপত্তি হয়নি।”
তিনি জানান, মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে ফায়ার সার্ভিসের টিম, পুলিশের সহায়তা এবং পরিবহন নিয়ন্ত্রণে নেওয়া ব্যবস্থাগুলো সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
✅ যাত্রীদের মুখে তৃপ্তির হাসি: ভোগান্তি নয়, আনন্দের যাত্রা
খুলনাগামী যাত্রী সালমা খাতুন বলেন, “গত ঈদে খুলনায় যেতে লেগেছিল ৮ ঘণ্টা, এবার মাত্র ৩ ঘণ্টায় পৌঁছে গেছি। সত্যিই বিশ্বাস হচ্ছে না—ভোগান্তি ছাড়াই ঘরে ফিরছেন দক্ষিণের মানুষ। ধন্যবাদ শেখ হাসিনা, এমন স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রার জন্য।”
ফরিদপুরের ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন—
“প্রতিবার ঈদের আগে টেনশনে থাকি—কখন গাড়ি ছাড়বে, কেমন জ্যাম হবে। এবার তেমন কিছু হয়নি। এটা শেখ হাসিনার উন্নয়নের ফল।”
✅ উন্নয়নের বাস্তব রূপ: পদ্মা সেতু বদলে দিয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের ঈদযাত্রা
যেখানে অন্য মহাসড়কগুলোতে ভোগান্তির খবর পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে পদ্মা সেতু হয়ে দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীরা স্বস্তিতে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন। নতুন এক্সপ্রেসওয়ে, আধুনিক অবকাঠামো এবং সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা—সবকিছু মিলিয়ে ভোগান্তি ছাড়াই ঘরে ফিরছেন দক্ষিণের মানুষ। আর এর জন্য তারা ধন্যবাদ জানাচ্ছেন শেখ হাসিনাকে।
প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।
কুমিল্লায় একসঙ্গে ৫ সন্তানের জন্ম, ২৪ ঘণ্টায় ৪ নবজাতকের মৃত্যু

ছয় মাসে জন্ম, সংকটে জীবিত শিশুর চিকিৎসা
কুমিল্লা নগরীর ঝাউতলা এলাকার মক্কা হাসপাতালে একসঙ্গে ৫ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন এক মা। জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই চার নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে একটি নবজাতক জীবিত রয়েছে। তার চিকিৎসা চলছে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার সূচিপাড়া এলাকার বাসিন্দা ও সৌদি আরবপ্রবাসী তারেকুল ইসলাম তারেকের স্ত্রী কুমিল্লার মক্কা হাসপাতালে স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে পাঁচ সন্তানের জন্ম দেন। নবজাতকদের মধ্যে দুই ছেলে ও তিন মেয়ে ছিল।
পরিবারের সদস্যরা জানান, জন্মের পর থেকেই পাঁচ নবজাতকের শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন ছিল। চিকিৎসকেরা জানান, নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রায় ছয় মাসে জন্ম নেওয়ায় নবজাতকদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা ও উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল।
তবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার ব্যয় বহন করা পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। এর মধ্যেই জন্মের পর একে একে চার নবজাতকের মৃত্যু হয়। বর্তমানে জীবিত একমাত্র শিশুটিকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শিশুটির উন্নত চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া নিয়েও তারা আর্থিক সংকটে রয়েছেন। নবজাতকটিকে বাঁচাতে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় ব্যক্তিদের সহযোগিতা চেয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
একসঙ্গে পাঁচ সন্তানের জন্মের ঘটনা কুমিল্লায় বিরল হওয়ায় বিষয়টি স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে পরিবারের একমাত্র আশা হয়ে বেঁচে থাকা নবজাতকটির সুস্থতার জন্য সবার সহযোগিতা ও দোয়া কামনা করেছে পরিবার।
১৪ পলিব্যাগে অর্ধশত টুকরা
ফরিদা হত্যায় ভাড়াটিয়া লাইলী আটক, মামলায় আসামি আরও ৩; মাথা মিললেও এখনো নিখোঁজ পা-হাত

সিসি ক্যামেরা দেখে ডাস্টবিনে মিলল মাথা, হত্যায় ভাড়াটিয়াসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা
কুমিল্লার দেবীদ্বারে গৃহবধূ ও বাড়ির মালিক ফরিদা বেগমকে (৫৫) হত্যার পর মরদেহ অর্ধশতাধিক টুকরো করে ১৪টি পলিব্যাগে প্যাকেট করার অভিযোগ উঠেছে। রোববার দিনভর অভিযানে বাড়ির আশপাশের ময়লার ভাগাড়, ঝোপঝাড়, পরিত্যক্ত ঘর ও ড্রেন থেকে মরদেহের বিভিন্ন অংশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে একটি ডাস্টবিন/ড্রেন থেকে নিহতের মাথার অংশও উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর পা, হাত ও শরীরের আরও কিছু অংশ উদ্ধার করা যায়নি।
এ ঘটনায় নিহতের স্বামী মো. মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়া (৭২) বাদী হয়ে দেবীদ্বার থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় নিহতের বাসার ভাড়াটিয়া ও ঘটনায় আটক লাইলী বেগম (৩৫) ছাড়াও আরও তিনজনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁরা হলেন—দেবীদ্বার পৌর এলাকার চাপানগর গ্রামের আবুল কালামের স্ত্রী লাইলী বেগম, একই বাড়ির জহিরুল ইসলামের ছেলে মো. আমির হোসেন (২৮), মৃত ফারুক মিয়ার ছেলে মো. সোহেল (৩৫) এবং মৃত লিলু মিয়ার ছেলে মো. রবিউল ইসলাম (২৪)।
রোববার দুপুরে আটক লাইলী বেগমকে কুমিল্লার আদালতে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, মামলার অন্য আসামিরা পলাতক রয়েছেন।
১৪ পলিব্যাগে মরদেহের খণ্ডিত অংশ
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার (৮ আগস্ট) বিকেলে দেবীদ্বার পৌর এলাকার ছোটআলমপুর মোহনা আবাসিক এলাকায় এ হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। দেবীদ্বার দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়ার মালিকানাধীন বাসার পেছনে পলিথিনে মোড়ানো কয়েকটি প্যাকেট দেখতে পান নিহতের বোনের ছেলে মামুন। পরে প্যাকেটগুলোতে খণ্ডিত মরদেহের অংশ দেখতে পেয়ে তিনি পুলিশে খবর দেন।
খবর পেয়ে দেবীদ্বার থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহের বিভিন্ন অংশ উদ্ধার করে। প্রাথমিকভাবে একাধিক প্যাকেট উদ্ধার হলেও পরবর্তী সময়ে পুলিশ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে মোট ১৪টি পলিব্যাগে মরদেহের খণ্ডিত অংশ পাওয়ার কথা জানায়।
রোববার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত পুলিশ বাড়ির আশপাশের ময়লার ভাগাড়, ঝোপঝাড়, পরিত্যক্ত ঘর ও ড্রেনসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায়। এ সময় দুটি পলিব্যাগে থাকা মাংস ও নিহতের পরিধেয় কাপড় উদ্ধার করা হয়। পরে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে একটি ড্রেন/ডাস্টবিন থেকে নিহতের মাথার অংশ উদ্ধার করা হয়।
তবে এখনো নিহতের পা, হাত ও শরীরের আরও কিছু অংশ পাওয়া যায়নি। এসব অংশ উদ্ধারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
চেহারা বিকৃত করতে চামড়া ছিলে ফেলার অভিযোগ
দেবীদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, হত্যার পর চেহারা বিকৃত করার উদ্দেশ্যে প্রথমে মরদেহের শরীরের চামড়া ছিলে ফেলা হয়। এরপর মরদেহ টুকরো টুকরো করা হয়েছে বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
ওসি বলেন, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ডাস্টবিন থেকে নিহতের মাথার অংশ উদ্ধার করা হয়েছে। পা ও শরীরের অন্যান্য অংশ উদ্ধারে অভিযান চলছে।
তিনি আরও বলেন, আটক লাইলী বেগমকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের জন্য আদালতে পাঠানো হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, কারা এতে জড়িত এবং কোথায় মরদেহের অন্যান্য অংশ ফেলা হয়েছে—এসব তথ্য বের করতে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে।
লাইলীর দাবি, হত্যায় সরাসরি জড়িত নন
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে লাইলী বেগম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে। তবে তিনি দাবি করেছেন, অন্যরা ফরিদা বেগমকে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করার পর মরদেহ বাথরুমে নিয়ে যায়। সেখানে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ আলাদা করার পর তিনি সেগুলো টুকরো করে প্যাকেটজাত করতে সহযোগিতা করেছেন বলে জানিয়েছেন।
লাইলীর দাবি অনুযায়ী, মরদেহের কিছু অংশ পলিথিনে মুড়িয়ে পুড়িয়ে বস্তাবন্দি করে বাড়ির পেছনে রাখা হয়। বাকি অংশ কোথায় ফেলা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি জানেন না বলে পুলিশকে জানিয়েছেন।
তবে তাঁর এসব বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করছে পুলিশ। হত্যার প্রকৃত কারণ, কার নির্দেশে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে এবং ঘটনায় মোট কতজন জড়িত—এসব বিষয়ে তদন্ত চলছে।
গহনা লুটের সন্দেহ স্বজনদের
নিহতের প্রতিবেশী আমেনা বেগমের দাবি, হত্যার আগের দিন শুক্রবার ফরিদা বেগম গহনা পরে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন। তাঁর ধারণা, গহনা লুটের উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়ে থাকতে পারে।
নিহতের স্বামী মো. মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়াও জানান, ফরিদা ও তাঁর দুই মেয়ের প্রায় ১০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার ছিল। হত্যাকাণ্ডের পর সেসব স্বর্ণালঙ্কার ঘরে পাওয়া যাচ্ছে না। একটি আলমারির চাবিও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আলমারি খোলা সম্ভব হলে আরও কোনো মালামাল খোয়া গেছে কি না, তা জানা যাবে বলে তিনি জানান।
তবে স্বর্ণালঙ্কার লুটের বিষয়টি এখনো তদন্তে নিশ্চিত হয়নি। পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য সব কারণই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
স্বামী ছিলেন চট্টগ্রামে
নিহত ফরিদা বেগম দেবীদ্বার পৌর এলাকার ফতেহাবাদ ভূঁইয়া বাড়ির মো. মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়ার স্ত্রী। প্রায় ৩০ বছর আগে তাঁরা ছোটআলমপুরের মোহনা আবাসিক এলাকায় বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস শুরু করেন।
মফিজুল ইসলাম চট্টগ্রামে জাহাজে চাকরি করেন। দুই মেয়ে রাবেয়া বসরী ও মরিয়ম আক্তারের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় ফরিদা বেগম বাড়িতে অনেকটা একাই থাকতেন। তাঁদের একমাত্র ছেলে ইব্রাহীম খলিল ২০১০ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান।
মামলার বাদী মফিজুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি চট্টগ্রামে কর্মস্থলে ছিলেন। গত ২২ জুলাই লাইলী বেগম তাঁর বাসার একটি কক্ষ মাসিক ১ হাজার ৬০০ টাকা ভাড়ায় নেন। বাসা মেরামত এবং স্ত্রীকে নিয়ে ওমরাহ পালনের জন্য তিনি ৭ লাখ টাকা পাঠিয়েছিলেন বলেও জানান তিনি।
মাত্র ১৮ দিন আগে ভাড়া নেন লাইলী
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দেবীদ্বার পৌর এলাকার চাপানগর গ্রামের ট্রাক্টরচালক আবুল কালামের স্ত্রী লাইলী বেগম পারিবারিক কলহের কারণে গত ২২ জুলাই ফরিদা বেগমের বাসার একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন।
অর্থাৎ হত্যাকাণ্ডের মাত্র ১৮ দিন আগে তিনি ওই বাড়িতে ওঠেন। লাইলীর স্বামী আবুল কালাম চট্টগ্রামে জাহাজে চাকরি করেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
ফরিদার বাসার একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে লাইলী বসবাস করলেও হত্যাকাণ্ডের আগে তাঁদের মধ্যে কোনো বিরোধ ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
সকাল থেকে নিখোঁজ ছিলেন ফরিদা
স্বজনেরা জানান, শনিবার সকাল থেকেই ফরিদা বেগমকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। ডায়াবেটিসের কারণে তিনি নিয়মিত সকালে হাঁটতে বের হতেন। ওইদিনও তাঁকে না পেয়ে স্বজনেরা প্রথমে ধারণা করেন, হয়তো কোথাও গেছেন। পরে আত্মীয়স্বজনের বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করা হয়।
সন্ধান না পেয়ে এলাকায় মাইকিংও করা হয়। স্বজনদের দাবি, থানায় নিখোঁজ সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরি করতে গেলে পুলিশ জিডি নেয়নি। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরে ফরিদা বেগমের বোনের ছেলে মামুন বাড়ির পেছনে পলিথিনে মোড়ানো প্যাকেট দেখতে পান। সেখানেই খণ্ডিত মরদেহের সন্ধান মেলে।
ঘটনার পর লাইলীকে গণধোলাই
মরদেহ উদ্ধারের পর হত্যাকাণ্ডে লাইলী বেগমের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা তাঁকে আটক করে মারধর করে এবং পার্শ্ববর্তী বালুর মাঠে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখে।
পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাইলীকে উদ্ধার করে। আহত অবস্থায় তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়ার পর থানায় নেওয়া হয়।
এরপর তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
লাইলীর বিরুদ্ধে পুরোনো হত্যা মামলার তথ্য
এদিকে লাইলী বেগমের বিরুদ্ধে একটি পুরোনো শিশু হত্যা মামলার তথ্যও সামনে এসেছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ২০২১ সালের ৭ নভেম্বর দেবীদ্বারে সাত বছর বয়সী শিশু ফাহিমা হত্যার ঘটনায় লাইলী বেগমসহ পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছিল। ওই মামলায় অভিযোগ ছিল, শিশুটি তার বাবা আমির হোসেন ও লাইলী বেগমকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে ফেলেছিল। পরে শিশুটিকে হত্যা করে বস্তাবন্দি করে কাচিসাইর পুলের নিচে ফেলে দেওয়া হয়।
ওই বছরের ১৪ নভেম্বর বস্তাবন্দি অবস্থায় শিশুটির গলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মামলায় লাইলী বেগমসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। পরে তাঁরা জামিনে মুক্তি পান।
তবে ওই পুরোনো মামলার সঙ্গে ফরিদা বেগম হত্যার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। পুলিশও এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত বক্তব্য দেয়নি।
মামলায় চারজন আসামি
শনিবার দিবাগত রাতে নিহতের স্বামী মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়া বাদী হয়ে দেবীদ্বার থানায় মামলা করেন। মামলায় লাইলী বেগমসহ চারজনকে আসামি করা হয়েছে।
অন্য আসামিরা হলেন—আমির হোসেন (২৮), সোহেল (৩৫) ও রবিউল ইসলাম (২৪)। তাঁদের মধ্যে লাইলী ছাড়া অন্যরা এখনো পলাতক রয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
রোববার বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত পুলিশ লাইলী বেগম ছাড়া আর কাউকে আটক করতে পারেনি।
একাধিক দল মাঠে পুলিশের
দেবীদ্বার থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান জানান, আসামিরা পলাতক থাকায় হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং মরদেহের বিভিন্ন অংশ কোথায় গোপন করা হয়েছে—এসব তথ্য সংগ্রহে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “আটক লাইলী বেগমকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ডের জন্য আদালতে পাঠানো হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে পুলিশের একাধিক দল বিভিন্ন দিক থেকে কাজ করছে। মরদেহের বাকি অংশ উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল ও আশপাশের বিভিন্ন স্থানে থাকা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে উদ্ধার করা আলামত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং জড়িতদের শনাক্ত করতে তথ্য সংগ্রহ চলছে।
নিহতের স্বজনেরা দ্রুত মরদেহের বাকি অংশ উদ্ধার, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং জড়িতদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৬: ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্তার স্বীকৃতি জরুরি

প্রতি বছর ৯ আগস্ট বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষা এবং তাদের জীবনযাত্রার নানা চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরিই এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, ঐতিহ্যগত জ্ঞান, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পরিবেশের টেকসই ব্যবস্থাপনায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়াও দিবসটির গুরুত্বপূর্ণ দিক।
২০২৬ সালের জাতিসংঘের প্রতিপাদ্য— “জীবন রক্ষা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণে আদিবাসী ধাত্রীদের অনন্য অবদানকে সম্মান জানানো”। এই প্রতিপাদ্যে মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, কল্যাণ এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা ঐতিহ্যগত জ্ঞান সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাস্তবতা
বাংলাদেশ বৈচিত্র্যময় জাতিগত, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত জনগোষ্ঠীর দেশ। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৫৪টিরও বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে, যারা অন্তত ৩৫টি ভিন্ন ভাষায় কথা বলে।
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ। তবে আদিবাসী সংগঠনগুলোর দাবি, প্রকৃত সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখের কাছাকাছি।
চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, ম্রো, বম, সাঁওতাল, ওরাঁও, গারো, মাহাতো, পাংখোয়া, রাখাইন, মুন্ডা, মণিপুরীসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারা ধরে রেখেছে।
তবে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এই সমৃদ্ধির পাশাপাশি ভূমির অধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক সুযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামনে এখনো নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
সংবিধানে সমঅধিকারের অঙ্গীকার
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকদের সমতা ও ন্যায়বিচারের মৌলিক ভিত্তি নিশ্চিত করেছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সব নাগরিকের আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং আইনের সমান সুরক্ষার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, জাত, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং রাষ্ট্র ও জনজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
তবে জাতিসত্তা বা ‘Indigenous Peoples’-এর অধিকারকে আরও স্পষ্টভাবে সাংবিধানিক ও আইনগত কাঠামোর মধ্যে আনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) কনভেনশন ১০৭ অনুসমর্থন করলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় এখনো বেশ কিছু মৌলিক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
২০১১ সালের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের জাতিগত বৈচিত্র্যের বিষয়টি স্বীকৃতি পেলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘Indigenous Peoples’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। সাংস্কৃতিক অধিকারের কিছু বিষয় স্বীকৃত হলেও ভূমির মালিকানা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) Committee of Experts on the Application of Conventions and Recommendations (CEACR)-সহ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বারবার এমন একটি পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, যেখানে আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের মৌলিক অধিকার পূর্ণাঙ্গভাবে ভোগ করতে পারে।
আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা
আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা এখনো বাংলাদেশের একটি গুরুতর মানবাধিকার উদ্বেগ। Kapaeeng Foundation-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩২ জন আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুকে কেন্দ্র করে মোট ২৯টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ধর্ষণ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, হত্যা, নির্যাতন ও যৌন হয়রানির মতো গুরুতর অপরাধ রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত এসব ঘটনা আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার চিত্র তুলে ধরে। তবে প্রকৃত ঘটনা আরও বেশি হতে পারে।
প্রতিশোধের ভয়, সামাজিক কলঙ্ক, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, আইনি সহায়তা ও প্রয়োজনীয় সেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার ঘাটতির কারণে অনেক ঘটনাই যথাযথভাবে নথিভুক্ত হয় না।
ফলে শুধু অপরাধের বিচারই বাধাগ্রস্ত হয় না, বরং সহিংসতা, বৈষম্য ও প্রান্তিকীকরণের চক্রও দীর্ঘস্থায়ী হয়। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, কার্যকর বিচারপ্রক্রিয়া এবং ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিচার বিলম্বিত হলে বাড়ে দায়মুক্তি
‘বিচার বিলম্বিত মানেই বিচার থেকে বঞ্চিত’—এই বহুল প্রচলিত কথাটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অনেক ভুক্তভোগীর ক্ষেত্রেও বাস্তবতার নির্মম প্রতিফলন।
তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, যথাযথ প্রমাণ সংগ্রহে ব্যর্থতা, বিচারিক প্রক্রিয়ার ধীরগতি, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের ভয়ভীতি এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে ব্যর্থতা ন্যায়বিচারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এর ফলে বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে এবং অনেক ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবার অভিযোগ জানাতেও নিরুৎসাহিত হন। একপর্যায়ে অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির প্রবণতা আরও শক্তিশালী হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির অপূর্ণ বাস্তবায়ন
১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় তিন দশক পরও এর গুরুত্বপূর্ণ কিছু অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে বলে আদিবাসী প্রতিনিধিরা মনে করেন।
চুক্তিটির অন্যতম লক্ষ্য ছিল স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন জোরদার করা, ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের কার্যকর সমাধান এবং পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠনের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা।
বিভিন্ন সরকার চুক্তির বিভিন্ন ধারা বাস্তবায়নে অগ্রগতির কথা বললেও আদিবাসী প্রতিনিধিদের অভিযোগ, অর্থবহ বিকেন্দ্রীকরণ, কার্যকর ভূমি কমিশন এবং দীর্ঘদিনের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
এই বাস্তবায়ন ঘাটতি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সংলাপের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনা
সম্প্রতি সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সংরক্ষিত মহিলা আসন-১৯-এর সংসদ সদস্য আন্না মিনজের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি এ সাক্ষাতে অংশ নেয়।
বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিষয়ক মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রতিনিধিরা তাদের বিভিন্ন ন্যায্য দাবি তুলে ধরেন এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি সুপারিশপত্র হস্তান্তর করেন।
আদিবাসী নেতৃবৃন্দের এই উদ্যোগ জাতীয় পর্যায়ে তাদের অধিকার ও দাবিগুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
কী করা জরুরি
একটি ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ভূমি বিরোধের সমাধান: আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। সমতলের আদিবাসীদের ভূমি সমস্যার সমাধানে পৃথক ভূমি কমিশন গঠনও গুরুত্বপূর্ণ।
ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা: আদিবাসী নারী ও কন্যাশিশুসহ সহিংসতার শিকার প্রত্যেক মানুষের ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে বিশেষায়িত আইনি সহায়তা, নিরাপত্তা, দ্রুত তদন্ত ও কার্যকর বিচারপ্রক্রিয়া প্রয়োজন।
শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি: জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় আদিবাসী ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং বিকাশের জন্য টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিতে হবে।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ জোরদার: জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আরও কার্যকর ও সক্ষম করে আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় মানবাধিকার পরিস্থিতির নিয়মিত ও স্বাধীন পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
শান্তিচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন: পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির অসম্পূর্ণ ধারাগুলো বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণে নতুন করে গঠনমূলক সংলাপ শুরু করা প্রয়োজন।
বৈচিত্র্যই বাংলাদেশের শক্তি
বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠী এ দেশের বাইরের কেউ নয়; তারা বাংলাদেশের সমাজ, ইতিহাস ও রাষ্ট্র গঠনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও বহু আদিবাসী সদস্য বাঙালি সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছেন এবং দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ করেছেন।
তাদের এই অবদান শুধু আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অধিকার, মর্যাদা ও সমান নাগরিক সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের শক্তি সাংস্কৃতিক একরূপতায় নয়; বরং তার বৈচিত্র্যের মধ্যেই নিহিত। বিভিন্ন জাতিসত্তা, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সহাবস্থানই দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিকে সমৃদ্ধ করেছে।
তাই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও পূর্বপুরুষের ভূমি রক্ষা কোনো অনুগ্রহ নয়। এটি ন্যায়বিচার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সমঅধিকারের প্রতি রাষ্ট্রের অঙ্গীকারের অংশ।
একটি সত্যিকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়তে হলে এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে পরিচয় বা জাতিসত্তার কারণে কেউ পিছিয়ে থাকবে না এবং প্রতিটি নাগরিক সমান মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে বাঁচতে পারবে।




























