‘ফেরার অঙ্গীকারে প্রশংসা, ধর্মান্ধ তোষণে তীব্র আঘাত’—শেখ হাসিনাকে নিয়ে তসলিমা নাসরিনের বিশ্লেষণ

‘ফেরার অঙ্গীকারে প্রশংসা, ধর্মান্ধ তোষণে তীব্র আঘাত’—শেখ হাসিনাকে নিয়ে তসলিমা নাসরিনের বিশ্লেষণ। ছবির গ্রাফিতি : দৈনিক আজকের কথা
‘কণ্ঠে ভাঙন নয়, ছিল ফেরার অঙ্গীকার; ধর্মান্ধদের তোষণেই নিজের পতনের ভিত্তি গড়েছিলেন শেখ হাসিনা’—তসলিমা নাসরিন
ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সাহসিকতার প্রশংসার পাশাপাশি রাজনৈতিক ভুল, ধর্মান্ধ শক্তির সঙ্গে আপস, মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় স্বীকারের আহ্বান নির্বাসিত লেখিকার
ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফেরার অঙ্গীকারে প্রশংসা করেছেন বিখ্যাত লেখিকা ড. তসলিমা নাসরিন। সাম্প্রতিক ভাষণের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে নির্বাসিত প্রখ্যাত লেখক ড. তসলিমা নাসরিন। বক্তব্যে তিনি একদিকে শেখ হাসিনার সাহসিকতা ও দেশে ফেরার দৃঢ় সংকল্পের প্রশংসা করেছেন, অন্যদিকে তাঁর শাসনামলের রাজনৈতিক ভুল, ধর্মান্ধ শক্তির সঙ্গে আপস, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কড়া সমালোচনা করেছেন।
‘কণ্ঠে ভাঙন ছিল না, ছিল দেশে ফেরার অঙ্গীকার’
শেখ হাসিনার ভাষণ শুনে তসলিমা নাসরিন লেখেন, “দুই বছর দেশ থেকে দূরে থেকেও তাঁর কণ্ঠে ভাঙন ছিল না; ছিল দেশে ফেরার দৃঢ় সংকল্প। বত্রিশ বছর ধরে নির্বাসিত একজন মানুষ হিসেবে নিজের দেশে ফেরার এই আকুলতা আমি বুঝি। তাঁর দৃঢ়তা আমাকে স্পর্শ করেছে।”
বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞাকে ‘অগণতান্ত্রিক’ আখ্যা
বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে সরকারি নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করে তসলিমা নাসরিন বলেন, ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, বিরোধী কণ্ঠ দমন গণতন্ত্রের পরিপন্থী। তাঁর ভাষায়, শেখ হাসিনার কথা বলার, আত্মপক্ষ সমর্থনের এবং নিজের দেশে ফেরার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সরকার বা আদালত নয়, জনগণই ভোটের মাধ্যমে নির্ধারণ করবে।

২০২৪ সালের আন্দোলন ও রাজনৈতিক দায় এড়ানোর সুযোগ নেই
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনার বক্তব্যের উল্লেখ করে তসলিমা নাসরিন বলেন, আন্দোলনটি পরিকল্পিতভাবে ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন, আন্দোলন চলাকালে প্রাণহানি, আহত হওয়া এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের জন্য শেখ হাসিনার সরকারের রাজনৈতিক ও নৈতিক দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর ভাষায়, “শুধু ষড়যন্ত্রের কথা বললে ইতিহাস সম্পূর্ণ হয় না। নিজের ভুল স্বীকার করা দুর্বলতা নয়; একজন নেতার সবচেয়ে বড় সাহস।”
‘ধর্মান্ধদের তোষণই পতনের পথ তৈরি করেছে’
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে ধর্মান্ধ শক্তির সঙ্গে আপসের বিষয়টি তুলে ধরেন তসলিমা নাসরিন। তিনি বলেন, ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে বারবার ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতা করা হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, হেফাজতের দাবি মেনে পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রগতিশীল ও অমুসলিম লেখকদের লেখা বাদ দেওয়া, কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি দেওয়া এবং ইসলামি জঙ্গিদের হাতে মুক্তচিন্তকরা নিহত হওয়ার পর তাঁদের পাশে না দাঁড়িয়ে উল্টো লেখকদের ধর্মের সমালোচনা না করার পরামর্শ দেওয়া ছিল গুরুতর রাজনৈতিক ভুল।
তসলিমা নাসরিনের ভাষায়, “ক্ষমতা রক্ষার জন্য যে ধর্মান্ধ জিহাদি অপশক্তিকে তিনি বছরের পর বছর তুষ্ট ও প্রশ্রয় দিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত সেই শক্তিই ছাত্রদের আন্দোলনে ঢুকে আন্দোলনটিকে নিজেদের রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করে তাঁর পতন ঘটিয়েছে। তিনি শুধু ষড়যন্ত্রের শিকার নন; ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে তাঁর ধারাবাহিক আপসই সেই ষড়যন্ত্র সফল হওয়ার জমি তৈরি করেছিল।”
তিনি আরও বলেন, ধর্মান্ধ শক্তিকে তুষ্ট করে সাময়িকভাবে ক্ষমতা রক্ষা করা গেলেও শেষ পর্যন্ত সেই শক্তিই রাষ্ট্র ও ক্ষমতাকে গ্রাস করে—বাংলাদেশে তারই বাস্তব উদাহরণ দেখা গেছে।
স্বচ্ছ বিচার ও প্রতিহিংসামুক্ত রাজনীতির আহ্বান
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রসঙ্গে তসলিমা নাসরিন বলেন, তিনি চান শেখ হাসিনা দেশে ফিরুন। তবে সেই ফেরা যেন হত্যা, ফাঁসি বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জন্য না হয়; বরং স্বাধীন, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের বিচারিক প্রক্রিয়ার নিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে হোক।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত অপরাধের বিচার যেমন প্রয়োজন, তেমনি তাঁর পতনের পর সংঘটিত হত্যা, লুটপাট, সংখ্যালঘু নির্যাতন, নারীর ওপর সহিংসতা, সাংবাদিক ও মুক্তচিন্তকদের কণ্ঠরোধ এবং ইসলামি মৌলবাদী সহিংসতারও সমানভাবে বিচার হতে হবে।
তাঁর ভাষায়, “ন্যায়বিচার বেছে বেছে করা যায় না।”
নিজের ভুল স্বীকার করেই ফিরতে হবে
প্রতিক্রিয়ার শেষাংশে বাংলাদেশকে প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তসলিমা নাসরিন বলেন, শেখ হাসিনাকে শুধু ক্ষমতার দাবিদার হিসেবে নয়, বরং নিজের শাসনের সাফল্য ও ব্যর্থতা—দুটোরই সত্য স্বীকার করতে প্রস্তুত একজন নেতা হিসেবে দেশে ফিরতে হবে।
তিনি মনে করেন, শেখ হাসিনা যদি অতীতের গুরুতর রাজনৈতিক ভুলগুলো স্বীকার করেন এবং ভবিষ্যতে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে আর কখনো আপস না করার অঙ্গীকার করেন, তবে তাঁর প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ পুনর্জাগরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।
কুমিল্লায় ৯ মাসে ১০৪ হত্যা, শিশু অপ্রতিমের মৃত্যুতে লালমাই পাহাড় ঘিরে তীব্র আলোচনা

কুমিল্লায় গত নয় মাসে ১০৪ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের নৃশংস মৃত্যু কুমিল্লাজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অপ্রতিমের মৃত্যু ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে চলছে আলোচনা। একই সঙ্গে লালমাই পাহাড় ও আশপাশের নির্জন এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।
রোববার সকালে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। সকাল ১০টা ১০ মিনিটে অনুষ্ঠিত জানাজায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, স্বজন, পরিচিতজনসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। জানাজা শেষে কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতিতে ঈদগাহ কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
অপ্রতিম বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। শুক্রবার বিকেলে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় সে। এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়।
শনিবার দুপুরে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার দক্ষিণ মোড়ের দক্ষিণ পাশে সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক।
অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন অপ্রতিমের পরিবার, স্বজন ও স্থানীয়রা।
অপ্রতিমের মৃত্যুর পর আলোচনায় এসেছে লালমাই পাহাড়ের নিরাপত্তা। কুমিল্লা শহর, কোটবাড়ি ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন হওয়ায় লালমাই পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে মানুষের চলাচল থাকলেও পাহাড়ের অনেক স্থান এখনো নির্জন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব নির্জন এলাকা অপরাধীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করছে।
লালমাই পাহাড়ে অপরাধের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০১০ সালে পাহাড়ের হাতিমারা এলাকা থেকে মেহেদি হাসান নামে এক কিশোর অটোরিকশাচালকের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। এর আগে ২০০৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি লালমাই পাহাড়ের মোড় থেকে রিফাত হোসেন নামে আরেক শিশুর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ছাড়া গত ২৯ আগস্ট কুমিল্লার কোটবাড়ির শান্তির মোড় এলাকায় দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে পাহাড়ের নির্জন স্থানে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা বিভিন্ন বসতিতেও ডাকাতি, ছিনতাই এবং মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পাহাড় ও আশপাশের এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। এসব অপরাধের সঙ্গে মাদকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, বিচ্ছিন্নভাবে অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি পাহাড়কেন্দ্রিক অপরাধচক্রের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, গত নয় মাসে জেলায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ১০৪ জন। জেলার সামগ্রিক হত্যাকাণ্ডের এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে লালমাই পাহাড় ও আশপাশের এলাকায় একের পর এক গুরুতর অপরাধের অভিযোগ স্থানীয়দের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয়দের প্রশ্ন, জনবসতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছাকাছি থাকা লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থা কতটা কার্যকর। পাহাড়ের বিভিন্ন প্রবেশপথে নজরদারি, নিয়মিত পুলিশ টহল এবং প্রয়োজনীয় স্থানে সিসিটিভি স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে মাঠে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। হত্যাকাণ্ডের ক্লু শনাক্ত করে প্রকৃত হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
একটি শিশুর আকস্মিক ও করুণ মৃত্যু এখন শুধু তার পরিবারকেই শোকাহত করেনি, লালমাই পাহাড়ের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে কুমিল্লাবাসীকে। অপ্রতিমের জানাজায় অংশ নেওয়া মানুষের চোখে ছিল শোক, ক্ষোভ ও দ্রুত বিচারের প্রত্যাশা।
স্থানীয়দের দাবি, অপ্রতিম হত্যার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে লালমাই পাহাড় ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা প্রতিরোধ করতে হবে।
অপ্রতিম আর ফিরবে না। কিন্তু তার মৃত্যু যেন কুমিল্লার পাহাড়ি এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্নগুলোর স্থায়ী সমাধানের কারণ হয়—এটাই এখন স্বজন, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা।
অপ্রতিমের আইফোন তুহিনের বাড়িতে, সামনে বাইক ছিনতাইয়ের অভিযোগ

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় আটক তুহিনের বাড়ি থেকে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধারের পর তার বিরুদ্ধে থাকা পুরোনো একটি অভিযোগও সামনে এসেছে। ২০২৫ সালে তুহিনের বিরুদ্ধে এক কিশোরের মোটরসাইকেল নিয়ে ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল বলে একটি লিখিত অভিযোগের কপি থেকে জানা গেছে।
ওই অভিযোগে বলা হয়, অভিযোগকারীর ছেলে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার একটি মোটরসাইকেল বিক্রয়কেন্দ্র থেকে ২ লাখ ৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি মোটরসাইকেল কেনেন। তুহিনের সঙ্গে তার পূর্বপরিচয় ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকায় তুহিন প্রায়ই মোটরসাইকেলটি নিয়ে চলাচল করতেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল রাত আনুমানিক ৯টার দিকে তুহিন মোটরসাইকেলটি নেওয়ার জন্য ফোন করেন। পরে অভিযোগকারীর ছেলে মোটরসাইকেলটি নিয়ে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার সালমানপুর এলাকার একটি স্থানে যান এবং তুহিনের কাছে সেটি দেন। এরপর তিনি কাছের একটি দোকানে বসে থাকেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, কিছুক্ষণ পর তুহিনের কাছে মোটরসাইকেলটি ফেরত চাইলে তিনি সেটি তার কাছে নেই বলে জানান। পরে মোটরসাইকেলটি উদ্ধারের চেষ্টা করা হলেও সেটি আর পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
এ ঘটনায় তুহিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য থানায় অভিযোগ করা হলেও মামলা না নিয়ে শুধু জিডি নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগকারীর বক্তব্য।
অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়, তুহিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি তার ওপর কোনো রাজনৈতিক দলের বড় নেতার প্রভাব রয়েছে—এমন কথাও পুলিশ পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল বলে অভিযোগকারীর দাবি। তবে এ দাবির স্বতন্ত্র সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অপ্রতিমের ঘটনায় ফের আলোচনায় তুহিন
পুরোনো ওই অভিযোগ সামনে আসার মধ্যেই অপ্রতিমের নিখোঁজ ও মৃত্যুর ঘটনায় তুহিনসহ তিনজনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনকে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাওয়ার পর তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আনাস ও ফাহিম নামের আরও দুজনকে আটক করা হয়েছে।
শনিবার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর তদন্তের অংশ হিসেবে তুহিনের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে অপ্রতিমের মায়ের আইফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
কোটবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মফিজ উদ্দিন ভূইয়া জানান, উদ্ধার হওয়া ফোনের কললিস্ট, মেসেজ, লোকেশনসহ বিভিন্ন তথ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার আগে ও পরে কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, এসব তথ্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসহ আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনকে দেখা যায়।
পুরোনো অভিযোগের সঙ্গে বর্তমান তদন্তের যোগসূত্র খতিয়ে দেখছে পুলিশ
অপ্রতিমের আইফোন তুহিনের বাড়ি থেকে উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তে নতুন তথ্য পাওয়ার আশা করছে পুলিশ। একই সঙ্গে তুহিনের বিরুদ্ধে আগে থাকা মোটরসাইকেল নেওয়ার অভিযোগের বিষয়টিও তদন্তসংশ্লিষ্টদের নজরে আসতে পারে।
তবে ২০২৫ সালের মোটরসাইকেল সংক্রান্ত অভিযোগ এবং অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনার মধ্যে কোনো সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। পুরোনো অভিযোগে তুহিনের বিরুদ্ধে মোটরসাইকেল নিয়ে ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে; সেটি কোনো আদালতে প্রমাণিত অপরাধ—এমন তথ্যও পাওয়া যায়নি।
অপ্রতিমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনায় কারা জড়িত, তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। তাই পুরোনো অভিযোগের পাশাপাশি বর্তমান ঘটনায় উদ্ধার হওয়া আইফোন, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং আটক ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করাই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অপ্রতিমের পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে পুরোনো অভিযোগে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
দেবীদ্বারে আলফি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের উদ্বোধন

চিকিৎসাসেবা ব্যবসা নয়, এটি মহৎ ও মানবিক সেবা: অধ্যাপক ডা. আছিফ মাহমুদ
কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার ইউছুফপুর ইউনিয়নের শিবপুর নিউমার্কেট এলাকায় আধুনিক ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে ‘আলফি ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ উদ্বোধন করা হয়েছে।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
উদ্যোক্তারা জানান, গ্রামীণ এলাকার মানুষের কাছে উন্নত চিকিৎসাসেবা ও রোগ নির্ণয়ের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠানটি চালু করা হয়েছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি, অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও দক্ষ টেকনিশিয়ানদের সমন্বয়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টারটি পরিচালিত হবে।
আলফি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ডা. মো. সফিউল আলম চৌধুরীর সভাপতিত্বে এবং ব্যাংক কর্মকর্তা মো. আল আমিনের সঞ্চালনায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. আছিফ মাহমুদ চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি এবিএম আতিকুর রহমান বাশার, দেবীদ্বার ডা. জসীম উদ্দিন হাড়ভাঙা হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. মানসুরুল হক, ডা. মো. দ্বীন মোহাম্মদ, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মো. নজরুল ইসলাম, কুমিল্লা এভারগ্রীন হসপিটালের পরিচালক ইউনুছ মাস্টার, ইউছুফপুর আইডিয়াল স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. আবু কাউছার, মো. মাজেদুল ইসলাম চৌধুরী, আলফি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালনা পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম মেম্বার, মাওলানা আলাউদ্দিন এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. শাহাদাত হোসেন দুলালসহ অন্যরা।

চিকিৎসাসেবা কোনো সাধারণ ব্যবসা নয়, এটি একটি মহৎ ও মানবিক সেবা।
তিনি বলেন, গ্রামীণ এলাকার মানুষকে চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়ের জন্য ঢাকাসহ বড় শহরে ছুটতে হয়। নিজ এলাকায় আধুনিক রোগ নির্ণয়ের সুযোগ তৈরি হওয়া তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আলফি ডায়াগনস্টিক সেন্টার নির্ভুল রিপোর্ট ও স্বল্প খরচে সেবা নিশ্চিত করে স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জন করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ব্যবসায়িক মুনাফার ঊর্ধ্বে উঠে প্রত্যন্ত এলাকার অসহায় ও দরিদ্র রোগীদের সেবা দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠান শেষে মিলাদ ও বিশেষ দোয়া পরিচালনা করেন সৈয়দপুর কামিল মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মাওলানা মো. আব্দুল লতিফ।































