ক্ষুব্ধ সুবিধাভোগীদের দীর্ঘশ্বাস
নওগাঁয় কুরবানির মাংস বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ, ২ কেজির বদলে মিলল ১ কেজি!

নওগাঁয় কুরবানির মাংস বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ, ২ কেজির বদলে মিলল ১ কেজি! ছবি : আজকের কথা
নওগাঁয় কুরবানির মাংস বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ, নির্ধারিত ওজন না পেয়ে ক্ষুব্ধ উপকারভোগীরা
ঈদুল আজহা উপলক্ষে ইসলামিক রিলিফ ইউএসএ’র অর্থায়নে নওগাঁ জেলার অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের মাঝে কুরবানির মাংস বিতরণ কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত ২ কেজির পরিবর্তে কম মাংস দেওয়ার অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক উপকারভোগী। একই সঙ্গে গরু ক্রয়, মাংস সংরক্ষণ ও বিতরণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
জানা গেছে, ইসলামিক রিলিফ ইউএসএ’র অর্থায়নে এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘সোশ্যাল এইড’-এর বাস্তবায়নে নওগাঁ জেলার পাঁচটি উপজেলায় মোট ২৬টি কুরবানির গরু জবাই করা হয়। এসব গরুর মাংস নওগাঁ সদর, রানীনগর, মান্দা, মহাদেবপুর ও পত্নীতলা উপজেলার ২ হাজার ৮০ জন দরিদ্র ও দুস্থ পরিবারের মধ্যে বিতরণের কথা ছিল। প্রতিটি পরিবারকে ২ কেজি করে মাংস দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
প্রকল্পের আওতায় আগে থেকেই সুবিধাভোগীদের মাঝে কার্ড বিতরণ করা হয়। ঈদের দিন থেকে তৃতীয় দিন পর্যন্ত (২৮ থেকে ৩০ মে) বিভিন্ন কেন্দ্রে মাংস বিতরণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে মাংস সংগ্রহ করতে এসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও অনেকে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম মাংস পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেন।
নওগাঁ সদর উপজেলার দুবলহাটি ইউনিয়নের মাতাসাগর গ্রামের বাসিন্দা বুলবুলি বেগম বলেন, “আমাকে ২ কেজি মাংস দেওয়ার কথা বলে কার্ড দেওয়া হয়েছিল। ৫০ টাকা ভাড়া খরচ করে উপজেলা সদরে এসেছি। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর একটি প্যাকেট দেওয়া হয়। পরে জানানো হয়, আমার ভাগে ১ কেজি মাংস রয়েছে। বাধ্য হয়ে সেটাই নিয়ে ফিরেছি।”
রানীনগর উপজেলার গোনা গ্রামের আরিফুল ইসলাম জানান, “চারটি কার্ড নিয়ে মাংস নিতে এসেছিলাম। যাতায়াতেই প্রায় ১৭০ টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু ওজন করে দেখি একটিতে ১ কেজি ৭০০ গ্রাম, আরেকটিতে ১ কেজি ৬০০ গ্রাম মাংস রয়েছে। বাকি দুই কার্ডের বিপরীতে মাংস দিতে অনুরোধ করলেও তারা দেয়নি।”
একই উপজেলার বরবরিয়া গ্রামের নাছিমা খাতুন বলেন, “প্রথমবার এ ধরনের সহায়তা পেয়েছি। কিন্তু ২ কেজির পরিবর্তে আমার প্যাকেটে ছিল মাত্র ১ কেজি ৪০০ গ্রাম মাংস।”
মাংস ওজনের দায়িত্বে থাকা স্বেচ্ছাসেবী মর্জিনা বেগম বলেন, অধিকাংশ প্যাকেটে ১ কেজি ৮০০ থেকে ১ কেজি ৯০০ গ্রাম পর্যন্ত মাংস ছিল। বড় আকারের মাংসের টুকরার কারণে কিছু ক্ষেত্রে ওজনের তারতম্য হতে পারে। তবে মাত্র ১ কেজি মাংস দেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রকল্প সমন্বয়কারী ও বেসরকারি সংস্থা ‘রানি’র প্রধান নির্বাহী ফজলুল হক খান বলেন, “২৬টি গরুর মাংস জেলার পাঁচটি উপজেলার উপকারভোগীদের মধ্যে জনপ্রতি ২ কেজি হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে। কোথাও সামান্য কম-বেশি হতে পারে, তবে ৫০০ গ্রাম বা ১ কেজি কম দেওয়ার সুযোগ নেই।” তবে প্রকল্পের মোট বাজেট বা বরাদ্দের পরিমাণ সম্পর্কে তিনি কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি।
বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) নওগাঁ জেলা সমন্বয়ক জয়নাল আবেদীন মুকুল বলেন, “এটি কোনো ব্যক্তি উদ্যোগ নয়, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত একটি মানবিক কর্মসূচি। তাই এখানে অনিয়মের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। গরু ক্রয় থেকে শুরু করে মাংস বিতরণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখা উচিত।”
এ বিষয়ে নওগাঁ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “মাংস বিতরণে ওজনে কম দেওয়ার অভিযোগ আমাদের নজরে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থা প্রয়োজনীয় প্রত্যয়ন নিতে এলে বিষয়টি জানানো হবে এবং অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হবে।”
এদিকে স্থানীয়দের দাবি, উপকারভোগীদের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে গরু ক্রয়, মাংস সংরক্ষণ ও বিতরণ কার্যক্রমের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা হোক এবং প্রকৃত তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা হোক। এতে ভবিষ্যতে এ ধরনের মানবিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে বলে মনে করছেন তারা।
‘ফেরাতে পারেনি সরকার, এখন শেখ হাসিনার স্বেচ্ছায় ফেরার খবরেই এত ভয়’—সাংবাদিক মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী

হাফিজের রাজনৈতিক অতীত, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ও বর্তমান সরকারের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরতে পারেন—এমন আলোচনার প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের “ইনশাল্লাহ রাজপথে দেখা হবে” মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছেন প্রবীণ অনুসন্ধানী সাংবাদিক মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী।
বুধবার (৫ আগস্ট) বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে হাফিজ উদ্দিন আহমদ আওয়ামী লীগের অতীত কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন এবং শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গে “ইনশাল্লাহ রাজপথে দেখা হবে” বলে মন্তব্য করেন।
এর প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিক মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী বলেন, “শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে যাননি। তাকে রাষ্ট্রীয় বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে নিরাপত্তার স্বার্থে ভারতে নেওয়া হয়েছিল। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার পদত্যাগপত্র রাষ্ট্র আজ পর্যন্ত জনসমক্ষে উপস্থাপন করতে পারেনি।”
হাফিজ উদ্দিন আহমদের রাজনৈতিক অতীতের সমালোচনা করে শরিফুল আলম চৌধুরী দাবি করেন, ২০০৭ সালের ১/১১-এর সেনাসমর্থিত সরকারের সময় হাফিজ উদ্দিন বিএনপি ভেঙে আলাদা নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় নির্বাচন কমিশন ও তৎকালীন প্রশাসন তাকে বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাকে স্পিকার ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেওয়া বিএনপির রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রমাণ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শরিফুল আলম চৌধুরী আরও দাবি করেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার থেকে শুরু করে বর্তমান প্রশাসন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েও শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়নি। তার অভিযোগ, এখন শেখ হাসিনা স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সম্ভাবনার কথা আলোচনায় আসতেই সরকার আতঙ্কিত হয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা ও গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে এবং জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
তবে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা, এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান এবং শরিফুল আলম চৌধুরীর উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
‘সাংবাদিকতা আমার কাছে পেশা নয়, নেশা’— অর্ধশতকের পথচলায় দেবীদ্বারের প্রবীণ সাংবাদিক আতিকুর রহমান বাশার

মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ৫০ বছরের নিরলস সাংবাদিকতা; অপসাংবাদিকতা নিয়ে উদ্বেগ, ইতিহাসচর্চায় কাটাতে চান জীবনের বাকিটা সময়
সাংবাদিকতা আমার কাছে কোনো পেশা নয়; এটি একটি আদর্শ, একটি দায়বদ্ধতা। কাকতালীয়ভাবে এই পেশায় এসেছিলাম, কিন্তু আর বের হতে পারিনি।
অর্ধশতকের সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে কথাগুলো বলছিলেন কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান সভাপতি, প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম আতিকুর রহমান বাশার।
দেবীদ্বার পৌর এলাকার ভূষণা গ্রামের সন্তান এবিএম আতিকুর রহমান বাশারের জন্ম ১৯৬৩ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লা শহরের মনোহরপুর মুন্সেফবাড়িতে। মাত্র দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় ১৯৭৬ সালে সম্পূর্ণ কাকতালীয়ভাবে তাঁর সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হয়।
সে সময় তৎকালীন ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের ঘনিষ্ঠজন, লেখক ও কলামিস্ট কাজল দত্ত তাঁকে কুমিল্লার দীর্ঘদিনের সমস্যা ‘কুমিল্লার দুঃখ গোমতী’ নিয়ে প্রতিবেদন লিখতে উৎসাহ দেন। সাংবাদিকতায় কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় তিনি প্রথমে বিষয়টি রচনার আকারে লিখলেও পরে কাজল দত্ত ও কুমিল্লা বঙ্গ বিদ্যালয়ের (কুমিল্লা হাই স্কুল) শিক্ষক আব্দুল খালেক মোল্লার সম্পাদনায় সেটি সংবাদের রূপ পায় এবং ‘নতুন বাংলা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর প্রতিবেদনটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদে তৎকালীন সংসদ সদস্য ও ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ ‘কুমিল্লার দুঃখ গোমতী’ প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। পরে গোমতী নদীর বেড়িবাঁধ নির্মাণে সরকারি উদ্যোগ ও বরাদ্দ আসে। ১৯৮৬ সালে তৎকালীন উপমন্ত্রী এএফএম ফখরুল ইসলাম মুন্সী প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে সাবেক সচিব এবিএম গোলাম মোস্তফার দায়িত্বকালে গোমতী বেড়িবাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন হয়।
তবে এই ঐতিহাসিক ঘটনার কৃতিত্ব নিজের নয় বলে উল্লেখ করেন আতিকুর রহমান বাশার। তাঁর ভাষায়, “আমি শুধু লেখাটি লিখেছিলাম। প্রকৃত কৃতিত্ব কাজল দত্ত ও খালেক মাস্টারের, যাঁরা আমার লেখাকে সংবাদে রূপ দিয়েছিলেন।”
মানুষের অধিকারের পক্ষে অর্ধশতকের লড়াই
দীর্ঘ ৫০ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে সাধারণ মানুষের অধিকার, অসহায় মানুষের দুর্ভোগ এবং সমাজ-রাষ্ট্রের অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরাকেই নিজের মূল দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন তিনি।

এই দীর্ঘ সময়ে তিনি একতা, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আজকের কাগজ ও দৈনিক ভোরের কাগজে কাজ করেছেন। পরে টানা ১২ বছর দৈনিক প্রথম আলো-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি দৈনিক কালের কণ্ঠ–এর দেবীদ্বার উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
দেবীদ্বার প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা
১৯৮০ সালে তিনি দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর হাত ধরেই দেবীদ্বারে বহু সাংবাদিকের পথচলা শুরু হয়েছে। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, বর্তমানে জীবিত সাংবাদিকদের মধ্যে তিনিই দেবীদ্বারের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।
অপসাংবাদিকতা নিয়ে ক্ষোভ
বর্তমান সাংবাদিকতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “সাংবাদিকতা জাতির চতুর্থ স্তম্ভ এবং সাংবাদিক জাতির বিবেক। ৯০-এর দশকের পর গণমাধ্যমের বিস্তার ঘটলেও ২০০১ সালের পর অপসাংবাদিকতা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। এখন প্রকৃত সাংবাদিকের চেয়ে অপসাংবাদিকের সংখ্যাই বেশি।”
তিনি অভিযোগ করেন, অনেকেই শুধু পরিচয়পত্র, ডায়েরি ও কলম নিয়ে বিভিন্ন অফিসে দালালি করেন, অথচ সংবাদ লেখার ন্যূনতম দক্ষতাও তাদের নেই। এমনকি একটি সাধারণ শোকসংবাদও অনেকের পক্ষে লেখা সম্ভব হয় না। এসব কর্মকাণ্ডে প্রকৃত সাংবাদিকদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অপসাংবাদিকতা রোধে প্রাথমিক স্তর থেকেই সাংবাদিকতা বিষয়ে মৌলিক শিক্ষা চালুর পাশাপাশি গণমাধ্যম ও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।

প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়াই সাংবাদিকতার পরিচয় নয়
প্রেসক্লাবের সদস্যপদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সাংবাদিক হতে প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় তিনি কোন গণমাধ্যমে কাজ করেন এবং তাঁর সংবাদ নিয়মিত প্রকাশিত হয় কি না।”
তিনি জানান, বর্তমানে দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবে ২৭ জন সদস্য রয়েছেন। এখানে দাতা, সহযোগী ও মূল—এই তিন ধরনের সদস্যপদ রয়েছে। মূল সদস্য হতে হলে অবশ্যই পেশাদার সাংবাদিক হতে হয়।
গবেষণা ও বই প্রকাশের পরিকল্পনা
ছাত্রজীবন থেকেই বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সাংবাদিকতায় সবসময় পেশাগত নিরপেক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন বলে জানান আতিকুর রহমান বাশার।
তিনি বলেন, অপসাংবাদিকতার কারণে বহুবার সাংবাদিকতা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবেছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সত্য অনুসন্ধানের দায়বদ্ধতা এবং পেশার প্রতি ভালোবাসা তাঁকে বারবার মাঠে ফিরিয়ে এনেছে।
জীবনের অবশিষ্ট সময় দেবীদ্বারের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণামূলক লেখালেখিতে ব্যয় করতে চান তিনি। ইতোমধ্যে বিভিন্ন পত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত লেখাগুলো একত্র করে বই আকারে প্রকাশের কাজও এগিয়ে নিচ্ছেন।

সম্মাননা ও স্বীকৃতি
মফস্বল সাংবাদিকতার সীমিত পরিসরেও তিনি অর্জন করেছেন একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় সম্মাননা। কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের (বিএমএসএফ) জাতীয় সম্মেলনে তিনি ‘যুগরত্ন’ সম্মাননা লাভ করেন। এছাড়া বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি, কুমিল্লার ‘আপনজন সম্মাননা’, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে সাংবাদিক কল্যাণ পরিষদ, কুমিল্লা প্রদত্ত নিরাপদ সাংবাদিকতা ও বিশেষ অবদানের সম্মাননাসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের স্বীকৃতিতে ভূষিত হয়েছেন।
তনু হত্যা: জামিনে কারামুক্ত অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর

হাইকোর্টের আদেশে কারামুক্তি, তদন্ত অব্যাহত; ডিএনএ পরীক্ষা ও পলাতকদের গ্রেপ্তারে তৎপর পিবিআই
আলোচিত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া একমাত্র সন্দেহভাজন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সন্ধ্যা প্রায় সোয়া ৭টায় কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পান। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. শাহ আলম খান।
তিনি জানান, গত রোববার হাইকোর্ট হাফিজুর রহমানকে জামিন প্রদান করেন। পরে মঙ্গলবার কুমিল্লা চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মাধ্যমে জামিনের আদেশ কারাগারে পৌঁছালে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
এর আগে গত ২১ এপ্রিল রাতে ঢাকার কেরানীগঞ্জে নিজ বাসা থেকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তাকে গ্রেপ্তার করে। তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলামের নেতৃত্বে অভিযানটি পরিচালিত হয়। গ্রেপ্তারের তিন মাস ১৪ দিন পর তিনি কারামুক্ত হলেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, গ্রেপ্তারের পরদিন হাফিজুর রহমানকে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মমিনুল হকের আদালতে হাজির করা হলে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরে তাকে ঢাকায় পিবিআইয়ের বিশেষ ইউনিটে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

ডিএনএ পরীক্ষায় নতুন অগ্রগতি
পিবিআই সূত্র জানায়, তনুর পরিধেয় পোশাক থেকে সংগৃহীত নমুনার বিশ্লেষণে একাধিক পুরুষের পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া গেছে। এসব প্রোফাইলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে দুই সন্দেহভাজনের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করা হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ জুলাই কুমিল্লার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সাবেক সৈনিক মো. জাহিদুল ইসলাম (৪১) এবং ফয়সাল আহমেদ ওরফে রাব্বী (৩২)-এর ডিএনএ পরীক্ষার অনুমতি দেন।
দুই পলাতকের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ
মামলায় পলাতক দুই সন্দেহভাজন—সার্জেন্ট (অব.) জাহিদুজ্জামান ওরফে জাহিদ এবং সৈনিক শাহীন আলমের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। একই সঙ্গে তাদের গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পিবিআই জানায়, ঘটনার সময় সার্জেন্ট জাহিদ কুমিল্লা সেনানিবাসের ১২ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন। তার বাড়ি বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জে। অন্যদিকে সৈনিক শাহীন আলম কর্মরত ছিলেন ২ সিগন্যাল ব্যাটালিয়নে। তার বাড়ি কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায়। বর্তমানে দুজনই পলাতক রয়েছেন।

তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, আদালতের মাধ্যমে হাফিজুর রহমানের জামিনের বিষয়টি জেনেছেন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী অন্যান্য সন্দেহভাজনকে আটক এবং তাদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে হাফিজুর রহমানের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে তনুর নমুনার মিল পাওয়া গেছে কি না—এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
হতাশ তনুর পরিবার
তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বলেন, হাফিজুর রহমান জামিনে মুক্ত হওয়ার খবর জেনে তারা হতাশ হয়েছেন। তার ভাষ্য, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই প্রধান সন্দেহভাজনের জামিনে মুক্তি বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। তিনি সরকারের কাছে সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানান।
আট বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত
২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন সোহাগী জাহান তনু। পরদিন সেনানিবাসের একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তার বাবা ইয়ার হোসেন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
প্রথমে থানা পুলিশ, পরে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং সিআইডি দীর্ঘ সময় তদন্ত করলেও হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি। ২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি জানায়, তনুর পোশাক থেকে পাওয়া নমুনায় তিনজন পুরুষের শুক্রাণুর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তবে সে সময় সন্দেহভাজনদের সঙ্গে ডিএনএ মিলিয়ে দেখা হয়নি।
২০২০ সালের ২১ অক্টোবর পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলাটি পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর থেকে সংস্থাটি তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে মামলার ষষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম।























