সীমান্তে মানবতার পরীক্ষা
ভূ-সীমানার চেয়ে মানুষ বড়

সীমান্তের ঘাসে বসে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অপেক্ষা—মায়ের কোলজুড়ে শিশুর নীরব আর্তনাদ। ছবি : আজকের কথা
সীমান্তের কাঁটাতারে আটকে থাকা মানবতার গল্প
— পুলক ঘটক
দেড় বছরের একটি শিশু। কুষ্টিয়ার প্রাগপুর সীমান্তে মায়ের কোলে আধশোয়া হয়ে আছে। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ, পায়ের নিচে ধুলোমাখা মাটি, সামনে কাঁটাতারের বেড়া, পেছনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। সে জানে না রাষ্ট্র কী, সীমান্ত কী, নাগরিকত্ব কী কিংবা কূটনীতি কী। সে শুধু জানে তার ক্ষুধা পেয়েছে, তৃষ্ণা পেয়েছে, সে ক্লান্ত।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা থেকে উঠে আসা এমন দৃশ্য শুধু একটি সীমান্ত বিরোধের গল্প নয়; এটি মানবতার এক নির্মম পরীক্ষার গল্প।
কুষ্টিয়া, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, নওগাঁ, যশোর, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা কিংবা সিলেট—সীমান্তের একের পর এক এলাকায় দেখা গেছে অসহায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের। কেউ কাঁটাতারের এপারে, কেউ ওপারে, আবার কেউ নো-ম্যানস-ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন—কোন দেশ তাদের নিজের বলে স্বীকার করবে সেই আশায়।
কেউ দাবি করছেন তারা বাংলাদেশের নাগরিক। কেউ বহু বছর আগে কাজের সন্ধানে ভারতে গিয়েছিলেন। কারও নাগরিকত্ব নিয়ে দুই দেশের প্রশাসনের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কিন্তু একটি বিষয়ে কোনো মতবিরোধ থাকার কথা নয়—
তারা সবাই মানুষ।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে সাম্প্রতিক বিতর্কে সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হচ্ছে এই মানবিক সত্যটিই।
চারদিকে আমরা শুনছি ‘পুশ-ইন’, ‘পুশ-ব্যাক’, ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’, ‘জাতীয় নিরাপত্তা’, ‘সীমান্ত সুরক্ষা’, ‘কূটনৈতিক প্রতিবাদ’ কিংবা ‘রাজনৈতিক অবস্থান’—কিন্তু মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর আর্তনাদ যেন ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির তথ্যমতে, চলতি বছরের জুন মাসের শুরুতেই সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে একাধিক পুশ-ইনের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সময়ে শত শত মানুষকে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সংখ্যার হিসেবে কিছু অমিল থাকতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই—সমস্যাটি বাস্তব এবং ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে।
প্রশ্ন হলো, এই মানুষগুলো কারা?
তারা কি সত্যিই বাংলাদেশের নাগরিক?
নাকি তাদের মধ্যে এমন মানুষও আছেন, যাদের পরিচয় নিয়ে দুই দেশের প্রশাসনের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে?
জামালপুর সীমান্তে ষষ্টি চন্দ্র বর্মণের ঘটনাটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে নানা তথ্য ছড়িয়ে পড়েছিল। কেউ বলেছিলেন তিনি ভারতের নাগরিক, কেউ দাবি করেছিলেন তিনি বাংলাদেশি। পরে প্রশাসনিক যাচাই-বাছাইয়ে জানা যায়, তিনি বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার বাসিন্দা।
এই ঘটনাই দেখিয়ে দেয়, নাগরিকত্ব অনুমানের বিষয় নয়।
ভাষা, পোশাক কিংবা চেহারা দেখে কোনো মানুষের জাতীয়তা নির্ধারণ করা যায় না। প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য নথি, প্রশাসনিক তদন্ত এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সমন্বয়।
সেখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠে আসে।
যদি এসব মানুষ সত্যিই বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে থাকেন, তাহলে তাদের কেন আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে?
আর যদি তারা বাংলাদেশের নাগরিক না হন, তাহলে কী ভিত্তিতে তাদের বাংলাদেশ সীমান্তে এনে ফেলে রাখা হচ্ছে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সীমান্তে নয়, দুই দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেও খুঁজতে হবে।
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘অবৈধ অভিবাসন’ বহুদিনের একটি আলোচিত ইস্যু। বিশেষ করে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে এটি নির্বাচনী রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বছরের পর বছর ধরে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ প্রশ্নটি রাজনৈতিক বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি নিরাপত্তা ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন।
বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন।
কিন্তু সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের কাছে এটি বেঁচে থাকার প্রশ্ন।
এটাই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
একজন মা যখন শিশুকে বুকে নিয়ে দিনের পর দিন সীমান্তে অপেক্ষা করেন, তখন তার কাছে কূটনীতি গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ একটি নিরাপদ আশ্রয়। একজন বৃদ্ধ যখন জানেন না তিনি কোন দেশে ফিরবেন, তখন তার কাছে জাতীয় রাজনীতির চেয়ে বেশি জরুরি একবেলা খাবার এবং নিরাপত্তা।
সমস্যার আরেকটি দিকও আমাদের স্বীকার করতে হবে।
বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ বছরের পর বছর ধরে জীবিকার সন্ধানে ভারতে গেছেন। কেউ শ্রমিক হিসেবে, কেউ নির্মাণকর্মী, কেউ গৃহকর্মী হিসেবে। এটি কোনো গোপন সত্য নয়।
তবে এটিও সত্য যে উন্নত জীবন ও কর্মসংস্থানের আশায় সীমান্ত অতিক্রম করা শুধু বাংলাদেশিদের বৈশিষ্ট্য নয়।
মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকা থেকে ইউরোপ, দক্ষিণ এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য—বিশ্বের সর্বত্র মানুষ জীবিকার তাগিদে সীমান্ত পাড়ি দেয়।
এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্যের বাস্তব চিত্র।
কাজ যেখানে আছে, মানুষ সেখানে যাবে। সুযোগ যেখানে আছে, মানুষ সেখানে পৌঁছাতে চাইবে।
তাই অভিবাসনের প্রশ্নকে শুধু আইন-শৃঙ্খলা বা নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সমাধান আসবে না।
আবার রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষার অধিকারও অস্বীকার করা যায় না।
তাই সমাধান হতে হবে যৌথ, ন্যায়সঙ্গত এবং মানবিক।
ভারত যদি মনে করে কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক, তাহলে তার পরিচয় যাচাইয়ের সুযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশ যদি যাচাই করে নাগরিকত্ব নিশ্চিত করে, তাহলে তাকে গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বের বহু দেশ এভাবেই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।
প্রয়োজন কার্যকর দ্বিপক্ষীয় কাঠামো, দ্রুত তথ্য যাচাই ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
দুঃখজনকভাবে পুরো আলোচনায় আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—অতি-জাতীয়তাবাদ।
একপক্ষ সব দায় ভারতের ওপর চাপাচ্ছে।
অন্যপক্ষ সীমান্ত পার হওয়া প্রতিটি মানুষকে অপরাধী হিসেবে চিত্রিত করছে।
দুই অবস্থানই মানবিক ও বাস্তবসম্মত নয়।
ভারতকে গালমন্দ করলে সীমান্তে আটকে থাকা শিশুটির ক্ষুধা মিটবে না।
আবার জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে একজন বৃদ্ধকে দিনের পর দিন নো-ম্যানস-ল্যান্ডে ফেলে রাখাও কোনো সভ্য রাষ্ট্রের আচরণ হতে পারে না।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু সীমান্ত পাহারা দেওয়া নয়; মানুষের মর্যাদা রক্ষা করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
আজ সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখে যে আতঙ্ক, তা শুধু তাদের ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়; এটি আমাদের সময়েরও একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক নয়। ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি, নদী, অর্থনীতি এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতে দুই দেশ গভীরভাবে সংযুক্ত।
সেই সম্পর্কের মাঝখানে কোনো শিশুর রাত কাটানো উচিত নয় কাঁটাতারের বেড়ার পাশে।
আজ প্রয়োজন উত্তেজনা নয়, সমাধান।
প্রয়োজন নতুন করে একটি কার্যকর প্রত্যাবাসন চুক্তি।
প্রয়োজন দ্রুত নাগরিকত্ব যাচাইয়ের আধুনিক ব্যবস্থা।
প্রয়োজন সীমান্তে আটকে পড়া মানুষদের জন্য মানবিক সহায়তা।
প্রয়োজন রাজনৈতিক স্লোগানের পরিবর্তে বাস্তব পদক্ষেপ।
কারণ কুষ্টিয়ার সেই শিশুটি, জামালপুরের সেই বৃদ্ধ কিংবা পঞ্চগড়ের সেই পরিবার—তারা কেউ ভূরাজনীতির খেলোয়াড় নয়। তারা শুধু মানুষ।
আর ইতিহাস শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে তার সীমান্তের কড়াকড়ি দিয়ে নয়, মানুষের প্রতি আচরণ দিয়েই বিচার করে।
সেই বিচারে আজ বাংলাদেশ ও ভারতের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন একটাই—
তারা কি সীমান্তকে বড় করবে, নাকি মানুষকে?
কারণ সত্যটি খুবই সহজ—
ভূ-সীমানার চেয়ে মানুষ বড়।
লেখক: সাংবাদিক, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ হিন্দু আইন সংস্কার পরিষদ। ghatack@gmail.com
‘সাংবাদিকতা আমার কাছে পেশা নয়, নেশা’— অর্ধশতকের পথচলায় দেবীদ্বারের প্রবীণ সাংবাদিক আতিকুর রহমান বাশার

মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ৫০ বছরের নিরলস সাংবাদিকতা; অপসাংবাদিকতা নিয়ে উদ্বেগ, ইতিহাসচর্চায় কাটাতে চান জীবনের বাকিটা সময়
সাংবাদিকতা আমার কাছে কোনো পেশা নয়; এটি একটি আদর্শ, একটি দায়বদ্ধতা। কাকতালীয়ভাবে এই পেশায় এসেছিলাম, কিন্তু আর বের হতে পারিনি।
অর্ধশতকের সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে কথাগুলো বলছিলেন কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান সভাপতি, প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম আতিকুর রহমান বাশার।
দেবীদ্বার পৌর এলাকার ভূষণা গ্রামের সন্তান এবিএম আতিকুর রহমান বাশারের জন্ম ১৯৬৩ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লা শহরের মনোহরপুর মুন্সেফবাড়িতে। মাত্র দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় ১৯৭৯ সালে সম্পূর্ণ কাকতালীয়ভাবে তাঁর সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হয়।
সে সময় তৎকালীন ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের ঘনিষ্ঠজন, লেখক ও কলামিস্ট কাজল দত্ত তাঁকে কুমিল্লার দীর্ঘদিনের সমস্যা ‘কুমিল্লার দুঃখ গোমতী’ নিয়ে প্রতিবেদন লিখতে উৎসাহ দেন। সাংবাদিকতায় কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় তিনি প্রথমে বিষয়টি রচনার আকারে লিখলেও পরে কাজল দত্ত ও কুমিল্লা বঙ্গ বিদ্যালয়ের (কুমিল্লা হাই স্কুল) শিক্ষক আব্দুল খালেক মোল্লার সম্পাদনায় সেটি সংবাদের রূপ পায় এবং ‘নতুন বাংলা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর প্রতিবেদনটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদে তৎকালীন সংসদ সদস্য ও ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ ‘কুমিল্লার দুঃখ গোমতী’ প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। পরে গোমতী নদীর বেড়িবাঁধ নির্মাণে সরকারি উদ্যোগ ও বরাদ্দ আসে। ১৯৮৬ সালে তৎকালীন উপমন্ত্রী এএফএম ফখরুল ইসলাম মুন্সী প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে সাবেক সচিব এবিএম গোলাম মোস্তফার দায়িত্বকালে গোমতী বেড়িবাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন হয়।
তবে এই ঐতিহাসিক ঘটনার কৃতিত্ব নিজের নয় বলে উল্লেখ করেন আতিকুর রহমান বাশার। তাঁর ভাষায়, “আমি শুধু লেখাটি লিখেছিলাম। প্রকৃত কৃতিত্ব কাজল দত্ত ও খালেক মাস্টারের, যাঁরা আমার লেখাকে সংবাদে রূপ দিয়েছিলেন।”
মানুষের অধিকারের পক্ষে অর্ধশতকের লড়াই
দীর্ঘ ৫০ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে সাধারণ মানুষের অধিকার, অসহায় মানুষের দুর্ভোগ এবং সমাজ-রাষ্ট্রের অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরাকেই নিজের মূল দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন তিনি।

এই দীর্ঘ সময়ে তিনি একতা, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আজকের কাগজ ও দৈনিক ভোরের কাগজে কাজ করেছেন। পরে টানা ১২ বছর দৈনিক প্রথম আলো-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি দৈনিক কালের কণ্ঠ–এর দেবীদ্বার উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
দেবীদ্বার প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা
১৯৮০ সালে তিনি দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর হাত ধরেই দেবীদ্বারে বহু সাংবাদিকের পথচলা শুরু হয়েছে। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, বর্তমানে জীবিত সাংবাদিকদের মধ্যে তিনিই দেবীদ্বারের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।
অপসাংবাদিকতা নিয়ে ক্ষোভ
বর্তমান সাংবাদিকতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “সাংবাদিকতা জাতির চতুর্থ স্তম্ভ এবং সাংবাদিক জাতির বিবেক। ৯০-এর দশকের পর গণমাধ্যমের বিস্তার ঘটলেও ২০০১ সালের পর অপসাংবাদিকতা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। এখন প্রকৃত সাংবাদিকের চেয়ে অপসাংবাদিকের সংখ্যাই বেশি।”
তিনি অভিযোগ করেন, অনেকেই শুধু পরিচয়পত্র, ডায়েরি ও কলম নিয়ে বিভিন্ন অফিসে দালালি করেন, অথচ সংবাদ লেখার ন্যূনতম দক্ষতাও তাদের নেই। এমনকি একটি সাধারণ শোকসংবাদও অনেকের পক্ষে লেখা সম্ভব হয় না। এসব কর্মকাণ্ডে প্রকৃত সাংবাদিকদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অপসাংবাদিকতা রোধে প্রাথমিক স্তর থেকেই সাংবাদিকতা বিষয়ে মৌলিক শিক্ষা চালুর পাশাপাশি গণমাধ্যম ও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।

প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়াই সাংবাদিকতার পরিচয় নয়
প্রেসক্লাবের সদস্যপদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সাংবাদিক হতে প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় তিনি কোন গণমাধ্যমে কাজ করেন এবং তাঁর সংবাদ নিয়মিত প্রকাশিত হয় কি না।”
তিনি জানান, বর্তমানে দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবে ২৭ জন সদস্য রয়েছেন। এখানে দাতা, সহযোগী ও মূল—এই তিন ধরনের সদস্যপদ রয়েছে। মূল সদস্য হতে হলে অবশ্যই পেশাদার সাংবাদিক হতে হয়।
গবেষণা ও বই প্রকাশের পরিকল্পনা
ছাত্রজীবন থেকেই বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সাংবাদিকতায় সবসময় পেশাগত নিরপেক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন বলে জানান আতিকুর রহমান বাশার।
তিনি বলেন, অপসাংবাদিকতার কারণে বহুবার সাংবাদিকতা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবেছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সত্য অনুসন্ধানের দায়বদ্ধতা এবং পেশার প্রতি ভালোবাসা তাঁকে বারবার মাঠে ফিরিয়ে এনেছে।
জীবনের অবশিষ্ট সময় দেবীদ্বারের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণামূলক লেখালেখিতে ব্যয় করতে চান তিনি। ইতোমধ্যে বিভিন্ন পত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত লেখাগুলো একত্র করে বই আকারে প্রকাশের কাজও এগিয়ে নিচ্ছেন।

সম্মাননা ও স্বীকৃতি
মফস্বল সাংবাদিকতার সীমিত পরিসরেও তিনি অর্জন করেছেন একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় সম্মাননা। কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের (বিএমএসএফ) জাতীয় সম্মেলনে তিনি ‘যুগরত্ন’ সম্মাননা লাভ করেন। এছাড়া বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি, কুমিল্লার ‘আপনজন সম্মাননা’, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে সাংবাদিক কল্যাণ পরিষদ, কুমিল্লা প্রদত্ত নিরাপদ সাংবাদিকতা ও বিশেষ অবদানের সম্মাননাসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের স্বীকৃতিতে ভূষিত হয়েছেন।
তনু হত্যা: জামিনে কারামুক্ত অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর

হাইকোর্টের আদেশে কারামুক্তি, তদন্ত অব্যাহত; ডিএনএ পরীক্ষা ও পলাতকদের গ্রেপ্তারে তৎপর পিবিআই
আলোচিত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া একমাত্র সন্দেহভাজন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সন্ধ্যা প্রায় সোয়া ৭টায় কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পান। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. শাহ আলম খান।
তিনি জানান, গত রোববার হাইকোর্ট হাফিজুর রহমানকে জামিন প্রদান করেন। পরে মঙ্গলবার কুমিল্লা চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মাধ্যমে জামিনের আদেশ কারাগারে পৌঁছালে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
এর আগে গত ২১ এপ্রিল রাতে ঢাকার কেরানীগঞ্জে নিজ বাসা থেকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তাকে গ্রেপ্তার করে। তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলামের নেতৃত্বে অভিযানটি পরিচালিত হয়। গ্রেপ্তারের তিন মাস ১৪ দিন পর তিনি কারামুক্ত হলেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, গ্রেপ্তারের পরদিন হাফিজুর রহমানকে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মমিনুল হকের আদালতে হাজির করা হলে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরে তাকে ঢাকায় পিবিআইয়ের বিশেষ ইউনিটে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

ডিএনএ পরীক্ষায় নতুন অগ্রগতি
পিবিআই সূত্র জানায়, তনুর পরিধেয় পোশাক থেকে সংগৃহীত নমুনার বিশ্লেষণে একাধিক পুরুষের পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া গেছে। এসব প্রোফাইলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে দুই সন্দেহভাজনের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করা হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ জুলাই কুমিল্লার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সাবেক সৈনিক মো. জাহিদুল ইসলাম (৪১) এবং ফয়সাল আহমেদ ওরফে রাব্বী (৩২)-এর ডিএনএ পরীক্ষার অনুমতি দেন।
দুই পলাতকের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ
মামলায় পলাতক দুই সন্দেহভাজন—সার্জেন্ট (অব.) জাহিদুজ্জামান ওরফে জাহিদ এবং সৈনিক শাহীন আলমের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। একই সঙ্গে তাদের গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পিবিআই জানায়, ঘটনার সময় সার্জেন্ট জাহিদ কুমিল্লা সেনানিবাসের ১২ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন। তার বাড়ি বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জে। অন্যদিকে সৈনিক শাহীন আলম কর্মরত ছিলেন ২ সিগন্যাল ব্যাটালিয়নে। তার বাড়ি কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায়। বর্তমানে দুজনই পলাতক রয়েছেন।

তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, আদালতের মাধ্যমে হাফিজুর রহমানের জামিনের বিষয়টি জেনেছেন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী অন্যান্য সন্দেহভাজনকে আটক এবং তাদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে হাফিজুর রহমানের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে তনুর নমুনার মিল পাওয়া গেছে কি না—এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
হতাশ তনুর পরিবার
তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বলেন, হাফিজুর রহমান জামিনে মুক্ত হওয়ার খবর জেনে তারা হতাশ হয়েছেন। তার ভাষ্য, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই প্রধান সন্দেহভাজনের জামিনে মুক্তি বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। তিনি সরকারের কাছে সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানান।
আট বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত
২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন সোহাগী জাহান তনু। পরদিন সেনানিবাসের একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তার বাবা ইয়ার হোসেন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
প্রথমে থানা পুলিশ, পরে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং সিআইডি দীর্ঘ সময় তদন্ত করলেও হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি। ২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি জানায়, তনুর পোশাক থেকে পাওয়া নমুনায় তিনজন পুরুষের শুক্রাণুর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তবে সে সময় সন্দেহভাজনদের সঙ্গে ডিএনএ মিলিয়ে দেখা হয়নি।
২০২০ সালের ২১ অক্টোবর পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলাটি পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর থেকে সংস্থাটি তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে মামলার ষষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীর চেম্বারে ‘মব’ হামলা: সারা দেশে আইনজীবীদের ক্ষোভ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড়

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীর চেম্বারে ‘মব’ হামলা: সারা দেশে আইনজীবীদের ক্ষোভ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড়
দেশে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের লক্ষ্য করে একের পর এক ‘মব জাস্টিস’ (উচ্ছৃঙ্খল জনতার হামলা), হয়রানিমূলক মামলা ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। সম্প্রতি এই ধরনের চরম নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন (Farzana Yeasmin)।
গতকাল এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে তিনি তার চেম্বারে ঘটে যাওয়া অতর্কিত হামলা ও শারীরিক নির্যাতনের বিবরণ দিয়ে বিচার দাবি করেছেন। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
চেম্বারে হামলা ও শারীরিক নির্যাতন
তিনি আরও জানান, হামলাকারীরা তার চেম্বারের সদস্যদের ওপর সরাসরি চড়-থাপ্পড় ও কিল-ঘুষি মেরে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেছে। একই সাথে অকথ্য ভাষায় হুমকি-ধামকি দিয়ে চেম্বার বন্ধ করে দেওয়ার অপচেষ্টা চালায় দুর্বৃত্তরা। ঘটনাটির বিষয়ে তিনি আইনগত পদক্ষেপ ও সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন।
নেটিজেনদের তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ
আইনজীবীর এ পোস্টটি মুহূর্তের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যায়। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ও লাইক-কমেন্টের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষ এই অন্যায় ও ‘মব কালচার’-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। পোস্টটির কমেন্ট সেকশনে হাজারেরও বেশি মানুষ ‘তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ’ লিখে দেশের বিচারব্যবস্থা ও আইনজীবীদের নিরাপত্তার চরম অবক্ষয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

মব ভায়োলেন্স ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমানে দেশে আইনজীবী, সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীদের নিরাপত্তাহীনতা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
- যত্রতত্র মব ভায়োলেন্স: স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে আদালত প্রাঙ্গণ—সব জায়গায় আইনি প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে একশ্রেণীর দুর্বৃত্ত ‘মব’ সৃষ্টি করে নিজেদের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে।
- বিচারে বাধা ও হয়রানি: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও পেশাগত দায়িত্ব পালন কঠিন হয়ে পড়েছে। মামলা-হামলার ভয়ে সত্য কথা বলার সাহস পাচ্ছেন না সাধারণ নাগরিকরাও।
- অহেতুক ও গায়েবি মামলা: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও গণহারে ও বিতর্কিতভাবে মামলা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যেখানে মৃত ব্যক্তি কিংবা প্রবাসীদের নামও বাদ যাচ্ছে না।
- জনজীবনের দুর্দশা: একদিকে মব জাস্টিসের ভয়, অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আকাশচুম্বী দাম, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট ও সার্বিক অর্থনৈতিক সংকট মিলিয়ে জনজীবন আজ বিপর্যস্ত।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীর ওপর এহেন হামলার পর দেশের সচেতন মহল ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা আশু পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, এখনই যদি মব ভায়োলেন্স এবং পেশাজীবীদের ওপর হামলা শক্ত হাতে দমন না করা হয়, তবে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে।























