সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬ আশ্বিন ১৪৩৩

সীমান্তে মানবতার পরীক্ষা

ভূ-সীমানার চেয়ে মানুষ বড়

পুলক ঘটক প্রকাশিত: সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ১১:৫১ এএম
সীমান্তে পুশইন সংকট

সীমান্তের ঘাসে বসে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অপেক্ষা—মায়ের কোলজুড়ে শিশুর নীরব আর্তনাদ। ছবি : আজকের কথা

সংবাদের মূল সারসংক্ষেপ

  • সীমান্তের কাঁটাতারে আটকে থাকা মানবতার গল্প — পুলক ঘটক দেড় বছরের একটি শিশু।
  • কুষ্টিয়ার প্রাগপুর সীমান্তে মায়ের কোলে আধশোয়া হয়ে আছে।
  • মাথার ওপরে তপ্ত রোদ, পায়ের নিচে ধুলোমাখা মাটি, সামনে কাঁটাতারের বেড়া, পেছনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

সীমান্তের কাঁটাতারে আটকে থাকা মানবতার গল্প

— পুলক ঘটক

দেড় বছরের একটি শিশু। কুষ্টিয়ার প্রাগপুর সীমান্তে মায়ের কোলে আধশোয়া হয়ে আছে। মাথার ওপরে তপ্ত রোদ, পায়ের নিচে ধুলোমাখা মাটি, সামনে কাঁটাতারের বেড়া, পেছনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। সে জানে না রাষ্ট্র কী, সীমান্ত কী, নাগরিকত্ব কী কিংবা কূটনীতি কী। সে শুধু জানে তার ক্ষুধা পেয়েছে, তৃষ্ণা পেয়েছে, সে ক্লান্ত।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা থেকে উঠে আসা এমন দৃশ্য শুধু একটি সীমান্ত বিরোধের গল্প নয়; এটি মানবতার এক নির্মম পরীক্ষার গল্প।

কুষ্টিয়া, লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, নওগাঁ, যশোর, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা কিংবা সিলেট—সীমান্তের একের পর এক এলাকায় দেখা গেছে অসহায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের। কেউ কাঁটাতারের এপারে, কেউ ওপারে, আবার কেউ নো-ম্যানস-ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন—কোন দেশ তাদের নিজের বলে স্বীকার করবে সেই আশায়।

কেউ দাবি করছেন তারা বাংলাদেশের নাগরিক। কেউ বহু বছর আগে কাজের সন্ধানে ভারতে গিয়েছিলেন। কারও নাগরিকত্ব নিয়ে দুই দেশের প্রশাসনের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। কিন্তু একটি বিষয়ে কোনো মতবিরোধ থাকার কথা নয়—

তারা সবাই মানুষ।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে সাম্প্রতিক বিতর্কে সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হচ্ছে এই মানবিক সত্যটিই।

চারদিকে আমরা শুনছি ‘পুশ-ইন’, ‘পুশ-ব্যাক’, ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’, ‘জাতীয় নিরাপত্তা’, ‘সীমান্ত সুরক্ষা’, ‘কূটনৈতিক প্রতিবাদ’ কিংবা ‘রাজনৈতিক অবস্থান’—কিন্তু মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর আর্তনাদ যেন ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির তথ্যমতে, চলতি বছরের জুন মাসের শুরুতেই সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে একাধিক পুশ-ইনের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সময়ে শত শত মানুষকে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সংখ্যার হিসেবে কিছু অমিল থাকতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই—সমস্যাটি বাস্তব এবং ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে।

প্রশ্ন হলো, এই মানুষগুলো কারা?

তারা কি সত্যিই বাংলাদেশের নাগরিক?

নাকি তাদের মধ্যে এমন মানুষও আছেন, যাদের পরিচয় নিয়ে দুই দেশের প্রশাসনের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে?

জামালপুর সীমান্তে ষষ্টি চন্দ্র বর্মণের ঘটনাটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে নানা তথ্য ছড়িয়ে পড়েছিল। কেউ বলেছিলেন তিনি ভারতের নাগরিক, কেউ দাবি করেছিলেন তিনি বাংলাদেশি। পরে প্রশাসনিক যাচাই-বাছাইয়ে জানা যায়, তিনি বাংলাদেশের রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার বাসিন্দা।

এই ঘটনাই দেখিয়ে দেয়, নাগরিকত্ব অনুমানের বিষয় নয়।

ভাষা, পোশাক কিংবা চেহারা দেখে কোনো মানুষের জাতীয়তা নির্ধারণ করা যায় না। প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য নথি, প্রশাসনিক তদন্ত এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সমন্বয়।

সেখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠে আসে।

যদি এসব মানুষ সত্যিই বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে থাকেন, তাহলে তাদের কেন আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে?

আর যদি তারা বাংলাদেশের নাগরিক না হন, তাহলে কী ভিত্তিতে তাদের বাংলাদেশ সীমান্তে এনে ফেলে রাখা হচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সীমান্তে নয়, দুই দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেও খুঁজতে হবে।

ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘অবৈধ অভিবাসন’ বহুদিনের একটি আলোচিত ইস্যু। বিশেষ করে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে এটি নির্বাচনী রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বছরের পর বছর ধরে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ প্রশ্নটি রাজনৈতিক বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।

ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি নিরাপত্তা ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন।

বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন।

কিন্তু সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের কাছে এটি বেঁচে থাকার প্রশ্ন।

এটাই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

একজন মা যখন শিশুকে বুকে নিয়ে দিনের পর দিন সীমান্তে অপেক্ষা করেন, তখন তার কাছে কূটনীতি গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ একটি নিরাপদ আশ্রয়। একজন বৃদ্ধ যখন জানেন না তিনি কোন দেশে ফিরবেন, তখন তার কাছে জাতীয় রাজনীতির চেয়ে বেশি জরুরি একবেলা খাবার এবং নিরাপত্তা।

সমস্যার আরেকটি দিকও আমাদের স্বীকার করতে হবে।

বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ বছরের পর বছর ধরে জীবিকার সন্ধানে ভারতে গেছেন। কেউ শ্রমিক হিসেবে, কেউ নির্মাণকর্মী, কেউ গৃহকর্মী হিসেবে। এটি কোনো গোপন সত্য নয়।

তবে এটিও সত্য যে উন্নত জীবন ও কর্মসংস্থানের আশায় সীমান্ত অতিক্রম করা শুধু বাংলাদেশিদের বৈশিষ্ট্য নয়।

মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকা থেকে ইউরোপ, দক্ষিণ এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্য—বিশ্বের সর্বত্র মানুষ জীবিকার তাগিদে সীমান্ত পাড়ি দেয়।

এটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্যের বাস্তব চিত্র।

কাজ যেখানে আছে, মানুষ সেখানে যাবে। সুযোগ যেখানে আছে, মানুষ সেখানে পৌঁছাতে চাইবে।

তাই অভিবাসনের প্রশ্নকে শুধু আইন-শৃঙ্খলা বা নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সমাধান আসবে না।

আবার রাষ্ট্রের সীমান্ত রক্ষার অধিকারও অস্বীকার করা যায় না।

তাই সমাধান হতে হবে যৌথ, ন্যায়সঙ্গত এবং মানবিক।

ভারত যদি মনে করে কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক, তাহলে তার পরিচয় যাচাইয়ের সুযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশ যদি যাচাই করে নাগরিকত্ব নিশ্চিত করে, তাহলে তাকে গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বের বহু দেশ এভাবেই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।

প্রয়োজন কার্যকর দ্বিপক্ষীয় কাঠামো, দ্রুত তথ্য যাচাই ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

দুঃখজনকভাবে পুরো আলোচনায় আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—অতি-জাতীয়তাবাদ।

একপক্ষ সব দায় ভারতের ওপর চাপাচ্ছে।

অন্যপক্ষ সীমান্ত পার হওয়া প্রতিটি মানুষকে অপরাধী হিসেবে চিত্রিত করছে।

দুই অবস্থানই মানবিক ও বাস্তবসম্মত নয়।

ভারতকে গালমন্দ করলে সীমান্তে আটকে থাকা শিশুটির ক্ষুধা মিটবে না।

আবার জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে একজন বৃদ্ধকে দিনের পর দিন নো-ম্যানস-ল্যান্ডে ফেলে রাখাও কোনো সভ্য রাষ্ট্রের আচরণ হতে পারে না।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু সীমান্ত পাহারা দেওয়া নয়; মানুষের মর্যাদা রক্ষা করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

আজ সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখে যে আতঙ্ক, তা শুধু তাদের ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়; এটি আমাদের সময়েরও একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক নয়। ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি, নদী, অর্থনীতি এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিতে দুই দেশ গভীরভাবে সংযুক্ত।

সেই সম্পর্কের মাঝখানে কোনো শিশুর রাত কাটানো উচিত নয় কাঁটাতারের বেড়ার পাশে।

আজ প্রয়োজন উত্তেজনা নয়, সমাধান।

প্রয়োজন নতুন করে একটি কার্যকর প্রত্যাবাসন চুক্তি।

প্রয়োজন দ্রুত নাগরিকত্ব যাচাইয়ের আধুনিক ব্যবস্থা।

প্রয়োজন সীমান্তে আটকে পড়া মানুষদের জন্য মানবিক সহায়তা।

প্রয়োজন রাজনৈতিক স্লোগানের পরিবর্তে বাস্তব পদক্ষেপ।

কারণ কুষ্টিয়ার সেই শিশুটি, জামালপুরের সেই বৃদ্ধ কিংবা পঞ্চগড়ের সেই পরিবার—তারা কেউ ভূরাজনীতির খেলোয়াড় নয়। তারা শুধু মানুষ।

আর ইতিহাস শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে তার সীমান্তের কড়াকড়ি দিয়ে নয়, মানুষের প্রতি আচরণ দিয়েই বিচার করে।

সেই বিচারে আজ বাংলাদেশ ও ভারতের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন একটাই—

তারা কি সীমান্তকে বড় করবে, নাকি মানুষকে?

কারণ সত্যটি খুবই সহজ—

ভূ-সীমানার চেয়ে মানুষ বড়।

লেখক: সাংবাদিক, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ হিন্দু আইন সংস্কার পরিষদ। ghatack@gmail.com

সর্বশেষ সংবাদের জন্য যুক্ত থাকুন:
সম্পাদকীয় নোট

প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী

সম্পাদক- দৈনিক আজকের কথা
0 0 votes
রেটিং দিন।
Subscribe
Notify of
guest
0 মন্তব্যসমূহ
Oldest
Newest Most Voted
এলাকার খবর

অপ্রতিম হত্যার রেশ কাটেনি, কুমিল্লায় আবারো কলেজছাত্রী অপহরণ কুমিল্লায়

আজকের কথা ডেস্ক : প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫২ এএম
অপ্রতিম হত্যার রেশ কাটেনি, কুমিল্লায় আবারো কলেজছাত্রী অপহরণ কুমিল্লায়

“অটোরিকশা থামিয়ে তুলে নেওয়ার অভিযোগ, ৪ ঘণ্টা পর উদ্ধার”

কুমিল্লা নগরীতে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার পথে আনিসা তাছনিম তনয়া (১৮) নামে এক কলেজছাত্রীকে অটোরিকশা থেকে নামিয়ে একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার প্রায় চার ঘণ্টা পর নগরীর আলেখারচর বিশ্বরোড এলাকা থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে তার পরিবার।

এ ঘটনায় অনন্য চৌধুরী (২১) নামে এক তরুণসহ অজ্ঞাত আরও ২ থেকে ৩ জনের বিরুদ্ধে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তনয়ার বাবা মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) রাতেই তিনি এ অভিযোগ করেন।

অভিযোগপত্র সূত্রে জানা যায়, তনয়া কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। অভিযুক্ত অনন্য তাদের প্রতিবেশী। পরিবারের অভিযোগ, গত ৩ থেকে ৪ দিন ধরে কলেজ ও প্রাইভেটে যাতায়াতের পথে এবং বাসার সামনে অনন্য তনয়াকে বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত ও হয়রানি করে আসছিলেন। বিষয়টি পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযুক্তের মাকে জানানো হলেও কোনো সমাধান হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, রোববার বিকেল পৌনে ৬টার দিকে তনয়ার মা তাকে অটোরিকশায় তুলে সরকারি মহিলা কলেজের সামনে প্রাইভেট পড়তে পাঠান। পথে পুলিশ লাইন মোড় এলাকায় অনন্য চৌধুরীসহ অজ্ঞাত ২ থেকে ৩ জন অটোরিকশাটির গতিরোধ করেন। পরে তারা তনয়াকে টেনে-হিঁচড়ে অটোরিকশা থেকে নামিয়ে একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে যান বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

নির্ধারিত সময়ে তনয়া বাসায় না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তবে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর স্বজনরা বিভিন্ন স্থানে তাকে খুঁজতে শুরু করেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, রাত আনুমানিক ১০টার দিকে আলেখারচর বিশ্বরোডের ওষুধ মার্কেট এলাকার একটি দোকানের সামনে তনয়াকে কান্নারত অবস্থায় দেখতে পান স্থানীয় এক দোকানদার। পরে ওই দোকানদার নিজের মোবাইল ফোন থেকে তনয়ার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। খবর পেয়ে স্বজনরা অটোরিকশাযোগে সেখানে গিয়ে তাকে বাসায় নিয়ে আসেন।

পরিবারের দাবি, উদ্ধারের পর তনয়া তাদের জানান, তাকে একটি গাড়িতে করে আলেখারচর এলাকার একটি বাড়ির একটি কক্ষে নিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল। এ সময় তার সঙ্গে থাকা একটি বাটন মোবাইল ফোন এবং কলেজ ব্যাগে থাকা বই-খাতা নিয়ে নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

পরিবারের আরও দাবি, ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তনয়ার মুখ বেঁধে তাকে আলেখারচর বিশ্বরোড এলাকায় ফেলে যাওয়া হয়।

এদিকে তনয়াকে উদ্ধারের পর রোববার রাতে হালিমা আক্তার তার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি লেখেন, “আলহামদুলিল্লাহ তনয়াকে পাওয়া গেছে। ও আমার আন্টির মেয়ে। ওর নামে উল্টাপাল্টা বলবেন না, ও বিবাহিত। আর ওরে কিডন্যাপ করা হয়েছিল।”

দৈনিক আজকের কথা
আলহামদুলিল্লাহ, তনয়াকে পাওয়া গেছে। সে আমার আন্টির মেয়ে। তার নামে উল্টাপাল্টা কিছু বলবেন না। সে বিবাহিত। তাকে কিডন্যাপ করা হয়েছিল। বিস্তারিত আগামীকাল বলা যাবে। পুরো পরিবার এখন থানায় রয়েছে। তনয়াকে দ্রুত উদ্ধারের জন্য পুলিশ প্রশাসনকে ধন্যবাদ।
— হালিমা আক্তার
তনয়ার স্বজন

পোস্টে হালিমা আক্তার আরও জানান, এ বিষয়ে বিস্তারিত পরদিন বলা যাবে এবং পুরো পরিবার থানায় রয়েছে। দ্রুত তনয়াকে উদ্ধারের জন্য পুলিশ প্রশাসনকে ধন্যবাদও জানান তিনি।

এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় অভিযোগ করেছেন তনয়ার বাবা মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন।

সোমবার সকাল ৮টার দিকে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, “এ বিষয়ে তদন্ত চলছে।”

তবে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।

দ্বিতীয় স্ত্রীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা: জামায়াতের এমপি গাজী নজরুল ও প্রথম স্ত্রী গ্রেপ্তার

খাদিজা বেগম, বিশেষ প্রতিবেদক : প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:৪৯ এএম
দ্বিতীয় স্ত্রীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা: জামায়াতের এমপি গাজী নজরুল ও প্রথম স্ত্রী গ্রেপ্তার

ন্যাম ভবনে দ্বিতীয় স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধারের পর জিজ্ঞাসাবাদ, পরে মামলায় গ্রেপ্তার

আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ। রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় দায়ের হওয়া মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ১টার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. ইবনে মিজান।

তিনি জানান, শেরেবাংলা নগর থানায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমকে আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

দৈনিক আজকের কথা
মরদেহ উদ্ধারের পর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
— মো. ইবনে মিজান
উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি), তেজগাঁও বিভাগ, ডিএমপি

এর আগে রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানাধীন ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে এমপি গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়ম খাতুনের (১৯) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশ জানায়, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। পরে সিআইডির ফরেনসিক টিমকে ঘটনাস্থলে ডাকা হয়। সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

এ ঘটনায় রোববার রাতে এমপি গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ। পরে আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর কারণ কী এবং এ ঘটনায় কারও দায় রয়েছে কি না—তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

অপ্রতিম হত্যা: দুই কিশোর যাচ্ছে সংশোধনাগারে, কারাগারে দুই আসামি

খাদিজা বেগম, বিশেষ প্রতিবেদক : প্রকাশিত: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৫৯ এএম
অপ্রতিম হত্যা: দুই কিশোর যাচ্ছে সংশোধনাগারে, কারাগারে দুই আসামি

চার আসামির তিনজনের স্বীকারোক্তি, মোবাইল ছিনিয়ে নিতেই হত্যার দাবি পুলিশের

কুমিল্লায় স্কুলছাত্র ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার চার আসামির মধ্যে দুই কিশোরকে গাজীপুরের টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হচ্ছে। অপর দুই আসামি তুহিন (১৯) ও সিয়াম (১৯) কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকবে।

রোববার রাতে অপ্রতিম হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সদর দক্ষিণ মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. সাইফুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, চার আসামিকে কুমিল্লা কারাগার কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আদালত মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫) ও কামরুল হাসানকে (১৬) সংশোধনাগারে পাঠানোর অনুমতি দিয়েছেন। তাদের সোমবার গাজীপুরের টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হবে।

অপর দুই আসামি তুহিন (১৯) ও সিয়াম (১৯) কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকবে। তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, সিয়াম এ মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে রয়েছে।

রোববার রাত ১০টার দিকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. শাহ আলম খান জানান, একটি হত্যা মামলায় পুলিশ চার আসামিকে কারাগারে হস্তান্তর করেছে। তাদের মধ্যে দুই কিশোরকে সোমবার গাজীপুরের টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হবে।

দৈনিক আজকের কথা
মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিতেই অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়েছে।
— মো. আনিসুজ্জামান
পুলিশ সুপার, কুমিল্লা।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের নিখোঁজ ছেলে ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের (১৩) মরদেহ শনিবার দুপুরে কুবি ক্যাম্পাসের পাশের লালমাই সানন্দা পাহাড় এলাকার জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয়। অপ্রতিম স্থানীয় বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

পরিবারের সদস্যরা জানান, শুক্রবার বিকেল ৩টার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে অপ্রতিম বাড়ি থেকে বের হয়। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও তার সন্ধান না পেয়ে বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, “শুক্রবার জুমার নামাজের পর অপ্রতিম আমাদের সঙ্গে দুপুরের খাবার খায়। পরে বন্ধুদের সঙ্গে আইফোন দিয়ে ছবি তুলতে বাইরে যেতে চায়। কিন্তু আর ফিরে আসেনি।”

রোববার দুপুরে কুমিল্লা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান সংবাদ সম্মেলনে জানান, মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়েছে।

এদিকে রোববার রাতে সিয়াম ছাড়া অপর তিন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আদালত পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান।

×
ENG