রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩

‘সাংবাদিকতা আমার কাছে পেশা নয়, নেশা’— অর্ধশতকের পথচলায় দেবীদ্বারের প্রবীণ সাংবাদিক আতিকুর রহমান বাশার

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী : প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ৩:০০ এএম
সাংবাদিক এবিএম আতিকুর রহমান বাশার।

সাংবাদিক এবিএম আতিকুর রহমান বাশার। ছবির গ্রাফিতি : দৈনিক আজকের কথা

সংবাদের মূল সারসংক্ষেপ

  • মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ৫০ বছরের নিরলস সাংবাদিকতা; অপসাংবাদিকতা নিয়ে উদ্বেগ, ইতিহাসচর্চায় কাটাতে চান জীবনের বাকিটা সময় সাংবাদিকতা আমার কাছে কোনো পেশা নয়; এটি একটি আদর্শ, একটি দায়বদ্ধতা।
  • কাকতালীয়ভাবে এই পেশায় এসেছিলাম, কিন্তু আর বের হতে পারিনি।
  • অর্ধশতকের সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে কথাগুলো বলছিলেন কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান সভাপতি, প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম আতিকুর রহমান বাশার।

মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ৫০ বছরের নিরলস সাংবাদিকতা; অপসাংবাদিকতা নিয়ে উদ্বেগ, ইতিহাসচর্চায় কাটাতে চান জীবনের বাকিটা সময়

সাংবাদিকতা আমার কাছে কোনো পেশা নয়; এটি একটি আদর্শ, একটি দায়বদ্ধতা। কাকতালীয়ভাবে এই পেশায় এসেছিলাম, কিন্তু আর বের হতে পারিনি।

অর্ধশতকের সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে কথাগুলো বলছিলেন কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান সভাপতি, প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম আতিকুর রহমান বাশার

দেবীদ্বার পৌর এলাকার ভূষণা গ্রামের সন্তান এবিএম আতিকুর রহমান বাশারের জন্ম ১৯৬৩ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লা শহরের মনোহরপুর মুন্সেফবাড়িতে। মাত্র দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় ১৯৭৬ সালে সম্পূর্ণ কাকতালীয়ভাবে তাঁর সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হয়।

সে সময় তৎকালীন ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের ঘনিষ্ঠজন, লেখক ও কলামিস্ট কাজল দত্ত তাঁকে কুমিল্লার দীর্ঘদিনের সমস্যা ‘কুমিল্লার দুঃখ গোমতী’ নিয়ে প্রতিবেদন লিখতে উৎসাহ দেন। সাংবাদিকতায় কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় তিনি প্রথমে বিষয়টি রচনার আকারে লিখলেও পরে কাজল দত্ত ও কুমিল্লা বঙ্গ বিদ্যালয়ের (কুমিল্লা হাই স্কুল) শিক্ষক আব্দুল খালেক মোল্লার সম্পাদনায় সেটি সংবাদের রূপ পায় এবং ‘নতুন বাংলা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর প্রতিবেদনটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

মফস্বল সাংবাদিকতার সীমিত পরিসরেও তিনি অর্জন করেছেন একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় সম্মাননা। কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের (বিএমএসএফ) জাতীয় সম্মেলনে তিনি ‘যুগরত্ন’ সম্মাননা লাভ করেন।
মফস্বল সাংবাদিকতার সীমিত পরিসরেও তিনি অর্জন করেছেন একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় সম্মাননা। কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের (বিএমএসএফ) জাতীয় সম্মেলনে তিনি ‘যুগরত্ন’ সম্মাননা লাভ করেন। ছবি : আজকের কথা

এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদে তৎকালীন সংসদ সদস্য ও ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ ‘কুমিল্লার দুঃখ গোমতী’ প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। পরে গোমতী নদীর বেড়িবাঁধ নির্মাণে সরকারি উদ্যোগ ও বরাদ্দ আসে। ১৯৮৬ সালে তৎকালীন উপমন্ত্রী এএফএম ফখরুল ইসলাম মুন্সী প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে সাবেক সচিব এবিএম গোলাম মোস্তফার দায়িত্বকালে গোমতী বেড়িবাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন হয়।

তবে এই ঐতিহাসিক ঘটনার কৃতিত্ব নিজের নয় বলে উল্লেখ করেন আতিকুর রহমান বাশার। তাঁর ভাষায়, “আমি শুধু লেখাটি লিখেছিলাম। প্রকৃত কৃতিত্ব কাজল দত্ত ও খালেক মাস্টারের, যাঁরা আমার লেখাকে সংবাদে রূপ দিয়েছিলেন।”

মানুষের অধিকারের পক্ষে অর্ধশতকের লড়াই

দীর্ঘ ৫০ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে সাধারণ মানুষের অধিকার, অসহায় মানুষের দুর্ভোগ এবং সমাজ-রাষ্ট্রের অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরাকেই নিজের মূল দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন তিনি।

FB IMG 1785874959019
সাংবাদিকতার পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডেও একনিষ্ট সাংবাদিক এবিএম আতিকুর রহমান বাশার। ছবি : আজকের কথা

এই দীর্ঘ সময়ে তিনি একতা, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আজকের কাগজদৈনিক ভোরের কাগজে কাজ করেছেন। পরে টানা ১২ বছর দৈনিক প্রথম আলো-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি দৈনিক কালের কণ্ঠএর দেবীদ্বার উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

দেবীদ্বার প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা

১৯৮০ সালে তিনি দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর হাত ধরেই দেবীদ্বারে বহু সাংবাদিকের পথচলা শুরু হয়েছে। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, বর্তমানে জীবিত সাংবাদিকদের মধ্যে তিনিই দেবীদ্বারের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।

অপসাংবাদিকতা নিয়ে ক্ষোভ

বর্তমান সাংবাদিকতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “সাংবাদিকতা জাতির চতুর্থ স্তম্ভ এবং সাংবাদিক জাতির বিবেক। ৯০-এর দশকের পর গণমাধ্যমের বিস্তার ঘটলেও ২০০১ সালের পর অপসাংবাদিকতা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। এখন প্রকৃত সাংবাদিকের চেয়ে অপসাংবাদিকের সংখ্যাই বেশি।”

তিনি অভিযোগ করেন, অনেকেই শুধু পরিচয়পত্র, ডায়েরি ও কলম নিয়ে বিভিন্ন অফিসে দালালি করেন, অথচ সংবাদ লেখার ন্যূনতম দক্ষতাও তাদের নেই। এমনকি একটি সাধারণ শোকসংবাদও অনেকের পক্ষে লেখা সম্ভব হয় না। এসব কর্মকাণ্ডে প্রকৃত সাংবাদিকদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অপসাংবাদিকতা রোধে প্রাথমিক স্তর থেকেই সাংবাদিকতা বিষয়ে মৌলিক শিক্ষা চালুর পাশাপাশি গণমাধ্যম ও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।

FB IMG 1785875008446
নিজ পরিবারের সাথে প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম আতিকুর রহমান বাশার। ছবি : আজকের কথা

প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়াই সাংবাদিকতার পরিচয় নয়

প্রেসক্লাবের সদস্যপদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সাংবাদিক হতে প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় তিনি কোন গণমাধ্যমে কাজ করেন এবং তাঁর সংবাদ নিয়মিত প্রকাশিত হয় কি না।”

তিনি জানান, বর্তমানে দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবে ২৭ জন সদস্য রয়েছেন। এখানে দাতা, সহযোগী ও মূল—এই তিন ধরনের সদস্যপদ রয়েছে। মূল সদস্য হতে হলে অবশ্যই পেশাদার সাংবাদিক হতে হয়।

গবেষণা ও বই প্রকাশের পরিকল্পনা

ছাত্রজীবন থেকেই বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সাংবাদিকতায় সবসময় পেশাগত নিরপেক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন বলে জানান আতিকুর রহমান বাশার।

তিনি বলেন, অপসাংবাদিকতার কারণে বহুবার সাংবাদিকতা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবেছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সত্য অনুসন্ধানের দায়বদ্ধতা এবং পেশার প্রতি ভালোবাসা তাঁকে বারবার মাঠে ফিরিয়ে এনেছে।

জীবনের অবশিষ্ট সময় দেবীদ্বারের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণামূলক লেখালেখিতে ব্যয় করতে চান তিনি। ইতোমধ্যে বিভিন্ন পত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত লেখাগুলো একত্র করে বই আকারে প্রকাশের কাজও এগিয়ে নিচ্ছেন।

FB IMG 1785874744598
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সাথে মুক্তিযুদ্ধের গবেষক হিসেবে বিভিন্ন কাজের বর্ননা করছেন সাংবাদিক এবিএম আতিকুর রহমান বাশার। ছবি : আজকের কথা

সম্মাননা ও স্বীকৃতি

মফস্বল সাংবাদিকতার সীমিত পরিসরেও তিনি অর্জন করেছেন একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় সম্মাননা। কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের (বিএমএসএফ) জাতীয় সম্মেলনে তিনি যুগরত্ন’ সম্মাননা লাভ করেন। এছাড়া বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি, কুমিল্লার ‘আপনজন সম্মাননা’, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে সাংবাদিক কল্যাণ পরিষদ, কুমিল্লা প্রদত্ত নিরাপদ সাংবাদিকতা ও বিশেষ অবদানের সম্মাননাসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের স্বীকৃতিতে ভূষিত হয়েছেন।

সর্বশেষ সংবাদের জন্য যুক্ত থাকুন:
সম্পাদকীয় নোট

প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী

সম্পাদক- দৈনিক আজকের কথা
0 0 votes
রেটিং দিন।
Subscribe
Notify of
guest
0 মন্তব্যসমূহ
Oldest
Newest Most Voted
এলাকার খবর

কুমিল্লায় ৯ মাসে ১০৪ হত্যা, শিশু অপ্রতিমের মৃত্যুতে লালমাই পাহাড় ঘিরে তীব্র আলোচনা

আজকের কথা ডেস্ক : প্রকাশিত: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৫৪ এএম
কুমিল্লায় ৯ মাসে ১০৪ হত্যা, শিশু অপ্রতিমের মৃত্যুতে লালমাই পাহাড় ঘিরে তীব্র আলোচনা

কুমিল্লায় গত নয় মাসে ১০৪ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের নৃশংস মৃত্যু কুমিল্লাজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অপ্রতিমের মৃত্যু ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে চলছে আলোচনা। একই সঙ্গে লালমাই পাহাড় ও আশপাশের নির্জন এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।

রোববার সকালে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। সকাল ১০টা ১০ মিনিটে অনুষ্ঠিত জানাজায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, স্বজন, পরিচিতজনসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। জানাজা শেষে কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতিতে ঈদগাহ কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।

অপ্রতিম বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। শুক্রবার বিকেলে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় সে। এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়।

শনিবার দুপুরে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার দক্ষিণ মোড়ের দক্ষিণ পাশে সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক।

অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন অপ্রতিমের পরিবার, স্বজন ও স্থানীয়রা।

অপ্রতিমের মৃত্যুর পর আলোচনায় এসেছে লালমাই পাহাড়ের নিরাপত্তা। কুমিল্লা শহর, কোটবাড়ি ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন হওয়ায় লালমাই পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে মানুষের চলাচল থাকলেও পাহাড়ের অনেক স্থান এখনো নির্জন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব নির্জন এলাকা অপরাধীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করছে।

লালমাই পাহাড়ে অপরাধের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০১০ সালে পাহাড়ের হাতিমারা এলাকা থেকে মেহেদি হাসান নামে এক কিশোর অটোরিকশাচালকের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। এর আগে ২০০৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি লালমাই পাহাড়ের মোড় থেকে রিফাত হোসেন নামে আরেক শিশুর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

এ ছাড়া গত ২৯ আগস্ট কুমিল্লার কোটবাড়ির শান্তির মোড় এলাকায় দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে পাহাড়ের নির্জন স্থানে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা বিভিন্ন বসতিতেও ডাকাতি, ছিনতাই এবং মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষের অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পাহাড় ও আশপাশের এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। এসব অপরাধের সঙ্গে মাদকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, বিচ্ছিন্নভাবে অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি পাহাড়কেন্দ্রিক অপরাধচক্রের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, গত নয় মাসে জেলায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ১০৪ জন। জেলার সামগ্রিক হত্যাকাণ্ডের এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে লালমাই পাহাড় ও আশপাশের এলাকায় একের পর এক গুরুতর অপরাধের অভিযোগ স্থানীয়দের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয়দের প্রশ্ন, জনবসতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছাকাছি থাকা লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থা কতটা কার্যকর। পাহাড়ের বিভিন্ন প্রবেশপথে নজরদারি, নিয়মিত পুলিশ টহল এবং প্রয়োজনীয় স্থানে সিসিটিভি স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটনে মাঠে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। হত্যাকাণ্ডের ক্লু শনাক্ত করে প্রকৃত হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

একটি শিশুর আকস্মিক ও করুণ মৃত্যু এখন শুধু তার পরিবারকেই শোকাহত করেনি, লালমাই পাহাড়ের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে কুমিল্লাবাসীকে। অপ্রতিমের জানাজায় অংশ নেওয়া মানুষের চোখে ছিল শোক, ক্ষোভ ও দ্রুত বিচারের প্রত্যাশা।

স্থানীয়দের দাবি, অপ্রতিম হত্যার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে লালমাই পাহাড় ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা প্রতিরোধ করতে হবে।

অপ্রতিম আর ফিরবে না। কিন্তু তার মৃত্যু যেন কুমিল্লার পাহাড়ি এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্নগুলোর স্থায়ী সমাধানের কারণ হয়—এটাই এখন স্বজন, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা।

অপ্রতিমের আইফোন তুহিনের বাড়িতে, সামনে বাইক ছিনতাইয়ের অভিযোগ

আজকের কথা ডেস্ক : প্রকাশিত: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:১০ এএম
অপ্রতিমের আইফোন তুহিনের বাড়িতে, সামনে বাইক ছিনতাইয়ের অভিযোগ

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় আটক তুহিনের বাড়ি থেকে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধারের পর তার বিরুদ্ধে থাকা পুরোনো একটি অভিযোগও সামনে এসেছে। ২০২৫ সালে তুহিনের বিরুদ্ধে এক কিশোরের মোটরসাইকেল নিয়ে ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল বলে একটি লিখিত অভিযোগের কপি থেকে জানা গেছে।

ওই অভিযোগে বলা হয়, অভিযোগকারীর ছেলে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার একটি মোটরসাইকেল বিক্রয়কেন্দ্র থেকে ২ লাখ ৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি মোটরসাইকেল কেনেন। তুহিনের সঙ্গে তার পূর্বপরিচয় ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকায় তুহিন প্রায়ই মোটরসাইকেলটি নিয়ে চলাচল করতেন।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল রাত আনুমানিক ৯টার দিকে তুহিন মোটরসাইকেলটি নেওয়ার জন্য ফোন করেন। পরে অভিযোগকারীর ছেলে মোটরসাইকেলটি নিয়ে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার সালমানপুর এলাকার একটি স্থানে যান এবং তুহিনের কাছে সেটি দেন। এরপর তিনি কাছের একটি দোকানে বসে থাকেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, কিছুক্ষণ পর তুহিনের কাছে মোটরসাইকেলটি ফেরত চাইলে তিনি সেটি তার কাছে নেই বলে জানান। পরে মোটরসাইকেলটি উদ্ধারের চেষ্টা করা হলেও সেটি আর পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

এ ঘটনায় তুহিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য থানায় অভিযোগ করা হলেও মামলা না নিয়ে শুধু জিডি নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগকারীর বক্তব্য।

অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়, তুহিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি তার ওপর কোনো রাজনৈতিক দলের বড় নেতার প্রভাব রয়েছে—এমন কথাও পুলিশ পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল বলে অভিযোগকারীর দাবি। তবে এ দাবির স্বতন্ত্র সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অপ্রতিমের ঘটনায় ফের আলোচনায় তুহিন

পুরোনো ওই অভিযোগ সামনে আসার মধ্যেই অপ্রতিমের নিখোঁজ ও মৃত্যুর ঘটনায় তুহিনসহ তিনজনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনকে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাওয়ার পর তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আনাস ও ফাহিম নামের আরও দুজনকে আটক করা হয়েছে।

শনিবার অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর তদন্তের অংশ হিসেবে তুহিনের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে অপ্রতিমের মায়ের আইফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

কোটবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মফিজ উদ্দিন ভূইয়া জানান, উদ্ধার হওয়া ফোনের কললিস্ট, মেসেজ, লোকেশনসহ বিভিন্ন তথ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার আগে ও পরে কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, এসব তথ্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসহ আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে অপ্রতিমের সঙ্গে তুহিনকে দেখা যায়।

পুরোনো অভিযোগের সঙ্গে বর্তমান তদন্তের যোগসূত্র খতিয়ে দেখছে পুলিশ

অপ্রতিমের আইফোন তুহিনের বাড়ি থেকে উদ্ধারের ঘটনায় তদন্তে নতুন তথ্য পাওয়ার আশা করছে পুলিশ। একই সঙ্গে তুহিনের বিরুদ্ধে আগে থাকা মোটরসাইকেল নেওয়ার অভিযোগের বিষয়টিও তদন্তসংশ্লিষ্টদের নজরে আসতে পারে।

তবে ২০২৫ সালের মোটরসাইকেল সংক্রান্ত অভিযোগ এবং অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনার মধ্যে কোনো সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। পুরোনো অভিযোগে তুহিনের বিরুদ্ধে মোটরসাইকেল নিয়ে ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে; সেটি কোনো আদালতে প্রমাণিত অপরাধ—এমন তথ্যও পাওয়া যায়নি।

অপ্রতিমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং ঘটনায় কারা জড়িত, তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। তাই পুরোনো অভিযোগের পাশাপাশি বর্তমান ঘটনায় উদ্ধার হওয়া আইফোন, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং আটক ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করাই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অপ্রতিমের পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে পুরোনো অভিযোগে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

দেবীদ্বারে আলফি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের উদ্বোধন

এবিএম আতিকুর রহমান বাশার, বিশেষ প্রতিবেদক : প্রকাশিত: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:২৮ এএম
দেবীদ্বারে আলফি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের উদ্বোধন

চিকিৎসাসেবা ব্যবসা নয়, এটি মহৎ ও মানবিক সেবা: অধ্যাপক ডা. আছিফ মাহমুদ

কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার ইউছুফপুর ইউনিয়নের শিবপুর নিউমার্কেট এলাকায় আধুনিক ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে ‘আলফি ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ উদ্বোধন করা হয়েছে।

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।

উদ্যোক্তারা জানান, গ্রামীণ এলাকার মানুষের কাছে উন্নত চিকিৎসাসেবা ও রোগ নির্ণয়ের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠানটি চালু করা হয়েছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি, অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও দক্ষ টেকনিশিয়ানদের সমন্বয়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টারটি পরিচালিত হবে।

আলফি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ডা. মো. সফিউল আলম চৌধুরীর সভাপতিত্বে এবং ব্যাংক কর্মকর্তা মো. আল আমিনের সঞ্চালনায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. আছিফ মাহমুদ চৌধুরী।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি এবিএম আতিকুর রহমান বাশার, দেবীদ্বার ডা. জসীম উদ্দিন হাড়ভাঙা হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. মানসুরুল হক, ডা. মো. দ্বীন মোহাম্মদ, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ মো. নজরুল ইসলাম, কুমিল্লা এভারগ্রীন হসপিটালের পরিচালক ইউনুছ মাস্টার, ইউছুফপুর আইডিয়াল স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. আবু কাউছার, মো. মাজেদুল ইসলাম চৌধুরী, আলফি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালনা পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম মেম্বার, মাওলানা আলাউদ্দিন এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. শাহাদাত হোসেন দুলালসহ অন্যরা।

দৈনিক আজকের কথা
চিকিৎসাসেবা কোনো সাধারণ ব্যবসা নয়, এটি একটি মহৎ ও মানবিক সেবা।
— ডা. মো. আছিফ মাহমুদ চৌধুরী
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল হাসপাতাল

তিনি বলেন, গ্রামীণ এলাকার মানুষকে চিকিৎসা ও রোগ নির্ণয়ের জন্য ঢাকাসহ বড় শহরে ছুটতে হয়। নিজ এলাকায় আধুনিক রোগ নির্ণয়ের সুযোগ তৈরি হওয়া তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আলফি ডায়াগনস্টিক সেন্টার নির্ভুল রিপোর্ট ও স্বল্প খরচে সেবা নিশ্চিত করে স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জন করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ব্যবসায়িক মুনাফার ঊর্ধ্বে উঠে প্রত্যন্ত এলাকার অসহায় ও দরিদ্র রোগীদের সেবা দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অনুষ্ঠান শেষে মিলাদ ও বিশেষ দোয়া পরিচালনা করেন সৈয়দপুর কামিল মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মাওলানা মো. আব্দুল লতিফ।

×
ENG