তনু হত্যা মামলায় প্রথম গ্রেপ্তার, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ৩ দিনের রিমান্ডে

দীর্ঘ এক দশক পর কুমিল্লার বহুল আলোচিত সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় প্রথমবারের মতো এক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তারের পর আদালত তাকে তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন।
বুধবার বিকেলে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোমিনুল হক এ আদেশ দেন। এর মাধ্যমে বহুদিন ধরে আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডে নতুন করে তদন্তে গতি সঞ্চার হয়েছে।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সূত্র জানায়, ঢাকার কেরানীগঞ্জে নিজ বাসা থেকে মঙ্গলবার রাতে হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে কুমিল্লা সদর আদালতে হাজির করা হলে তদন্তের স্বার্থে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তারকৃতের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে, যা শিগগিরই ক্রসম্যাচ করা হবে। তিনি বলেন, তনুর মায়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এ ঘটনায় সন্তোষ প্রকাশ করে তনুর মা আনোয়ারা বেগম বলেন, “দীর্ঘদিন পর একজন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে। আমি চাই, এই হত্যার সঠিক বিচার হোক এবং দোষীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।”
তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বলেন, “দেশবাসী জানতে চায়, এই হত্যার বিচার হবে কি না। এখন বলতে পারছি, অন্তত একজন আসামি ধরা পড়েছে। আমরা ন্যায়বিচারের আশায় আছি।”
মামলাটি দীর্ঘদিন ধরেই তদন্তের জটিলতায় আটকে ছিল। গত ১০ বছরে অন্তত ৮০টির বেশি শুনানির তারিখ পার হলেও প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এ সময়ের মধ্যে চারটি সংস্থার সাতজন তদন্ত কর্মকর্তা মামলাটির দায়িত্ব পালন করেন।
সম্প্রতি আদালতের অনুমতি নিয়ে তিনজনের ডিএনএ নমুনা ক্রসম্যাচ করার উদ্যোগ নেয় তদন্তকারী সংস্থা। এর পরিপ্রেক্ষিতেই হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তারের পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন তনু। পরে সেনানিবাসের একটি জঙ্গলে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তার বাবা অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
শুরুতে থানা পুলিশ, পরে ডিবি ও সিআইডি দীর্ঘ সময় তদন্ত করেও রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি। সর্বশেষ ২০২০ সালে মামলাটি পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং নতুন গ্রেপ্তারের মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়ায় অগ্রগতির আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।
কুমিল্লায় মববাজদের দৌরাত্ম্য! শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সাইনবোর্ড ভাঙল এনসিপি নেতারা

ঐতিহ্য সংরক্ষণের নামে ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ, বৈধ ওয়ারিশ আরমা দত্তের সাইনবোর্ড গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ-নিন্দা
কুমিল্লায় এবার ভাষাসৈনিক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পৈতৃক বাড়ির সাইনবোর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মহানগর শাখার নেতাদের বিরুদ্ধে। ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ ও স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবির আড়ালে শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাতে নগরীর ধর্মসাগরের পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত বাড়িটিতে এ ঘটনা ঘটে। বাড়িটির বৈধ ওয়ারিশ আরমা দত্তের মালিকানা-সংক্রান্ত সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলার ঘটনায় ক্ষোভ ও নিন্দা জানিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
শনিবার সাইনবোর্ড ভাঙচুরের একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের নাতনি ও সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আরমা দত্ত।
স্থানীয় সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে বাড়িটি সংস্কার, সংরক্ষণ এবং সেখানে স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার দাবি উঠলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এর মধ্যে আরমা দত্ত উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তির মালিকানা উল্লেখ করে বাড়িতে একটি সাইনবোর্ড স্থাপন করেন। তিনি শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের একমাত্র ছেলে সঞ্জিব দত্তের মেয়ে।
সাইনবোর্ডে লেখা ছিল, ‘এই জমির প্রকৃত মালিক ওয়ারিশ সূত্রে আরমা দত্ত। পিতা মৃত সঞ্জিব দত্ত। দাগ নং ১৮০০, মৌজা ছোটরা, কুমিল্লা।’
ঐতিহ্য রক্ষার নামে সাইনবোর্ড ভাঙচুর
এনসিপির কুমিল্লা মহানগর শাখার নেতাদের দাবি, বাড়িটি ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঐতিহ্য। তাদের অভিযোগ, বাড়িটি বিক্রির প্রচেষ্টা হিসেবে সেখানে সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে এবং পুরোনো স্থাপনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাড়ি বিক্রি ঠেকাতেই সাইনবোর্ডটি ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে তারা জানান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার সন্ধ্যার পর এনসিপির নেতারা বাড়িটিতে গিয়ে প্রথমে স্থাপনাটি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বক্তব্য দেন। পরে তাঁরা সাইনবোর্ডটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কুমিল্লা মহানগর শাখার সদস্যসচিব মাসুমুল বারী কাওসারের স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি কোনো সাধারণ স্থাপনা নয়। এটি ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ঐতিহ্য। তাই বাড়িটি ব্যক্তিগত কেনাবেচার বিষয় না করে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সংরক্ষণ করতে হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন জানাবেন তাঁরা।
শনিবার মাসুমুল বারী কাওসার বলেন, ‘একটি ঐতিহাসিক বাড়ি রক্ষা করতে আমরা সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলেছি। এখানে অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। এ কাজে আশা করি সরকার ও ওয়ারিশ হিসেবে আরমা দত্তকে পাশে পাব। এ জায়গা বিক্রি কিংবা বহুতল ভবন করতে চাইলে জনগণ নিয়ে প্রতিহত করা হবে।’
‘আমার সম্পত্তি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমার’
এদিকে আরমা দত্ত বলেন, ‘এটি আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি। আমি এর বৈধ ওয়ারিশ। এটা কুমিল্লাবাসীও জানেন। তাই এ বাড়ির জায়গা আমি কী করব, রাখব নাকি বিক্রি করব—সেটি একান্তই আমার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু রাতে এভাবে একটি বাড়ির বৈধ সাইনবোর্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। আমি এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করব।’
ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের দাবি থাকলেও ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তিতে এভাবে হস্তক্ষেপের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, কোনো সম্পত্তি ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করলেই কি তার মালিক বা বৈধ ওয়ারিশের অধিকার উপেক্ষা করে কেউ নিজ উদ্যোগে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারেন? সংরক্ষণের দাবি থাকলে তা বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণের কথা বলছেন তাঁরা।
কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ির সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলার বিষয়ে তাঁরা কোনো অভিযোগ পাননি। অভিযোগ পেলে এ বিষয়ে তদন্ত করা হবে।
ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত
উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।
১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে কুমিল্লার নিজ বাসভবন থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাঁকে ও তাঁর ছেলে দিলীপ কুমার দত্তকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাঁদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ সালে তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। দিলীপ কুমার দত্তের মেয়ে আরমা দত্ত একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন।
খাল পরিষ্কারে নেমে কাদায় আটকে গেলেন ইউএনও, তবু থামেননি কাজ

সরকারি বরাদ্দের অপেক্ষা না করে স্বেচ্ছাশ্রমে দুই কিলোমিটার খাল পরিষ্কারের উদ্যোগ, ইউএনওর সঙ্গে শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী
বরিশালের উজিরপুরে দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে থাকা একটি খাল পরিষ্কারের অভিযানে নিজেই নেমে পড়েন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা। পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে গিয়ে একপর্যায়ে কাদায় আটকে যান তিনি। পরে স্বেচ্ছাসেবীরা তাঁকে টেনে উদ্ধার করেন। তবে এতে দমে না গিয়ে আবারও খাল পরিষ্কারের কাজে যোগ দেন তিনি।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) উজিরপুর উপজেলা পরিষদসংলগ্ন প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ খালে এ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হয়। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিডি ক্লিন বরিশালের সহযোগিতায় আয়োজিত কর্মসূচিতে ইউএনওর পাশাপাশি শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী, স্থানীয় তরুণ-তরুণী ও যুবসমাজের সদস্যরা অংশ নেন।
সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত টানা পাঁচ ঘণ্টা চলে পরিচ্ছন্নতা অভিযান। এ সময় খাল থেকে কচুরিপানা, প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিনসহ দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য অপসারণ করা হয়। এতে খালের পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একসময় খালটি ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছিল। কচুরিপানা ও প্লাস্টিক বর্জ্যে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আশপাশের এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে খালটির এমন দুরবস্থা চলছিল।
অভিযানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ইউএনও মো. আলী সুজার সরাসরি অংশগ্রহণ। বিডি ক্লিনের টি-শার্ট পরে স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে তিনিও খালের ময়লা পরিষ্কারে নেমে পড়েন। একপর্যায়ে কাদায় আটকে গেলে স্বেচ্ছাসেবীরা তাঁকে টেনে তুলে সহযোগিতা করেন। এরপর আবারও কাজে যোগ দেন তিনি।
ইউএনওর খাল পরিষ্কারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে একজন সরকারি কর্মকর্তার সরাসরি অংশগ্রহণকে দায়িত্ববোধ, জনসম্পৃক্ততা ও নেতৃত্বের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন অনেকে।
বিডি ক্লিনের বিভাগীয় সমন্বয়ক জাহেদ ইরফান বলেন, উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজার আহ্বানে দীর্ঘদিনের অপরিচ্ছন্ন খালটি পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় স্থানীয় তরুণ-তরুণীসহ শতাধিক স্বেচ্ছাসেবীর অংশগ্রহণে কর্মসূচিটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। ইউএনও নিজে স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করায় সবাই আরও উৎসাহিত হয়েছেন।
ইউএনও মো. আলী সুজা বলেন, খালের পাশের বাসিন্দাদের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিনসহ বিভিন্ন বর্জ্যে পানিপ্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সরকারি বরাদ্দের অপেক্ষায় না থেকে সম্মিলিত স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে উদ্যোগী হলে সমাজের অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। এই পরিচ্ছন্নতা অভিযান তারই একটি উদাহরণ।
তিনি আরও বলেন, তরুণ-তরুণী ও যুবসমাজকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রাখা অত্যন্ত জরুরি। অবসর সময়ের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে অনেকেই নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে। পরিচ্ছন্নতা অভিযানসহ সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রমে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এতে তারা মাদকাসক্তি ও মোবাইল ফোনের অপব্যবহারসহ বিভিন্ন নেতিবাচক প্রবণতা থেকে দূরে থেকে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারবে।
৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২ সফটওয়্যার, সাধারণ মানুষের কতটা কাজে আসছে?

১০ বছর ধরে চলা বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পে ব্যয় ৮০ কোটি টাকা, অধিকাংশ প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত; প্রকল্পের কার্যকারিতা ও ব্যয় নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন
তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার সহজ ও সমৃদ্ধ করতে ১০ বছর ধরে কাজ করছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ। এ সময়ের মধ্যে ১২টি সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি উপকরণ তৈরি করতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। তবে বিপুল অর্থ ব্যয়ে তৈরি এসব প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের কতটা কাজে আসছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
২০১৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ‘গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির প্রাথমিক বরাদ্দ ছিল ১৫৮ কোটি টাকা। তিন দফা মেয়াদ বাড়িয়ে সর্বশেষ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পটির আওতায় মোট ১৬টি সফটওয়্যার, প্রযুক্তি উপকরণ ও সেবা তৈরির পরিকল্পনা ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে ১২টির কাজ শেষ হয়েছে। তবে সব সেবা এখনো সাধারণ মানুষের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত কিংবা সহজলভ্য হয়নি।
প্রকল্পের আওতায় তৈরি করা হয়েছে বাংলা ভাষাভিত্তিক বিভিন্ন প্রযুক্তি। এর মধ্যে রয়েছে ছবি বা নথি থেকে লেখা শনাক্ত ও রূপান্তরের ওসিআর, অডিও থেকে লেখা তৈরি, বানান যাচাই, ব্যাকরণ সংশোধন, ভাষা অনুবাদ, বাংলা ফন্ট ও কিবোর্ড, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য স্ক্রিন রিডার, ব্রেইল কনভার্টার এবং ইশারাভাষা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি। সরকারি সেবা সম্পর্কে তথ্য দিতে তৈরি করা হয়েছে ‘জিজ্ঞাসা’ নামের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট।
ব্যবহারকারীর সংখ্যা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
প্রকল্পের বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সেবাভেদে ব্যবহারকারীর সংখ্যা ও কার্যকারিতায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। সরকারি সেবা সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার জন্য তৈরি ‘জিজ্ঞাসা’ চ্যাটবটে পরীক্ষামূলকভাবে প্রতিদিন গড়ে ১১০টি অনুরোধ আসে। বাংলা ফন্ট রূপান্তরের সেবায় ৩৫ দিনে ফাইল রূপান্তর হয়েছে মাত্র ২৭৫টি। অন্যদিকে বাংলা বানান যাচাইয়ের সেবায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ লাখ অনুরোধ আসে। কাগজডটএআই প্ল্যাটফর্মের ওসিআর সেবায় দৈনিক অনুরোধের সংখ্যা প্রায় ৫০টি।
প্রযুক্তিগুলোর কার্যকারিতা যাচাইয়ে বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার করে দেখা গেছে, বাংলা বানান যাচাইয়ের সেবাটি তুলনামূলক ভালো ফল দিচ্ছে। তবে বড় আকারের অডিও ফাইল থেকে লেখা তৈরির ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ‘জিজ্ঞাসা’ সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেও জটিল প্রশ্নে কখনো কখনো বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বর্তমানে যে পরিমাণ গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ) সক্ষমতা রয়েছে, তা দিয়ে একসঙ্গে সীমিতসংখ্যক ব্যবহারকারীকে সেবা দেওয়া সম্ভব। তাঁদের দাবি, বিদ্যমান অবকাঠামোয় একসঙ্গে পাঁচ থেকে ১০ হাজার ব্যবহারকারী সেবা নিতে পারলেও চাহিদা বাড়লে অপেক্ষা করতে হয়। ফলে বৃহৎ পরিসরে সেবা চালু রাখতে অতিরিক্ত জিপিইউ ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো প্রয়োজন।
৮০ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব
প্রকল্প সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সফটওয়্যার উন্নয়ন, হোস্টিং ও তথ্য সংরক্ষণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬০ কোটি টাকা। বাকি অর্থ ব্যয় হয়েছে অফিস ব্যবস্থাপনা, সভা-সেমিনার, প্রচার-প্রচারণা ও পরিচালন কার্যক্রমে।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশ্ন, তৈরি করা প্রযুক্তিগুলোর কোনটিতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং প্রকৃত ব্যয়ের সঙ্গে কাজের মানের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রকল্পের আওতায় শুধু সফটওয়্যার তৈরি নয়, বাংলা ভাষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভাষাপ্রযুক্তির উন্নয়নে প্রয়োজনীয় তথ্যভান্ডার তৈরির কাজও করা হয়েছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় আট হাজার কপিরাইটমুক্ত বই ডিজিটাল করা হয়েছে। বাংলা কথাকে লেখায় রূপান্তরের জন্য ১০ হাজার ঘণ্টা এবং লেখা থেকে কণ্ঠ তৈরির জন্য এক হাজার ঘণ্টার অডিও উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪৪টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষার ১২ হাজার মিনিটের বেশি অডিও এবং ইশারাভাষার ৪২ হাজার ৮০০টি ভিডিও সংগ্রহ করা হয়েছে।
মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে সমালোচনা
প্রকল্পটির মেয়াদ ও ব্যয় নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আগের সরকারের সময় নেওয়া তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় কার্যক্রম বাদ দেওয়া এবং অনিয়মের অভিযোগ থাকলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানো হলেও এর ব্যয় কমানো হয়নি।
আইসিটি সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা জানিয়েছেন, প্রকল্পের আওতায় বেশ কিছু প্রযুক্তি তৈরি হলেও সব কটির কার্যকারিতা সমান নয়। প্রত্যাশা অনুযায়ী সাধারণ মানুষের কাছে সেবাগুলো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এসব প্রযুক্তিকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে এনে আরও ব্যবহারবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, আইসিটি খাতের চলমান প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে যেসব কার্যক্রম অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে, সেগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। ১০ থেকে ১২টি প্রকল্পের পরিধি পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে।
অন্যদিকে প্রকল্প পরিচালক মাহবুব করিম জানান, প্রকল্পের কাজ শেষ হলে প্রযুক্তি ও তথ্যভান্ডার বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী জিপিইউ কেনা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।
অতীতের প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আইসিটি খাতে ২১টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। আইসিটি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ছিল প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা।
২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট প্রকল্পগুলো পর্যালোচনায় ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রতিবেদনে বেশ কিছু প্রকল্পে উদ্দেশ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কার্যক্রম এবং আইসিটি বিভাগের আওতাবহির্ভূত কাজ অন্তর্ভুক্ত থাকার বিষয়টি উঠে আসে। অপ্রয়োজনীয় খাত বাদ দিলে প্রায় ৬ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আইসিটি খাতের প্রকল্পগুলোতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, অতীতের প্রকল্পগুলোর কর্মপদ্ধতি ও ফলাফল যথাযথভাবে যাচাই না করে শুধু মেয়াদ বাড়ানো হলে পুরোনো কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে ১০ বছর ধরে বিপুল অর্থ ব্যয়ে তৈরি বাংলা ভাষাভিত্তিক প্রযুক্তিগুলোর বাস্তব উপযোগিতা, সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এসব প্রযুক্তি সচল রাখা এবং জনগণের ব্যবহার উপযোগী করার দায়িত্ব কে নেবে, সেটিও এখন বড় বিবেচ্য বিষয়।
































