প্রেস কনফারেন্স ঘিরে বিতর্ক
মূলধারার সাংবাদিকদের বাদ দিয়ে প্রেস কনফারেন্স, কুড়িগ্রাম সিভিল সার্জনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন

কুড়িগ্রাম সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার চৌধুরী। জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন উপলক্ষে আয়োজিত প্রেস কনফারেন্সে মূলধারার সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ না জানানো নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে সিভিল সার্জন কার্যালয়। ছবি : আজকের কথা
জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কুড়িগ্রামে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। জেলার মূলধারার গণমাধ্যমকর্মীদের বাদ দিয়ে বাছাইকৃত কয়েকজনকে নিয়ে অবহিতকরণ সভা ও প্রেস কনফারেন্স আয়োজনের অভিযোগ উঠেছে কুড়িগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় জেলার জাতীয় ও মূলধারার বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
আগামী ২৮ জুন অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন-২০২৬ (প্রথম রাউন্ড) উপলক্ষে বুধবার কুড়িগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ে একটি অবহিতকরণ সভা এবং পরবর্তীতে প্রেস কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, জেলার অধিকাংশ জাতীয়, আঞ্চলিক ও মূলধারার সংবাদমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। বরং সীমিত পরিসরে পছন্দের কিছু ব্যক্তিকে নিয়ে দায়সারাভাবে কর্মসূচি সম্পন্ন করা হয়েছে।
সাংবাদিকদের ভাষ্য, জনসচেতনতা তৈরির সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম গণমাধ্যম। শিশুস্বাস্থ্য ও পুষ্টি সংশ্লিষ্ট এমন একটি জাতীয় কর্মসূচিতে মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে উপেক্ষা করা শুধু দায়িত্বহীনতার পরিচয় নয়, বরং জনস্বার্থবিরোধী পদক্ষেপ বলেও মনে করছেন তারা।
জাতীয় দৈনিক কালবেলা’র কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি এবং ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য এশিয়ান এজ’-এর রংপুর ব্যুরো প্রধান সিনিয়র সাংবাদিক সাইয়েদ আহমেদ বাবু বলেন, বর্তমানে শিশুদের হাম প্রতিরোধ ও শিশু মৃত্যুহার কমাতে সরকার নানা কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন সেই উদ্যোগগুলোর অন্যতম। তিনি বলেন, “এ ধরনের কর্মসূচির গুরুত্ব জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে মূলধারার গণমাধ্যমের কোনো বিকল্প নেই। অথচ সিভিল সার্জন পরিকল্পিতভাবে তার পছন্দের কয়েকজনকে নিয়ে দায়সারাভাবে অবহিতকরণ সভা ও প্রেস কনফারেন্স সম্পন্ন করেছেন। একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন স্বজনপ্রীতিমূলক আচরণ কাম্য নয়।”
দৈনিক আজকালের খবর-এর জেলা প্রতিনিধি ও সিনিয়র সাংবাদিক এম এ আযমও সিভিল সার্জনের এ ধরনের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানান।
ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশন ও দৈনিক আগামীর সময়-এর কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি তামজিদ হাসান তুরাগ বলেন, “জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি। এর প্রচার ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে মূলধারার মিডিয়ার ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে সাংবাদিকদের একটি বড় অংশকে বাদ দিয়ে প্রেস কনফারেন্স আয়োজন করা হয়েছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত এবং দুঃখজনক।”
দৈনিক আমার দেশ-এর কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আব্দুল্লাহ আল মুজাহিদ বলেন, “যার কাছে মূলধারার গণমাধ্যমের গুরুত্ব নেই, তার কাছে জনস্বাস্থ্যের গুরুত্ব কতটুকু তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। জনগণকে সচেতন করার প্রধান মাধ্যমকে উপেক্ষা করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা।”
কুড়িগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য সচিব ও এটিএন নিউজ প্রতিনিধি মনোয়ার হোসেন লিটন বলেন, “জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে জেলার বৃহত্তম সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ না জানানো অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে মূলধারার সাংবাদিকদের ইচ্ছাকৃতভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।”
ইউনাইটেড প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক ও চ্যানেল ওয়ানের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি রাশিদুল ইসলাম বলেন, “সিভিল সার্জন দীর্ঘদিন ধরেই জেলার মূলধারার গণমাধ্যমকর্মীদের বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি থেকে দূরে রাখছেন। একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন আচরণ সরকারের জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। সাংবাদিকদের প্রতি এই বৈষম্যমূলক মনোভাব দীর্ঘদিনের।”
সাংবাদিকদের অভিযোগ, কুড়িগ্রাম স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রমে দীর্ঘদিন ধরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক যোগাযোগের ঘাটতি রয়েছে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত না করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও পক্ষপাতমূলক পন্থা অনুসরণ করায় সরকারের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত প্রচার ও জনসম্পৃক্ততা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে জেলার সাংবাদিক মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকের মতে, জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মসূচিতে মূলধারার গণমাধ্যমকে বাদ দেওয়া শুধু প্রশাসনিক উদাসীনতাই নয়, বরং তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের একটি অস্বচ্ছ প্রবণতারও ইঙ্গিত বহন করে।
তবে অভিযোগের বিষয়ে কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার চৌধুরী বলেন, “আমি মূলধারার সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ জানাতে বলেছিলাম। কিন্তু অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্টাফরা তা করেনি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। ভবিষ্যতে যাতে কোনো মূলধারার সাংবাদিক এ ধরনের কর্মসূচি থেকে বাদ না পড়েন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উল্লেখ্য, আগামী ২৮ জুন সারাদেশের মতো কুড়িগ্রামেও জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন-২০২৬ (প্রথম রাউন্ড) অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ কর্মসূচি সফল করতে গণমাধ্যমের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা অপরিহার্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।
৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২ সফটওয়্যার, সাধারণ মানুষের কতটা কাজে আসছে?

১০ বছর ধরে চলা বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পে ব্যয় ৮০ কোটি টাকা, অধিকাংশ প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত; প্রকল্পের কার্যকারিতা ও ব্যয় নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন
তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার সহজ ও সমৃদ্ধ করতে ১০ বছর ধরে কাজ করছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ। এ সময়ের মধ্যে ১২টি সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি উপকরণ তৈরি করতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। তবে বিপুল অর্থ ব্যয়ে তৈরি এসব প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের কতটা কাজে আসছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
২০১৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ‘গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির প্রাথমিক বরাদ্দ ছিল ১৫৮ কোটি টাকা। তিন দফা মেয়াদ বাড়িয়ে সর্বশেষ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পটির আওতায় মোট ১৬টি সফটওয়্যার, প্রযুক্তি উপকরণ ও সেবা তৈরির পরিকল্পনা ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে ১২টির কাজ শেষ হয়েছে। তবে সব সেবা এখনো সাধারণ মানুষের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত কিংবা সহজলভ্য হয়নি।
প্রকল্পের আওতায় তৈরি করা হয়েছে বাংলা ভাষাভিত্তিক বিভিন্ন প্রযুক্তি। এর মধ্যে রয়েছে ছবি বা নথি থেকে লেখা শনাক্ত ও রূপান্তরের ওসিআর, অডিও থেকে লেখা তৈরি, বানান যাচাই, ব্যাকরণ সংশোধন, ভাষা অনুবাদ, বাংলা ফন্ট ও কিবোর্ড, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য স্ক্রিন রিডার, ব্রেইল কনভার্টার এবং ইশারাভাষা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি। সরকারি সেবা সম্পর্কে তথ্য দিতে তৈরি করা হয়েছে ‘জিজ্ঞাসা’ নামের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট।
ব্যবহারকারীর সংখ্যা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
প্রকল্পের বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সেবাভেদে ব্যবহারকারীর সংখ্যা ও কার্যকারিতায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। সরকারি সেবা সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার জন্য তৈরি ‘জিজ্ঞাসা’ চ্যাটবটে পরীক্ষামূলকভাবে প্রতিদিন গড়ে ১১০টি অনুরোধ আসে। বাংলা ফন্ট রূপান্তরের সেবায় ৩৫ দিনে ফাইল রূপান্তর হয়েছে মাত্র ২৭৫টি। অন্যদিকে বাংলা বানান যাচাইয়ের সেবায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ লাখ অনুরোধ আসে। কাগজডটএআই প্ল্যাটফর্মের ওসিআর সেবায় দৈনিক অনুরোধের সংখ্যা প্রায় ৫০টি।
প্রযুক্তিগুলোর কার্যকারিতা যাচাইয়ে বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার করে দেখা গেছে, বাংলা বানান যাচাইয়ের সেবাটি তুলনামূলক ভালো ফল দিচ্ছে। তবে বড় আকারের অডিও ফাইল থেকে লেখা তৈরির ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ‘জিজ্ঞাসা’ সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেও জটিল প্রশ্নে কখনো কখনো বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বর্তমানে যে পরিমাণ গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ) সক্ষমতা রয়েছে, তা দিয়ে একসঙ্গে সীমিতসংখ্যক ব্যবহারকারীকে সেবা দেওয়া সম্ভব। তাঁদের দাবি, বিদ্যমান অবকাঠামোয় একসঙ্গে পাঁচ থেকে ১০ হাজার ব্যবহারকারী সেবা নিতে পারলেও চাহিদা বাড়লে অপেক্ষা করতে হয়। ফলে বৃহৎ পরিসরে সেবা চালু রাখতে অতিরিক্ত জিপিইউ ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো প্রয়োজন।
৮০ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব
প্রকল্প সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সফটওয়্যার উন্নয়ন, হোস্টিং ও তথ্য সংরক্ষণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬০ কোটি টাকা। বাকি অর্থ ব্যয় হয়েছে অফিস ব্যবস্থাপনা, সভা-সেমিনার, প্রচার-প্রচারণা ও পরিচালন কার্যক্রমে।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশ্ন, তৈরি করা প্রযুক্তিগুলোর কোনটিতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং প্রকৃত ব্যয়ের সঙ্গে কাজের মানের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রকল্পের আওতায় শুধু সফটওয়্যার তৈরি নয়, বাংলা ভাষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভাষাপ্রযুক্তির উন্নয়নে প্রয়োজনীয় তথ্যভান্ডার তৈরির কাজও করা হয়েছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় আট হাজার কপিরাইটমুক্ত বই ডিজিটাল করা হয়েছে। বাংলা কথাকে লেখায় রূপান্তরের জন্য ১০ হাজার ঘণ্টা এবং লেখা থেকে কণ্ঠ তৈরির জন্য এক হাজার ঘণ্টার অডিও উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪৪টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষার ১২ হাজার মিনিটের বেশি অডিও এবং ইশারাভাষার ৪২ হাজার ৮০০টি ভিডিও সংগ্রহ করা হয়েছে।
মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে সমালোচনা
প্রকল্পটির মেয়াদ ও ব্যয় নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আগের সরকারের সময় নেওয়া তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় কার্যক্রম বাদ দেওয়া এবং অনিয়মের অভিযোগ থাকলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানো হলেও এর ব্যয় কমানো হয়নি।
আইসিটি সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা জানিয়েছেন, প্রকল্পের আওতায় বেশ কিছু প্রযুক্তি তৈরি হলেও সব কটির কার্যকারিতা সমান নয়। প্রত্যাশা অনুযায়ী সাধারণ মানুষের কাছে সেবাগুলো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এসব প্রযুক্তিকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে এনে আরও ব্যবহারবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, আইসিটি খাতের চলমান প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে যেসব কার্যক্রম অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে, সেগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। ১০ থেকে ১২টি প্রকল্পের পরিধি পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে।
অন্যদিকে প্রকল্প পরিচালক মাহবুব করিম জানান, প্রকল্পের কাজ শেষ হলে প্রযুক্তি ও তথ্যভান্ডার বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী জিপিইউ কেনা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।
অতীতের প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আইসিটি খাতে ২১টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। আইসিটি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ছিল প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা।
২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট প্রকল্পগুলো পর্যালোচনায় ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রতিবেদনে বেশ কিছু প্রকল্পে উদ্দেশ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কার্যক্রম এবং আইসিটি বিভাগের আওতাবহির্ভূত কাজ অন্তর্ভুক্ত থাকার বিষয়টি উঠে আসে। অপ্রয়োজনীয় খাত বাদ দিলে প্রায় ৬ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আইসিটি খাতের প্রকল্পগুলোতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, অতীতের প্রকল্পগুলোর কর্মপদ্ধতি ও ফলাফল যথাযথভাবে যাচাই না করে শুধু মেয়াদ বাড়ানো হলে পুরোনো কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে ১০ বছর ধরে বিপুল অর্থ ব্যয়ে তৈরি বাংলা ভাষাভিত্তিক প্রযুক্তিগুলোর বাস্তব উপযোগিতা, সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এসব প্রযুক্তি সচল রাখা এবং জনগণের ব্যবহার উপযোগী করার দায়িত্ব কে নেবে, সেটিও এখন বড় বিবেচ্য বিষয়।
বুড়িচংয়ে মাদরাসার শিক্ষা সফরের বাস খাদে, শিক্ষকসহ নিহত ২; আহত ৩০

কক্সবাজার যাওয়ার পথে কেরানীহাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা, আহতদের কয়েকজন চট্টগ্রাম মেডিকেলে
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার একটি মাদরাসার বার্ষিক শিক্ষা সফরের বাস ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। কক্সবাজার যাওয়ার পথে চট্টগ্রামের কেরানীহাট এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি মহাসড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়। এতে মাদরাসার সহকারী অধ্যাপকসহ দুজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন বাসচালকসহ অন্তত ৩০ জন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারী।
শনিবার (৭ নভেম্বর) ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে কেরানীহাটের নবনির্মিত রেলক্রসিং সংলগ্ন এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন, বুড়িচংয়ের বাকশীমূল সুন্নিয়া ইসলামিয়া সিনিয়র মাদরাসার সহকারী অধ্যাপক সোহানা আফরোজ (৪৫) এবং অধ্যাপক নাদিরা আফরোজ মেঘলার স্বামী ও দৈনিক রূপসী বাংলা পত্রিকার ম্যানেজার মো. ইসরাফিল আলম (৫৫)।
মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মো. মফিজুল ইসলাম ও আইসিটি বিভাগের শিক্ষক মো. জাকির হোসেন দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মাদরাসা সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাত ১০টার দিকে বার্ষিক শিক্ষা সফরের উদ্দেশ্যে দুটি বাসে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা কক্সবাজারের পথে রওনা হন। বাস দুটি বুড়িচং সদর থেকে যাত্রা শুরু করে। শনিবার ভোরে কেরানীহাটের নবনির্মিত রেলক্রসিং এলাকায় পৌঁছালে একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয় এবং অন্তত ৩০ জন আহত হন।
দুর্ঘটনার বিকট শব্দ শুনে স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তাঁরা উদ্ধারকাজে অংশ নিয়ে বাসের ভেতরে আটকে পড়া যাত্রীদের বের করেন। পরে আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
আহতদের মধ্যে রয়েছেন মাদরাসার অধ্যাপক নাদিরা আফরোজ মেঘলা, শিক্ষক মাওলানা তাজুল ইসলাম ভূঁইয়া ও তাঁর স্ত্রী-সন্তান, আইসিটি বিভাগের শিক্ষক মো. জাকির হোসেন, তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে সামিয়া আক্তার নিহা, শিক্ষক আতিকুর রহমান, অধ্যাপক রাসেল, অফিস সহকারী আলাউদ্দিন, তাঁর স্ত্রী সুইটি আক্তার ও মেয়ে, দপ্তরি শাহজালাল, আয়া সেলিনা আক্তার এবং শিক্ষক রুনা লায়লা ও তাঁর স্বামীসহ ৩০ জন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারী।
এ দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বুড়িচংয়ের বাকশীমূল এলাকায় মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
দোহাজারী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুল আবছার দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশের টহল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। স্থানীয়দের সহযোগিতায় হতাহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ওসি আরও জানান, দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি মহাসড়ক থেকে সরিয়ে থানা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। পুলিশ বিভিন্ন হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসার খোঁজখবর নিচ্ছে এবং নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে।
তবে কী কারণে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে।
অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী, দেখতে ছুটে গেলেন বাণিজ্যমন্ত্রী

সিলেটে চিকিৎসাধীন আরিফুল হক চৌধুরী, চলছে হৃদ্যন্ত্র ও স্নায়ুর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা
সিলেটে সরকারি সফরে গিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে হাসপাতালে ছুটে যান বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এ সময় তিনি মন্ত্রীর সহধর্মিণী শামা হক চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলেন এবং চিকিৎসার সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেলে সিলেট নগরীর আখালিয়া এলাকার মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে গিয়ে অসুস্থ মন্ত্রীকে দেখতে যান বাণিজ্যমন্ত্রী।
জানা গেছে, শুক্রবার সকালে সরকারি কাজে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় যাওয়ার পথে হঠাৎ বুকে ব্যথা, শরীর ঝিমঝিম করা ও অস্বস্তি অনুভব করেন আরিফুল হক চৌধুরী। একপর্যায়ে তাঁর শরীরের ডান পাশ দুর্বল হয়ে আসে। পাশাপাশি কাঁপুনি ও অতিরিক্ত ঘাম দেখা দেয়।
এ অবস্থায় পূর্বনির্ধারিত সফরসূচি বাতিল করে দ্রুত তাঁকে সিলেট নগরীর মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
বর্তমানে হাসপাতালের কার্ডিওলজিস্ট ডা. শিশির বসাক ও নিউরো মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. নজরুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি। তাঁর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। কয়েকটি পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়া গেলেও বাকি প্রতিবেদন হাতে আসার পর পরবর্তী চিকিৎসার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অসুস্থতার কারণে কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট উপজেলায় প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রীর পূর্বনির্ধারিত সরকারি সফর বাতিল করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম জানান, কোম্পানীগঞ্জে সরকারি কাজ শেষে মন্ত্রী হঠাৎ শরীরের ডান পাশ দুর্বল হয়ে আসা ও কাঁপুনি অনুভব করেন। একই সঙ্গে তিনি অস্বস্তিবোধ করছিলেন এবং অতিরিক্ত ঘামছিলেন। পরে তাঁকে মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে নেওয়া হয়।
তিনি আরও জানান, মন্ত্রীর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। কয়েকটি পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। বাকি প্রতিবেদন পাওয়ার পর চিকিৎসার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বর্তমানে তিনি আগের তুলনায় কিছুটা সুস্থ রয়েছেন।
বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন এবং সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী।





























