বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট ২০২৬, ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩

‘ফেরার অঙ্গীকারে প্রশংসা, ধর্মান্ধ তোষণে তীব্র আঘাত’—শেখ হাসিনাকে নিয়ে তসলিমা নাসরিনের বিশ্লেষণ

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী : প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ১০:০৪ পিএম
‘ফেরার অঙ্গীকারে প্রশংসা, ধর্মান্ধ তোষণে তীব্র আঘাত’—শেখ হাসিনাকে নিয়ে তসলিমা নাসরিনের বিশ্লেষণ

‘ফেরার অঙ্গীকারে প্রশংসা, ধর্মান্ধ তোষণে তীব্র আঘাত’—শেখ হাসিনাকে নিয়ে তসলিমা নাসরিনের বিশ্লেষণ। ছবির গ্রাফিতি : দৈনিক আজকের কথা

‘কণ্ঠে ভাঙন নয়, ছিল ফেরার অঙ্গীকার; ধর্মান্ধদের তোষণেই নিজের পতনের ভিত্তি গড়েছিলেন শেখ হাসিনা’—তসলিমা নাসরিন

ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সাহসিকতার প্রশংসার পাশাপাশি রাজনৈতিক ভুল, ধর্মান্ধ শক্তির সঙ্গে আপস, মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় স্বীকারের আহ্বান নির্বাসিত লেখিকার

ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফেরার অঙ্গীকারে প্রশংসা করেছেন বিখ্যাত লেখিকা ড. তসলিমা নাসরিন। সাম্প্রতিক ভাষণের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে নির্বাসিত প্রখ্যাত লেখক ড. তসলিমা নাসরিন। বক্তব্যে তিনি একদিকে শেখ হাসিনার সাহসিকতা ও দেশে ফেরার দৃঢ় সংকল্পের প্রশংসা করেছেন, অন্যদিকে তাঁর শাসনামলের রাজনৈতিক ভুল, ধর্মান্ধ শক্তির সঙ্গে আপস, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কড়া সমালোচনা করেছেন।

‘কণ্ঠে ভাঙন ছিল না, ছিল দেশে ফেরার অঙ্গীকার’

শেখ হাসিনার ভাষণ শুনে তসলিমা নাসরিন লেখেন, “দুই বছর দেশ থেকে দূরে থেকেও তাঁর কণ্ঠে ভাঙন ছিল না; ছিল দেশে ফেরার দৃঢ় সংকল্প। বত্রিশ বছর ধরে নির্বাসিত একজন মানুষ হিসেবে নিজের দেশে ফেরার এই আকুলতা আমি বুঝি। তাঁর দৃঢ়তা আমাকে স্পর্শ করেছে।”

বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞাকে ‘অগণতান্ত্রিক’ আখ্যা

বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারে সরকারি নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করে তসলিমা নাসরিন বলেন, ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, বিরোধী কণ্ঠ দমন গণতন্ত্রের পরিপন্থী। তাঁর ভাষায়, শেখ হাসিনার কথা বলার, আত্মপক্ষ সমর্থনের এবং নিজের দেশে ফেরার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।

একই সঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সরকার বা আদালত নয়, জনগণই ভোটের মাধ্যমে নির্ধারণ করবে।

স্বনামধন্য লেখিকা ড. তসলিমা নাসরিন।
স্বনামধন্য লেখিকা ড. তসলিমা নাসরিন। ছবি : দৈনিক আজকের কথা

২০২৪ সালের আন্দোলন ও রাজনৈতিক দায় এড়ানোর সুযোগ নেই

২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনার বক্তব্যের উল্লেখ করে তসলিমা নাসরিন বলেন, আন্দোলনটি পরিকল্পিতভাবে ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দেন, আন্দোলন চলাকালে প্রাণহানি, আহত হওয়া এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের জন্য শেখ হাসিনার সরকারের রাজনৈতিক ও নৈতিক দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর ভাষায়, “শুধু ষড়যন্ত্রের কথা বললে ইতিহাস সম্পূর্ণ হয় না। নিজের ভুল স্বীকার করা দুর্বলতা নয়; একজন নেতার সবচেয়ে বড় সাহস।”

‘ধর্মান্ধদের তোষণই পতনের পথ তৈরি করেছে’

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে ধর্মান্ধ শক্তির সঙ্গে আপসের বিষয়টি তুলে ধরেন তসলিমা নাসরিন। তিনি বলেন, ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বার্থে বারবার ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতা করা হয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন, হেফাজতের দাবি মেনে পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রগতিশীল ও অমুসলিম লেখকদের লেখা বাদ দেওয়া, কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি দেওয়া এবং ইসলামি জঙ্গিদের হাতে মুক্তচিন্তকরা নিহত হওয়ার পর তাঁদের পাশে না দাঁড়িয়ে উল্টো লেখকদের ধর্মের সমালোচনা না করার পরামর্শ দেওয়া ছিল গুরুতর রাজনৈতিক ভুল।

তসলিমা নাসরিনের ভাষায়, “ক্ষমতা রক্ষার জন্য যে ধর্মান্ধ জিহাদি অপশক্তিকে তিনি বছরের পর বছর তুষ্ট ও প্রশ্রয় দিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত সেই শক্তিই ছাত্রদের আন্দোলনে ঢুকে আন্দোলনটিকে নিজেদের রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করে তাঁর পতন ঘটিয়েছে। তিনি শুধু ষড়যন্ত্রের শিকার নন; ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে তাঁর ধারাবাহিক আপসই সেই ষড়যন্ত্র সফল হওয়ার জমি তৈরি করেছিল।”

তিনি আরও বলেন, ধর্মান্ধ শক্তিকে তুষ্ট করে সাময়িকভাবে ক্ষমতা রক্ষা করা গেলেও শেষ পর্যন্ত সেই শক্তিই রাষ্ট্র ও ক্ষমতাকে গ্রাস করে—বাংলাদেশে তারই বাস্তব উদাহরণ দেখা গেছে।

স্বচ্ছ বিচার ও প্রতিহিংসামুক্ত রাজনীতির আহ্বান

শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রসঙ্গে তসলিমা নাসরিন বলেন, তিনি চান শেখ হাসিনা দেশে ফিরুন। তবে সেই ফেরা যেন হত্যা, ফাঁসি বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জন্য না হয়; বরং স্বাধীন, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের বিচারিক প্রক্রিয়ার নিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে হোক।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত অপরাধের বিচার যেমন প্রয়োজন, তেমনি তাঁর পতনের পর সংঘটিত হত্যা, লুটপাট, সংখ্যালঘু নির্যাতন, নারীর ওপর সহিংসতা, সাংবাদিক ও মুক্তচিন্তকদের কণ্ঠরোধ এবং ইসলামি মৌলবাদী সহিংসতারও সমানভাবে বিচার হতে হবে।

তাঁর ভাষায়, “ন্যায়বিচার বেছে বেছে করা যায় না।”

নিজের ভুল স্বীকার করেই ফিরতে হবে

প্রতিক্রিয়ার শেষাংশে বাংলাদেশকে প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তসলিমা নাসরিন বলেন, শেখ হাসিনাকে শুধু ক্ষমতার দাবিদার হিসেবে নয়, বরং নিজের শাসনের সাফল্য ও ব্যর্থতা—দুটোরই সত্য স্বীকার করতে প্রস্তুত একজন নেতা হিসেবে দেশে ফিরতে হবে।

তিনি মনে করেন, শেখ হাসিনা যদি অতীতের গুরুতর রাজনৈতিক ভুলগুলো স্বীকার করেন এবং ভবিষ্যতে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে আর কখনো আপস না করার অঙ্গীকার করেন, তবে তাঁর প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ পুনর্জাগরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

0 0 votes
রেটিং দিন।
Subscribe
Notify of
guest
0 মন্তব্যসমূহ
Oldest
Newest Most Voted
এলাকার খবর

‘ফেরাতে পারেনি সরকার, এখন শেখ হাসিনার স্বেচ্ছায় ফেরার খবরেই এত ভয়’—সাংবাদিক মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী

আজকের কথা ডেস্ক প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ৭:০৬ পিএম
‘ফেরাতে পারেনি সরকার, এখন শেখ হাসিনার স্বেচ্ছায় ফেরার খবরেই এত ভয়’—সাংবাদিক মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী

হাফিজের রাজনৈতিক অতীত, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ও বর্তমান সরকারের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরতে পারেন—এমন আলোচনার প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের “ইনশাল্লাহ রাজপথে দেখা হবে” মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছেন প্রবীণ অনুসন্ধানী সাংবাদিক মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী।

বুধবার (৫ আগস্ট) বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে হাফিজ উদ্দিন আহমদ আওয়ামী লীগের অতীত কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন এবং শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গে “ইনশাল্লাহ রাজপথে দেখা হবে” বলে মন্তব্য করেন।

এর প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিক মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী বলেন, “শেখ হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে যাননি। তাকে রাষ্ট্রীয় বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ বিমানে নিরাপত্তার স্বার্থে ভারতে নেওয়া হয়েছিল। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার পদত্যাগপত্র রাষ্ট্র আজ পর্যন্ত জনসমক্ষে উপস্থাপন করতে পারেনি।”

হাফিজ উদ্দিন আহমদের রাজনৈতিক অতীতের সমালোচনা করে শরিফুল আলম চৌধুরী দাবি করেন, ২০০৭ সালের ১/১১-এর সেনাসমর্থিত সরকারের সময় হাফিজ উদ্দিন বিএনপি ভেঙে আলাদা নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় নির্বাচন কমিশন ও তৎকালীন প্রশাসন তাকে বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাকে স্পিকার ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেওয়া বিএনপির রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রমাণ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শরিফুল আলম চৌধুরী আরও দাবি করেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার থেকে শুরু করে বর্তমান প্রশাসন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েও শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়নি। তার অভিযোগ, এখন শেখ হাসিনা স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সম্ভাবনার কথা আলোচনায় আসতেই সরকার আতঙ্কিত হয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা ও গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে এবং জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।

তবে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা, এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান এবং শরিফুল আলম চৌধুরীর উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

‘সাংবাদিকতা আমার কাছে পেশা নয়, নেশা’— অর্ধশতকের পথচলায় দেবীদ্বারের প্রবীণ সাংবাদিক আতিকুর রহমান বাশার

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী : প্রকাশিত: বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬, ৩:০০ এএম
‘সাংবাদিকতা আমার কাছে পেশা নয়, নেশা’— অর্ধশতকের পথচলায় দেবীদ্বারের প্রবীণ সাংবাদিক আতিকুর রহমান বাশার

মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ৫০ বছরের নিরলস সাংবাদিকতা; অপসাংবাদিকতা নিয়ে উদ্বেগ, ইতিহাসচর্চায় কাটাতে চান জীবনের বাকিটা সময়

সাংবাদিকতা আমার কাছে কোনো পেশা নয়; এটি একটি আদর্শ, একটি দায়বদ্ধতা। কাকতালীয়ভাবে এই পেশায় এসেছিলাম, কিন্তু আর বের হতে পারিনি।

অর্ধশতকের সাংবাদিকতা জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে কথাগুলো বলছিলেন কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান সভাপতি, প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম আতিকুর রহমান বাশার

দেবীদ্বার পৌর এলাকার ভূষণা গ্রামের সন্তান এবিএম আতিকুর রহমান বাশারের জন্ম ১৯৬৩ সালের ১ অক্টোবর কুমিল্লা শহরের মনোহরপুর মুন্সেফবাড়িতে। মাত্র দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় ১৯৭৬ সালে সম্পূর্ণ কাকতালীয়ভাবে তাঁর সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হয়।

সে সময় তৎকালীন ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদের ঘনিষ্ঠজন, লেখক ও কলামিস্ট কাজল দত্ত তাঁকে কুমিল্লার দীর্ঘদিনের সমস্যা ‘কুমিল্লার দুঃখ গোমতী’ নিয়ে প্রতিবেদন লিখতে উৎসাহ দেন। সাংবাদিকতায় কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় তিনি প্রথমে বিষয়টি রচনার আকারে লিখলেও পরে কাজল দত্ত ও কুমিল্লা বঙ্গ বিদ্যালয়ের (কুমিল্লা হাই স্কুল) শিক্ষক আব্দুল খালেক মোল্লার সম্পাদনায় সেটি সংবাদের রূপ পায় এবং ‘নতুন বাংলা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর প্রতিবেদনটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

মফস্বল সাংবাদিকতার সীমিত পরিসরেও তিনি অর্জন করেছেন একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় সম্মাননা। কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের (বিএমএসএফ) জাতীয় সম্মেলনে তিনি ‘যুগরত্ন’ সম্মাননা লাভ করেন।
মফস্বল সাংবাদিকতার সীমিত পরিসরেও তিনি অর্জন করেছেন একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় সম্মাননা। কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের (বিএমএসএফ) জাতীয় সম্মেলনে তিনি ‘যুগরত্ন’ সম্মাননা লাভ করেন। ছবি : আজকের কথা

এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৯ সালে জাতীয় সংসদে তৎকালীন সংসদ সদস্য ও ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ ‘কুমিল্লার দুঃখ গোমতী’ প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। পরে গোমতী নদীর বেড়িবাঁধ নির্মাণে সরকারি উদ্যোগ ও বরাদ্দ আসে। ১৯৮৬ সালে তৎকালীন উপমন্ত্রী এএফএম ফখরুল ইসলাম মুন্সী প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে সাবেক সচিব এবিএম গোলাম মোস্তফার দায়িত্বকালে গোমতী বেড়িবাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন হয়।

তবে এই ঐতিহাসিক ঘটনার কৃতিত্ব নিজের নয় বলে উল্লেখ করেন আতিকুর রহমান বাশার। তাঁর ভাষায়, “আমি শুধু লেখাটি লিখেছিলাম। প্রকৃত কৃতিত্ব কাজল দত্ত ও খালেক মাস্টারের, যাঁরা আমার লেখাকে সংবাদে রূপ দিয়েছিলেন।”

মানুষের অধিকারের পক্ষে অর্ধশতকের লড়াই

দীর্ঘ ৫০ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে সাধারণ মানুষের অধিকার, অসহায় মানুষের দুর্ভোগ এবং সমাজ-রাষ্ট্রের অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরাকেই নিজের মূল দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন তিনি।

FB IMG 1785874959019
সাংবাদিকতার পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডেও একনিষ্ট সাংবাদিক এবিএম আতিকুর রহমান বাশার। ছবি : আজকের কথা

এই দীর্ঘ সময়ে তিনি একতা, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক আজকের কাগজদৈনিক ভোরের কাগজে কাজ করেছেন। পরে টানা ১২ বছর দৈনিক প্রথম আলো-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি দৈনিক কালের কণ্ঠএর দেবীদ্বার উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

দেবীদ্বার প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা

১৯৮০ সালে তিনি দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর হাত ধরেই দেবীদ্বারে বহু সাংবাদিকের পথচলা শুরু হয়েছে। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, বর্তমানে জীবিত সাংবাদিকদের মধ্যে তিনিই দেবীদ্বারের সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।

অপসাংবাদিকতা নিয়ে ক্ষোভ

বর্তমান সাংবাদিকতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “সাংবাদিকতা জাতির চতুর্থ স্তম্ভ এবং সাংবাদিক জাতির বিবেক। ৯০-এর দশকের পর গণমাধ্যমের বিস্তার ঘটলেও ২০০১ সালের পর অপসাংবাদিকতা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। এখন প্রকৃত সাংবাদিকের চেয়ে অপসাংবাদিকের সংখ্যাই বেশি।”

তিনি অভিযোগ করেন, অনেকেই শুধু পরিচয়পত্র, ডায়েরি ও কলম নিয়ে বিভিন্ন অফিসে দালালি করেন, অথচ সংবাদ লেখার ন্যূনতম দক্ষতাও তাদের নেই। এমনকি একটি সাধারণ শোকসংবাদও অনেকের পক্ষে লেখা সম্ভব হয় না। এসব কর্মকাণ্ডে প্রকৃত সাংবাদিকদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অপসাংবাদিকতা রোধে প্রাথমিক স্তর থেকেই সাংবাদিকতা বিষয়ে মৌলিক শিক্ষা চালুর পাশাপাশি গণমাধ্যম ও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানান তিনি।

FB IMG 1785875008446
নিজ পরিবারের সাথে প্রবীণ সাংবাদিক এবিএম আতিকুর রহমান বাশার। ছবি : আজকের কথা

প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়াই সাংবাদিকতার পরিচয় নয়

প্রেসক্লাবের সদস্যপদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সাংবাদিক হতে প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয় তিনি কোন গণমাধ্যমে কাজ করেন এবং তাঁর সংবাদ নিয়মিত প্রকাশিত হয় কি না।”

তিনি জানান, বর্তমানে দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবে ২৭ জন সদস্য রয়েছেন। এখানে দাতা, সহযোগী ও মূল—এই তিন ধরনের সদস্যপদ রয়েছে। মূল সদস্য হতে হলে অবশ্যই পেশাদার সাংবাদিক হতে হয়।

গবেষণা ও বই প্রকাশের পরিকল্পনা

ছাত্রজীবন থেকেই বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সাংবাদিকতায় সবসময় পেশাগত নিরপেক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন বলে জানান আতিকুর রহমান বাশার।

তিনি বলেন, অপসাংবাদিকতার কারণে বহুবার সাংবাদিকতা ছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবেছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সত্য অনুসন্ধানের দায়বদ্ধতা এবং পেশার প্রতি ভালোবাসা তাঁকে বারবার মাঠে ফিরিয়ে এনেছে।

জীবনের অবশিষ্ট সময় দেবীদ্বারের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণামূলক লেখালেখিতে ব্যয় করতে চান তিনি। ইতোমধ্যে বিভিন্ন পত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত লেখাগুলো একত্র করে বই আকারে প্রকাশের কাজও এগিয়ে নিচ্ছেন।

FB IMG 1785874744598
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সাথে মুক্তিযুদ্ধের গবেষক হিসেবে বিভিন্ন কাজের বর্ননা করছেন সাংবাদিক এবিএম আতিকুর রহমান বাশার। ছবি : আজকের কথা

সম্মাননা ও স্বীকৃতি

মফস্বল সাংবাদিকতার সীমিত পরিসরেও তিনি অর্জন করেছেন একাধিক জাতীয় ও স্থানীয় সম্মাননা। কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের (বিএমএসএফ) জাতীয় সম্মেলনে তিনি যুগরত্ন’ সম্মাননা লাভ করেন। এছাড়া বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি, কুমিল্লার ‘আপনজন সম্মাননা’, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে সাংবাদিক কল্যাণ পরিষদ, কুমিল্লা প্রদত্ত নিরাপদ সাংবাদিকতা ও বিশেষ অবদানের সম্মাননাসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের স্বীকৃতিতে ভূষিত হয়েছেন।

তনু হত্যা: জামিনে কারামুক্ত অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী : প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬, ১০:১৮ পিএম
তনু হত্যা: জামিনে কারামুক্ত অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর

হাইকোর্টের আদেশে কারামুক্তি, তদন্ত অব্যাহত; ডিএনএ পরীক্ষা ও পলাতকদের গ্রেপ্তারে তৎপর পিবিআই

আলোচিত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া একমাত্র সন্দেহভাজন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সন্ধ্যা প্রায় সোয়া ৭টায় কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পান। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. শাহ আলম খান।

তিনি জানান, গত রোববার হাইকোর্ট হাফিজুর রহমানকে জামিন প্রদান করেন। পরে মঙ্গলবার কুমিল্লা চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মাধ্যমে জামিনের আদেশ কারাগারে পৌঁছালে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।

এর আগে গত ২১ এপ্রিল রাতে ঢাকার কেরানীগঞ্জে নিজ বাসা থেকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তাকে গ্রেপ্তার করে। তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলামের নেতৃত্বে অভিযানটি পরিচালিত হয়। গ্রেপ্তারের তিন মাস ১৪ দিন পর তিনি কারামুক্ত হলেন।

আদালত সূত্রে জানা যায়, গ্রেপ্তারের পরদিন হাফিজুর রহমানকে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মমিনুল হকের আদালতে হাজির করা হলে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরে তাকে ঢাকায় পিবিআইয়ের বিশেষ ইউনিটে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

সোহাগী জাহান তনু
সোহাগী জাহান তনু। ছবি : আজকের কথা

ডিএনএ পরীক্ষায় নতুন অগ্রগতি

পিবিআই সূত্র জানায়, তনুর পরিধেয় পোশাক থেকে সংগৃহীত নমুনার বিশ্লেষণে একাধিক পুরুষের পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া গেছে। এসব প্রোফাইলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে দুই সন্দেহভাজনের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করা হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ জুলাই কুমিল্লার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সাবেক সৈনিক মো. জাহিদুল ইসলাম (৪১) এবং ফয়সাল আহমেদ ওরফে রাব্বী (৩২)-এর ডিএনএ পরীক্ষার অনুমতি দেন।

দুই পলাতকের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ

মামলায় পলাতক দুই সন্দেহভাজন—সার্জেন্ট (অব.) জাহিদুজ্জামান ওরফে জাহিদ এবং সৈনিক শাহীন আলমের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। একই সঙ্গে তাদের গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পিবিআই জানায়, ঘটনার সময় সার্জেন্ট জাহিদ কুমিল্লা সেনানিবাসের ১২ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন। তার বাড়ি বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জে। অন্যদিকে সৈনিক শাহীন আলম কর্মরত ছিলেন ২ সিগন্যাল ব্যাটালিয়নে। তার বাড়ি কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায়। বর্তমানে দুজনই পলাতক রয়েছেন।

(অবঃ) ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান
(অবঃ) ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান। ছবি : আজকের কথা

তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, আদালতের মাধ্যমে হাফিজুর রহমানের জামিনের বিষয়টি জেনেছেন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী অন্যান্য সন্দেহভাজনকে আটক এবং তাদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে হাফিজুর রহমানের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে তনুর নমুনার মিল পাওয়া গেছে কি না—এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

হতাশ তনুর পরিবার

তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বলেন, হাফিজুর রহমান জামিনে মুক্ত হওয়ার খবর জেনে তারা হতাশ হয়েছেন। তার ভাষ্য, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই প্রধান সন্দেহভাজনের জামিনে মুক্তি বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। তিনি সরকারের কাছে সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানান।

আট বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত

২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন সোহাগী জাহান তনু। পরদিন সেনানিবাসের একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তার বাবা ইয়ার হোসেন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।

প্রথমে থানা পুলিশ, পরে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং সিআইডি দীর্ঘ সময় তদন্ত করলেও হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি। ২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি জানায়, তনুর পোশাক থেকে পাওয়া নমুনায় তিনজন পুরুষের শুক্রাণুর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তবে সে সময় সন্দেহভাজনদের সঙ্গে ডিএনএ মিলিয়ে দেখা হয়নি।

২০২০ সালের ২১ অক্টোবর পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলাটি পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর থেকে সংস্থাটি তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে মামলার ষষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম।

×
CLOSE X