চিকিৎসা নিতে গিয়ে দখল ৬০০ কোটি টাকার হাসপাতাল

চান্দিনায় চাঁদাবাজি না পেয়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাকে আটক করে পুলিশের হাতে দিতে চেয়েছিল বৈষম্যবিরোধী সমন্বয়করা, তেমনি আরেক ঘটনায় ৬০০ কোটি টাকার হাসপাতালও দখল করে নিয়েছে এ সমন্বয়করা---- ছবি। দৈনিক আজকের কথা।
দেশের একমাত্র আধুনিক সরকারি চক্ষু হাসপাতাল জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট বর্তমানে কার্যত চিকিৎসা সেবা বন্ধ রেখে আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের আহতরা দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালটি দখল করে রাখায় প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার রোগী সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ৬০০ কোটি টাকার সরঞ্জামসহ হাসপাতালটি এখন একপ্রকার আবাসিক হোটেলে রূপ নিয়েছে।
গত ২৮ মে নিছক ‘ভুল বোঝাবুঝি’ থেকে হাসপাতালটির চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পিটিয়ে তাড়িয়ে দেন জুলাই আন্দোলনের আহতরা। এরপর থেকে নিরাপত্তা শঙ্কায় কেউ হাসপাতালে আসছেন না। হাসপাতালের সব সেবা বন্ধ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, শহীদ জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশসহ অনেকে চেষ্টা করেও বিষয়টির সমাধানে নিয়ে আসতে পারেননি।
এরই মধ্যে গত কয়েকদিন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা, সহকারী উপদেষ্টাসহ নানান পক্ষের তৎপরতায় দফায় দফায় বৈঠক হয়, তদন্ত কমিটি কাজ করে। অবশেষে গত ৩ জুন হাসপাতালের জরুরি বিভাগটি চালুর সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি দেশসেরা চক্ষু বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বলা হয়, মেডিকেল বোর্ড ৪ জুন হাসপাতাল পরিদর্শন করবে। একই সঙ্গে বোর্ড জুলাই আহতদের চিকিৎসা সমন্বয় এবং সামগ্রিক কার্যক্রম নির্ণয় করবে।
সরকারের ৬০০ কোটি টাকার সরঞ্জামসমৃদ্ধ অত্যাধুনিক
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এ হাসপাতালটি এত দিন বন্ধ। প্রতিদিন পাঁচ হাজার মানুষ সেবাবঞ্চিত হচ্ছে। এ নিয়ে তাদের (জুলাই আহতদের) কোনো মাথাব্যথা নেই। তাদের কথা হলো, ‘আমরা ঢাকায় এসে কোথায় থাকবো? বলছেন হাসপাতালের চিকিৎসকরা
যেমন সিদ্ধান্ত তেমন কাজ। বন্ধের এক সপ্তাহ পর ৪ জুন পুলিশি পাহারায় যথারীতি জরুরি বিভাগ চালু করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরাও পরিদর্শনে আসেন। তারা হাসপাতালে এসে ২০৭ নম্বর রুমে ভর্তি থাকা ৫৪ জন জুলাই আহতের সঙ্গে চিকিৎসাসংক্রান্ত বৈঠকে বসতে চান। আহতদের মধ্যে ৩০ জন তাদের ডাকে সাড়া দেন। তাদের সবার চোখ পরীক্ষা করেন বোর্ডের সদস্যরা। তাদের সবাইকে ছাড়পত্র (রিলিজ) দেওয়া এবং পুনর্বাসন করার সুপারিশ করে মেডিকেল বোর্ড। বাকি ২৪ জন হাজির না হওয়ায় তাদের ব্যাপারে সুপারিশ করতে পারেননি।
মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা চলে যাওয়ার পর জরুরি বিভাগের সামনে আবাসিক চিকিৎসকের (আরএস) রুম থেকে হইহুল্লোড় শোনা যায়। এগিয়ে গিয়ে দেখা যায়, জুলাই আহতরা চিকিৎসকদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় লিপ্ত।
এর মধ্যেই নিরাপত্তাজনিত কারণে আবাসিক চিকিৎসকসহ উপস্থিত কয়েকজন চিকিৎসক হাসপাতাল ত্যাগ করেন। ভারপ্রাপ্ত পরিচালককে তাদের দাবির প্রতি সম্মতি দিয়েই পুলিশ প্রটোকলে বের হতে হয়। জুলাই আহতরা সাফ জানিয়ে দেন, ‘নানান কারণে আমাদের ঢাকায় আসতে হয়। ঢাকায় এসে থাকবো কোথায়? এজন্য আমাদের পক্ষে হাসপাতাল ছাড়া সম্ভব নয়।’ এসময় জুলাই আহতরা তাদের রিলিজের যাবতীয় কাগজ ছিঁড়ে ফেলেন।
এ নিয়ে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালটির একাধিক চিকিৎসক জানিয়েছেন, সরকারের ৬০০ কোটি টাকার সরঞ্জাম সমৃদ্ধ অত্যাধুনিক এ হাসপাতালটি এত দিন বন্ধ। প্রতিদিন পাঁচ হাজার মানুষ সেবাবঞ্চিত হচ্ছে। এ নিয়ে তাদের (জুলাই আহতদের) কোনো মাথাব্যথা নেই। তাদের কথা হলো, ‘আমরা ঢাকায় এসে কোথায় থাকবো?’ তাদের থাকার জায়গা সরকার ভিন্ন কোথাও দিতে পারে। কিন্তু হাসপাতাল তো আবাসিক হোটেল বা লিল্লাহ বোর্ডিং হতে পারে না। এখানে জরুরি প্রয়োজনে রোগী ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, ‘জুলাই আহতদের কেউ কেউ এত দিন বলেছে, আমাদের চিকিৎসা ভালো নয়। সরকার এখন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চক্ষু বিভাগের চেয়ারম্যান, ঢাকা মেডিকেল কলেজের চক্ষু বিভাগের প্রধান, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) চক্ষু বিভাগের প্রধান এবং ইস্পাহানি ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এবং ঢাকার বিভাগীয় প্রধানের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে দিলো। দেশসেরা এই চিকিৎসকরা তাদের চিকিৎসার বিষয়ে মতামত দিলেন। কিন্তু তারা এটাও মানে না।’
“অবশ্য, সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে এসেও একজন জুলাই আহত হাসপাতালের পরিচালকের সামনে বলেন, ‘ওটা (মাউন্ট এলিজাবেথ) ভুয়া হাসপাতাল। আমাদের আমেরিকা বা ইউরোপ পাঠান’।” বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের বেশ কয়েকজন চিকিৎসক।
কী বলছে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট মেডিকেল বোর্ড
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোস্তাক আহমেদ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চক্ষু বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আব্দুল ওয়াদুদ, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) চক্ষু বিভাগের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইসমাঈল হোসেন এবং ইস্পাহানি ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালের বিভাগীয় প্রধান ডা. মোমিনুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের যৌথ স্বাক্ষরিত প্রতিবেদন গত ৪ জুন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব বরাবর জমা দেওয়া হয়।
তারা কিন্তু এরই মধ্যে বেশিরভাগ বাড়ি চলে গেছে। এখন মাত্র ৭-৮ জন আছে। তাদের কেউ রিলিজ নেয়নি। যে যার মতো আবার এসে থাকবে, এমনটাই তাদের চাওয়া। তাই হাসপাতাল থেকে তারা রিলিজ নিতে চায় না।- ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. জানে আলম
প্রতিবেদনে চারটি মতামত তুলে ধরা হয়
১. রোগীদের প্রদত্ত চিকিৎসা এবং চলমান চিকিৎসা সন্তোষজনক; ২. আপাতত রোগীদের ছাড়পত্র দিয়ে প্রয়োজনে নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগের জন্য উপদেশ দেওয়া হলো; ৩. বিশেষ ক্ষেত্রে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ), ইস্পাহানি ইসলামিয়া আই ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হসপিটাল, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ করার জন্য উপদেশ দেওয়া হলো এবং ৪. তাদের অতিসত্বর যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার জন্য জোর সুপারিশ করা হলো।
‘সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অবরুদ্ধ ভারপ্রাপ্ত পরিচালক’
প্রতিবেদন মোতাবেক মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত প্রতিপালনে কাজ করতে গিয়ে সেদিন (৪ জুন) সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অবরুদ্ধ ছিলেন জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. জানে আলম।
জানতে চাইলে ডা. জানে আলম বলেন, ‘গত বুধবার (৪ জুন) মেডিকেল বোর্ড এসেছিল। তখন হাসপাতালে ভর্তি ৫৪ জন জুলাই আহতের মধ্যে ৩০ জন বোর্ডের ডাকে সাড়া দেয়। চিকিৎসাপত্র ও নানাবিধ রিপোর্ট দেখে বোর্ড সিদ্ধান্ত দেয়, তাদের হাসপাতালে থাকার দরকার নেই। তারা বাড়ি চলে যাবে। সমস্যা হলে ফলোআপ করবে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা সব কাগজপত্র রেডি করেছিলাম। কিন্তু তারা মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত মানেনি। তারা তাদের মতো থাকবে। কোনো অর্ডার মানবে না। তাদের কথা হচ্ছে, এখানে বসে ওরা ওদের বার্গেনিং করবে। সরকার থেকে নানান দাবি আদায় করে নেবে।’
ডা. জানে আলম বলেন, ‘ওইদিন তো তারা (জুলাই আহতরা) আমাকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অবরুদ্ধ করে রেখেছে। পরে আমি তাদের দাবির প্রতি সহমত প্রকাশ করে পুলিশের সহায়তায় বেরিয়ে এসেছি।’
বিষয়টি খুবই বিব্রতকর। এ ঘটনায় সারাদেশে মানুষের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে। মাত্র কয়েকজন আহতের বিশৃঙ্খল আচরণের কারণে সারাদেশে জুলাই আহত ও পঙ্গুদের ত্যাগ বিতর্কিত হচ্ছে।- সমন্বয়ক
‘তারা কিন্তু এরই মধ্যে বেশিরভাগ বাড়ি চলে গেছে। এখন (৬ জুন রাত পর্যন্ত) মাত্র সাত-আটজন আছে। তাদের কেউ রিলিজ নেয়নি। যে যার মতো আবার এসে থাকবে, এমনটাই তাদের চাওয়া। তাই হাসপাতাল থেকে তারা রিলিজ নিতে চায় না’- যোগ করেন ভারপ্রাপ্ত পরিচালক।
মেডিকেল বোর্ড সিদ্ধান্ত দিলো, জুলাই আহতদের হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন নেই। আবার হাসপাতালে থেকেও তাদের চিকিৎসা হচ্ছে না, যেহেতু হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম বন্ধ। তাহলে তারা এখন কী হিসেবে সেখানে থাকছে? আবাসিক হোটেল বা লিল্লাহ বোর্ডিং হিসেবে কি না—জানতে চাইলে ডা. জানে আলম বলেন, ‘ওই রকমই। তাদের ঢাকায় থাকা দরকার। এখন হাসপাতালকে বেছে নিয়েছে থাকার জন্য।’
চক্ষু হাসপাতালে থাকা জুলাই আহতদের মধ্যে একজন হলেন কুষ্টিয়ার মো. কোরবান শেখ হিল্লোল। তাদের দাবি-দাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভাই, এই গ্যাঞ্জামটা আমাদের ছিল না। আমাদের দাবি-দাওয়া অনেকবার দিয়েছি। আমার মনে হয়, আহতরা আর দাবি-দাওয়া নিয়ে কথা বলবে না। সারা বাংলাদেশের প্রত্যেকটা মানুষের খালি দাবি দাবি দাবি। দেশটা আমার আপনার সবার ভাই। মানবতার দিক দিয়ে কেউ না কেউ ছাড় না দিলে দেশটা আগাবে কী করে ভাই? আর কত দাবি দেব ভাই? চিকিৎসা, পুনর্বাসন, এ ও বলে বলে, আপনারা নিজেরাও তো জানেন। প্রত্যেকটা জায়গায় তো একই কথা। আমরা এ ব্যাপারে আর কথা বলব না এ রকম একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সরকার, দেশ যেটা ভালো মনে করে করুক।’
হাসপাতাল আবার চালু হোক, এ বিষয়টি মেডিকেল বোর্ডকে বলেছেন কিনা? জবাবে হিল্লোল বলেন, ‘গত কয়েকদিন যাবৎ আমরা বলেছি, যারা আসছিলেন তাদের কাছে আমরা রিকোয়েস্ট করেছি। আমাদের ট্রিটমেন্ট রিলেটেড ব্যাপারগুলো নিয়ে আপনারা কী করবেন, এটা আপনাদের ব্যাপার। বাট পাবলিক যারা আই হসপিটাল হিসেবে এখানে আসেন, তাদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা দায়িত্ব কিন্তু আমাদের সবার। তারা সহমত হয়েছেন যে না এটা দরকার।’
নেপথ্যে পাঁচ কারণ
জুলাই আহতরা কেন চিকিৎসা শেষ হওয়ার পরও হাসপাতাল ছাড়ছেন না—এ নিয়ে অনুসন্ধানে উল্লেখযোগ্য পাঁচটি কারণ উঠে এসেছে। হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক, কর্মচারী, রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এবং একাধিক দিন সরেজমিনে পরিদর্শন করে এই কারণগুলো জানা গেছে।
১. সেটেল হওয়ার জন্য ইউরোপ-আমেরিকা যাওয়া অথবা যথাযথ পুনর্বাসনের আশায় তারা হাসপাতালে থাকছেন। তাদের ধারণা, হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেলে সরকার বা কর্তৃপক্ষের নজর তাদের দিকে থাকবে না।
২. জুলাই আহতদের মধ্যে দু-একজন অর্থের বিনিময়ে অন্য রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি, অপারেশনের সিরিয়াল এগিয়ে দেওয়াসহ নানান তদবিরে জড়িয়ে পড়েছেন। আবার কেউ কেউ সেখানে বসে ওই হাসপাতালসহ ঢাকার অন্য হাসপাতালগুলোর নিয়োগ ও টেন্ডারে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করছেন। জোটবদ্ধ হয়ে হাসপাতাল ও বিভিন্ন দপ্তরে যাচ্ছেন।
৩. হাসপাতালে অবস্থান করা দু-একজনের যাওয়ার মতো জায়গাও নেই। তারা বউ-বাচ্চা নিয়ে হাসপাতালে থাকেন। একজনের নামে দুই থানায় মাদক মামলা আছে, অভিযোগপত্র দাখিলও হয়ে গেছে। হাসপাতাল থেকে চলে গেলে গ্রেফতারের ভয় আছে তার।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বা জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাদের আহ্বানে তাৎক্ষণিক যে কোনো কর্মসূচিতে সবার আগে দৌড়ে গিয়ে যোগ দেন এই হাসপাতালে অবস্থান করা আহতরা। যে কারণে তাদের বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্তে যাচ্ছেন না ছাত্র সমন্বয়করাও।
৪. বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদের আহ্বানে তাৎক্ষণিক যে কোনো কর্মসূচিতে সবার আগে দৌড়ে গিয়ে যোগ দেন এই হাসপাতালে অবস্থান করা আহতরা। যে কারণে তাদের বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্তে যাচ্ছেন না ছাত্র সমন্বয়ক ও এনসিপি নেতারাও।
৫. জুলাই আন্দোলনে এই আহতদের অনেকের বাড়ি ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলায়। তাদের জুলাই ফাউন্ডেশনসহ নানান জায়গার কাজে ঢাকায় আসতে হয়। ঢাকায় তাদের থাকার জায়গা নেই। তাই হাসপাতালটিতে দখলে রাখা সিট তারা ছাড়তে চায় না। এখানে যখন-তখন যেন এসে থাকা যায়, খাওয়াও পাওয়া যায়—এটিই তারা চান।
এরকম অন্তত পাঁচটি কারণে হাতেগোনা কয়েকজন অন্য জুলাই আহতদের নানাভাবে বুঝিয়ে হাসপাতাল দখলে রাখতে উদ্বুদ্ধ করছেন। আহতদের মধ্যে যারা বাড়িতে আছেন তাদেরও এই হাসপাতালে এসে সিট দখল নেওয়ার প্রলোভন দেখাচ্ছেন। এক্ষেত্রে তারা অন্যদের বলছেন, সরকার জুলাই আহতদের দুই হাজার ৬০০ ফ্ল্যাট দেবে। ঢাকায় থাকলে ফ্ল্যাট পাওয়া যাবে। চলে গেলে দেবে না।
এই জুলাই আহতরা অন্য সুযোগ-সুবিধাও একে অন্যের মধ্যে ভাগ করে নিচ্ছেন। বিভিন্ন সহযোগিতার অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে তাদের মধ্যে গ্রুপ, সাব-গ্রুপও হয়েছে। মাঝেমধ্যে হাসপাতালের ভেতরে নিজেরাই মারামারিতে জড়িয়ে পড়ছেন।
একজনেরও হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন নেই: পরিচালক
ছুটিতে থাকা হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা স্বীকার করি যে, তারা (জুলাই আহত) অনেক বড় স্যাক্রিফাইস করেছে। তাদের অনেকের দুই চোখ ক্ষতিগ্রস্ত, অনেকের এক চোখ ক্ষতিগ্রস্ত। আমরা সাধ্যের পুরোটা দিয়েই চিকিৎসা দিয়েছি। এমনকি যাদের প্রয়োজন তাদের বিদেশে পাঠিয়েছি। বিদেশ থেকে বিখ্যাত ডাক্তারদের এনেও চিকিৎসা করিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘তাদের এখন প্রয়োজন পুনর্বাসন। সেটিও মন্ত্রণালয়সহ সব জায়গায় বলেছি। সমন্বিত প্রচেষ্টা চলমান। এরই মধ্যে পরপর কয়েকটি ঘটনা তারা ঘটিয়েছে। যেসব ঘটনায় আমরা বিব্রত। তারপরও তাদের মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছিলাম। সর্বশেষ গত ২৮ মে তারা যেভাবে চিকিৎসক ও স্টাফদের গায়ে হাত তুলেছে, এতে তারা (ডাক্তার-স্টাফ) অনিরাপদ বোধ করছেন। হাসপাতালে আসতে চাইছেন না।’
‘জুলাই আহতদের চিকিৎসাটা এখন মূলত ফলোআপ বা চলমান চিকিৎসা। এজন্য তাদের এনআইওর (জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান হাসপাতাল) মতো বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। যার যার এলাকায় ফেরত যেতে পারে। তাদের অসুস্থতার সিমটম দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট এলাকার মেডিকেল কলেজগুলোর চক্ষু বিভাগে যাবে, সেখানে তাদের সেবা দিতে পারবে।’
অধ্যাপক ডা. খায়ের আরও বলেন, ‘যদি ওই হাসপাতাল মনে করে অস্ত্রোপচার লাগবে বা বিশেষায়িত কোনো সেবা লাগবে, তারা এনআইওতে রেফার করবে। আমরা সেটা করে দেবো। অথবা সরকার যদি মনে করে তাদের ঢাকার হাসপাতালে রেখেই সেবা দেবে, তাহলে অন্য হাসপাতালে শিফট করতে হবে।’
কাজটা সহজ নয়, আমরা চেষ্টা করছি: স্বাস্থ্য সচিব
জানতে চাইলে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. সাইদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘হাসপাতালে যে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেটা স্বাভাবিক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটা কীভাবে চালু করা যায়, চেষ্টা হচ্ছে। আহতদের বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া এবং পুনর্বাসনের দাবির বিষয়টি আমাদের কাছে স্পষ্ট। আমরা চেষ্টা করছি, যাদের বিদেশ যাওয়া প্রয়োজন, যাবে। পুনর্বাসন কমন দাবি, কিন্তু একেকজনের একেকভাবে পুনর্বাসন করতে হবে, কাজটা সহজ নয়। আমরা চেষ্টা করছি।’
মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্তও তো জুলাই আহতরা মানে না, এখন কী করবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিষয়টি সময় নিয়ে ভাবছি। যেহেতু ঈদের ছুটিতে তারা বেশিরভাগ চলে গেছে। এ মুহূর্তে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছি। এটা খুবই সংবেদনশীল ব্যাপার। গত ৪ জুনের ঘটনা আপনারা জানেন, আমরাও জানি। আমরা চেষ্টা করছি, ঈদের পর পরিস্থিতি যেন স্বাভাবিক করা যায়।’
প্রয়োজন সম্মিলিতভাবে কঠিন সিদ্ধান্ত
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একজন কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, ‘জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের বিষয়টি খুবই বিব্রতকর। এ ঘটনায় সারাদেশে মানুষের কাছে নেতিবাচক বার্তা যাচ্ছে। মাত্র কয়েকজন আহতের বিশৃঙ্খল আচরণের কারণে সারাদেশে জুলাই আহত ও পঙ্গুদের ত্যাগ বিতর্কিত হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকার, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং ছাত্র সমন্বয়কদের সমন্বয়ে সম্মিলিতভাবে কঠিন সিদ্ধান্তে আসা দরকার। এভাবে চলতে পারে না। চলতে দেওয়া যায় না।’
ঈদের আগের দিন (৬ জুন) খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি জুলাই আহত ৫৫ জনের মধ্যে মাত্র চারজন এখনো অবস্থান করছেন। তাদের সঙ্গে ভর্তি ছাড়া বহিরাগত আছেন তিনজন। অন্যরা বাড়ি চলে গেছেন। কিন্তু বাড়ি গেলেও তারা রিলিজ নেননি। তারা তাদের সুবিধামতো সময়ে এসে আবার এখানে থাকবেন।
যেভাবে হামলা-মারধরের সূত্রপাত
কর্মস্থলে নিরাপত্তার দাবিতে গত ২৮ মে কর্মবিরতি পালন করেন চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। জরুরি বিভাগ ছাড়া নিয়মিত অস্ত্রোপচার থেকে শুরু করে সব চিকিৎসাসেবা বন্ধ ছিল। যে কারণে সকাল থেকেই হাসপাতালে আসা সাধারণ রোগী ও সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে কর্মীদের কথা কাটাকাটি হয়। বেলা সাড়ে ১১টার পর চিকিৎসক ও রেজিস্ট্রার মাহফুজ আলম বিষয়টি ব্যাখ্যা করে সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালে যাদের পূর্বনির্ধারিত অস্ত্রোপচারের তারিখ ছিল, তাদের পরে ফোনে ডেকে এনে অস্ত্রোপচার করে দেবেন বলে জানান। এতেও সেবাপ্রার্থীরা নিবৃত হননি। তারা হইহুল্লোড় ও হট্টগোল করতে থাকেন। চিকিৎসক ও নার্সদের দিকে তেড়ে যান। এসময় আনসার সদস্যরা নিবৃত করতে গেলে হাতাহাতি হয়। হাসপাতালের কর্মী ও সেবাপ্রার্থীদের মধ্যে মারামারিও হয়।
এরপর পুরো হাসপাতালে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে ভেতরের সব ওয়ার্ডের কলাপসিবল গেট আটকে তালা দিয়ে দেন নিরাপত্তারক্ষীরা। বিষয়টি নিজেদের জন্য আতঙ্কের বা আক্রমণাত্মক হতে পারে—এমন আশঙ্কায় উল্টো তালা ভেঙে জুলাই আহতরা লাঠিসোঁটা ও রড হাতে চিকিৎসক, কর্মী ও সেবাপ্রার্থীদের এলোপাতাড়ি পেটানো শুরু করেন। তাদের সঙ্গে এসে সেই হামলায় যোগ দেন পঙ্গু হাসপাতালে থাকা জুলাই আহতরাও।
এ ঘটনায় চিকিৎসকসহ ১৫ জন আহত হন। এরপর আতঙ্কে চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীদের বেশিরভাগ দ্রুত হাসপাতাল ছেড়ে যান। তাদের কেউ কেউ ভেতরে আটকা পড়লে সেনাসদস্যরা গিয়ে উদ্ধার করেন। এরপরই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম। কার্যত ওইদিন থেকে পুরো হাসপাতাল জুলাই আহতদের দখলে চলে যায়। এরপর থেকে হাসপাতালে যাচ্ছেন না চিকিৎসক-নার্সসহ অন্য কর্মীরা। সেখানে এখন শুধু জুলাই আহতরা অবস্থান করছেন। সরকার রুটিনমাফিক তাদের জন্য খাবার সরবরাহ করছে।
চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর জুলাই আহতদের হামলার অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কোরবান শেখ হিল্লোল বলেন, ‘স্বার্থান্বেষী মানুষ কী বললো এর সঙ্গে সত্যের সংশ্লিষ্টতা নাই। আমরা দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এই হাসপাতালে আছি। আমরা জানি প্রত্যেকটা জায়গায় সিসি ক্যামেরা লাগানো আছে। দ্বিতীয় কথা, এখানে একটা বাহিনী আছে, আনসার বাহিনী, যারা অলটাইম এখানে নিরাপত্তায় থাকে। তৃতীয় কথা হচ্ছে এখানে শেরেবাংলা নগর থানার ওসিসহ যার টিম ছিল তারা আন্দোলনের শুরু থেকে ছিল। তারা আমরা, সবাই মিলে যদি একটা কথা বলে, আর এক গ্রুপ যদি একটা কথা বলে এর কোনো ভিত্তি নেই। এসব বাজে কথার কোনো ভিত্তি নেই।’
প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।
দেবীদ্বারে ক্ষেতমজুর সমিতির সম্মেলন: লিল মিয়া সভাপতি, রোবেল মিয়া সাধারণ সম্পাদক

‘কাজ, মজুরি, জমি ও ইনসাফের লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে’
কাজ, মজুরি, জমি ও ইনসাফের দাবিতে কুমিল্লার দেবীদ্বারে বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতি উপজেলা কমিটির দ্বিবার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে দেবীদ্বার নিউমার্কেট এলাকার একটি স্থানীয় হোটেলে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সম্মেলনে লিল মিয়াকে সভাপতি ও রোবেল মিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করে ১৩ সদস্যের নতুন উপজেলা কমিটি ঘোষণা করা হয়।

আমাদের লড়াই অত্যন্ত পরিষ্কার—আমাদের লড়াই কাজ, মজুরি, জমি, অধিকার এবং ইনসাফের লড়াই। মেহনতি মানুষের জন্য সরকারি রেশনিং ব্যবস্থা চালু করে ন্যায্যমূল্যে খাদ্যপণ্য নিশ্চিত করতে হবে।
নবগঠিত কমিটির সহ-সভাপতি হয়েছেন তজুমদ্দিন মিয়া ও ফাতেমা বেগম। সহ-সাধারণ সম্পাদক বাবুল মিয়া, সাংগঠনিক সম্পাদক আজাদ কামাল এবং সদস্য হিসেবে রয়েছেন নাছিমা, কামাল উদ্দিন, বাদল মিয়া, মালু মিয়া, আব্দুল গফুর, নাছিমা বেগম ও নাজির মিয়া।
তজুমদ্দিন মিয়ার সভাপতিত্বে এবং মালু মিয়ার সঞ্চালনায় সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি কমরেড পরেশ কর।
সম্মেলনে ক্ষেতমজুরদের বিভিন্ন দাবি ও অধিকার নিয়ে আলোচনা করেন ক্ষেতমজুর নেতা জালাল উদ্দিন, আব্দুল গফুর ও নাছিমা আক্তার।
সংহতি জানিয়ে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সিপিবি কুমিল্লা জেলা কমিটির সাবেক সভাপতি কমরেড এবিএম আতিকুর রহমান বাশার, সিপিবি জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য কমরেড সুধাংশু কুমার নন্দী, ‘নিজেরা করি’ সংস্থার বিভাগীয় সংগঠক আব্দুল জব্বার, কৃষক সমিতির জেলা নেতা আব্দুল ওয়াদুদ এবং ছাত্র ইউনিয়ন কুমিল্লা জেলা সভাপতি দীপ্ত দেবনাথসহ অন্যরা।
সম্মেলনে বক্তারা সারাদেশে রেশনিং ব্যবস্থা চালুর দাবি জানান। তারা দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য ৫ টাকা দরে আটা ও লবণ, ৩০ টাকা দরে তেল ও ডাল এবং ১৫ টাকা দরে চিনি সরবরাহের দাবি জানান।
বক্তারা বলেন, গ্রামীণ অঞ্চলের ক্ষেতমজুর ও শ্রমজীবী মানুষ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির চাপে জীবনযাপন করছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও তাঁদের আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। তাই ন্যায্য মজুরি, কাজের নিশ্চয়তা ও শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে কমরেড পরেশ কর বলেন, দেশের খেটে খাওয়া মানুষ, ক্ষেতমজুর ও শ্রমজীবী সমাজ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে, সেই তুলনায় গ্রামীণ মেহনতি মানুষের আয় বাড়ছে না।
তিনি বলেন, “আজকের এই মঞ্চ থেকে আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি—অনতিবিলম্বে সারাদেশে সরকারি রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। দেশের দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য ৫ টাকা দরে আটা ও লবণ, ৩০ টাকা দরে তেল ও ডাল এবং ১৫ টাকা দরে চিনি নিশ্চিত করতে হবে। এটি কোনো দয়া নয়, এটি মেহনতি মানুষের অধিকার।”
সম্মেলন শেষে নতুন কমিটির নেতারা ক্ষেতমজুরদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
কৃষকের কান্না আদালতে পৌঁছাল আবুল কালাম আজাদের হাত ধরে, মুরাদনগরে ড্রেজার বন্ধে হাইকোর্টের নির্দেশ

মুরাদনগরে ড্রেজার সন্ত্রাস: কৃষিজমি গিলে খাচ্ছে বালুখেকো চক্র, হাইকোর্টের নির্দেশে এবার প্রশাসনের কঠিন পরীক্ষা
রিট নং ১৪১০৮/২০২২ ঘিরে নতুন করে আলোচনায় কৃষিজমি রক্ষা | ক্ষতিগ্রস্ত জমির তালিকা, দাগ নম্বরসহ আবেদন চেয়েছেন আইনজীবী | মাঠে অভিযান ও জমি ভরাটের দাবি
কোথাও ধানক্ষেত। কোথাও সরিষার হলুদ চাদর। আবার কোথাও সবুজ সবজির মাঠ। কয়েক বছর আগেও এসব জমিই ছিল মুরাদনগরের কৃষকের জীবিকা, পরিবারের খাবার এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। এখন সেই জমির বুক চিরে তৈরি হয়েছে গভীর গর্ত। কোথাও ফসলি জমির একাংশ ধসে পড়েছে, কোথাও পাশের জমিও রয়েছে ভাঙনের ঝুঁকিতে।
অভিযোগের তীর একটি চক্রের দিকে—অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু ও মাটি উত্তোলনকারী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি মহলের ছত্রচ্ছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে উপজেলার বিভিন্ন বিল, চক ও কৃষিজমিতে ড্রেজার বসিয়ে মাটি-বালু উত্তোলন করা হয়েছে। কোথাও জমি চুক্তিতে নেওয়া হয়েছে, কোথাও কৃষকদের নানা প্রলোভন দেখানো হয়েছে। আবার কোথাও প্রতিবাদ করতে গিয়ে কৃষককে ভয়ভীতি বা হুমকির মুখে পড়তে হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মুরাদনগরের কৃষিজমি রক্ষা এবং অবৈধ ড্রেজিং বন্ধে দায়ের করা রিট পিটিশন নং ১৪১০৮/২০২২ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
রিটকারী পক্ষের আইনজীবী ও কৃষি ও পরিবেশ ফাউন্ডেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. আবুল কালাম আজাদ (উজ্জল) সম্প্রতি এক ভিডিও বার্তায় দাবি করেছেন, হাইকোর্টের নির্দেশনার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন, অবৈধ ড্রেজারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জমির তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম চলছে।
তবে প্রশ্ন এখন একটাই—আদালতের নির্দেশ কাগজে থাকবে, নাকি মুরাদনগরের মাঠেও তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাবে?
ড্রেজারের পাইপে উধাও কৃষকের জমি
মুরাদনগরের কৃষিজমিতে ড্রেজিংয়ের অভিযোগ নতুন নয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রথমে একটি জমির মালিককে রাজি করানো হয়। এরপর সেখানে বসানো হয় ড্রেজার। মাটির নিচ থেকে বালু ও মাটি তুলে অন্যত্র সরবরাহ করা হয়।
কিন্তু বিপদ শুরু হয় তখনই, যখন একটি জমির গভীর থেকে মাটি তুলে নেওয়ার কারণে পাশের জমির মাটি দুর্বল হয়ে পড়ে।
কৃষকদের অভিযোগ, একপর্যায়ে পাশের জমির আইল ভেঙে যায়। জমির অংশবিশেষ ধসে পড়ে ড্রেজারের তৈরি গর্তে। এভাবে একটি জমির পর আরেকটি জমি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে কৃষককে পরে বলা হয়—জমি বিক্রি করে দিন, না হলে আরও ক্ষতি হবে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি কেবল অবৈধ বালু উত্তোলন, নাকি পরিকল্পিতভাবে কৃষিজমিকে অকার্যকর করে ফেলার একটি অর্থনৈতিক চক্র?
টপসয়েল হারালে ফিরে আসে না কৃষিজমির প্রাণ
কৃষিজমির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো উপরিভাগের উর্বর মাটি বা টপসয়েল। দীর্ঘ সময় ধরে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হওয়া এই স্তরে কৃষি উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জৈব উপাদান ও পুষ্টি থাকে।
ড্রেজিং কিংবা নির্বিচারে মাটি কেটে নেওয়ার ফলে শুধু একটি গর্ত তৈরি হয় না; নষ্ট হয় জমির স্বাভাবিক গঠন।
গভীরভাবে মাটি কেটে ফেললে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, আশপাশের জমির স্থিতিশীলতা এবং স্থানীয় পরিবেশেও প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থাৎ আজ যে জমি থেকে কয়েক হাজার বা কয়েক লাখ টাকা আয় হচ্ছে, সেই জমি আগামী দিনের কৃষি উৎপাদনের জন্য কতটা সক্ষম থাকবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
হাইকোর্টে গড়াল মুরাদনগরের কৃষকের লড়াই
কৃষিজমি রক্ষার দাবিতে কৃষি ও পরিবেশ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়।
রিট পিটিশনটির নম্বর ১৪১০৮/২০২২।
রিটে কৃষি, ভূমি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি কুমিল্লা জেলা প্রশাসন, মুরাদনগর উপজেলা প্রশাসন, সহকারী কমিশনার (ভূমি), কুমিল্লা পুলিশ সুপার এবং মুরাদনগর ও বাংগরা বাজার থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পক্ষভুক্ত করা হয়েছে বলে রিটকারী পক্ষ জানিয়েছে।
রিটকারী আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, মুরাদনগরের কৃষিজমিতে অনুমোদনহীনভাবে ড্রেজিং, মাটি ও বালু উত্তোলন এবং এর ফলে কৃষিজমির ক্ষতি বন্ধে আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়।
এরপর আদালতের নির্দেশনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক পর্যায়ে শুরু হয় বিভিন্ন কার্যক্রম।
আদালতের নির্দেশ—এবার মাঠে বাস্তবায়নের পালা
রিটকারী পক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, হাইকোর্টের নির্দেশনায় মুরাদনগর ও বাংগরা বাজার থানার আওতাধীন এলাকায় অবৈধ ড্রেজিং বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমি পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত জমির তথ্য সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদন দেওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
এখানেই শেষ নয়।
আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মাঠ প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা।
কারণ, আদালতের আদেশ যদি মাঠে কার্যকর না হয়, তাহলে কাগজে যত কঠোর নির্দেশই থাকুক, কৃষকের জমি রক্ষা করা কঠিন।
প্রশাসনের সামনে তিন বড় প্রশ্ন
মুরাদনগরের কৃষিজমি রক্ষায় এখন প্রশাসনের সামনে অন্তত তিনটি বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে।
১. কোথায় কোথায় ড্রেজার চলছে?
শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না। উপজেলার কোন ইউনিয়নের কোন মৌজায়, কোন দাগে এবং কার মালিকানাধীন জমিতে ড্রেজার চলছে—তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রয়োজন।
২. কত জমি ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত?
কত বিঘা জমি কাটা হয়েছে, কত জমি ধসে গেছে, কত জমি বর্তমানে ঝুঁকিতে রয়েছে—তার নির্ভুল হিসাব ছাড়া ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের কার্যকর পরিকল্পনা করা কঠিন।
৩. বন্ধ হওয়ার পর আবার ড্রেজার বসছে কি না?
অভিযানের পর রাতের আঁধারে আবার ড্রেজার চালু হলে আগের সব অভিযানই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
তাই শুধু ড্রেজারের পাইপ কেটে দেওয়া নয়, পুনরায় যাতে ড্রেজার বসাতে না পারে সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই হবে প্রশাসনের বড় পরীক্ষা।
কৃষকদের প্রতি অ্যাডভোকেট আজাদের আহ্বান
রিটকারী আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আবুল কালাম আজাদ (উজ্জল) তাঁর ভিডিও বার্তায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রশাসনের কাছে লিখিতভাবে তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তাঁর মতে, শুধু আদালতের নির্দেশ থাকলেই সমস্যার সমাধান হবে না। মাঠপর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তথ্যও প্রশাসনের হাতে পৌঁছাতে হবে।
তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আবেদনে জমির খতিয়ান, দাগ নম্বর ও মৌজার নাম উল্লেখ করার পরামর্শ দিয়েছেন।
শুধু যে জমিতে ইতোমধ্যে গর্ত হয়েছে, তা নয়—ড্রেজিংয়ের কারণে পাশের জমি ধসে পড়ার আশঙ্কা থাকলেও প্রশাসনকে জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
এতে প্রশাসনের পক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ জমিগুলো চিহ্নিত করা সহজ হবে।
কৃষকের আর্তনাদ: ‘জমি গেল, এখন বাঁচার উপায় কী?’
মুরাদনগরের বিভিন্ন এলাকায় ড্রেজিংয়ের কারণে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
একাধিক কৃষকের ভাষ্য, প্রথমে তারা বিষয়টিকে সাধারণ বালু উত্তোলন হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু ড্রেজার দিয়ে গভীরভাবে মাটি কাটার পর যখন পাশের জমিতে ফাটল ও ধস দেখা দেয়, তখন পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারেন তারা।
এক কৃষকের ভাষায়—
“জমির পাশে গভীর করে মাটি কাটার পর আমার জমিটাও ধসে পড়েছে। জমি থাকলেও এখন সেখানে আগের মতো চাষ করা যায় না। আমরা চাই প্রশাসন বিষয়টি সরেজমিনে দেখে ব্যবস্থা নিক।”
আরেক কৃষকের অভিযোগ, ড্রেজিংয়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে তারা চাপ ও ভয়ভীতির মুখে পড়েছেন।
তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি ঘটনার স্বাধীন তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
‘বালুখেকো’ চক্রের অর্থনীতি কত বড়?
একটি ড্রেজার মানেই শুধু একটি মেশিন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে পাইপলাইন, শ্রমিক, পরিবহন, বালু বিক্রির বাজার এবং অর্থের লেনদেন।
ফলে কৃষিজমি থেকে অবৈধভাবে বালু বা মাটি উত্তোলনের পেছনে যদি সংঘবদ্ধ কোনো চক্র সক্রিয় থাকে, তাহলে কেবল একজন ড্রেজার মালিককে আটক করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
প্রশ্ন উঠবে—
কে জমি দিচ্ছে?
কে ড্রেজার বসাচ্ছে?
কারা বালু পরিবহন করছে?
কারা বালু কিনছে?
কারা এই কর্মকাণ্ডকে প্রভাব খাটিয়ে টিকিয়ে রাখছে?
এই পুরো চেইন শনাক্ত করা না গেলে অবৈধ ড্রেজিং বন্ধ করা কঠিন।
রাতের আঁধারের ড্রেজার বন্ধে পুলিশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ
স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের বেলায় প্রশাসনের তৎপরতা থাকলেও অনেক সময় রাতের আঁধারে ড্রেজার চালানোর চেষ্টা করা হয়।
তাই নিয়মিত নজরদারি ও টহল জোরদার করার দাবি উঠেছে।
মুরাদনগর ও বাংগরা বাজার থানা এলাকায় সন্দেহজনক ড্রেজিং কার্যক্রমের খবর পেলে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো, সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।
তবে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রত্যেকটি গ্রেপ্তার, জব্দ, জরিমানা বা মামলা সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া ও প্রমাণের ভিত্তিতেই হতে হবে।
জমি ভরাটের প্রশ্নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
ড্রেজিং করে জমি নষ্ট করার পর শুধু ড্রেজার বন্ধ করলেই কৃষকের ক্ষতি পূরণ হয় না।
যে জমিতে ৩০-৪০ ফুট বা তারও বেশি গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে, সেটি কীভাবে নিরাপদভাবে ভরাট হবে—সেটিও বড় প্রশ্ন।
কারণ অপরিকল্পিতভাবে মাটি ফেলে গর্ত ভরাট করলেও কৃষিজমির আগের উর্বরতা ফিরতে সময় লাগতে পারে।
তাই ক্ষতিগ্রস্ত জমি পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন—
- ক্ষতিগ্রস্ত জমির বৈজ্ঞানিক জরিপ;
- দাগভিত্তিক তালিকা তৈরি;
- গর্তের গভীরতা ও আয়তন নির্ধারণ;
- নিরাপদ উপায়ে ভরাট;
- উপরিভাগে উর্বর মাটি সংরক্ষণ;
- কৃষকের জমি পুনরায় চাষযোগ্য করার পরিকল্পনা।
ইউনিয়ন পর্যায়েও জবাবদিহি দরকার
একটি উপজেলায় শত শত ড্রেজার বসানো হয়েছে—এমন অভিযোগ যদি সত্য হয়, তাহলে শুধু উপজেলা প্রশাসন বা পুলিশের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না।
ইউনিয়ন পরিষদ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ভূমি প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, পুলিশ এবং স্থানীয় জনগণ—সব পক্ষের সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন।
প্রতিটি ইউনিয়নে কৃষিজমির ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে নিয়মিত নজরদারি চালানো যেতে পারে।
কোনো এলাকায় নতুন করে ড্রেজার বসলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসনকে জানানো এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যবস্থাও কার্যকর করা দরকার।
কৃষকের সাময়িক লাভ, দীর্ঘমেয়াদে সর্বনাশ
ড্রেজার মালিকদের কাছে জমি দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক কৃষক হয়তো তাৎক্ষণিক আর্থিক সুবিধার কথা বিবেচনা করেন।
কিন্তু একটি জমির উর্বরতা নষ্ট হলে শুধু ওই বছরের ফসল নয়, বহু বছরের কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আজ কয়েক হাজার টাকা পাওয়ার বিনিময়ে জমি কেটে ফেললে আগামীতে সেই জমি থেকেই হয়তো পরিবারের খাদ্য, আয় ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা পাওয়া যাবে না।
তাই কৃষকদেরও সচেতন হতে হবে।
জমি একবার গভীরভাবে কেটে ফেললে টাকা দিয়ে সবসময় তার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।
হাইকোর্টের নির্দেশ: মুরাদনগরের জন্য শুধু আইনি লড়াই নয়, বাস্তব পরীক্ষাও
রিট পিটিশন নং ১৪১০৮/২০২২ মুরাদনগরের কৃষিজমি রক্ষার আলোচনাকে আদালতের কাঠগড়ায় নিয়ে গেছে।
কিন্তু আদালতের নির্দেশনার প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে তার বাস্তবায়নের ওপর।
প্রশাসন যদি নিয়মিত অভিযান চালায়, ক্ষতিগ্রস্ত জমির পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে, অবৈধ ড্রেজিং বন্ধ করে এবং আইন অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়—তাহলেই কৃষকের আস্থা ফিরবে।
অন্যদিকে অভিযান কয়েকদিন পর থেমে গেলে কিংবা রাতের আঁধারে আবার ড্রেজার চালু হলে পুরো উদ্যোগই ব্যর্থ হয়ে যাবে।
‘মুরাদনগরের মাটি বিক্রি হতে দেওয়া যাবে না’
অ্যাডভোকেট মো. আবুল কালাম আজাদ (উজ্জল) তাঁর বক্তব্যে মুরাদনগরের কৃষিজমি রক্ষায় সাধারণ মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন—
“শুধু আইনি নোটিশ আর হাইকোর্টের কাগজ দিয়ে জমি রক্ষা হবে না, যদি না কৃষকেরা মাঠপর্যায়ে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেন।”
তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাগ নম্বরসহ প্রশাসনের কাছে আবেদন করার আহ্বান জানান।
তাঁর বক্তব্যের মূল বার্তা হলো—আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের তথ্য, প্রশাসনিক তৎপরতা এবং কৃষকদের সম্মিলিত প্রতিরোধই পারে কৃষিজমি রক্ষা করতে।
এখন নজর মুরাদনগর প্রশাসনের দিকে
মুরাদনগরের কৃষিজমি রক্ষার এই লড়াই এখন আর শুধু কৃষকের ব্যক্তিগত সমস্যা নয়।
এটি ভূমি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ, খাদ্য নিরাপত্তা, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনের শাসনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
একটি জমি নষ্ট হওয়া হয়তো একটি পরিবারের ক্ষতি। কিন্তু শত শত জমি নষ্ট হলে তা পুরো উপজেলার কৃষি অর্থনীতিতে আঘাত হানতে পারে।
তাই এখন প্রয়োজন ড্রেজার বন্ধের পাশাপাশি ড্রেজার সন্ত্রাসের অর্থনৈতিক ও প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা।
প্রয়োজন ক্ষতিগ্রস্ত জমির নির্ভুল তালিকা।
প্রয়োজন কৃষকদের অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা।
প্রয়োজন নিয়মিত পুলিশি ও প্রশাসনিক নজরদারি।
এবং সর্বোপরি প্রয়োজন—আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে কোনো ধরনের শিথিলতা না দেখানো।
শেষ কথা
মুরাদনগরের মাঠে এখন যে গর্তগুলো দেখা যাচ্ছে, সেগুলো শুধু মাটির গর্ত নয়; এগুলো কৃষকের নিরাপত্তাহীনতা, প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নের প্রতীক।
একদিকে ড্রেজার ব্যবসায়ীদের দ্রুত মুনাফা, অন্যদিকে কৃষকের প্রজন্মের পর প্রজন্মের সম্পদ—কৃষিজমি।
এই দুইয়ের লড়াইয়ে কে জিতবে, তার উত্তর নির্ভর করছে এখনকার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর।
হাইকোর্টের নির্দেশনা যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, ক্ষতিগ্রস্ত জমি পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং অবৈধ ড্রেজিংয়ের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা অব্যাহত থাকে, তাহলে মুরাদনগরের কৃষকের জন্য এটি হতে পারে নতুন আশার সূচনা।
আর যদি আদালতের নির্দেশ কেবল ফাইলের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ড্রেজারের পাইপ আরও গভীরে যাবে—আর মুরাদনগরের কৃষিজমি আরও একটু করে হারিয়ে যাবে।
মুরাদনগরের কৃষিজমি বাঁচাতে এখন আর শুধু প্রতিশ্রুতি নয়—দরকার দৃশ্যমান অভিযান, জবাবদিহি এবং কঠোর আইনের প্রয়োগ।
‘আমেরিকার দাসত্বের চুক্তি’ বাতিল না হলে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি সিপিবির

‘আমেরিকার সঙ্গে ইউনূস সরকারের দাসত্বমূলক চুক্তি বাতিল করুন’
দেবীদ্বারে সিপিবির মানববন্ধনে কমরেড পরেশ কর
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক সম্পাদিত কথিত গোপন ও সার্বভৌমত্ববিরোধী চুক্তি বাতিলের দাবিতে কুমিল্লার দেবীদ্বারে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৫টায় দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের নিউমার্কেট এলাকা প্রদক্ষিণ করে মুক্তিযুদ্ধ চত্বরের স্বাধীনতা স্তম্ভের পাদদেশে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

আমেরিকার সঙ্গে সম্পাদিত দাসত্বমূলক ও দেশবিরোধী চুক্তি অনতিবিলম্বে বাতিল করতে হবে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কোনোভাবেই বিদেশি স্বার্থের কাছে বন্ধক রাখা যাবে না।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড পরেশ কর বলেন, “ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কারের নামে দেশে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করেছিল। দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে তাড়াহুড়ো করে মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় একটি অসম ও দেশবিরোধী চুক্তি করা হয়েছে। তাঁর দাবি, এই চুক্তির মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে বন্ধক রাখার পথ তৈরি হয়েছে।
কমরেড পরেশ কর আরও বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এমন কোনো আইনি বা নৈতিক এখতিয়ার থাকা উচিত ছিল না, যার মাধ্যমে দেশের দীর্ঘমেয়াদি নীতি ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো চুক্তি করা যায়।
স্বাস্থ্য খাতে সংস্কারের প্রসঙ্গ তুলে তিনি পূর্ববর্তী প্রশাসনের ব্যর্থতারও সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, টিকা সংকটসহ বিভিন্ন অব্যবস্থাপনার কারণে দেশে মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে এবং চার শতাধিক শিশুর মৃত্যুর মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমান নির্বাচিত সংসদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সিপিবির এই নেতা বলেন, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভূ-রাজনৈতিক স্বকীয়তা রক্ষায় জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। অন্যথায় ছাত্র, শ্রমিক ও সাধারণ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে আরও তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
এ সময় তিনি রংপুরের শিক্ষক গণপতি তর্কবর্ত্তীসহ তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার দ্রুত বিচার, গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সারের সরবরাহ বাড়িয়ে দাম কমানোর দাবি জানান।
সিপিবি দেবীদ্বার উপজেলা সভাপতি কমরেড আব্দুল ওয়াদুদের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন সিপিবি কুমিল্লা জেলার সাবেক সভাপতি কমরেড আবুল বাশার, জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি কমরেড সুধাংশু কুমার নন্দী, ছাত্র ইউনিয়ন জেলা সভাপতি দীপ্ত দেবনাথসহ দলের নেতারা।



























