

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ এবার আবারো সাংবাদিক সমাজের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। ৪ জুন (বুধবার) দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া একটি স্ট্যাটাসে তিনি সাংবাদিকদের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে সাংবাদিকদের ‘সরকারঘেঁষা’ অবস্থান এবং তথাকথিত ‘মিডিয়া সন্ত্রাস’-এর অভিযোগ।
ফেসবুক স্ট্যাটাসে হাসনাত আবদুল্লাহ লিখেছেন—
“অথচ এই সাংবাদিকরাই যদি ৫ই আগস্ট না হতো, জুলাই অভ্যুত্থান ব্যর্থ হতো, তাহলে তার পেছনে নিজেদের ভূমিকাকে সাহসী সাংবাদিকতা দাবি করে হাসিনার কদমবুচি করতে করতে পুরস্কার নিতে ছুটে যেত।”
তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, অতীতে কোনো রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটলে সাংবাদিকদের একটি অংশ নিজেদের প্রচার করতে পছন্দ করেন এবং ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে পুরস্কার পাওয়ার আশায় থাকে।
স্ট্যাটাসে আরও লেখা হয়েছে—
“এই হাসিনার মিডিয়া সন্ত্রাস সবার ওপরই চেপে বসবে—আজ আমার ওপর, কাল আপনার ওপর।”
তিনি একে শুধুমাত্র সাংবাদিকতার পক্ষপাতিত্ব নয় বরং ক্ষমতাসীনদের একপ্রকার ‘প্রপাগান্ডা যন্ত্র’ হিসেবেও উপস্থাপন করেছেন। তার মতে, মতপ্রকাশ ও রাজনৈতিক বিরোধিতা দমনে রাষ্ট্র বর্তমানে সংবাদমাধ্যমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণাঞ্চলে এনসিপি-সমর্থিত কর্মসূচিতে সরকারি বাধা এবং মিডিয়ায় সেই প্রতিবেদন না আসার কারণে হাসনাতের মধ্যে ক্ষোভ জমে থাকতে পারে। স্থানীয় সাংবাদিকদের অনেকেই এনসিপির সংবাদ কাভার করেন না বলে দলীয় নেতাকর্মীরা অভিযোগ করে আসছেন।
একজন ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, হাসনাত সম্প্রতি একাধিক বড় কর্মসূচি দিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়াতে চাচ্ছিলেন, কিন্তু মূলধারার কোনো টিভি চ্যানেল কিংবা জাতীয় দৈনিক তাতে গুরুত্ব দেয়নি।
হাসনাত আবদুল্লাহর আবারো এরকম স্ট্যাটাস ইতোমধ্যেই সাংবাদিকদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের এক প্রবীণ সাংবাদিক বলেন—
“কোনো রাজনৈতিক নেতার এভাবে গোটা সাংবাদিক সমাজকে দায়ী করা গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা নানা চাপের মাঝেও পেশাগত দায়িত্ব পালন করি। তবে সমালোচনার জায়গা থাকতেই পারে।”
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) এক নেতা বলেন—
“প্রেসকে আক্রমণ না করে বরং রাজনৈতিক নেতাদের উচিত তাদের বক্তব্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করা। মিডিয়ার স্বাধীনতা রক্ষায় সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান বলেন—
“এই ধরনের স্ট্যাটাস রাজনৈতিক বক্তব্য হলেও তা থেকে বোঝা যায়, গণমাধ্যমের ওপর আস্থাহীনতা এবং রাজনৈতিক বিকল্পদের প্রতি মিডিয়ার অবহেলা নিয়ে অনেক নেতাই ক্ষুব্ধ। এটি গণতান্ত্রিক পরিবেশে মিডিয়া-পলিটিকস সম্পর্কের সংকটকে তুলে ধরছে।”
তিনি আরও বলেন, “এই টানাপোড়েন মিডিয়া স্বাধীনতার জন্য যেমন হুমকি, তেমনি অপারদর্শিতা ও পক্ষপাতমূলক সাংবাদিকতার প্রশ্নও সামনে আনে।”
এখন পর্যন্ত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) হাসনাত আবদুল্লাহর মন্তব্য সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। তবে দলটির এক কেন্দ্রীয় নেতা জানিয়েছেন, “এটি তার ব্যক্তিগত স্ট্যাটাস, দলীয় অবস্থান নয়।”
উপসংহার
হাসনাত আবদুল্লাহর ফেসবুক স্ট্যাটাস শুধু একটি ক্ষোভপ্রকাশ নয়; বরং এটি রাজনৈতিক দল ও সাংবাদিক সমাজের সম্পর্কের এক নতুন সংকট নির্দেশ করে। ক্ষমতাসীনদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া রাজনীতিকদের অভিযোগ এবং সাংবাদিকদের স্বাধীনতা রক্ষার চ্যালেঞ্জ—দুইয়ের মধ্যকার সুষম সমীকরণ খুঁজে পাওয়া আজ সময়ের দাবি।