ঘটনাস্থলে না থেকেও আসামি করার দাবি
মুরাদনগরে ‘গায়েবি মিছিল’ দেখিয়ে ৭৪ জনকে আসামি করে পুলিশের মামলা, ফুঁসে উঠছে জনতা

যে মিছিল দেখেনি কেউ, সেই মিছিলের মামলায় ৭৪ আসামি! উত্তাল মুরাদনগর। ছবি : আজকের কথা
মুরাদনগর থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলাকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। মামলায় নাম থাকা ব্যক্তিদের দাবি, এজাহারে বর্ণিত তারিখ, সময় ও স্থানে কোনো মিছিল, সমাবেশ বা সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেনি। তাদের ভাষ্য, মামলার আসামিদের অনেকেই মামলা দায়েরের পর জানতে পেরেছেন যে ওই দিন মুরাদনগরে কথিত একটি মিছিল হয়েছে বলে অভিযোগ আনা হয়েছে। ফলে মামলাটিকে তারা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও রাজনৈতিক হয়রানিমূলক বলে দাবি করছেন।
কুমিল্লার মুরাদনগর থানায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি মামলাকে ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য, আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। মামলায় নাম থাকা নেতাকর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, এটি একটি সম্পূর্ণ ‘গায়েবি’, ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে এবং বিরোধী মতের নেতাকর্মীদের হয়রানি করতেই এ মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে দাবি তাদের।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ৮ জুন মুরাদনগর থানার এসআই (নিরস্ত্র) মো. মহিন উদ্দিন বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ২৪ জন নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ৪০ থেকে ৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়, গত ৫ জুন ভোর আনুমানিক ৬টা ৫৫ মিনিটে মুরাদনগর উপজেলার ১৪ নম্বর নবীপুর পূর্ব ইউনিয়নের বাখরা নগর এলাকায় কুমিল্লা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের সিএন্ডবি ব্রিজ সংলগ্ন স্থানে কয়েকজন ব্যক্তি সংঘবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রবিরোধী স্লোগান দেয়, সড়কে যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে এবং জনমনে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করে।
ঘটনাস্থলে না থেকেও আসামি করার অভিযোগ; নিরপেক্ষ তদন্ত ও মামলা প্রত্যাহারের দাবি
তবে মামলায় অভিযুক্ত নেতাকর্মীদের দাবি, উল্লিখিত তারিখ, সময় ও স্থানে এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তাদের ভাষ্য, মহাসড়কের মতো ব্যস্ত এলাকায় এমন ঘটনা ঘটলে তা সাধারণ মানুষের নজর এড়ানোর সুযোগ নেই। অথচ ওই দিন ওই এলাকায় কোনো ধরনের মিছিল, সমাবেশ বা সড়ক অবরোধের ঘটনা কেউ প্রত্যক্ষ করেননি।
মামলার অন্যতম আসামি এবং কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সৈয়দ তানভীর আহমেদ ফয়সাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে মামলার অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, ঘটনার দিন তিনি কুমিল্লায় ছিলেন না।
ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেন, “৪ জুন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৫টা ৩০ মিনিটে মহানগর গোধূলি ট্রেনে কুমিল্লা থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হই। ভৈরব স্টেশনে দুই পক্ষের সংঘর্ষের কারণে গভীর রাতে বিমানবন্দর রেলস্টেশনে পৌঁছাই। রাত ৪টার দিকে বাসায় প্রবেশ করি। পরদিন কন্যা সন্তানের চিকিৎসা নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত ছিলাম। এরপর ৬ জুন বিকেলে ঢাকায় থেকে কুমিল্লায় ফিরে আসি। অথচ ৫ জুন সকালে মুরাদনগরে অবস্থান করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগ এনে আমাকে মামলার এক নম্বর আসামি করা হয়েছে। এটি রাজনৈতিক দৈন্যতার জ্বলন্ত উদাহরণ।”
তিনি আরও দাবি করেন, ঘটনার দিন মুরাদনগরে কোনো মিছিল হয়নি বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন মহল থেকেও মন্তব্য করা হয়েছিল। এরপরও তার নাম মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
মামলায় যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছ
এজাহার অনুযায়ী মামলায় ২৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন—
১. সৈয়দ তানভীর আহমেদ ফয়সাল (৪৬), পিতা- মৃত সৈয়দ সেলিম, সাং- আন্দিকুট, থানা- বাঙ্গরা বাজার, জেলা- কুমিল্লা।
২. শরিফুল ইসলাম শরিফ (৩৭), পিতা- নান্নু মিয়া, সাং- পূর্ব জাঙ্গাল, ০২নং ওয়ার্ড, থানা- বাঙ্গরা বাজার, জেলা- কুমিল্লা।
৩. আবুল কাশেম (৩৫), পিতা- মোহাম্মদ নূরু মিয়া, সাং- ফুলঘর, ০৭নং ওয়ার্ড, থানা- বাঙ্গরা বাজার, জেলা- কুমিল্লা।
৪. ভুট্টু মিয়া (৪৮), পিতা- মৃত রেহমত মিয়া, সাং- আন্দিকুট, ০৩নং ওয়ার্ড, থানা- বাঙ্গরা বাজার, জেলা- কুমিল্লা।
৫. হানিফ বাদশা (৫৫), পিতা- মৃত আকরম আলী মাস্টার, সাং- আন্দিকুট, ০৩নং ওয়ার্ড, থানা- বাঙ্গরা বাজার, জেলা- কুমিল্লা।
৬. কাউছার মোল্লা (৪১), পিতা- কাশেম মোল্লা, সাং- পাক দেওড়া, ০৪নং ওয়ার্ড, থানা- বাঙ্গরা বাজার, জেলা- কুমিল্লা।
৭. মোতাহার হোসেন মোল্লা (৪২), ধর্মবিষয়ক সম্পাদক, কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগ, জেলা- কুমিল্লা।
৮. সোহেল মুন্সী (৪০), পিতা- মালেক মুন্সী, সাং- পাক দেওড়া, ০৪নং ওয়ার্ড, থানা- বাঙ্গরা বাজার, জেলা- কুমিল্লা।
৯. ওসমান বাছর (৪২), পিতা- বাবরু মিয়া, সাং- পাক দেওড়া, ০৪নং ওয়ার্ড, থানা- বাঙ্গরা বাজার, জেলা- কুমিল্লা।
১০. হাবিব উল্লাহ মুন্সি (২০), পিতা- লিটন মাস্টার, সাং- পাক দেওড়া, ০৪নং ওয়ার্ড, থানা- বাঙ্গরা বাজার, জেলা- কুমিল্লা।
১১. জাফিল হোসেন (৪৩), পিতা- মৃত আমীর আলী, সাং- জাভড়া, ০১নং ওয়ার্ড, থানা- বাঙ্গরা বাজার, জেলা- কুমিল্লা।
১২. জসিম উদ্দিন (৪০), পিতা- মৃত করিম মিয়া, সাং- জাভড়া, ০১নং ওয়ার্ড, থানা- বাঙ্গরা বাজার, জেলা- কুমিল্লা।
১৩. মশিউর রহমান (৩৫), পিতা- মৃত আলিম মাস্টার, সাং- জাভড়া, ০১নং ওয়ার্ড, থানা- বাঙ্গরা বাজার, জেলা- কুমিল্লা।
১৪. সেলিম মিয়া (৪০), পিতা- রবি উল্লাহ, সাং- জাভড়া, ০১নং ওয়ার্ড, থানা- বাঙ্গরা বাজার, জেলা- কুমিল্লা।
১৫. পাপন মিয়া (৩৮), পিতা- সিরাজ মিয়া, সাং- জাভড়া, ০১নং ওয়ার্ড, থানা- বাঙ্গরা বাজার, জেলা- কুমিল্লা।
১৬. ফজলু মিয়া (৪৫), পিতা- মৃত কিতাব আলী, সাং- জাভড়া, ০১নং ওয়ার্ড, থানা- বাঙ্গরা বাজার, জেলা- কুমিল্লা।
১৭. জাহিদুল ইসলাম জানু (৪৮), পিতা- মৃত রহিদ মিয়া, সাং- পূর্ব জাঁদাল, ০২নং ওয়ার্ড, থানা- বাঙ্গরা বাজার, জেলা- কুমিল্লা।
১৮. আমান উল্লাহ পারভেজ (৩০), পিতা- আবুল হাসেম, সাং- দারোরা (উত্তর পাড়া), ০১নং ওয়ার্ড, থানা- মুরাদনগর, জেলা- কুমিল্লা।
১৯. আজিজুল হক (৩৬), পিতা- মৃত আব্দুল বারেক, সাং- রহিমপুর, থানা- মুরাদনগর, জেলা- কুমিল্লা।
২০. সাইফুল ইসলাম রাজিব (৫৫), পিতা- আকমত আলী, সাং- পরমতলা (রহমান মেম্বার বাড়ি), থানা- মুরাদনগর, জেলা- কুমিল্লা।
২১. রুবেল (২৮), পিতা- মৃত মোসলেম, সাং- পরমতলা (ছলমুদ্দিন বাড়ি), থানা- মুরাদনগর, জেলা- কুমিল্লা।
২২. ফয়সাল (৩৫), পিতা- নুরুল ইসলাম ধনু, সাং- পরমতলা বকশী বাড়ি, ০২নং ওয়ার্ড, থানা- মুরাদনগর, জেলা- কুমিল্লা।
২৩. অলিউল্লাহ মোল্লা (৫০), পিতা- আব্দুস সালাম, সাং- পাক দেওড়া, থানা- বাঙ্গরা বাজার, জেলা- কুমিল্লা।
২৪. জুয়েল (২৮), পিতা- শামসু মিয়া, সাং- রহিমপুর, থানা- মুরাদনগর, জেলা- কুমিল্লা।
এছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ৪০ থেকে ৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে নাম থাকা অধিকাংশ ব্যক্তি বাঙ্গরা বাজার ও মুরাদনগর এলাকার বিভিন্ন গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা এবং স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে।
অভিযুক্তদের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, মামলার পর থেকে এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেক পরিবার অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। মামলা ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় অনেকে বাড়িঘরে স্বাভাবিকভাবে অবস্থান করতে পারছেন না বলেও দাবি করেছেন তারা।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিরোধী মতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা নতুন কিছু নয়। তবে কোনো ঘটনার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। অন্যথায় জনমনে বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাস তৈরি হতে পারে।
এদিকে মামলাটিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তি মামলার অভিযোগের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আবার কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন।
অভিযুক্ত নেতাকর্মীরা দাবি করেছেন, রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করতে এবং তাদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন করতেই এ মামলা দায়ের করা হয়েছে। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত তথ্য উদঘাটন এবং মিথ্যা অভিযোগ প্রমাণিত হলে মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
তবে মামলার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত ও তদন্তের ভিত্তিতেই মামলা দায়ের করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হবে এবং সে অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মামলাটি ঘিরে মুরাদনগরের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এখন তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে স্থানীয় জনগণ ও সংশ্লিষ্ট মহল।
এদিকে এ মামলাটিকে মিথ্যা ও গায়েবি মামলা দাবি করে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ কমিটির মুরাদনগর উপজেলা শাখার সভাপতি ও সিনিয়র সাংবাদিক মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “যেখানে কথিত ঘটনার দিন ও সময়ে কোনো মিছিল, মিটিং কিংবা সমাবেশের কোনো অস্তিত্বই ছিল না, সেখানে কাদের খুশি করতে গিয়ে পুলিশ নিজ উদ্যোগে এমন একটি গায়েবি মামলা দায়ের করলো, সেটি জনমনে বড় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই মামলার মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক দলেরই লাভ হবে না; বরং এর নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা দিতে শুরু করেছে। নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে দায়ের করা এ ধরনের মামলা সমাজে বিভাজন ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে।”
তিনি আরও বলেন, “একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা এ মামলার নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগ প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের গায়েবি ও হয়রানিমূলক মামলা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিরত থাকার আহ্বান জানাই।”
বিবৃতিতে তিনি মামলাটির তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ এবং অবিলম্বে পুনঃতদন্তের দাবি জানান।
প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।
ব্রাহ্মণপাড়ায় রাষ্ট্রীয় সম্মান ছাড়াই মুক্তিযোদ্ধার দাফন, দায় এড়াতে ইউএনও-পুলিশের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই দাফন করা হয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তারকে। একাত্তরের রণাঙ্গনে জীবন বাজি রেখে দেশ স্বাধীন করা এই বীরের শেষ বিদায়ে গার্ড অব অনার না পাওয়ার ঘটনায় উপজেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। তবে ঘটনার দায় নিয়ে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের মধ্যে দেখা দিয়েছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। এক পক্ষের দাবি, প্রশাসনের কেউ উপস্থিত না থাকায় পুলিশ গার্ড অব অনার দিতে পারেনি; অন্য পক্ষের বক্তব্য, সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া যায় না।
৭৮ বছর বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার দীর্ঘ কর্মজীবনে যোগাযোগ ও আইন মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন। গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। সেখানে প্রথম জানাজা শেষে তাঁর মরদেহ কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া সদর ইউনিয়নের মহালক্ষীপাড়া গ্রামে নেওয়া হয়।
মরদেহ গ্রামে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল সাড়ে ৫টা পেরিয়ে যায়। পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসী আশা করেছিলেন, দেশের জন্য জীবন বাজি রাখা এই বীরকে শেষ বিদায়ে রাষ্ট্রীয় সালাম ও গার্ড অব অনার দেওয়া হবে। কিন্তু দীর্ঘ অপেক্ষার পরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সম্মান ছাড়াই তাঁকে দাফন করা হয়।
মরহুমের ভাই শাহজাহান আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম আমার ভাইকে শেষ সম্মানটুকু জানিয়ে চিরবিদায় দিতে। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। আমরা আজ লজ্জিত। যে মানুষটি ৯ মাস অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে এই দেশকে স্বাধীন করল, সে তার প্রাপ্য সম্মানটুকুও পেল না।’
স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার মোল্লা বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া সম্ভব না হলেও প্রশাসনের কোনো প্রতিনিধি এসে অন্তত শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পারতেন। কিন্তু সেটিও করা হয়নি।
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইদ্রিস মিয়া মাস্টার জানান, গার্ড অব অনার ও সশস্ত্র সালামের জন্য তাঁরা উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুন্নী ইসলাম তাঁদের জানিয়েছিলেন, সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া যায় না।
সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জহিরুল হক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, তিনি মরহুমের জানাজায় উপস্থিত ছিলেন। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার না দেওয়ার ঘটনায় পুরো এলাকায় তীব্র সমালোচনা চলছে।
অন্যদিকে ব্রাহ্মণপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফারুক হোসেন বলেন, গার্ড অব অনারের জন্য পুলিশ সদস্যদের একটি দল পাঠানো হয়েছিল। পুলিশ লাইন থেকে বিউগল বাজানোর দলও এসেছিল। কিন্তু উপজেলা প্রশাসনের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত না থাকায় পুলিশ একা গার্ড অব অনার দিতে পারেনি। তবে তাঁরা জানাজায় অংশ নিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে ইউএনও মুন্নী ইসলাম বলেন, সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়া হয় না। তারপরও তাঁরা প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু ঢাকা থেকে মরদেহ আনা নিয়ে দ্বিধা ছিল। মাগরিবের পর কেউ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। এ কারণে গার্ড অব অনার দেওয়া সম্ভব হয়নি।
এ সময় তিনি বিষয়টি সংবাদে প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ঘটনাটি যেন ব্রাহ্মণপাড়া তথা কুমিল্লার ‘মান-সম্মানের প্রশ্ন’ হিসেবে সংবাদে তুলে ধরা না হয়।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায়ে রাষ্ট্রীয় সম্মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের, তাঁদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব কেন দেখা দিল? পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যেই রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই চিরবিদায় নিতে হলো মুক্তিযুদ্ধের এই বীর সন্তানকে।
দারোরায় বাজিমাত করালেন সৈয়দ কায়েস মীর, ২১ কিমি সড়ক পুনর্নির্মাণে অনুমোদন

বি-স্ট্রং প্রকল্পে মুরাদনগরের ১০ সড়ক ও একাধিক কালভার্ট-ড্রেনের উন্নয়ন, দারোরা ইউনিয়নেই প্রায় ২০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজের প্রত্যাশা
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার দারোরা ইউনিয়নে গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও কালভার্ট পুনর্নির্মাণে প্রায় ২১ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বাস্তবায়নাধীন বাংলাদেশ সাস্টেইনেবল রিকভারি, ইমার্জেন্সি প্রিপেয়ার্ডনেস অ্যান্ড রেসপন্স (বি-স্ট্রং) প্রকল্পের আওতায় এসব কাজ বাস্তবায়িত হবে।
স্থানীয়ভাবে এ উন্নয়ন উদ্যোগের পেছনে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের আপন মামা, জননেতা সৈয়দ কায়েস আহমেদ মীরের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁর প্রচেষ্টায় দারোরা ইউনিয়নের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক উন্নয়ন ও পুনর্নির্মাণের প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
এলজিইডি হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা থেকে জারি করা দাপ্তরিক স্মারক অনুযায়ী, মুরাদনগর উপজেলার ১০টি গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ সড়ক পুনর্বাসনে পৃথক দুটি প্যাকেজের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। দুই প্যাকেজে মোট ২০ দশমিক ৮২৯ কিলোমিটার সড়ক পুনর্বাসনের পাশাপাশি বক্স কালভার্ট ও ইউ-ড্রেন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রথম প্যাকেজের আওতায় ১১ দশমিক ৪০১ কিলোমিটার সড়ক পুনর্বাসন এবং ৫ দশমিক ৪০ মিটার বক্স কালভার্ট/ইউ-ড্রেন নির্মাণ করা হবে। এ প্যাকেজে রয়েছে খুরুইল বাজার-শিদ্বেশ্বরী বাজার-দারোরা ইউপি-দারোরা বাজার-রায়তলা সড়ক, চন্দানাইল-সালপা-পান্নাই সড়ক (পিপুরিয়াকান্দা সড়ক হয়ে), পুষ্করুনিপার সড়ক (শহীদ রামিউদ্দিন সড়ক), দৌলতপুর-ধনপতিখোলা সড়ক এবং নাঈরপাড়-আলখাল সড়ক।
দ্বিতীয় প্যাকেজের আওতায় ৯ দশমিক ৪২৮ কিলোমিটার সড়ক পুনর্বাসন এবং ১ দশমিক ৮০ মিটার ইউ-ড্রেন নির্মাণ করা হবে। এ তালিকায় রয়েছে পালাসুতা (দারোরা ইউপি)-সুবিলাড়চর (বুরারচর বাজার) সড়ক, শুশুন্ডা বাজার-দারোরা বাজার সড়ক (পায়ব রোড হয়ে), সুরানন্দি-নিয়ামতকান্দি আরএইচডি সড়ক, চাপিতলা-বাইড়া সড়ক এবং পিপুরিয়া-রোয়াচলা-দানাপাতিখোলা সড়ক।
বিশেষ করে দারোরা ইউনিয়নের খুরুইল বাজার-শিদ্বেশ্বরী বাজার-দারোরা ইউপি-দারোরা বাজার-রায়তলা সড়ক, পালাসুতা-সুবিলাড়চর সড়ক, শুশুন্ডা বাজার-দারোরা বাজার সড়ক এবং সুরানন্দি-নিয়ামতকান্দি সড়কের উন্নয়ন স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সমস্যার সমাধানে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি দারোরা বাজারের উন্নয়নেও প্রায় কোটি টাকার বরাদ্দের কথা জানানো হয়েছে।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, উভয় প্যাকেজের কাজ শেষ করতে ৫৪০ দিন সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। দ্রুততম সময়ে ই-জিপি পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বানের জন্য কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে অনুমোদিত দাপ্তরিক স্মারকে প্রকল্পগুলোর নির্দিষ্ট আর্থিক বরাদ্দ উল্লেখ করা হয়নি। প্রাক্কলন যাচাই ও সরেজমিন পরিদর্শনের পর দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ব্যয় নির্ধারিত হবে।
এদিকে সৈয়দ কায়েস আহমেদ মীরের প্রচেষ্টায় দারোরা ইউনিয়নে সড়ক, কালভার্ট ও বাজার উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ২০ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ইউনিয়নের গ্রামীণ যোগাযোগ, কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জনসাধারণের দৈনন্দিন চলাচলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সকালের স্নিগ্ধতায় চা-বিস্কুটের অমৃত ছোঁয়া: দৈনন্দিন ব্যস্ততার মাঝে একটু প্রশান্তি

সোনালী টোস্টে চায়ের চুমুক: যান্ত্রিকতার ভিড়ে এক টুকরো স্নিগ্ধ সকাল
জীবনের যান্ত্রিকতা আর কর্মব্যস্ততার ভিড়ে আমরা অনেকেই নিজেদের জন্য একটু সময় বের করতে ভুলে যাই। অথচ সকালের স্নিগ্ধ আলোয় কিংবা একান্তে কাটানো কিছু মুহূর্ত পুরো দিনের জন্য আমাদের শক্তি জোগাতে পারে। আজ খুব ভোরে নিজ হাতে তৈরি এক কাপ গরম ধোঁয়া ওঠা চা আর মুচমুচে টোস্ট বিস্কুট দিয়ে এমনই এক সুন্দর ও প্রাণবন্ত সকালের শুরু হয়েছে।
বাঙালি সংস্কৃতিতে সকালের নাশতায় কিংবা আড্ডায় চা-বিস্কুট এক চিরচেনা ও আরামদায়ক নাম। ঘুম জড়ানো ভোরে চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার অনুভূতিটাই আলাদা। বিশেষ করে সোনালী রঙের মুচমুচে টোস্ট বিস্কুট যখন চায়ের ছোঁয়া পেয়ে নরম হয়ে আসে, তখন তা কেবল একটি খাবারই থাকে না, বরং এটি হয়ে ওঠে স্মৃতির পাতায় ডুব দেওয়ার এক জাদুকরি মাধ্যম।
ব্যস্ততম সাংবাদিকতা ও সংবাদ পরিচালনার নানা ঝক্কিঝামেলা আর খবরের অন্তহীন দুনিয়ায় ডুব দেওয়ার আগে এমন একটি গোছানো ও ঘরোয়া সকালের নাশতা মনকে সতেজ ও ফুরফুরে রাখতে দারুণ ভূমিকা রাখে। কাচের বয়াম থেকে পছন্দের টোস্ট বিস্কুট তুলে নিয়ে চায়ের পেয়ালার পাশে সাজিয়ে রাখার এই ছোট আয়োজনটুকু আমাদের শিকড়ের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
আধুনিকতার ছোঁয়া যতই লাগুক না কেন, খাঁটি বাঙালিিয়ানার এই ছোট অভ্যাসগুলোই আমাদের জীবনকে সহজ ও সুন্দর করে তোলে। ব্যস্ত জীবনের হাজারো কাজের মাঝেও এমন ছোট্ট কিছু মুহূর্ত নিজের জন্য বাঁচিয়ে রাখাটাই আসল জীবনবোধ।






























