রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩

গ্রেপ্তার ঘিরে বিতর্ক তুঙ্গে

আওয়ামী লীগ নেতা ‘ট্যাগ’ দিয়ে সাংবাদিক কারাগারে! শার্শায় পুলিশি ভূমিকা নিয়ে তোলপাড়

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী, সম্পাদক : প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬, ১১:৪৬ এএম
সাংবাদিক আসাদুজ্জামান গ্রেপ্তার

শার্শায় গ্রেপ্তার হওয়া সাংবাদিক আসাদুজ্জামানকে ঘিরে পরিচয় বিভ্রান্তির অভিযোগ তুলেছেন স্বজন ও সহকর্মীরা। ছবি : আজকের কথা

সংবাদের মূল সারসংক্ষেপ

  • শার্শায় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পুলিশি অভিযান নামের মিল নাকি পরিচয় বিভ্রান্তি—কারাগারে সাংবাদিক, প্রশ্ন তুলছেন স্বজন ও সহকর্মীরা যশোরের শার্শা উপজেলায় সাংবাদিক আসাদুজ্জামানকে গভীর রাতে বাড়ি থেকে আটক করে বিশেষ ক্ষমতা আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
  • পরিবারের সদস্য, আইনজীবী ও স্থানীয় সাংবাদিকদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভুল তথ্যের ভিত্তিতে একজন সাংবাদিককে মামলায় জড়ানো হয়েছে।
  • অভিযোগ অনুযায়ী, রোববার গভীর রাতে শার্শা উপজেলার জামতলা এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে আসাদুজ্জামানকে আটক করে পুলিশ।

আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয়ে সাংবাদিক গ্রেপ্তার? শার্শায় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পুলিশি অভিযান

নামের মিল নাকি পরিচয় বিভ্রান্তি—কারাগারে সাংবাদিক, প্রশ্ন তুলছেন স্বজন ও সহকর্মীরা

যশোরের শার্শা উপজেলায় সাংবাদিক আসাদুজ্জামানকে গভীর রাতে বাড়ি থেকে আটক করে বিশেষ ক্ষমতা আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। পরিবারের সদস্য, আইনজীবী ও স্থানীয় সাংবাদিকদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভুল তথ্যের ভিত্তিতে একজন সাংবাদিককে মামলায় জড়ানো হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, রোববার গভীর রাতে শার্শা উপজেলার জামতলা এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে আসাদুজ্জামানকে আটক করে পুলিশ। পরিবারের দাবি, আটকের সময় পুলিশ কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা লিখিত নথি প্রদর্শন করেনি। পাশাপাশি আটকের সুনির্দিষ্ট কারণও জানানো হয়নি।

পরে জানা যায়, তাকে আওয়ামী লীগের শার্শা উপজেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক পরিচয়ে আদালতে হাজির করা হয়েছে। তবে এ তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তার স্বজন ও আইনজীবীরা।

পরিবারের দাবি, আসাদুজ্জামান একজন পেশাদার সাংবাদিক। তিনি একসময় শার্শা সরকারি মহিলা কলেজে প্রদর্শক (ডেমোনস্ট্রেটর) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অতীতে আওয়ামী লীগের উপজেলা কমিটির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক পদে থাকলেও বর্তমানে তিনি কোনো রাজনৈতিক পদে নেই। বিশেষ করে সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দেওয়াকে তারা সম্পূর্ণ ভুল ও বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছেন।

এদিকে পুলিশ বলছে, সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড ও নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছে। শার্শা থানার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতেই তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মামলাটি ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর দায়ের করা হয়। মামলার এজাহারে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাত নেতার নাম উল্লেখ থাকলেও সাংবাদিক আসাদুজ্জামানের নাম নেই বলে দাবি করেছেন তার স্বজনরা। তাদের অভিযোগ, একই নামের এক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে পরিচয় বিভ্রান্তির কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

সোমবার তাকে আদালতে হাজির করা হলে তার পক্ষে জামিন আবেদন করা হয়। তবে আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শার্শা ও বেনাপোলের সাংবাদিকরা। তারা থানার সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে অবিলম্বে আসাদুজ্জামানের মুক্তি এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।

স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতারা এ ঘটনাকে ‘উদ্বেগজনক’ ও ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ উল্লেখ করে বলেন, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে তাকে অভিযুক্ত করা হলে তা আইনি ও নৈতিক উভয় দিক থেকেই গুরুতর বিষয়।

অন্যদিকে পুলিশ বলছে, তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, পরিচয় যাচাই এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিষয়টি এখন জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সর্বশেষ সংবাদের জন্য যুক্ত থাকুন:
সম্পাদকীয় নোট

প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী

সম্পাদক- দৈনিক আজকের কথা
0 0 votes
রেটিং দিন।
Subscribe
Notify of
guest
0 মন্তব্যসমূহ
Oldest
Newest Most Voted
এলাকার খবর

দেবীদ্বারে হত্যা-নাশকতা মামলায় ছাত্রলীগের দুই নেতা গ্রেপ্তার

এবিএম আতিকুর রহমান বাশার, বিশেষ প্রতিবেদক : প্রকাশিত: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৩৫ পিএম
দেবীদ্বারে হত্যা-নাশকতা মামলায় ছাত্রলীগের দুই নেতা গ্রেপ্তার

কুমিল্লার দেবীদ্বারে হত্যা ও সন্ত্রাসবিরোধী নাশকতা মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের দুই নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে দেবীদ্বার থানা পুলিশ। গ্রেপ্তার দুজনের মধ্যে একজন সাব্বির হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি এবং অপরজন সন্ত্রাসবিরোধী নাশকতা মামলার আসামি।

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে গ্রেপ্তার দুজনকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এর আগে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে পৃথক স্থানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—দেবীদ্বার উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ও এলাহাবাদ গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে মো. আল-আমিন অভি (২৯) এবং দেবীদ্বার বরকামতা ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ও একই ইউনিয়নের বাগুর গ্রামের বাবুল সরকারের ছেলে মো. আশরাফুল সরকার রাতুল (২০)।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আমিনুল ইসলাম সাব্বিরকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে পিটিয়ে আহত করা হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একই বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান। এ ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার আল-আমিন অভি এজাহারভুক্ত ৪৪ নম্বর আসামি।

দৈনিক আজকের কথা
সাব্বির হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছাত্রলীগ নেতা আল-আমিন অভি এবং নাশকতা মামলার আসামি আশরাফুল সরকার রাতুলকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।
— মো. মনিরুজ্জামান
ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), দেবীদ্বার থানা।

মামলা দায়েরের পর থেকেই অভি পলাতক ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। এছাড়া সম্প্রতি ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যুবলীগের ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় মুরাদনগর থানায় দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী মামলায়ও তিনি এজাহারনামীয় ১৯ নম্বর আসামি। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অন্যদিকে, দেবীদ্বার থানাধীন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের খাদঘর এলাকায় ছাত্রলীগের প্ল্যাকার্ড হাতে সরকারবিরোধী মিছিল এবং নাশকতার প্রস্তুতির ঘটনায় তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আশরাফুল সরকার রাতুলকে সন্ত্রাসবিরোধী নাশকতা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

তুহিনের বাড়িতে মিলল আইফোন

খুন করে শোকের ভান, অপ্রতিমের মাকেও সান্ত্বনা দেয় খুনিরা: পুলিশ

খাদিজা বেগম, বিশেষ প্রতিবেদক : প্রকাশিত: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:২৪ পিএম
খুন করে শোকের ভান, অপ্রতিমের মাকেও সান্ত্বনা দেয় খুনিরা: পুলিশ

আইফোন ছিনিয়ে নিতে পাহাড়ি জঙ্গলে নিয়ে হত্যা, প্রধান পরিকল্পনাকারীসহ চারজন গ্রেপ্তার

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। আরও হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, হত্যাকাণ্ডের পরদিন অপ্রতিমের বাড়িতে গিয়ে তার শোকাহত মাকে সান্ত্বনাও দিয়েছিল হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা।

রোববার দুপুরে কুমিল্লায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান এসব তথ্য জানান। এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের প্রধান পরিকল্পনাকারী সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনটিও উদ্ধার করা হয়েছে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন কুমিল্লা নগরীর সানন্দা এলাকার সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫), কোতোয়ালি থানার হাতিগাড়া এলাকার মো. কামরুল হাসান এবং আফজাল খান ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. সিয়াম (১৯)।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, গত ১৮ সেপ্টেম্বর জুমার নামাজের পর কুমিল্লা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে অপ্রতিমকে দেখা যায়। পরে মেসেঞ্জারে যোগাযোগ করে তাকে এক ঘণ্টার জন্য বাইরে যাওয়ার কথা বলে ডেকে নেয় তুহিন।

সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিকেল ৩টা ১৫ মিনিটের দিকে তুহিন অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনের পাশ দিয়ে সানন্দা এলাকার দিকে যায়। পরে ফাহাদ ও কামরুলও ওই এলাকার একটি নির্জন জঙ্গলের দিকে যায়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে পাহাড়ঘেরা নির্জন এলাকায় অপ্রতিমের কাছে থাকা আইফোনটি নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে অপ্রতিম বাধা দিলে তুহিনের সঙ্গে তার ধস্তাধস্তি শুরু হয়। পরে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে। একপর্যায়ে অপ্রতিমের মৃত্যু হলে তার আইফোন নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায় তারা।

দৈনিক আজকের কথা
প্রাথমিক তদন্তে আমরা জানতে পেরেছি, অপ্রতিমকে তার ব্যবহৃত আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে নির্জন পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আইফোন নেওয়ার চেষ্টা করলে অপ্রতিম বাধা দেয়। একপর্যায়ে তাকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। হত্যার পরদিনও আসামিরা অপ্রতিমের বাড়িতে গিয়ে তার শোকাহত মাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভান করেছে। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য ও জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে আমরা ঘটনাটির রহস্য উদঘাটন করেছি। তদন্ত শেষে দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিলের প্রস্তুতি চলছে।
— আনিসুজ্জামান
পুলিশ সুপার, কুমিল্লা।

কিন্তু হত্যার পরও থামেনি নির্মমতার এই অধ্যায়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, পরদিন শনিবার সকালে তুহিনসহ কয়েকজন অপ্রতিমের বাড়িতে গিয়ে তার শোকাহত মাকে সান্ত্বনা দেয়। তখনও পরিবার জানত না, যাদের একজন তাদের পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছে, তার বিরুদ্ধেই উঠছে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ।

অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেন। সন্ধান না পেয়ে রাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়।

পরদিন শনিবার দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণে সালমানপুর এলাকার পাহাড়ঘেরা জঙ্গলে স্থানীয় লোকজন ও শিক্ষার্থীরা অপ্রতিমের মরদেহ দেখতে পান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিমের মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল।

পরে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলের নেতারা তুহিনকে শনাক্ত করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাকে আটক করার পর পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্যদেরও গ্রেপ্তার করা হয়। তুহিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তার বাসা থেকে অপ্রতিমের আইফোন উদ্ধার করা হয়েছে।

নিহত অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। সে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে অপ্রতিমের বাবা-মায়ের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। স্বজন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া।

রোববার সকালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকায় নিজ বাড়ির পাশের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও তার স্মরণে বিশ্ববিদ্যালয়ে শোক কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। এ কারণে স্থগিত রাখা হয়েছে ক্লাস ও পরীক্ষা। নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান আরো জানান, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটন করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়াই হত্যার উদ্দেশ্য ছিল বলে জানা গেছে। মামলার তদন্ত শেষ করে দ্রুত আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের প্রস্তুতি চলছে।

অপ্রতিমের মরদেহ এখন মাটির নিচে। কিন্তু তার হত্যাকাণ্ড ঘিরে কুমিল্লাজুড়ে যে প্রশ্ন ও শোক তৈরি হয়েছে, তা আরও গভীর হয়েছে একটি কারণে—একটি শিশুকে হত্যার পর তারই শোকাহত মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো নির্মম পরিহাসও ঘটেছে এই ঘটনায়।

কুমিল্লায় ৯ মাসে ১০৪ হত্যা, শিশু অপ্রতিমের মৃত্যুতে লালমাই পাহাড় ঘিরে তীব্র আলোচনা

আজকের কথা ডেস্ক : প্রকাশিত: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৫৪ এএম
কুমিল্লায় ৯ মাসে ১০৪ হত্যা, শিশু অপ্রতিমের মৃত্যুতে লালমাই পাহাড় ঘিরে তীব্র আলোচনা

কুমিল্লায় গত নয় মাসে ১০৪ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের নৃশংস মৃত্যু কুমিল্লাজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অপ্রতিমের মৃত্যু ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে চলছে আলোচনা। একই সঙ্গে লালমাই পাহাড় ও আশপাশের নির্জন এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।

রোববার সকালে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। সকাল ১০টা ১০ মিনিটে অনুষ্ঠিত জানাজায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, স্বজন, পরিচিতজনসহ বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন। জানাজা শেষে কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতিতে ঈদগাহ কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।

অপ্রতিম বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। শুক্রবার বিকেলে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় সে। এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়।

শনিবার দুপুরে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার দক্ষিণ মোড়ের দক্ষিণ পাশে সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক।

অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন অপ্রতিমের পরিবার, স্বজন ও স্থানীয়রা।

অপ্রতিমের মৃত্যুর পর আলোচনায় এসেছে লালমাই পাহাড়ের নিরাপত্তা। কুমিল্লা শহর, কোটবাড়ি ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন হওয়ায় লালমাই পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে মানুষের চলাচল থাকলেও পাহাড়ের অনেক স্থান এখনো নির্জন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব নির্জন এলাকা অপরাধীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করছে।

লালমাই পাহাড়ে অপরাধের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০১০ সালে পাহাড়ের হাতিমারা এলাকা থেকে মেহেদি হাসান নামে এক কিশোর অটোরিকশাচালকের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। এর আগে ২০০৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি লালমাই পাহাড়ের মোড় থেকে রিফাত হোসেন নামে আরেক শিশুর গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

এ ছাড়া গত ২৯ আগস্ট কুমিল্লার কোটবাড়ির শান্তির মোড় এলাকায় দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে পাহাড়ের নির্জন স্থানে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। পাহাড়ের কোলে গড়ে ওঠা বিভিন্ন বসতিতেও ডাকাতি, ছিনতাই এবং মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষের অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পাহাড় ও আশপাশের এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। এসব অপরাধের সঙ্গে মাদকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, বিচ্ছিন্নভাবে অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি পাহাড়কেন্দ্রিক অপরাধচক্রের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, গত নয় মাসে জেলায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ১০৪ জন। জেলার সামগ্রিক হত্যাকাণ্ডের এই পরিসংখ্যানের সঙ্গে লালমাই পাহাড় ও আশপাশের এলাকায় একের পর এক গুরুতর অপরাধের অভিযোগ স্থানীয়দের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয়দের প্রশ্ন, জনবসতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছাকাছি থাকা লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা ও নজরদারি ব্যবস্থা কতটা কার্যকর। পাহাড়ের বিভিন্ন প্রবেশপথে নজরদারি, নিয়মিত পুলিশ টহল এবং প্রয়োজনীয় স্থানে সিসিটিভি স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটনে মাঠে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। হত্যাকাণ্ডের ক্লু শনাক্ত করে প্রকৃত হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

একটি শিশুর আকস্মিক ও করুণ মৃত্যু এখন শুধু তার পরিবারকেই শোকাহত করেনি, লালমাই পাহাড়ের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে কুমিল্লাবাসীকে। অপ্রতিমের জানাজায় অংশ নেওয়া মানুষের চোখে ছিল শোক, ক্ষোভ ও দ্রুত বিচারের প্রত্যাশা।

স্থানীয়দের দাবি, অপ্রতিম হত্যার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে লালমাই পাহাড় ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা প্রতিরোধ করতে হবে।

অপ্রতিম আর ফিরবে না। কিন্তু তার মৃত্যু যেন কুমিল্লার পাহাড়ি এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্নগুলোর স্থায়ী সমাধানের কারণ হয়—এটাই এখন স্বজন, শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা।

×
ENG