সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

উন্নয়নের নামে ধ্বংসযজ্ঞ, কথিত নদী খননের মাটিতে চাপা শতাধিক ঘর

আজকের কথা ডেস্ক প্রকাশিত: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ৩:০৭ পিএম
নদী খননের মাটিতে আশ্রয়ণ ঘর ধ্বংস

ভদ্রা নদী খননের মাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর। পুনর্বাসনের অপেক্ষায় খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো। ছবি : আজকের কথা

সংবাদের মূল সারসংক্ষেপ

  • সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর একসময় ছিল মাথা গোঁজার শেষ ঠিকানা।
  • সেই ঘর পেয়েই নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন পারুল বেগম, রাবেয়া বেগম, হাজেরা, রিজিয়াদের মতো শতাধিক ভূমিহীন ও অসহায় পরিবার।
  • কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ চাপা পড়েছে নদী খননের নামে ফেলা বিশাল মাটির স্তূপের নিচে।

সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর একসময় ছিল মাথা গোঁজার শেষ ঠিকানা। সেই ঘর পেয়েই নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন পারুল বেগম, রাবেয়া বেগম, হাজেরা, রিজিয়াদের মতো শতাধিক ভূমিহীন ও অসহায় পরিবার। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ চাপা পড়েছে নদী খননের নামে ফেলা বিশাল মাটির স্তূপের নিচে। উন্নয়নের যে প্রকল্প মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার কথা, সেই প্রকল্পের মাটিই এখন কেড়ে নিয়েছে তাদের শেষ সম্বল।

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আপার ভদ্রা নদী পুনঃখনন প্রকল্পের মাটি ফেলার কারণে চুকনগর, কাঁঠালতলা ও বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের শতাধিক ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও ঘরের চাল ভেঙে গেছে, কোথাও দরজা-জানালা মাটিচাপা পড়েছে, আবার কোথাও পুরো ঘরই মাটির স্তূপের নিচে হারিয়ে গেছে। ফলে আশ্রয়ণ প্রকল্পের শতাধিক পরিবার এখন কার্যত গৃহহীন।

চুকনগর আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, হাতে ছোট্ট একটি লোহার টুকরা নিয়ে নিজের মাটিচাপা ঘরের ইট খুঁড়ে বের করার চেষ্টা করছেন পারুল বেগম। একসময় যে ঘরটি ছিল তার নিরাপদ আশ্রয়, আজ সেটির কোনো অস্তিত্বই চোখে পড়ে না। মাথার ওপর উঁচু মাটির ঢিবি, আর তার নিচে চাপা পড়ে আছে ঘর, স্মৃতি ও বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

পারুল বলেন, “ঘরটা আর ফেরত পাব কি না জানি না। তাই অন্তত ইটগুলো তুলে রাখছি। যদি কোনোদিন আবার ঘর বানানোর সুযোগ হয়।”

চুকনগর আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের অধিকাংশই এখন স্থানীয় গরুর হাটের মাঠে অস্থায়ী ছাউনিতে বসবাস করছেন। বৃষ্টি হলেই সেখানে পানি জমে যায়। নেই নিরাপদ টয়লেট, নেই বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা।

রিজিয়া বেগম বলেন, “পাঁচ-ছয় মাস ধরে মাঠে আছি। আমাদের ঘর ভেঙে দিয়েছে। বাথরুম নেই, টিউবওয়েল নেই। একটু বৃষ্টি হলেই পানির মধ্যে থাকতে হয়। ভোটের আগে অনেক আশ্বাস পেয়েছি, কিন্তু এখন কেউ খোঁজ নেয় না।”

হাজেরা বেগমের কণ্ঠেও একই হতাশা। তিনি বলেন, “ঘর বাঁচানোর সুযোগই পাইনি। শুধু টিনগুলো খুলে রাখতে পেরেছিলাম। এখন গরুর হাটে থাকি। সেখান থেকেও উঠে যেতে বলে।”

রাবেয়া বেগমের প্রশ্ন আরও তীব্র—“আমাদের ঘর নেই, বাথরুম নেই, মাথা গোঁজার জায়গা নেই। তাহলে আমরা কোথায় যাব?”

শুধু চুকনগর নয়, একই চিত্র কাঁঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পেও। সেখানে অন্তত ১৩টি ঘর মাটির চাপে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক পরিবার ঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে।

তানিয়া বেগম বলেন, “ঘরের চালে মাটি উঠে গেছে, বারান্দা ভেঙে পড়েছে। ভয় নিয়ে বসবাস করছি। কখন কী হয় বলা যায় না।”

বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পেও ২৪টি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে ঘরের ওপর মাটি ফেলার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো অভিযোগ করছে, নদী খননের মাটি সরানোর আগেই নতুন করে মাটি ফেলায় বিপর্যয় আরও বেড়েছে।

তপতী দাস বলেন, “মাটির চাপে দরজা-জানালা খোলা যায় না। টয়লেট বন্ধ হয়ে গেছে। ঘর মেরামত হচ্ছে, কিন্তু স্বাভাবিক জীবন ফেরেনি।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করেই আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশে ও ওপর মাটি ফেলা হয়েছে। ফলে যাদের জন্য সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ঘর নির্মাণ করেছিল, তারাই আজ আবার আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছেন।

উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, নদী খনন প্রকল্পটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে সেনাবাহিনী বাস্তবায়ন করছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করা হয়েছে এবং কিছু স্থানে মাটি অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে।

ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবিতা সরকার বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। যাদের ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের বিষয়ে আলোচনা চলছে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে—যে আশ্রয়ণ প্রকল্পকে সরকারের অন্যতম সফল মানবিক উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরা হয়, সেই প্রকল্পের ঘরগুলোই যদি উন্নয়ন কাজের কারণে মাটিচাপা পড়ে, তাহলে দায় কার? পুনর্বাসনের আগে কেন মানুষের শেষ আশ্রয় ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হলো?

ভদ্রা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা মাটির বিশাল স্তূপ যেন এখন উন্নয়নের এক নির্মম প্রতীক। যেখানে প্রকল্প এগিয়েছে, কিন্তু পিছিয়ে গেছে মানুষের জীবন। আর ঘরহারা পরিবারগুলোর চোখে আজ একটাই প্রশ্ন—“আমাদের ঘর কবে ফিরবে?”

সর্বশেষ সংবাদের জন্য যুক্ত থাকুন:
সম্পাদকীয় নোট

প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী

সম্পাদক- দৈনিক আজকের কথা
0 0 votes
রেটিং দিন।
Subscribe
Notify of
guest
0 মন্তব্যসমূহ
Oldest
Newest Most Voted
এলাকার খবর

জামিনে মুক্তদের বরণে প্রস্তুতি

ফুলের মালা হাতে কারাফটকে ‘শোডাউন’, আ.লীগের ৪ নেতাকর্মী আটক

আজকের কথা ডেস্ক প্রকাশিত: সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৩১ এএম
ফুলের মালা হাতে কারাফটকে ‘শোডাউন’, আ.লীগের ৪ নেতাকর্মী আটক

নোয়াখালী জেলা কারাগারের সামনে ফুলের মালা নিয়ে ‘শোডাউন’ করার অভিযোগে আওয়ামী লীগের চার নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। রোববার (৯ আগস্ট) বিকেল ৫টার দিকে সদর উপজেলার জেলা কারাগারের ফটক থেকে তাদের আটক করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে এক ব্যাগ ফুলের মালা উদ্ধার করা হয়।

আটকরা হলেন—সদর উপজেলার এওজবালিয়া ইউনিয়নের পশ্চিম এওজবালিয়া গ্রামের ছেরাজল হক চৌধুরী (৬৩), মেহেদী হাসান হৃদয় (২০), মো. ফারুক হোসেন (১৮) ও মো. নাজিম (১৮)। পুলিশের দাবি, আটক চারজনই আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ৫ জুন জুমার নামাজের পর নোয়ান্নই ইউনিয়নের বাঁধের হাট বাজারে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের উদ্যোগে প্রায় তিন হাজার নেতাকর্মী বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। ওই কর্মসূচির পর এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পুলিশ অভিযান চালিয়ে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে।

রোববার তাদের মধ্যে কয়েকজন জামিনে মুক্তি পেলে খবর পেয়ে একদল নেতাকর্মী ফুলের মালা নিয়ে কারাগারের সামনে জড়ো হন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আটক চারজন মুক্তিপ্রাপ্তদের আত্মীয় নন এবং বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে ছবি তুলে শোডাউন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে।

পুলিশের চোখে ফুলের মালা, উদ্দেশ্য ‘শোডাউন’

স্বজনেরা ফুলের মালা নিয়ে আসতেই পারেন। কিন্তু আটক ব্যক্তিরা এক ব্যাগ ফুলের মালা নিয়ে এসেছিলেন এবং তারা জামিনে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের আত্মীয়-স্বজন নন। বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে ছবি তুলে শোডাউন করতে চেয়েছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
মো. নজরুল ইসলাম
ওসি- সুধারাম থানা

ওসি আরও জানান, এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হবে।

বিশেষ বক্তব্য:
কারামুক্ত ব্যক্তিকে স্বজনদের ফুল দিয়ে বরণ করা স্বাভাবিক হলেও, দলীয় পরিচয়ে একাধিক ব্যক্তির সংগঠিতভাবে কারাফটকে অবস্থান ও শোডাউনের প্রস্তুতি নেওয়ার অভিযোগ নতুন করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে আটক ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে এ অভিযোগের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কুমিল্লা ওয়াসা বোর্ডের নয়া চেয়ারম্যান আশিকুর রহমান মাহমুদ

আজকের কথা ডেস্ক প্রকাশিত: সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬, ১২:০৭ এএম
কুমিল্লা ওয়াসা বোর্ডের নয়া চেয়ারম্যান আশিকুর রহমান মাহমুদ

সরকার কুমিল্লা ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে আশিকুর রহমান মাহমুদকে নিয়োগ দিয়েছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের পানি সরবরাহ-২ শাখা থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব মোছা: আকতারুন নেছা স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এই নিয়োগ প্রদান করা হয়।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, “পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) আইন, ২০২৬”-এর ধারা ৭(১) অনুযায়ী তিন বছরের জন্য তাকে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকারি আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, জনস্বার্থে জারিকৃত এই নির্দেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।
আশিকুর রহমান মাহমুদ কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার মুন্সেফ বাড়ির বাসিন্দা। তাঁর বাবার নাম হাজী আব্দুর রহিম মাহমুদ এবং মায়ের নাম জাহানারা মাহমুদ। নিয়োগ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনের অনুলিপি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট ২১টি দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে আশিকুর রহমান মাহমুদ কুমিল্লা ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান মনোনীত হওয়ায় তাকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন কুমিল্লার বিশিষ্ট সমাজসেবক, ধর্ম মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদের মামাতো ভাই এবং মুরাদনগর উপজেলার জাহাপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সৈয়দ আতিকুল্লাহ প্রিয়া।

এক অভিনন্দন বার্তায় সৈয়দ আতিকুল্লাহ প্রিয়া বলেন, “আশিকুর রহমান মাহমুদের মতো একজন দক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিত্ব কুমিল্লা ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ায় আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। তাঁর এই নেতৃত্বের মাধ্যমে কুমিল্লার সুপেয় পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবনীয় উন্নয়ন সাধিত হবে এবং নাগরিক সেবা পৌঁছাবে জনগণের দোড়গোড়ায়। আমি তাঁর জীবনের উত্তরোত্তর সাফল্য, দীর্ঘায়ু ও সার্বিক কল্যাণ কামনা করছি

ধর্ম, রাজনীতি ও নির্বাসনে বিস্তর ফারাক

‘শেখ হাসিনা আর আমাকে এক পাল্লায় তুলবেন না’: তসলিমা নাসরিন

মোহাম্মদ শরিফুল আলম চৌধুরী : প্রকাশিত: রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬, ৭:৩০ পিএম
‘শেখ হাসিনা আর আমাকে এক পাল্লায় তুলবেন না’: তসলিমা নাসরিন

শেখ হাসিনার সঙ্গে নিজের তুলনা টানার সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ বক্তব্য দিয়েছেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন। তাঁর দাবি, শেখ হাসিনা ও তাঁর মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক অবস্থান, নির্বাসনের কারণ, আইনি অবস্থান এবং আদর্শের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।

নিজের ফেসবুক পোস্টে তসলিমা নাসরিন বলেন, অনেকে শেখ হাসিনা ও তাঁকে একই পাল্লায় তুলছেন এবং দুজনকেই মুসলমান ও রাজনৈতিক শরণার্থী হিসেবে উল্লেখ করছেন। তাঁর ভাষ্য, এই দুই দাবিই সঠিক নয়।

তসলিমা নাসরিন নিজেকে ‘হার্ডকোর নাস্তিক’ উল্লেখ করে বলেন, তিনি কোনো ঈশ্বর, ধর্মগ্রন্থ বা ধর্মীয় বিধানে বিশ্বাস করেন না। অন্যদিকে শেখ হাসিনা ধর্ম পালনকারী মুসলমান—এমন দাবি করেন তিনি।

নিজের দেশ থেকে দূরে থাকা ছাড়া শেখ হাসিনা ও আমার মধ্যে বড় কোনো মিল নেই; পরিচয়, আদর্শ ও নির্বাসনের বাস্তবতায় আমাদের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য।
তসলিমা নাসরিন
লেখিকা, ফেসবুক পোস্ট থেকে নেয়া

নিজের ভারতে অবস্থান প্রসঙ্গে তসলিমা বলেন, তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী নন। ভারত সরকার তাঁর থাকা-খাওয়া বা জীবনযাপনের ব্যয় বহন করে না। নিজের সব খরচ নিজেই বহন করেন এবং ভারত সরকার শুধু তাঁর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি সুইডেনের নাগরিক এবং সেই পরিচয়েই ভারতে বসবাস করছেন।

তসলিমা নাসরিন আরও বলেন, ভারত কোনো বিদেশি শিল্পী, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী বা গবেষকের কাজ ও অবদান বিবেচনা করে তাঁকে বৈধভাবে দেশটিতে বসবাসের অনুমতি দিতে পারে। তাঁর মতে, এ ধরনের অনুমতি রাজনৈতিক আশ্রয়ের সমতুল্য নয়।

আদর্শগত পার্থক্যের কথাও তুলে ধরেন তসলিমা

শেখ হাসিনার সঙ্গে নিজের সবচেয়ে বড় পার্থক্যগুলোর একটি হিসেবে ধর্ম ও রাষ্ট্রের সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরেন তসলিমা নাসরিন।

তিনি দাবি করেন, শেখ হাসিনা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। বিপরীতে তিনি সব শিশুর জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে। তাঁর মতে, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড থেকে ধর্মকে দূরে রাখা উচিত।

তসলিমা নাসরিন শেখ হাসিনা সরকারের ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পেরও সমালোচনা করেন। তাঁর দাবি, এসব মসজিদ একসময় শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা তিনি প্রকল্পের শুরুতেই প্রকাশ করেছিলেন।

তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতাশালী রাজনীতিক, আর তিনি ক্ষমতাহীন একজন লেখিকা। শেখ হাসিনার নির্বাসন দুই বছরের হলেও তাঁর নিজের নির্বাসন ৩২ বছরের বলে উল্লেখ করেন তসলিমা।

‘ফেরার দরজা বহুদিন ধরেই বন্ধ’

বাংলাদেশে নিজের ফেরার প্রসঙ্গে তসলিমা নাসরিন বলেন, বাংলাদেশের কোনো সরকারই তাঁর বাংলাদেশি পাসপোর্ট নবায়ন করেনি এবং তাঁর বিদেশি পাসপোর্টেও ভিসা দেয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে ফেরার পথ তাঁর জন্য বন্ধ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা সরকারের ভূমিকাও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশে ফেরার পথ বন্ধ রাখার দায় শেখ হাসিনা সরকারেরও রয়েছে।

তবে শেখ হাসিনার সঙ্গে নিজের অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তুলে ধরে তসলিমা বলেন, তিনি চান শেখ হাসিনা নিজ দেশে ফিরে নিরাপদে বসবাস করুন এবং রাজনীতি করুন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবিও তিনি দীর্ঘদিন ধরে জানিয়ে আসছেন বলে উল্লেখ করেন।

‘আমি শেখ হাসিনার দেশে ফেরা চাই’

তসলিমা নাসরিনের ভাষ্য, তিনি নিজের দেশে ফিরে নিরাপদে বসবাস করতে চান এবং শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও একই প্রত্যাশা রাখেন। তাঁর মতে, একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জন্য রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হলেও তাঁর মতো একজন ধর্ম ও জিহাদবিরোধী লেখিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে ফিরতে পারলেও তাঁকে জিহাদিদের হামলার ঝুঁকিতে পড়তে হতে পারে। এ কারণে দেশে ফিরে নিরাপদে বসবাস করতে পারবেন কি না, সেটি নিয়েও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

বাক্‌স্বাধীনতা নিয়েও শেখ হাসিনার সমালোচনা

তসলিমা নাসরিন নিজেকে বাক্‌স্বাধীনতার প্রবল সমর্থক হিসেবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনার সঙ্গে এ ক্ষেত্রেও তাঁর পার্থক্যের কথা তুলে ধরেন।

তিনি দাবি করেন, ১৯৯৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার তাঁর পুরস্কারপ্রাপ্ত আত্মজীবনী ‘আমার মেয়েবেলা’ নিষিদ্ধ করেছিল এবং সেই নিষেধাজ্ঞা এখনো প্রত্যাহার করা হয়নি।

সবশেষে তসলিমা নাসরিন বলেন, নিজের দেশ থেকে দূরে থাকতে বাধ্য হওয়া ছাড়া তাঁর সঙ্গে শেখ হাসিনার বড় কোনো মিল নেই। শুধু এই একটি মিলের ভিত্তিতে দুজনের পরিচয়, অবস্থান, আদর্শ ও জীবনসংগ্রামকে একইভাবে দেখাকে তিনি ‘ভুল তথ্য’ ছড়ানো হিসেবে উল্লেখ করেন।

×
CLOSE X
ENG