

বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর একদিকে চলছে নির্যাতন, অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে মন্দিরের ছবি ছাপানো হচ্ছে নতুন মুদ্রায়—হিন্দু নির্যাতন ও মন্দিরের ছবি সম্বলিত টাকার নোট দেখতে পেয়ে অনেকে রিতীমতো থমকে গেছেন! এই দ্বিচারিতাকে “প্রতারণা ও প্রচারণার ফাঁদ” বলে অভিহিত করেছেন প্রবাসে নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের প্রকাশিত নতুন নোটে একটি হিন্দু মন্দিরের ছবি ছাপানো হয়েছে। এতে একদিকে সরকার ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ মুখোশে বিশ্ব সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে দেশের মাটিতে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে সমালোচনা উঠেছে।
তসলিমা নাসরিন তাঁর ফেসবুক পেজে লেখেন:
“সরকার হিন্দুদের সঙ্গে প্রতারণা করছে। একদিকে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে, অন্যদিকে মন্দিরের ছবি ছাপিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের সহানুভূতি অর্জনের চেষ্টা করছে।”
তিনি আরও বলেন, “ইউনুস সরকারের আমলে হিন্দু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কোন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তাদের প্রতীকে পরিণত করে রাজনীতি করা হচ্ছে।”
তসলিমার মতে, কিছু উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠী ইতোমধ্যে নতুন টাকায় মন্দিরের ছবি দেখে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও স্ট্যাটাসে দেখা গেছে, কেউ কেউ নোট জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। হিন্দু নির্যাতন ও মন্দিরের ছবি দিয়ে রীতিমতো হিন্দুদের বোকা বানানো হয়েছে বলে অনেকে সমালোচনা করেন।
১৯৯৪ সালের আগস্টে খালেদা জিয়ার আমলে দেশত্যাগে বাধ্য হন তসলিমা নাসরিন। মায়ের কান্না, ভাইবোনের আহাজারি পেছনে ফেলে দেশ ছাড়তে হয় তাঁকে।
তিনি বলেন,
“বাংলাদেশই আমার দেশ, কলকাতা বা ইউরোপ নয়। আমি বাংলার মাটি, বাতাস, ভাষার টানেই বেঁচে থাকতে চাই।”
তসলিমা দীর্ঘদিন ধরে ভারত, ইউরোপ ও আমেরিকায় নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। নারীবাদ, ধর্মীয় মৌলবাদ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে লেখালেখির কারণে তিনি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হলেও নিজ দেশে এখনও নিষিদ্ধ, অবাঞ্ছিত ও বিতর্কিত।
হিন্দু নির্যাতন ও মন্দিরের ছবি এ নিয়ে বরাবরই সাহসি প্রতিবাদ করে আসছেন বিখ্যাত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। তার বিষয়ে সামান্য ধারনা পেতে পড়তে পারেন নিচের তসলিমা নাসরিন দেশে ফেরার বাধা কোথায় এ প্রতিবেদনটি পড়ুন —
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার নতুন টাকায় মন্দিরের ছবি ছাপিয়ে সংখ্যালঘুদের প্রতি সহানুভূতির বার্তা দিতে চাচ্ছে। তবে এটি মূলত বিশ্বমঞ্চে ‘সেক্যুলার ইমেজ’ প্রদর্শনের কৌশল, বাস্তবতা ভিন্ন।
অনেকের মতে, এধরনের প্রচার যদি সত্যিই আন্তরিক হতো, তাহলে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়কে নিরাপত্তা দেওয়া হতো, হামলার বিচার হতো, মন্দির-দখল রোধ করা হতো।
বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে কেন তসলিমা দেশে ফিরতে পারেন না? এই প্রশ্নও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। লেখিকার বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি কোনো অপরাধী নন, শুধুমাত্র লেখার মাধ্যমে মত প্রকাশের জন্য তাঁকে দেশছাড়া হতে হয়েছে।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ও রাষ্ট্রের দ্বিমুখী নীতির বিরুদ্ধে তসলিমা নাসরিনের মতো কণ্ঠগুলো আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে—আসলেই কি আমরা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে বাস করছি? নাকি এটি এক রাজনৈতিক মুখোশমাত্র?