জুলাই শহীদ সংখ্যা বিতর্ক: জাতিসংঘের ত্রুটিপূর্ণ রিপোর্ট সংশোধনের আইনি দাবি
জুলাই শহীদ সংখ্যা বিতর্ক: জাতিসংঘের ত্রুটিপূর্ণ রিপোর্ট সংশোধনের আইনি দাবি। ছবি : আজকের কথা
২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনে নিহতের সংখ্যা নিয়ে জুলাই শহীদ সংখ্যা বিতর্ক যেন কিছুতেই থামছে না। বিশেষ করে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের কার্যালয়ের (OHCHR) একটি ত্রুটিপূর্ণ রিপোর্ট এই বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিয়েছে। ওই রিপোর্টে নিহতের যে সংখ্যা দাবি করা হয়েছে, তা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অফিশিয়াল গেজেটের চেয়েও প্রায় দ্বিগুণ।
অবশেষে জাতিসংঘের এই বিতর্কিত রিপোর্ট সংশোধন ও প্রত্যাহারের আইনি দাবি উঠেছে। সুইজারল্যান্ডের জেনিভায় জাতিসংঘের হাই কমিশনারের কাছে এই বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছেন শেখ হাসিনার লিগ্যাল কাউন্সেল মি. স্টিভেন পাউলস কেসি।
লন্ডনের বিখ্যাত ‘ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্স’ (Doughty Street Chambers)-এর এই আইনি পরামর্শদাতা গত ২৮ মে ২০২৬ তারিখে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার মি. ভলকার তুর্ক (Mr. Volker Türk) -কে এই চিঠি পাঠান।
মূল বিবাদ: ওএইচসিএইচআর (OHCHR) ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্ট
২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের কার্যালয় থেকে “Human Rights Violations and Abuses related to the Protests of July and August 2024 in Bangladesh” শীর্ষক একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছিল। মি. স্টিভেন পাউলস কেসি তাঁর চিঠিতে এই রিপোর্টের কিছু তথ্যের তীব্র বিরোধিতা করে তা সংশোধন ও প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছেন।
চিঠিতে জুলাই শহীদ সংখ্যা বিতর্ক এবং জাতিসংঘের রিপোর্টের নিরপেক্ষতা নিয়ে মূলত তিনটি প্রধান আপত্তি ও আইনি যুক্তি উত্থাপন করা হয়েছে:
১. নিহতের সংখ্যা নিয়ে অতিরঞ্জিত দাবি ও বিভ্রান্তি
চিঠির সবচেয়ে বড় আপত্তিটি এসেছে নিহতের সংখ্যা নিয়ে। জাতিসংঘের রিপোর্টে দাবি করা হয়েছিল যে, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসের আন্দোলনে প্রায় ১,৪০০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন।মি. পাউলস কেসি তাঁর চিঠিতে যুক্তি দেন যে, এই সংখ্যাটি অত্যন্ত ভুল এবং অতিরঞ্জিত। এর সপক্ষে তিনি দুটি সরকারি ও বেসরকারি তথ্য তুলে ধরেন।
সরকারি গেজেট: বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিজস্ব অফিশিয়াল গেজেট (*”The Gazette of Martyrs of the July Uprising 2024″*) অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা প্রায় ৮৩৪ জন। অর্থাৎ জাতিসংঘের দাবি করা সংখ্যার প্রায় অর্ধেক।
ছাত্রদের রিপোর্ট: এমনকি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নিজস্ব ওয়েবসাইট (shohid.info) অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ৬৫০ জনের মতো দেখানো হয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, যদি একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ তদন্ত করা হয়, তবে এই সংখ্যাটি আরও কম হতে পারে।
২. তদন্তের নিরপেক্ষতা ও নির্দিষ্ট সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন
চিঠিতে অভিযোগ করা হয় যে, এই তদন্তটি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমন্ত্রণে এবং তাদের প্রভাবেই করা হয়েছিল। যার ফলে এই রিপোর্টের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।
পাশাপাশি তদন্তের সময়সীমা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। জাতিসংঘের এই তদন্তটি শুধুমাত্র ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট ২০২৪ সালের মধ্যকার ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে ১৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর যে ব্যাপক সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, তা এই রিপোর্টে পুরোপুরি চেপে যাওয়া হয়েছে।
৩. রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তথ্যের ব্যবহার
আইনজীবীর চিঠিতে স্পষ্ট অভিযোগ করা হয়েছে যে, শেখ হাসিনা যেন শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডের নির্দেশ দিয়েছেন—এমন একটি মিথ্যা ন্যারেটিভ বা গল্প তৈরি করতেই এই অতিরঞ্জিত সংখ্যা (১,৪০০) ব্যবহার করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনা সরকারকে অসাংবিধানিকভাবে উৎখাত করার বিষয়টিকে বিশ্ববাসীর কাছে বৈধতা দেওয়া।
চিঠিতে আরও মনে করিয়ে দেওয়া হয় যে, তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার নিজেই পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঘটনা তদন্তে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত commission গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল।
জাতিসংঘের কাছে চূড়ান্ত আইনি অনুরোধ
চিঠির শেষ অংশে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনারের কার্যালয়ের (OHCHR) প্রতি সম্মান বজায় রেখেই দুটি চূড়ান্ত অনুরোধ জানানো হয়েছে:
১. ১,৪০০ জন নিহতের এই ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্যটি জনসমক্ষে সংশোধন এবং প্রত্যাহার (Public Retraction and Correction) করতে হবে, যাতে জুলাই শহীদ সংখ্যা বিতর্ক চিরতরে অবসান ঘটে।
২. জাতিসংঘ যেন ভবিষ্যতে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠী বা সরকারের উদ্দেশ্য হাসিল কিংবা মিথ্যা প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
জেলা পরিষদের অর্থ নিয়ে প্রশ্ন
জনগণকে খেজুরের অঙ্ক শিখানো সেই হাসনাতের পেটে ১০ কোটি টাকার হিসাব কেন আড়ালে?
৩৯ বক্স খেজুরের ‘অঙ্ক ক্লাস’ বনাম ১০ কোটির বৈষম্য: হাসনাতের স্বচ্ছতার আসল রূপ নিয়ে প্রশ্ন
৩৯ বক্স খেজুরের হিসাব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভে এসে দিয়ে যারা নিজেদের স্বচ্ছতার ‘সস্তা বাহবা’ কুড়াতে চেয়েছিলেন, ক্ষমতার আবর্তে তাদেরই আসল রূপ এখন প্রকাশ্য। জেলা পরিষদ, ত্রাণ ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিবকে না জানিয়ে কোটি কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের নেপথ্য কাহিনি এবার চলে এসেছে জনসমক্ষে।
একদিকে নির্বাচনের মাঠে ভোটারদের মন জয়ের জন্য ‘সরকার থেকে কোনো ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি নেবেন না’ বলে ঘোষণা দেওয়া, অন্যদিকে গোপনে সংসদ থেকে সরাসরি রাজস্বখাতের বিলাসবহুল গাড়ি দাবি করার মতো দ্বিমুখী নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সাবেক এই মুখ।
শনিবার (৩০ মে) দুপুরে কুমিল্লা শিল্পকলা একাডেমিতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলে কুমিল্লা জেলা পরিষদ প্রশাসক মো. মোস্তাক মিয়া এমন বিস্ফোরক অভিযোগ তোলেন।
খেজুরের সস্তা বাহবা বনাম ১০ কোটির বড় কোটা
রাজনৈতিক মহলে ও সাধারণ মানুষের মাঝে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—যে হাসনাত আবদুল্লাহ ৩৯ বক্স খেজুরের হিসাব দিয়ে ফেসবুকে ‘খেজুরের অঙ্ক ক্লাস’ নিয়েছিলেন, তিনি জেলা পরিষদের কোটি কোটি টাকার হিসাব কেন আড়াল করলেন?
জেলা পরিষদের হিসাব বিভাগের সূত্র নিশ্চিত করেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিশেষ বরাদ্দের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ চলে গেছে মুরাদনগর ও দেবীদ্বার উপজেলায়। যার মধ্যে দেবীদ্বার আসন থেকে নির্বাচিত বর্তমান সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ একাই বাগিয়ে নিয়েছেন ১০ কোটি টাকা। অথচ এই বিশাল বরাদ্দের বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট সচিবের কোনো প্রকাশ্য হিসাব জনসমক্ষে আসেনি।
বক্তব্যের বিষয়ে পরবর্তীতে জানতে চাওয়া হলে জেলা পরিষদ প্রশাসক মো. মোস্তাক মিয়া সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমি বলছি না ওই টাকা তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছেন। তাঁরা দুজনেই নিজেদের উপজেলায় বিশেষ বরাদ্দ বা উন্নয়ন বরাদ্দের নামে বিপুল পরিমাণ ওই টাকা নিয়ে অন্যান্য উপজেলাগুলোকে মারাত্মকভাবে বঞ্চিত করেছেন। কারণ তাঁরা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন করেছিলেন, অথচ তাঁরাই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিশেষ বরাদ্দ নিয়ে বাকি উপজেলাগুলোর সঙ্গে তীব্র বৈষম্য করলেন।”
তীব্র বৈষম্যের শিকার কুমিল্লার ১৫ উপজেলা
জেলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলার ১৭টি উপজেলার মধ্যে কেবল মুরাদনগর (আসিফ মাহমুদ ১৫ কোটি) এবং দেবীদ্বার (হাসনাত আবদুল্লাহ ১০ কোটি) উপজেলাতেই সিংহভাগ টাকা চলে যায়। এর বাইরে নামমাত্র ১ কোটি টাকার মতো বরাদ্দ পেয়েছিল চৌদ্দগ্রাম উপজেলা। বাকি ১৪টি উপজেলা এই অর্থবছরে বলতে গেলে কোনো বরাদ্দই পায়নি। ‘বৈষম্যহীন’ রাজনীতির বুলি আউড়ে এসে এমন চরম আঞ্চলিক বৈষম্য তৈরি করায় জেলা জুড়ে সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
মুখে ট্যাক্স ফ্রি গাড়ির ত্যাগ, নেপথ্যে রাজস্বের গাড়ির আবদার
হাসনাত আবদুল্লাহর এই দ্বিমুখী আচরণ কেবল বরাদ্দের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি ও তার পরিবার সরকারের কোনো ‘ট্যাক্স ফ্রি’ গাড়ি সুবিধা গ্রহণ করবেন না বলে জনসভায় আবেগঘন বক্তব্য দিয়েছিলেন। অথচ দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই পর্দার আড়ালে সরকার থেকে সরাসরি রাজস্বখাতের ব্যয়বহুল গাড়ি বরাদ্দ চেয়ে সংসদে জোর দাবি জানিয়েছেন, যা তার কথার ও কাজের বৈষম্যকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জেলা পরিষদ প্রশাসক মোস্তাক মিয়া আরও বলেন, “আজ বাংলাদেশ সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত। আমাদের প্রিয় নেতা তারেক রহমান আজ দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং ধ্বংস হওয়া অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের জন্য দিনরাত কাজ করছেন। কিন্তু যারা সমন্বয়ের রাজনীতির কথা বলে বৈষম্য তৈরি করেছে, তাদের জবাব জনগণকে দিতে হবে।”
মাত্র ৩৯ বক্স খেজুরের হিসাব দিয়ে কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন বরাদ্দের বৈষম্য আড়াল করার এই চতুর রাজনীতিকে এখন স্থানীয় ভোটাররা দেখছেন ‘জনগণের সাথে প্রতারণা’ হিসেবে। দেবীদ্বারের সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, সস্তা বাহবা পাওয়ার এই নাটক আর কতদিন চলবে?
পরিচ্ছন্নতায় তরুণদের অনন্য উদ্যোগ
দেবীদ্বারে কোরবানির বর্জ্য অপসারণে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ, প্রশংসায় ভাসছে ‘আমার গ্রাম আমার দায়িত্ব’
পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে কোরবানির পশুর রক্ত ও বর্জ্য দ্রুত অপসারণ এবং পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সামাজিক সংগঠন ‘আমার গ্রাম আমার দায়িত্ব’। সংগঠনটির স্বেচ্ছাসেবকরা ঈদের দিন সকাল থেকেই দেবীদ্বার পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের চাপানগর, সাইলচর ও বিজলীপাঞ্জার গ্রামে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এ উদ্যোগ। কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণের পাশাপাশি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সংগঠনটি।
সংগঠনের প্রতিনিধিরা জানান, কোরবানির পর পশুর রক্ত ও বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ না করলে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে এবং ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। এসব স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশ দূষণ রোধে তারা টানা তিন দিনব্যাপী বর্জ্য অপসারণ, জীবাণুনাশক ছিটানো এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
তারা আরও জানান, কোরবানির পরপরই নির্ধারিত স্থান থেকে পশুর বর্জ্য সংগ্রহ করে সেগুলো স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে অপসারণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি রক্তমাখা মাটিতে ব্লিচিং পাউডার ও স্যাভলন মিশ্রিত পানি ছিটিয়ে জীবাণুমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়া যত্রতত্র বর্জ্য না ফেলে নির্দিষ্ট গর্তে মাটিচাপা দেওয়ার বিষয়ে স্থানীয়দের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে।
এলাকাবাসীর মতে, তরুণদের এই স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগের ফলে এবার গ্রামগুলোতে ঈদ-পরবর্তী সময়ের চিরচেনা দুর্গন্ধ ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়নি। তারা আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতেও এ ধরনের সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
চাঁপানগর গ্রামের বাসিন্দা মো. রুহুল আমিন হাজারী বলেন, “সাধারণত গ্রামের মানুষ দায়সারাভাবে কোরবানির বর্জ্য অপসারণ করেন, ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে যায়। কিন্তু ‘আমার গ্রাম আমার দায়িত্ব’ সংগঠনের সদস্যরা গত তিন দিন ধরে যেভাবে স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে বর্জ্য অপসারণ করেছে, তাতে রোগজীবাণুর বিস্তারের সম্ভাবনা অনেকাংশে কমেছে।”
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সাংবাদিক এ আর আহমেদ হোসাইন বলেন, “ঈদুল আজহার সময় কোরবানির পশুর রক্ত ও বর্জ্য যত্রতত্র পড়ে থাকলে পরিবেশ দূষিত হয় এবং দুর্গন্ধে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। এ সমস্যা সমাধান এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ডকে একটি আদর্শ ও পরিচ্ছন্ন ওয়ার্ড হিসেবে গড়ে তুলতেই আমরা ঈদের দিন সকাল থেকে মাঠে কাজ করছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের গ্রাম, আমাদের ওয়ার্ড ও আমাদের শহর পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব সবার আগে আমাদের নিজেদের। পবিত্র কোরবানির পর পশুর বর্জ্য যেন কোনোভাবেই মশা-মাছির উপদ্রব, দুর্গন্ধ বা স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ না হয়, সে লক্ষ্যেই আমাদের এই উদ্যোগ।”
সংগঠনটির এমন জনকল্যাণমুখী ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমকে সাধুবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মতে, সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে পরিচালিত এ ধরনের উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দুই দিনে দুই হামলা
মুরাদনগরে কিশোর গ্যাংয়ের রক্তাক্ত তাণ্ডব: দুই দিনে দফায় দফায় হামলা, আহত ২০, থানায় পৃথক ২ অভিযোগ
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার দারোরা ইউনিয়নের কাজিয়াতল গ্রামে পূর্ব শত্রুতা ও মোটরসাইকেল চালানোকে কেন্দ্র করে দুই দিনে দফায় দফায় সংঘটিত ভয়াবহ হামলায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে এক পক্ষের ৯ জন ও প্রতিপক্ষের ২ জনসহ মোট ১১ জন গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হামলার ঘটনায় একই আসামিদের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে মুরাদনগর থানায় পৃথক দুটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় কিশোর গ্যাং ও দাঙ্গাবাজ চক্র হিসেবে পরিচিত। তাদের ভয়ে সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে সাহস পান না। সর্বশেষ এই ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
জানা যায়, গত ২৮ মে বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ১১টার দিকে কাজিয়াতল গ্রামের চাঁনগাজী মুন্সী বাড়িতে প্রথম হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ অনুযায়ী, একই গ্রামের দুলাল মিয়ার ছেলে সাইদুল (২০) বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালিয়ে মেকানিক শহিদ মুন্সীর বাড়ির সীমানা বেড়ার ওপর উঠিয়ে দিলে এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে কথাকাটাকাটি হয়।
একপর্যায়ে পূর্ব বিরোধের জের ধরে সাইদুল ও তার সহযোগীরা লোহার রড, লাঠি, বাঁশ এবং ধারালো দা নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে শহিদ মুন্সীর বাড়িতে হামলা চালায়। এ সময় বাড়ির লোকজনকে এলোপাতাড়ি মারধর করা হয় এবং বাড়িঘরে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার পর আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে শহিদ মুন্সী বাদী হয়ে শুক্রবার রাতে মুরাদনগর থানায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও ৪ থেকে ৫ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
কিন্তু প্রথম দিনের রক্তাক্ত হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই পরদিন ২৯ মে শুক্রবার আবারও একই পরিবারের সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, শুক্রবার সকালে কাজিয়াতল বাজার এলাকায় একা পেয়ে মোবারক হোসেনকে লোহার রড ও হকিস্টিক দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। পরে দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে তার কাকা রাজীব মুন্সীকে একা পেয়ে নাক, মুখ ও মাথায় এলোপাতাড়ি আঘাত করা হয়। হামলার সময় তার পরনের শার্ট ছিঁড়ে ফেলা হয় এবং নগদ ১ হাজার ৫০০ টাকা ও প্রায় ১৫ হাজার টাকা মূল্যের একটি স্মার্টফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
এই দ্বিতীয় হামলার ঘটনায় মৃত জলিল মুন্সীর ছেলে মোবারক মুন্সী বাদী হয়ে একই আসামিদের বিরুদ্ধে মুরাদনগর থানায় আরও একটি পৃথক অভিযোগ দায়ের করেন।
দুইটি অভিযোগে যাদের আসামি করা হয়েছে তারা হলেন— মো. সায়মন (২০), পিতা রবিউল; মো. সুজন (২০), পিতা মোকবল হোসেন; মো. সাইদুল (২০), পিতা দুলাল মিয়া; আনোয়ার হোসেন (৩০); দেলোয়ার হোসেন (৩৫); সাইদুল ইসলাম (২৪); মো. জহির (২৮), পিতা রবিউল; মো. সেলিম (৩৫), পিতা মোকবল হোসেন; মো. শফিক (৪০), পিতা আব্দুল খালেক এবং রাসেল মিয়া (২৭), পিতা ফজলু মিয়া। এছাড়াও অজ্ঞাতনামা আরও ৪ থেকে ৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, দুই দিনের দফায় দফায় সংঘটিত হামলায় উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে গুরুতর জখম হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১১ জন। তাদের মধ্যে ভুক্তভোগী পরিবারের ৯ জন এবং প্রতিপক্ষের একই পরিবারের ২ জন সদস্য রয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের দাবি, অভিযোগ দায়েরের পরও অভিযুক্তরা বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছে। হামলার শিকার পরিবারটির সদস্যরা বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এমনকি এই প্রতিবেদন লেখার সময়ও নতুন করে হামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে একজন ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন।
এ বিষয়ে শনিবার (৩০ মে) সকালে মুরাদনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে একই আসামিদের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে একজন সাব-ইন্সপেক্টরকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্তদের একটি অংশ এলাকায় কিশোর গ্যাং হিসেবে পরিচিত। তারা প্রায়ই বিভিন্ন সংঘর্ষ, হামলা ও বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। ফলে সাধারণ মানুষ ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। সর্বশেষ এই হামলার ঘটনায় এলাকাজুড়ে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

















