নতুন বন্ধুত্বের নীরব যাত্রা
একটি ‘প্রিয়’ সম্বোধন থেকে শুরু, সেলিনা নামের এক অচেনা মানুষের গল্প

একটি ‘প্রিয়’ সম্বোধন, কিছু আন্তরিক কথা আর একজন ভালো মানুষের সন্ধান—ছবিতে সেলিনা আক্তার। ছবি : আজকের কথা
একটা সময় ছিল, যখন মানুষের সঙ্গে মানুষের পরিচয় হতো গ্রামের মেঠোপথে, স্কুলের বেঞ্চে কিংবা কোনো আত্মীয়ের বাড়ির উঠানে। এখন সময় বদলেছে। পরিচয়ের দরজা খুলে যায় একটি নোটিফিকেশন থেকে, একটি মেসেজ থেকে, কখনো কখনো মাত্র দুটি শব্দ থেকেও।
আমার ক্ষেত্রেও তেমনই হয়েছিল।
ঘটনাটা খুব সাধারণ। অথচ কেন জানি না, আমার কাছে এটি সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি কিছু হয়ে উঠেছে।
অনেকদিন ধরে আমার একটি পুরোনো ফেসবুক আইডি প্রায় অচল অবস্থায় পড়ে ছিল। সেখানে আমি খুব একটা যাই না। মাঝে মাঝে লগইন করে পুরোনো কিছু স্মৃতি দেখি, পরিচিত কারও খোঁজ নিই, তারপর আবার হারিয়ে যাই নিজের ব্যস্ততায়।
সেদিনও ঠিক তেমনভাবেই ঢুকেছিলাম।
নোটিফিকেশন ঘাঁটতে ঘাঁটতে মেসেঞ্জারে একটি অপঠিত বার্তা চোখে পড়ল। প্রেরকের নাম—সেলিনা।
বার্তাটি খুব ছোট।
“প্রিয় মোহাম্মদ শরিফুল আলম!”
মাত্র তিনটি শব্দ।
কিন্তু এই তিনটি শব্দই আমার মনে এক ধরনের কৌতূহল তৈরি করল।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতারণা, ভুয়া পরিচয় আর অসংখ্য ফেক আইডির ভিড়ে এমন মেসেজ দেখলে সন্দেহ হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমিও প্রথমে তাই ভেবেছিলাম। মনে হয়েছিল হয়তো কোনো ভুয়া অ্যাকাউন্ট। হয়তো কোনো উদ্দেশ্য আছে। তাই মেসেজটি দেখেও উত্তর দিইনি।
দিন কয়েক পর আবার মেসেজটি চোখে পড়ল।
মনের ভেতরে তখন অন্যরকম একটি প্রশ্ন জাগল।
যদি মানুষটি সত্যিই বাস্তব হন?
যদি তিনি কোনো প্রয়োজনেই যোগাযোগ করতে চান?
সন্দেহ আর কৌতূহলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত উত্তর দিলাম।
“কে আপনি?”
প্রশ্নটা পাঠিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
কিন্তু কোনো উত্তর এল না।
একদিন গেল, দুদিন গেল।
নীরবতা।
আমি তখন আমার বাস্তব ফেসবুক আইডির লিংক এবং হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর দিয়ে লিখে রাখলাম, প্রয়োজন হলে যেন সেখানে যোগাযোগ করেন।
তারপরও কোনো সাড়া নেই।
অবশেষে কিছুটা মজা করেই আবার লিখলাম—
“কিতাগো ভাই, আপনি যে আপনার পরিচয় দিলেন না!”
এবার উত্তর এল।
ছোট্ট একটি বার্তা।
“আমি মোস্ট সেলিনা আক্তার। আমি ঢাকায় থাকি। একটা মেডিকেলে চাকরি করি।”
এরপর আরেকটি মেসেজ।
“আপনাকে চিনি না। ফেসবুকে দেখেছি তাই নক দিয়েছিলাম অ্যাড হওয়ার জন্য।”
আরেকটি।
“আপনি কেমন আছেন? কোথায় থাকেন?”
এই ছিল পরিচয়ের শুরু।
কোনো নাটকীয়তা ছিল না।
কোনো প্রেমের গল্পও নয়।
ছিল শুধু দুইজন অপরিচিত মানুষের ভদ্র ও সাধারণ কথোপকথন।
কথা বলতে বলতে জানতে পারলাম, সেলিনার বাড়ি ঠাকুরগাঁও জেলায়। বর্তমানে তিনি ঢাকায় থাকেন এবং একটি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করছেন।
মানুষকে সাহায্য করাই যেন তার পেশা এবং নেশা।
আমি মজা করে বলেছিলাম, “তাহলে আমার চিকিৎসার দায়িত্বও আপনাকেই নিতে হবে।”
তিনি হেসে উত্তর দিয়েছিলেন,
“আপনি শুধু বলবেন, আপনাকে কিভাবে সহযোগিতা করতে পারি।”
এই একটি বাক্য আমাকে অদ্ভুতভাবে স্পর্শ করেছিল।
কারণ পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছে, যারা কথা বলে।
কিন্তু খুব কম মানুষ আছে, যারা সাহায্যের কথা বলে।
এরপর ধীরে ধীরে কথোপকথনের পরিধি বাড়তে লাগল।
একসময় তিনি তার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরও দিলেন।
সেখান থেকেই শুরু হয় নতুন এক বন্ধুত্বের যাত্রা।
বন্ধুত্ব—শব্দটি যত সহজ, বাস্তবে তা ততটাই কঠিন।
আমার জীবনের অভিজ্ঞতা অন্তত তাই বলে।
সত্যি কথা বলতে কী, আমার জীবনে কোনো নারীর সঙ্গে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব খুব বেশি দিন টেকেনি।
এর জন্য হয়তো আমিই দায়ী।
আমার একরোখা স্বভাব, স্পষ্টবাদিতা, মুখের ওপর সত্য কথা বলে ফেলার অভ্যাস—সব মিলিয়ে অনেক সম্পর্কই সময়ের আগেই দূরত্বে হারিয়ে গেছে।
অনেকেই এসেছে।
আবার চলে গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ যোগাযোগ করেছে।
অনেক সুন্দরী নারীও বিভিন্ন সময় ফেসবুক কিংবা হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠিয়েছেন।
কিন্তু আমি সেসবের বেশিরভাগের উত্তরই দিইনি।
কারণ আমি কখনো অযথা কোনো ঝামেলায় জড়াতে চাইনি।
আর সবচেয়ে বড় কথা, সহজে কাউকে বিশ্বাস করতে পারিনি।
বিশ্বাস আমার কাছে খুব মূল্যবান একটি বিষয়।
যাকে বিশ্বাস করব, তাকে মন থেকে করতে চাই।
যাকে বন্ধু বলব, তাকে সত্যিকার অর্থেই বন্ধু ভাবতে চাই।
ভান কিংবা অভিনয়ের সম্পর্ক আমার কখনো ভালো লাগেনি।
এই কারণেই হয়তো জীবনের বড় একটা সময় আমি একাই কাটিয়েছি।
আজও আমি একা।
একা থাকতে শিখে গেছি।
একা থাকতেই অভ্যস্ত।
কিন্তু মানুষ যতই বলুক সে একা থাকতে চায়, মনের ভেতরে কোথাও না কোথাও একজন ভালো মানুষের জন্য অপেক্ষা থেকে যায়।
যে বিচার করবে না।
যে স্বার্থ খুঁজবে না।
যে অভিনয় করবে না।
যে শুধু মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াবে।
সেলিনার সঙ্গে পরিচয়ের পর বারবার সেই কথাটাই মনে হয়েছে।
হয়তো মানুষটি সত্যিই ভালো।
হয়তো তিনি অন্যদের মতো নন।
হয়তো এই পরিচয়টুকু শুধু পরিচয় হয়েই থাকবে।
হয়তো সময়ের সঙ্গে হারিয়েও যাবে।
আবার হয়তো টিকে থাকবে বহুদিন।
কে জানে?
ভবিষ্যৎ তো কেউ বলতে পারে না।
তবে এটুকু বলতে পারি, পৃথিবী যতই স্বার্থপর হয়ে উঠুক, মানুষের প্রতি বিশ্বাস পুরোপুরি হারিয়ে ফেলাটা ঠিক নয়।
কারণ কখনো কখনো একটি ছোট্ট বার্তাও মানুষের জীবনে নতুন ভাবনার জন্ম দেয়।
একটি ‘প্রিয়’ সম্বোধনও নতুন করে মানুষের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।
আজ আমার বন্ধু তালিকায় অনেক পরিচিত মানুষ আছেন।
বিভিন্ন পেশার, বিভিন্ন শ্রেণির, বিভিন্ন অবস্থানের মানুষ।
অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সাংবাদিক, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, সমাজকর্মী—অনেকেই আছেন।
কিন্তু ব্যক্তিগত অনুভূতির গল্প খুব কম মানুষের সঙ্গেই ভাগাভাগি করেছি।
হয়তো কখনো করিনি।
তবুও এই অচেনা পরিচয়ের গল্পটি লিখতে বসে মনে হলো, মানুষের জীবনে সম্পর্কের সংজ্ঞা আসলে খুব জটিল নয়।
কখনো কখনো একটি আন্তরিক বার্তাই যথেষ্ট।
একটি শুভেচ্ছাই যথেষ্ট।
একটি মানবিক বাক্যই যথেষ্ট।
সেলিনা হয়তো আমার জীবনের কোনো বিশেষ চরিত্র নন।
হয়তো সময়ের স্রোতে তিনি হারিয়ে যাবেন।
হয়তো থেকে যাবেন একজন ভালো বন্ধু হয়ে।
কিন্তু এই পরিচয় আমাকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে—
পৃথিবী এখনো পুরোপুরি খারাপ হয়ে যায়নি।
এখনো কোথাও কোথাও কিছু ভালো মানুষ আছেন।
যারা কোনো স্বার্থ ছাড়াই শুধু মানুষকে মানুষ ভেবে কথা বলতে জানেন।
আর সেই কারণেই, একটি পুরোনো ইনঅ্যাকটিভ ফেসবুক আইডিতে আসা একটি ছোট্ট বার্তা আজ আমার কাছে শুধুই একটি মেসেজ নয়—
এটি মানবিকতার প্রতি নতুন করে বিশ্বাস করার একটি গল্প।
প্রকাশিত সংবাদটি আমাদের প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে প্রস্তুত ও পুনর্লিখন করা হয়েছে। নতুন বা ভিন্ন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি হালনাগাদ করা হবে।
খাল পরিষ্কারে নেমে কাদায় আটকে গেলেন ইউএনও, তবু থামেননি কাজ

সরকারি বরাদ্দের অপেক্ষা না করে স্বেচ্ছাশ্রমে দুই কিলোমিটার খাল পরিষ্কারের উদ্যোগ, ইউএনওর সঙ্গে শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী
বরিশালের উজিরপুরে দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে থাকা একটি খাল পরিষ্কারের অভিযানে নিজেই নেমে পড়েন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা। পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে গিয়ে একপর্যায়ে কাদায় আটকে যান তিনি। পরে স্বেচ্ছাসেবীরা তাঁকে টেনে উদ্ধার করেন। তবে এতে দমে না গিয়ে আবারও খাল পরিষ্কারের কাজে যোগ দেন তিনি।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) উজিরপুর উপজেলা পরিষদসংলগ্ন প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ খালে এ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালিত হয়। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিডি ক্লিন বরিশালের সহযোগিতায় আয়োজিত কর্মসূচিতে ইউএনওর পাশাপাশি শতাধিক স্বেচ্ছাসেবী, স্থানীয় তরুণ-তরুণী ও যুবসমাজের সদস্যরা অংশ নেন।
সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত টানা পাঁচ ঘণ্টা চলে পরিচ্ছন্নতা অভিযান। এ সময় খাল থেকে কচুরিপানা, প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিনসহ দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য অপসারণ করা হয়। এতে খালের পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একসময় খালটি ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছিল। কচুরিপানা ও প্লাস্টিক বর্জ্যে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আশপাশের এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে খালটির এমন দুরবস্থা চলছিল।
অভিযানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে ইউএনও মো. আলী সুজার সরাসরি অংশগ্রহণ। বিডি ক্লিনের টি-শার্ট পরে স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে তিনিও খালের ময়লা পরিষ্কারে নেমে পড়েন। একপর্যায়ে কাদায় আটকে গেলে স্বেচ্ছাসেবীরা তাঁকে টেনে তুলে সহযোগিতা করেন। এরপর আবারও কাজে যোগ দেন তিনি।
ইউএনওর খাল পরিষ্কারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে একজন সরকারি কর্মকর্তার সরাসরি অংশগ্রহণকে দায়িত্ববোধ, জনসম্পৃক্ততা ও নেতৃত্বের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন অনেকে।
বিডি ক্লিনের বিভাগীয় সমন্বয়ক জাহেদ ইরফান বলেন, উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজার আহ্বানে দীর্ঘদিনের অপরিচ্ছন্ন খালটি পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় স্থানীয় তরুণ-তরুণীসহ শতাধিক স্বেচ্ছাসেবীর অংশগ্রহণে কর্মসূচিটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। ইউএনও নিজে স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করায় সবাই আরও উৎসাহিত হয়েছেন।
ইউএনও মো. আলী সুজা বলেন, খালের পাশের বাসিন্দাদের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিনসহ বিভিন্ন বর্জ্যে পানিপ্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সরকারি বরাদ্দের অপেক্ষায় না থেকে সম্মিলিত স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে উদ্যোগী হলে সমাজের অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। এই পরিচ্ছন্নতা অভিযান তারই একটি উদাহরণ।
তিনি আরও বলেন, তরুণ-তরুণী ও যুবসমাজকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত রাখা অত্যন্ত জরুরি। অবসর সময়ের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে অনেকেই নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে। পরিচ্ছন্নতা অভিযানসহ সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রমে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। এতে তারা মাদকাসক্তি ও মোবাইল ফোনের অপব্যবহারসহ বিভিন্ন নেতিবাচক প্রবণতা থেকে দূরে থেকে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারবে।
৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২ সফটওয়্যার, সাধারণ মানুষের কতটা কাজে আসছে?

১০ বছর ধরে চলা বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পে ব্যয় ৮০ কোটি টাকা, অধিকাংশ প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত; প্রকল্পের কার্যকারিতা ও ব্যয় নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন
তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার সহজ ও সমৃদ্ধ করতে ১০ বছর ধরে কাজ করছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ। এ সময়ের মধ্যে ১২টি সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি উপকরণ তৈরি করতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। তবে বিপুল অর্থ ব্যয়ে তৈরি এসব প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের কতটা কাজে আসছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
২০১৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ‘গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির প্রাথমিক বরাদ্দ ছিল ১৫৮ কোটি টাকা। তিন দফা মেয়াদ বাড়িয়ে সর্বশেষ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পটির আওতায় মোট ১৬টি সফটওয়্যার, প্রযুক্তি উপকরণ ও সেবা তৈরির পরিকল্পনা ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে ১২টির কাজ শেষ হয়েছে। তবে সব সেবা এখনো সাধারণ মানুষের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত কিংবা সহজলভ্য হয়নি।
প্রকল্পের আওতায় তৈরি করা হয়েছে বাংলা ভাষাভিত্তিক বিভিন্ন প্রযুক্তি। এর মধ্যে রয়েছে ছবি বা নথি থেকে লেখা শনাক্ত ও রূপান্তরের ওসিআর, অডিও থেকে লেখা তৈরি, বানান যাচাই, ব্যাকরণ সংশোধন, ভাষা অনুবাদ, বাংলা ফন্ট ও কিবোর্ড, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য স্ক্রিন রিডার, ব্রেইল কনভার্টার এবং ইশারাভাষা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি। সরকারি সেবা সম্পর্কে তথ্য দিতে তৈরি করা হয়েছে ‘জিজ্ঞাসা’ নামের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট।
ব্যবহারকারীর সংখ্যা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
প্রকল্পের বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সেবাভেদে ব্যবহারকারীর সংখ্যা ও কার্যকারিতায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। সরকারি সেবা সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার জন্য তৈরি ‘জিজ্ঞাসা’ চ্যাটবটে পরীক্ষামূলকভাবে প্রতিদিন গড়ে ১১০টি অনুরোধ আসে। বাংলা ফন্ট রূপান্তরের সেবায় ৩৫ দিনে ফাইল রূপান্তর হয়েছে মাত্র ২৭৫টি। অন্যদিকে বাংলা বানান যাচাইয়ের সেবায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ লাখ অনুরোধ আসে। কাগজডটএআই প্ল্যাটফর্মের ওসিআর সেবায় দৈনিক অনুরোধের সংখ্যা প্রায় ৫০টি।
প্রযুক্তিগুলোর কার্যকারিতা যাচাইয়ে বিভিন্ন সময়ে ব্যবহার করে দেখা গেছে, বাংলা বানান যাচাইয়ের সেবাটি তুলনামূলক ভালো ফল দিচ্ছে। তবে বড় আকারের অডিও ফাইল থেকে লেখা তৈরির ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ‘জিজ্ঞাসা’ সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেও জটিল প্রশ্নে কখনো কখনো বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বর্তমানে যে পরিমাণ গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ) সক্ষমতা রয়েছে, তা দিয়ে একসঙ্গে সীমিতসংখ্যক ব্যবহারকারীকে সেবা দেওয়া সম্ভব। তাঁদের দাবি, বিদ্যমান অবকাঠামোয় একসঙ্গে পাঁচ থেকে ১০ হাজার ব্যবহারকারী সেবা নিতে পারলেও চাহিদা বাড়লে অপেক্ষা করতে হয়। ফলে বৃহৎ পরিসরে সেবা চালু রাখতে অতিরিক্ত জিপিইউ ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো প্রয়োজন।
৮০ কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব
প্রকল্প সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সফটওয়্যার উন্নয়ন, হোস্টিং ও তথ্য সংরক্ষণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬০ কোটি টাকা। বাকি অর্থ ব্যয় হয়েছে অফিস ব্যবস্থাপনা, সভা-সেমিনার, প্রচার-প্রচারণা ও পরিচালন কার্যক্রমে।
তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশ্ন, তৈরি করা প্রযুক্তিগুলোর কোনটিতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং প্রকৃত ব্যয়ের সঙ্গে কাজের মানের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রকল্পের আওতায় শুধু সফটওয়্যার তৈরি নয়, বাংলা ভাষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভাষাপ্রযুক্তির উন্নয়নে প্রয়োজনীয় তথ্যভান্ডার তৈরির কাজও করা হয়েছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় আট হাজার কপিরাইটমুক্ত বই ডিজিটাল করা হয়েছে। বাংলা কথাকে লেখায় রূপান্তরের জন্য ১০ হাজার ঘণ্টা এবং লেখা থেকে কণ্ঠ তৈরির জন্য এক হাজার ঘণ্টার অডিও উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪৪টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষার ১২ হাজার মিনিটের বেশি অডিও এবং ইশারাভাষার ৪২ হাজার ৮০০টি ভিডিও সংগ্রহ করা হয়েছে।
মেয়াদ বাড়ানো নিয়ে সমালোচনা
প্রকল্পটির মেয়াদ ও ব্যয় নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আগের সরকারের সময় নেওয়া তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় কার্যক্রম বাদ দেওয়া এবং অনিয়মের অভিযোগ থাকলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পটির মেয়াদ বাড়ানো হলেও এর ব্যয় কমানো হয়নি।
আইসিটি সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা জানিয়েছেন, প্রকল্পের আওতায় বেশ কিছু প্রযুক্তি তৈরি হলেও সব কটির কার্যকারিতা সমান নয়। প্রত্যাশা অনুযায়ী সাধারণ মানুষের কাছে সেবাগুলো পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এসব প্রযুক্তিকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে এনে আরও ব্যবহারবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, আইসিটি খাতের চলমান প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে যেসব কার্যক্রম অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে, সেগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। ১০ থেকে ১২টি প্রকল্পের পরিধি পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে।
অন্যদিকে প্রকল্প পরিচালক মাহবুব করিম জানান, প্রকল্পের কাজ শেষ হলে প্রযুক্তি ও তথ্যভান্ডার বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী জিপিইউ কেনা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ থাকবে।
অতীতের প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আইসিটি খাতে ২১টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। আইসিটি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ছিল প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা।
২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট প্রকল্পগুলো পর্যালোচনায় ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রতিবেদনে বেশ কিছু প্রকল্পে উদ্দেশ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কার্যক্রম এবং আইসিটি বিভাগের আওতাবহির্ভূত কাজ অন্তর্ভুক্ত থাকার বিষয়টি উঠে আসে। অপ্রয়োজনীয় খাত বাদ দিলে প্রায় ৬ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আইসিটি খাতের প্রকল্পগুলোতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক বি এম মইনুল হোসেন বলেন, অতীতের প্রকল্পগুলোর কর্মপদ্ধতি ও ফলাফল যথাযথভাবে যাচাই না করে শুধু মেয়াদ বাড়ানো হলে পুরোনো কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে ১০ বছর ধরে বিপুল অর্থ ব্যয়ে তৈরি বাংলা ভাষাভিত্তিক প্রযুক্তিগুলোর বাস্তব উপযোগিতা, সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এসব প্রযুক্তি সচল রাখা এবং জনগণের ব্যবহার উপযোগী করার দায়িত্ব কে নেবে, সেটিও এখন বড় বিবেচ্য বিষয়।
বুড়িচংয়ে মাদরাসার শিক্ষা সফরের বাস খাদে, শিক্ষকসহ নিহত ২; আহত ৩০

কক্সবাজার যাওয়ার পথে কেরানীহাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা, আহতদের কয়েকজন চট্টগ্রাম মেডিকেলে
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার একটি মাদরাসার বার্ষিক শিক্ষা সফরের বাস ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। কক্সবাজার যাওয়ার পথে চট্টগ্রামের কেরানীহাট এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি মহাসড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়। এতে মাদরাসার সহকারী অধ্যাপকসহ দুজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন বাসচালকসহ অন্তত ৩০ জন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারী।
শনিবার (৭ নভেম্বর) ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে কেরানীহাটের নবনির্মিত রেলক্রসিং সংলগ্ন এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহতরা হলেন, বুড়িচংয়ের বাকশীমূল সুন্নিয়া ইসলামিয়া সিনিয়র মাদরাসার সহকারী অধ্যাপক সোহানা আফরোজ (৪৫) এবং অধ্যাপক নাদিরা আফরোজ মেঘলার স্বামী ও দৈনিক রূপসী বাংলা পত্রিকার ম্যানেজার মো. ইসরাফিল আলম (৫৫)।
মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মো. মফিজুল ইসলাম ও আইসিটি বিভাগের শিক্ষক মো. জাকির হোসেন দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মাদরাসা সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাত ১০টার দিকে বার্ষিক শিক্ষা সফরের উদ্দেশ্যে দুটি বাসে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা কক্সবাজারের পথে রওনা হন। বাস দুটি বুড়িচং সদর থেকে যাত্রা শুরু করে। শনিবার ভোরে কেরানীহাটের নবনির্মিত রেলক্রসিং এলাকায় পৌঁছালে একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয় এবং অন্তত ৩০ জন আহত হন।
দুর্ঘটনার বিকট শব্দ শুনে স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তাঁরা উদ্ধারকাজে অংশ নিয়ে বাসের ভেতরে আটকে পড়া যাত্রীদের বের করেন। পরে আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
আহতদের মধ্যে রয়েছেন মাদরাসার অধ্যাপক নাদিরা আফরোজ মেঘলা, শিক্ষক মাওলানা তাজুল ইসলাম ভূঁইয়া ও তাঁর স্ত্রী-সন্তান, আইসিটি বিভাগের শিক্ষক মো. জাকির হোসেন, তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে সামিয়া আক্তার নিহা, শিক্ষক আতিকুর রহমান, অধ্যাপক রাসেল, অফিস সহকারী আলাউদ্দিন, তাঁর স্ত্রী সুইটি আক্তার ও মেয়ে, দপ্তরি শাহজালাল, আয়া সেলিনা আক্তার এবং শিক্ষক রুনা লায়লা ও তাঁর স্বামীসহ ৩০ জন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারী।
এ দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বুড়িচংয়ের বাকশীমূল এলাকায় মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
দোহাজারী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুল আবছার দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশের টহল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে। স্থানীয়দের সহযোগিতায় হতাহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ওসি আরও জানান, দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি মহাসড়ক থেকে সরিয়ে থানা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। পুলিশ বিভিন্ন হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসার খোঁজখবর নিচ্ছে এবং নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে।
তবে কী কারণে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে।

































