

ফেব্রুয়ারীর জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ আয়োজনের ঘোষণা এলেও সংশয় এখনো কাটেনি। নির্বাচন কমিশনের তোড়জোড়, সরকারের দৃঢ় অবস্থান এবং বিরোধী পক্ষের দাবি সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক জটিল রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপ।

অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা, কিন্তু অনিশ্চয়তা কাটেনি
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষণা দেয় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার ভাষণে নির্বাচনের সময়সীমা নিশ্চিত করেন—রমজানের আগেই ভোট। নির্বাচন কমিশন প্রস্তুতি শুরু করেছে ঠিকই, কিন্তু স্পষ্ট রোডম্যাপ এখনো অনুপস্থিত।
সংস্কার ও সনদ: বিরোধের কেন্দ্রে
প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বলছে—এই অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো সংস্কার করার এখতিয়ার নেই। তারা চাইছে নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকার সংস্কার করুক। অন্যদিকে জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ইসলামপন্থী দলগুলো বলছে, সংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে নির্বাচন নয়।
এদের দাবি, “জুলাই সনদে” জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি। অনেক অমীমাংসিত বিষয় আছে। ৮৪ দফার চূড়ান্ত খসড়ায় ‘সংবিধান সংশোধনী দুই বছরের মধ্যে পাস হবে’ এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি গায়েব হয়ে গেছে।
পিআর বনাম আসনভিত্তিক ভোট: বিভক্ত রাজনীতি
সবচেয়ে বড় বিতর্কের জায়গা হয়ে উঠেছে—ভোট হবে কি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (PR) পদ্ধতিতে? জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ একটি শক্তিশালী ইসলামি ফ্রন্ট চাইছে পিআর পদ্ধতি। তাদের বক্তব্য, একমাত্র এই পদ্ধতিতেই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্ভব।
অন্যদিকে বিএনপি এই পদ্ধতির ঘোর বিরোধী। সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী স্পষ্ট করে বলেছেন, “পিআর কী সেটা যারা চাইছে তারাও জানে না।” দলটি বলছে, জনগণ এ ধরনের ব্যবস্থার জন্য প্রস্তুত নয়।
মাঠের বক্তব্য বনাম বাস্তবতা
জামায়াত নেতাদের বক্তৃতা দিনে দিনে আরও র্যাডিকাল হচ্ছে। এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী তো সরকারকে খোলাখুলি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন: “সংস্কার ও নতুন সংবিধান ছাড়া ভোট হলে, শহীদদের রক্তের দায় সরকারকে নিতে হবে।” এমনকি বঙ্গভবনের পতনের কথাও বলেন তিনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, জুলাই সনদের সূচনায় অসত্য তথ্য, আলোচনাবিহীন সিদ্ধান্ত এবং গোপন এজেন্ডা লুকানো রয়েছে। দলটি ৮৪ দফা খসড়া পর্যালোচনা করে ইসিকে মতামত পাঠাবে বলে জানিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি: দেরিতে শুরু, চ্যালেঞ্জ অনেক
নির্বাচন কমিশন এখনো নির্বাচনী রোডম্যাপ চূড়ান্ত করতে পারেনি। সীমানা পুনর্নির্ধারণ, ভোটকেন্দ্র তালিকা, নিরাপত্তা পরিকল্পনা—সবখানেই ধোঁয়াশা। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও মোটেই নিয়ন্ত্রণে নেই। প্রশাসনিক স্তরে অস্থিরতা অব্যাহত।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, খসড়া রোডম্যাপ তৈরি হয়েছে, কমিশনের অনুমোদনের পর চূড়ান্ত করা হবে।
সরকারের অবস্থান: ফেব্রুয়ারীতেই ভোট, কোনো ছাড় নয়
প্রধান উপদেষ্টা ও তার টিম বারবার ঘোষণা দিচ্ছে—ভোট হবে ফেব্রুয়ারিতেই, রোজার আগেই। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, প্রেস সচিব শফিকুল আলমসহ সবাই একই বার্তা দিচ্ছেন: “পিছিয়ে আসার প্রশ্নই আসে না।”
প্রেস সচিব বলেন, “সংস্কার, বিচার, নির্বাচন—এই তিনটি লক্ষ্যেই সরকার কাজ করছে। এখন সবার চোখ ফেব্রুয়ারীর নির্বাচনের দিকে।”
জনগণের প্রশ্ন: তাহলে ভোট হবে তো?
ওয়াকিবহাল মহল বলছে, একদিকে পিআর বনাম আসনভিত্তিক বিতর্ক, অন্যদিকে সনদ ও সংস্কার ঘিরে তীব্র মতানৈক্য—সব মিলিয়ে নির্বাচন নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
মাঠের বিরোধী পক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অল্প সময়ে সংস্কার সম্পন্ন করা অসম্ভব। এমনকি নির্বাচনের মতো জটিল ব্যবস্থাপনা গুছিয়ে তুলতে সময় নেই।
যার ফলে, সাধারণ মানুষের মুখে এখন একটাই প্রশ্ন—“ফেব্রুয়ারীর জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ আদৌ হবে তো?”